শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

পাঠক সমাচার








বই কেন পড়ব? কেন বই পড়ি? 

প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও সব ‘জানা উত্তর’ যে সঠিক তেমন নয়। হেঁয়ালি করে অবশ্যই বলা যায়, ‘পড়িলে বই, আলোকিত হই’। তা সত্যি সত্যি কতজন আলোকিত হন সেটা বিস্তর গবেষণার বিষয়। বই পড়লে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ হয় এমন কথা বিদ্বজ্জনেরা প্রায়শ বলে থাকেন। আবার ‘যে যত বেশি পড়ে সে তত বেশি মূর্খ হয়’ এমন বিরুদ্ধ ঘোষণাও শোনা যায়। আমরা যারা নিছক পাঠক তাদের এমন সব কূট-কচালে জড়িয়ে পড়া শোভন তো নয়ই, তার চেয়েও বড় কথা, মোটেও নিরাপদ নয়। অতএব নিরাপদ বলয়ে দাঁড়িয়েই বিষয়টা একটু নেড়ে চেড়ে দেখা যেতে পারে বটে। তবে অবশ্যই বিপদসীমা অতিক্রম না করে। 

‘কেন পড়ি’-র নানা রকম উত্তর হতে পারে। কেউ বলতেই পারেন, বলেনও, ‘না পড়ে পারি না তাই পড়ি’! অনেকটা কবি-লেখকদের ‘না লিখে পারিনা’ জবাবের অনুকরণ। কিংবা অনুরণন। এর মধ্যে কুঁজোর চিৎ হয়ে শোয়ার মত কোন সুপ্ত বাসনা থাকাও অসম্ভব নয়। আবার এক দল আছেন হা-ই তুলে বলবেন, ‘স্রেফ সময় কাটানোর জন্য পড়ি’, ব্যাস! কেউ কেউ এও মনে করেন যে ‘না পড়লে আপ-টু-ডেট’ থাকা যায় না। ‘অমুক বটিকা সেবনের দশটি কারণ’ গোছের গোটা বিশেক কারণ হয়ত ঝটপট বলে ফেলা যায়। যেমন -অভ্যাসবশত, জানার জন্য, পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, জীবনযুদ্ধের রসদ আহরণ, ব্যক্তিগত সামাজিক কারণ, সাংস্কৃতিক চেতনা বৃদ্ধি, নিজেকে সমৃদ্ধ করা, গবেষণার জন্য, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা পূরণ, আনন্দ লাভের জন্য, ইত্যাদি নানাবিধ বহু কারণ। 

সে যা হোক, পাঠককে নিয়ে রসিকতা বাদ দিয়ে এবার নাহয় রসিক পাঠকের দরবারে হাত পাতা যাক। দেখা যাক, সিরিয়াস পাঠকের সেলফে কোন উত্তরগুলো সাজানো আছে। আসলে বই পড়ার মধ্যে দিয়ে একজন পাঠক ক্লিন্ন-ক্লিষ্ট জীবনের দৈনন্দিন গল্প থেকে সাময়িক ছুটি নিয়ে অন্য গল্পের, অন্যের গল্পের শরিক হন। অন্যজনের অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়ার আগ্রহ মানুষের বোধহয় সহজাত। গুজবের আকর্ষণের মূলেও হয়ত সেরকম কিছু থাকে! বই যখন ছিল না তখনও মানুষ গল্প শুনেছে, কথকঠাকুররা তো লেখকেদেরই পূর্বসূরী। শোনা গল্পে আরো কিছু কল্পনার মিশেল দিয়ে অন্যকে শোনানোর চেষ্টায় গল্পও যেত বদলে। অর্থাৎ, শ্রোতা (কিংবা পাঠক) নিজস্ব কল্পনাশক্তি দিয়ে আরো কিছু যোগ করতেন। এ অনেকটা ‘উসকে’ দেওয়ার মত ব্যাপার। বই পড়ার ভেতর দিয়ে এই উৎসাহ-উদ্দীপনা জাগে। বই পড়তে হয় কারণ বই হচ্ছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের আলাপ। আর সে সংলাপে নিহিত থাকে আগামীর প্রস্তাবনা। 

প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন – ‘এ দেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি’। স্কুল কলেজের চাইতে গুরুত্ব যে বেশি সে বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র কারণ নেই। মনের অসুখ সারাতে বইয়ের জুড়ি নেই। অবশ্য এর উল্টোটাও যে ঘটে সেও ঠিক। বই অসুখ বাধাতেও পারে বইকি! কেউ একজন বলেছিলেন যে সাধারণ বিষ কটু স্বাদের জন্য সহজে চেনা যায়, কিন্তু যেসব বই বুদ্ধিবৃত্তিক বিষ ছড়ায় সেগুলো বহুক্ষেত্রে আকর্ষক হয়ে থাকে বলে বেশি বিপজ্জনক। বই নির্বাচনও তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন বই পড়ব কোনটা পড়ব না সে সিদ্ধান্ত গ্রহণও খুব একটা সহজ কম্মো না! জীবন সীমিত, কিন্তু বই তো অগণন! সব বই সবার কেন, কারোর পক্ষেই যহেতু পড়ে ফেলা সম্ভব নয় কাজেই বাছাই করে পড়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। 

কী করে বাছাই করা যায় ? প্রয়োজনানুসারে বাছাই করা যেতে পারে বটে। কিন্তু প্রয়োজনেরও কি শেষ আছে? প্রত্যেকের প্রয়োজনও তো আবার আলাদা! বইও আবার নানান জাতের, নানা গোত্রের। বিজ্ঞজনের পরামর্শ মানলে কিছু কিছু বই বারবার পড়া চাই, কিছু বই একবার পড়াই যথেষ্ট। আবার এমন বইও আছে যেগুলো না-পড়ে নেড়েচেড়ে রেখে দিলেও নাকি চলে! এত কিছু জানা বোঝা সত্ত্বেও বাছাই করার ধরাবাঁধা কোনও নিয়ম বা পদ্ধতি কিন্তু হাতের মুঠোয় মজুত নেই। তবে যে বিষয়ে সকলেই সমস্বরে সমর্থন জানাবেন সে হচ্ছে ভালো বই পড়া উচিত। খারাপ বই পড়ে সময় এবং শরীরপাত করার চেয়ে। যেহেতু এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না, অতএব ভালো বই পড়ার সবচেয়ে সহজ সূত্রটি তাদের মনে রাখতেই হবে বইকি! কী সেই সূত্র? (কানে কানে বলি) ভালো বই পড়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূত্রটি হচ্ছে খারাপ বই না পড়া !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ব্লগ সংরক্ষাণাগার