রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১২

নামের প্রতিমা : প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ



   
    
      “তোমরা রচিলে যারে
          নানা অলংকারে
      তারে তো চিনি নে আমি
      চেনেন না মোর অন্তর্যামী
তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই মোর নামের প্রতিমা”।  [‘নবজাতক’]
                                             

সার্ধ শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা – এরকম একটা বিষয়ে কিছু বলার চেষ্টা আসলে ‘স্বখাত সলিলে’ ডুবে মরার সামিল। এর মতো বিড়ম্বনা আর নেই। রবীন্দ্রনাথ যদি একজন হতেন তাহলে নাহয় গা-বাঁচানো বক্তব্যের একটা খসড়া তৈরি করা যেত। কিন্তু তা তো হবার জো নেই। রবীন্দ্রনাথ মানে তো আসলে ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’! আর কে না জানেন যে এই নানান রকমের ফুলের মধ্যে কোনও একটিকে রেখে  অন্যটিকে ছুঁড়ে ফেলা বস্তুত অসম্ভব। কেননা তাহলে মালাটিই হাপিস হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে গিয়ে তাই অবশ্যই ভাবতে হয় যে ‘কার’ বা ‘কাদের’ কাছে প্রাসঙ্গিক (অথবা অপ্রাসঙ্গিক) এই বিরাট মাপের মানুষটি? এবং কোন অর্থে?
বিশ্বকবি বলে যাঁকে জানি তাঁকে নিয়ে সত্যিই কি ভাবিত আজকের বুদ্ধিমান কিংবা বৌদ্ধিক জগত? মনে তো হয় না। অথবা এই ভারতবর্ষ নামক ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সবার কাছে তিনি কি সম ভাবে সমান মর্যাদায় গৃহীত? এরকমের বহু অস্বস্তিকর প্রশ্নের মোকাবিলা করে (কিংবা না করেই) ‘বাঙালি জাতির কাছে অতি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক’ এমন মন্তব্য অনায়াসে করা যায়, করা যেতে পারে। করা হয়েও থাকে আকছার। কিন্তু সমস্যা পিছু নেবে সেখানেও। বাঙালি বলতে কাদের বুঝব? ’৪৭ সালে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে যে বাঙালির শরীর, তার আত্মা কি ভূগোলের বেড়া ডিঙিয়ে একাত্ম হবার সামর্থ্য ধরে আজো! এপারের এবং ওপারের, উভয় বাঙালির জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেও কি একাত্ম হতে পারি আমরা! না, পারি না। সাময়িক কোলাকুলিতে আমরা যতই আবেগতাড়িত হই না কেন ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন সাক্ষ্য দেয়, কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের। ধরা যাক সত্তর দশকের কথা, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সাংঘাতিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, এমনকি তাদের কাছেও যাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রসমালোচনায় (?নিন্দা) মুখর হয়েছেন। অথচ এপার বাংলায় তখন অন্য ছবি। সত্তর দশককে মুক্তির দশকে বদলে দেবার নিটোল স্বপ্নে বিভোর সংগ্রামী তরুণদের কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন অপ্রাসঙ্গিক নন শুধু, চিহ্নিত হচ্ছেন শ্রেণীশত্রু রূপে! অর্থাৎ দেশ ভেদে আমূল বদলে গেছে প্রসঙ্গ। এ কিছু আশ্চর্যের নয়, ইতিহাসে এরকম নজির খুঁজলে অনেক মিলবে।
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের এভাবে প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক  হয়ে পড়া নিয়ে আমাদের মতো ছাপোষা মানুষেরা বিব্রত বিভ্রান্ত হই বটে, কিন্তু এরকম ঘটা খুবই স্বাভাবিক। কালের ব্যবধানও এরকম পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, দেয়। সাহিত্যে রবীন্দ্রোত্তর যুগের উচ্চকিত ঘোষণা শোনা গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ই, কল্লোল গোষ্ঠীর কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন কবি। আবার সুরেশচন্দ্র সমাজপতি কিংবা সজনীকান্ত দাসের মত ব্যক্তিরাও রবীন্দ্রনাথের সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন। কিন্তু এদের রবীন্দ্রবিরোধিতার কারণ ভিন্ন, ধরন আলাদা, মাত্রাও পৃথক। অর্থাৎ, দেশ কালের সীমায় কিংবা সীমানা পেরিয়ে বিরাট মাপের একজন মানুষ একই সময়ে এক দলের কাছে  প্রাসঙ্গিক এবং অন্য আরেক দলের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হতেই পারেন। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে প্রোজেক্ট  করে থাকে। রাষ্ট্রের কাছে এই যে প্রাসঙ্গিকতা তার সঙ্গে আমরা যে প্রাসঙ্গিকতার আলোচনায় মেতে আছি তা কি এক গোত্রের? নিশ্চয়ই না। আর সে কারণেই সীমান্তে বি এস এফ-এর গুলিতে নিহত নিরপরাধ যুবকের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের মর্মাহত তরুণ বন্ধুটি নিজস্ব ব্লগে যখন লেখেন, ‘সীমান্তে রবীন্দ্রনাথ ও বি এস এফের সঙ্গে একই সঙ্গে লড়তে হচ্ছে’, তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই ক্ষুব্ধ হই, অথচ বুঝতে চাইনা যে রাজনৈতিক ঠোকাঠুকির  দরুণ এক্ষেত্রে টুকরো হয়ে পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।

ব্লগ সংরক্ষাণাগার