(কবিতা পাঠকের জার্নাল)
১
‘সব কাজ তুচ্ছ হয় –পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা – প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়
শূন্য মনে হয়’
(জীবনানন্দ দাশ)
কাব্যের
আধুনিকতা যাঁর অভাবনীয় মনন ও অননুকরণীয় শব্দ সমন্বয়ে শরীরী হয়েছিল তাঁর কাব্যের এক
অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই এসেছে শূন্যতার এই বোধ। শুধু বোধ বললে হয়ত পুরোপুরি বলা
হয় না, বরং বলা ভালো বোধের এই বিপন্নতা
ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক অভিজ্ঞান। উনবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত নবজাগৃতির তুমুল
প্রচার এবং বিজ্ঞাপন সে অর্থে আধুনিক মানুষের জীবন-যাপনে, চিন্তা ও মননে তেমন কোন
সচ্ছলতা আনতে পারেনি। এক প্রান্তে শস্যের প্রত্যাশা আর অন্য প্রান্তে খরার শাসন –
এ দু’য়ের মাঝখানে ক্রমাগত বিদ্ধ ও বিধ্বস্ত হ’তে হ’তে শতাব্দীর দুই বন্ধ্যা দশক পেরিয়ে তৃতীয় দশকে পৌঁছে, আধুনিক মানুষ জেনেছে
তার পার্থিব দীনতার স্বরূপ। জেনেছে, কিন্তু আকুল আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও সে দৈন্য
অতিক্রমণের কোনো পন্থা আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। অন্বেষণের আন্তরিক প্রয়াস টুকুও
এক সময় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দন্ত-বিস্ফোটনে। এই পর্যায়
দহনের বেলা হিসেবেই স্বীকৃত ও চিহ্নিত।
এক সময় ঈশ্বরের মহিমাকে জানতে পারছি
অন্যদিকে,
বহির্ভুবনে, আন্তর্জাতিক স্তরে আরো নির্মম আরো ভয়ানক বিভীষিকা-পূর্ণ অভিজ্ঞতার
অকরুণ সাক্ষী হয়েছে বিগত শতাব্দীর মানুষ। হিরোসিমা-নাগাসাকি’র ধ্বংস যজ্ঞ সমগ্র
মানব জাতিকেই দাঁড় করিয়েছে বিরাট এক প্রশ্নের মুখোমুখি। বিপন্ন বিস্ময়ে মানুষ দেখেছে ‘শেষের
সে দিন’ কী ভীষণ কী ভয়ঙ্কর হতে পারে! বিশ্বাস-প্রতীতির প্রস্থান ভূমিতে দাঁড়িয়ে স্বভাবত মনে হয়েছে –‘হয়ত
অন্ধকারই সৃষ্টির অন্তিমতম কথা’। এভাবেই
তিন ও চারের দশকে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে জীবনের একমাত্র সম্বল শেষ আশাটুকুও। উদ্দীপনার
রঙ ফিকে হয়ে গেছে, ধীরে ধীরে সঙ্ঘ ভেঙ্গে গেছে আমাদের। সঙ্গতি বলে তখন আর কিছু
নেই, রক্তমাখা স্মৃতির মিনার শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে দীর্ঘশ্বাসের চেয়েও দীর্ঘ পথের কিনারায়।
সেই শুরু,
সঙ্কটের। জীবন ও জীবিকা, দু’য়েরই। এরই বিস্তৃতিতে পাঁচের দশকে এসে সযত্ন লালিত
মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের কাঠামোটিও টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে পড়ে। একমাত্র রক্ষাকবচ
ভদ্রতার মুখোসও খসে পড়ে, খসে খসে পড়ে। অপেক্ষাকৃত সংযমী (কিংবা ভীরু) কেউ-কেউ
ক্ষয়ের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে পুরোনো মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় শরীরপাত করে। কিন্তু পারে না, পারা
সম্ভব ছিল না বলেই। সমাজ ও প্রতিবেশের প্ররোচনায় এক সময় পার্ট- টাইম দুর্নীতির ফাঁদে
পা দেয় মানুষ, শুরু হয় অনিবার্য অন্তর্দাহ। একদিকে মাথার উপর পৃথিবীর মৃত্যু-আশঙ্কা,
আর অন্যদিকে ব্যক্তিগত দীনতার কাছে হাঁটু-মুড়ে
বসা –এই দ্বিবিধ যন্ত্রণায় তার ধান-ধ্যান দুই-ই নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। নিরাপত্তার
অভাব-বোধে আক্রান্ত মানুষ ক্রমশ নিজেকে শামুকের মত আবৃত করে ফেলে, জগৎ-সংসার থেকে
বিচ্ছিন্ন আত্মনির্বাসিত হয়ে আত্মরতিকেই সার বলে স্বীকার করে নেয়। যে-জীবন যাপনের
যোগ্য নয় সেরকম জীবনযাপনেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, ক্রমশ উন্মার্গগামী হয় তার চেতনা।
মানুষ নিজেকে বিকলাঙ্গ সভ্যতার ভ্রান্তির ফসল ‘চতুর্থ সন্তান’ ভাবতে শুরু করে, আর
মাঝে-মাঝে তার স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিকতাকে আত্মমগ্নতার খোলস পরিয়ে আর্তনাদ করে
ওঠে –
‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’!
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
অসহায় এই
উচ্চারণের বাইরে ব্যক্তি-মানুষের আত্ম- অথবা আর্ত- কোনো পরিচয়ই অবশিষ্ট থাকে না
আর। আসলে,ততদিনে, ‘জীবন যাত্রার মূলে লেগে গেছে চৈত্রের বাতাস’।
২
‘আমাদের স্বর্গ নেই, স্যারিডন আছে’।
(ভাস্কর চক্রবর্তী)
ব্যাণ্ড
মাস্টারের এই ঘোষণা নিয়েই বিবৃত হয় ছয়ের দশক। যা আসলে অন্য এক গভীর গভীরতর অসুখের
উপাখ্যান মাত্র। নিরাময় অসম্ভব জেনে শুরু
হয় বিকল্পের সহজ-সন্ধান – ‘স্বর্গে’র বিকল্প হিসেবে ‘স্যারিডন’ মান্যতা পায়। অতি
সহজেই পায়। এমন কি আরোগ্য আর উপশম যে কোনও অর্থেই এক নয় এই বোধ পর্যন্ত অস্বীকৃত
হয়। মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অধোগতি প্রায়
তলানিতে এসে ঠেকে, তখন, ‘মানুষ মানুষকে জীবিকা করে, মানুষ মানুষকে পণ্য করে’।
মূল্যবোধের বাণিজ্যীকরণে মানুষেরও বাজারদর পারদের মত
ওঠা-নামা করে, শুরু হয় অসুস্থ প্রতিযোগিতার ইঁদুর-দৌড়। ক্লান্ত-ক্ষতবিক্ষত-পর্যুদস্ত
মানুষ অতঃপর ‘তুমি আর আমি আর আমাদের
সন্তান, এই আমাদের পৃথিবী’-গোছের দর্শনের কাছে আত্ম-সমর্পণ করে বসে। শেষরক্ষা হয়
না তবু। আত্মভুক ছেঁদো-কলসির ফুটো বেয়ে ঝরে যায় মৃত্যুর চেয়েও শীতল ভালোবাসার
সবটুকু জল। ‘সমস্ত দিনের হীন-বাণিজ্যটাই ফাঁকা’ হয়ে যায়, দিনশেষে। নিরালম্ব যাম
মৃত্যুর কাছেই গচ্ছিত থেকে যায়।
ক্ষুধিত
প্রজন্মের কেউ কেউ তবু ‘আগুন-ভরা জল’ বুকে নিয়ে পরম দুঃসাহসে আগুনের মাঝখানে গিয়ে
দাঁড়ায়। যেহেতু
‘আগুনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালে গায়ে আর আগুন লাগে না’।
(ব্রত চক্রবর্তী)
তাই, পরবর্তী সাতের দশক অন্তত কিছু অঙ্গীকার অঙ্গীকৃত করে নেয়, আপন সামর্থ্যে। যাবতীয় পুরোনো আদর্শের ভিত নাড়িয়ে দিয়ে যায় ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষে’। এই একটি মাত্র দশক মধ্যবিত্ত রক্ত-বর্জনের ব্রত যাপন করে, যদিও শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তীয় রোমান্টিক বিলাসেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। ফলে,
ঘুমের শিথিলতা দুহাতে সরিয়ে স্বপ্ন আর রোদ্দুরের ছোঁয়ায় ঘটনার শরীর পায় না
চৈত্রের জ্যোৎস্নায় মাতাল কাকের মতিভ্রম ভোরকে আগাম জাগাতে পারে না’।
(রবীন সুর)
আর পারে না বলেই মানুষের
মুক্তাঞ্চল গড়ার স্বপ্ন-বাসনা দৃপ্ত পরাভব নিয়ে প্রত্যন্তবাসী হয়।
...
‘আমারও পায়ের কাছে চাপ চাপ রক্ত লেগে আছে,’-
(শঙ্খ
ঘোষ)
কিংবা‘
আমার নিহত মুখ রাজপথে বলে দেয় সুন্দর কিসের প্রতিমান ’।
(শঙ্খ ঘোষ)
-আত্মভুক
পাখির ডাকের মত এইসব উচ্চারণও একদিন সময়ের জঙ্ঘা বেয়ে আস্তে-আস্তে সরে যায়। অন্যতর
উচ্চারণ অনিবার্য জমি পেয়ে যায় অতঃপর।
‘জয় আমাদের হাতের মধ্যে নেই, বরং
পা ফেললেই পরাজয়।’
(পবিত্র মুখোপাধ্যায়)
উত্তর
সত্তরের এই খণ্ড-উপলব্ধি জন্ম দেয় এক সচেতন নিষ্ক্রিয়তার, কিংবা এক সক্রিয়
নিশ্চেতনার –পরবর্তী দশক পেরিয়ে আজ অবধি যা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ
দশকে পৌঁছে মানুষ তার হীন-জন্মের অধিকারটুকুও বুঝি হারিয়ে ফেলে, নিঃস্ব-রিক্ত তার
‘অকোষ বিড়ম্বনা’ ঘুচাতে তাই আর ঝরে না একবিন্দুও ‘চাতক-জল’। আত্মক্ষয়
যেন হয়েছে অক্ষয়। সমাজের বিবিধ বিভাজন আর মেধাহীন শ্রমের ফেনায় মানুষের ‘হা-নির্ণয়
সংজ্ঞা’ তাই মৃত্যুর কুহক রচনা করে চলে
কেবল। কোনো কিছুতেই আজ আর পীড়িত হই না আমরা, উদাসীন ধ্যান-যোগে ‘মন্ত্রের মতন আছি
স্থির’। স্বজনের মৃত্যুতেও আমরা আমাদের
মৌনতা ভাঙি না, আমরা আসলে ‘অজাতশত্রু’।
৩
‘কাল যে-ঘরে ছিলাম, আমি যে-ঘর ছেড়ে গিয়েছিলাম কোথায় সেই ঘর ?’...
(শঙ্খ ঘোষ)
হারানো
স্বদেশের খোঁজে পথে বেরিয়ে পথ হারিয়ে-ফেলা মানুষ কোথায় দাঁড়াবে আজ ? কোন পথে যাবে
? নিজের নিখোঁজ হওয়ার খবর নিজেই রাখে না যে-মানুষ তার কপালে নিজের শুশ্রূষার হাতও
বুঝি লভ্য নয়! অস্পষ্ট এই যুগ, হয়ত অন্তঃসারশূন্যও। শূন্যতা পীড়িত মানুষ তাই কোন
মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে অপারগ। যন্ত্রনির্ভর আধুনিক সভ্যতায় সম্পর্ক মাত্রেই ‘সিন্থেটিক
রিলেশন’ –আগাগোড়া কৃত্রিম। প্রতিবেশের সঙ্গে নিঃসম্পর্কিত সংযোগহীন একাকী মানুষের
কাছে ভিড় আর নিঃসঙ্গতা তাই সমার্থক হয়ে পড়ে। আর তাই ব্যর্থতার চরম গ্লানি ও ভবিষ্যতের প্রতি
চূড়ান্ত অনাস্থা নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে হয় একবিংশ শতাব্দীর বধ্যভূমির দিকে – ফাঁসির
রশি, গিলোটিন-সহ যাবতীয় মারণাস্ত্র যেখানে তারই কন্ঠনালীর অপেক্ষায়। গৌরবহীন
মৃত্যুই বুঝি মানুষের অন্তিম নিয়তি।
হয়ত তাই;
কিন্তু তার চেয়ে নিশ্চয় বহুগুণ শ্রেয় ‘গৌরবময় দৃপ্ত-পরাজয়’। আর সে কারণেই ‘বুকে
বর্শার ফলক নিয়েও’ বেঁচে থাকে বিপন্ন মানুষ, পৃথিবীর আঘ্রাণ নেয়। সন্তানের মুখ ধরে
চুমো খাবার আকুল আকাঙ্ক্ষায় হঠাৎ-অতর্কিতে আবিষ্কার করে ফেলে – ‘মানুষের মৃত্যু
হলে তবুও মানব বেঁচে থাকে’। আর তখনই,
‘...নিজের ছায়া হঠাৎ জড়িয়ে ধরে
তুমি কি সুন্দর নও ? বেঁচে আছো কেন পৃথিবীতে’?
(শঙ্খ ঘোষ)
কে জানে,
হয়ত এই জটিল জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই মানুষ একদিন ব্রাত্য থেকে বৃক্ষ হয়ে
উঠবে, অভিমন্যু থেকে অর্জুন ! আপাতত, এই
মুমূর্ষু বিশ্বাস নিয়েই আমাদের অপলক চেয়ে থাকা – অনাগত শতাব্দীর দিকে।...
“কিংবদন্তী জানে সেই বুড়োটির কথা, যে এখনো
খরায় জড়ানো দিনে মাটির আঘ্রাণ নিতে নিতে
বলে দিতে পারে বুকে কোনখানে জমে আছে জল
সমস্ত গাঁয়ের লোক তার শীর্ণ চোখে চেয়ে থাকে”। (শঙ্খ ঘোষ)
কে জানে
অনাগত শতাব্দীর কোনও কিংবদন্তীতে সত্যিই সেই বুড়োটির দেখা পাওয়া যাবে কি না, মাটির
আঘ্রাণ নিতে নিতে যে অনায়াসে বলে দেবে
আমাদের খরায় জড়ানো জীবনে আদৌ কোথাও জল জমে আছে কি না ! তবু, জানা না- জানার সংশয়
সত্ত্বেও, চেয়ে-থাকা শীর্ণ-চোখের এই বাস্তব-স্বপ্নে আমাদের অন্নহীন অস্তিত্বের
যেটুকু ইতিবাচকতা প্রকাশিত, তার মধ্যে হয়ত জীবনের অর্থ কিংবা সচ্ছলতা নয়, অন্য কোন
অন্তিম-বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে। শঙ্কায়-দ্বিধায় বিক্ষোভে-অনুরাগে বারুদরাশির ওপর
দাঁড়িয়েও তাই প্রলুব্ধ হতে সাধ জাগে, ভাবতে ইচ্ছে করে – হয়ত অন্ধকারই শেষ কথা নয়,
‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’য় একদিন উদ্ভাসিত হবে এ-পৃথিবীর মুখ। এ বিশ্বাসও
হয়ত তেমনি, উপড়ে-তোলা শিকড়ে লেগে থাকা মাটির গন্ধের মত, অপ্রতুল। ধ্বংসের মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে এই বিশ্বাসই তবু আঁকড়ে ধরতে হয়, আগলে রাখতে হয়, কেননা,
‘কেননা বিনাশ সেও কোষে কোষে উৎস রেখে যায়’ ।
(শঙ্খ ঘোষ)
৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪৪