পাঁচমিশেলি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পাঁচমিশেলি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২০

একুশ শতকে একুশের প্রাসঙ্গিকতা

 

 

প্যারিসের জেহান রিক্টাস স্কোয়ারের একটি দেয়ালে মানবিক ঐক্যের প্রতীক স্বরূপ ইউনেস্কোর অন্তর্ভুক্ত ও বহির্ভূত বহু দেশের নিজস্ব ভাষায় ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ কথাটি লেখা রয়েছে । দেয়াল জুড়ে পরস্পর অপরিচিত ও অচেনা অক্ষরমালার এমন সহাবস্থান যেন এই কথাই বলতে চায় যে, ‘তুমি আমার ভাষা বলো আমি আনন্দকে দেখি / আমি তোমার ভাষা বলি তুমি আশ্চর্যকে দেখো’ কিন্তু বাস্তবে  এরকম  ‘আনন্দে-আশ্চর্যে সাক্ষাৎকার’ তো দূর অস্ত , ‘আমি আমার ভাষা বলি তুমি তোমার ভাষা বলো’-গোছের সহনশীলতার পর্যায়েও পৌঁছতে পারেনি সভ্যতার বড়াই করা এ পৃথিবীর মানুষ । না, একুশ শতকের একটা দশক পাড়ি দিয়েও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ পতাকায় পতাকায় ফের মিল আনবে এমন আশা আমাদের পক্ষে আজো দুরাশা বইকি !  

একুশে ফেব্রুয়ারি । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে এই দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । তারপর থেকে সদস্য দেশগুলোয় সরকারি-বেসরকারি , প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান উদ্যোগে নানা ভাবে ‘মাতৃভাষা দিবস’  পালিত হয়ে আসছে । ভারতবর্ষেও হচ্ছে অবশ্যই । তবে তা মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেমিনার , সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল , কিছু সরকারি উদ্যোগ , আর পত্র-পত্রিকার এলোমেলো নিবন্ধাদিতে সীমিত থাকছে । জনসমাজে তার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে । ভাষা-সচেতনতা বলতে যা বোঝায় তা বস্তুত আমাদের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তদের মধ্যেও দুর্লভ । ভাসা-ভাসা ভাষা-প্রেম সম্বল করেই তাই নিয়ম-মাফিক চলে ‘একুশে’র বাৎসরিক উদযাপন । ‘শহিদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ ! না, পারি না ; সারা বছর ভুলে থাকতে পারলেও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটিতে তা পারি না । বাঙালি অতটা আত্মবিস্মৃত জাতি নয় অবশ্যই বরাক উপত্যকার বাঙালির কাছে ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’ মিলেমিশে একাকার । এই পারে ‘উনিশ’, ওই পারে ‘একুশ’ – ভাষা নদীর দুই কূল জুড়ে একই ইতিহাস ।  

            গোটা বিশ্বে কম বেশি ছ’হাজার ভাষা রয়েছে , যার হাজার তিনেক এ শতাব্দির শেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে । বিশেষজ্ঞদের এরকমই অভিমতবিশ্বায়নের জাঁতাকলে অবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে প্রতিনিয়ত । অঞ্চল বিশেষে এই জটিলতার মাত্রা ও পরিধি কেবল ভিন্ন নয় , প্রায় চরমে পৌঁছে গেছে । হাতের কাছের উদাহরণ  আমাদের প্রিয় রাজ্য অসম ।  কিন্তু এরকম এক জটিল পরিস্থিতিতে , যেখানে প্রতিদিন  কোন না কোন ভাষার সলিল সমাধি ঘটছে কিংবা ঘটার উপক্রম হচ্ছে , মাতৃভাষার সুরক্ষা আদৌ সম্ভব কি না সেটাই এক কঠিন জিজ্ঞাসা । এই প্রশ্নচিহ্নের ভূমিতে দাঁড়িয়েই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ প্রাসঙ্গিকতা বিচার্য । মাতৃভাষার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সম্পর্কই বা কি এবং কতটুকু সেটাও বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি । Nobel Laureate Mr. Hallor Laxness-এর মন্তব্য এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য – ‘the world becomes a poorer place whenever an international language swallows up a smaller one, but the international language becomes no richer for doing so...

মাতৃভাষা হচ্ছে চিন্তা-চেতনার আঁতুর ঘর । মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতির সারস্বত বৃত্তটি । মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা তাই সমগোত্রীয় । ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ হরিহর আত্মার । সংস্কৃতির বৈচিত্র আসলে বহুরূপে বিশ্বের অবলোকন , জীবন রহস্যের বহুমাত্রিক প্রতিফলন । সংস্কৃতির সমন্বয়ই হল  বৈশ্বিক উপলব্ধির একমাত্র পথ । এই সমন্বয় যদি কাঙ্ক্ষিত হয় তাহলে ভাষার মৃত্যু প্রতিরোধ করতেই হবে । মাতৃভাষার অধিকার তারাই দাবি করতে পারে প্রতিটি ভাষাকে যারা বৃহত্তর মানব পরিবারের সম্পদ জ্ঞানে সমমর্যাদা দিতে উৎসুক । ভাষাগত বিভেদ কিংবা সংস্কৃতির সংঘাত নিঃসন্দেহে শান্তি ও মৈত্রীর পরিপন্থী । সে কারণেই ১৯৯৯ সালের উল্লিখিত অধিবেশনে Kofi  Annan সময়োচিত মন্তব্য করেছিলেন যে - ‘ the lesson of our age is that languages are not mutually exclusive, but that human beings and humanity itself are enriched by communicating in more than one language .

বহু ভাষা ও বিবিধ সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠা সমাজ (Multilingual multicultural society) ব্যতীত মানব জাতির মুক্তি অসম্ভব । বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির বৈচিত্রকে স্বীকার করে নিয়েই সৃষ্টি হতে পারে বিশ্বমানবের নয়া বিশ্বসংস্কৃতি । এছাড়া বিশ্বশান্তির অন্যতর সম্ভাবনা আপাতত দৃষ্টিগোচর নয় । ‘সিভিল সোসাইটি’ গুলিকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে  আঞ্চলিক বৈশিষ্ট রক্ষা করার সাথে সাথে বিশ্ব-সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে তুলতেও হবে ।  শেকড়ে থাকবে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির সংহতি , আর শাখার বিস্তারে আন্তর্জাতিকতার বোধ ।  বিশ্ব-নাগরিক হয়ে ওঠার এই প্রয়াস ব্যতীত বিশ্বশান্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে । অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক উল্টো । বাচনে ভাষণে যেখানে বিবিধের মাঝে মিলনের এত অসংখ্য অপরূপ বিজ্ঞাপন সেক্ষেত্রে বাস্তবে  বিরোধ কেন ? এক কথায় একেবারে সহজ উত্তর একটা দেওয়া যায় অবশ্যই , এবং সেটা একেবারে ভুল উত্তরও নয় । উত্তরটা হল – বিশ্বায়নের বিশ্বজোড়া বিভেদনীতি । যে কোন জাতির ভাষা-সংস্কৃতি যদি কেড়ে নেওয়া যায় তাহলে সেই জাতিকে পদানত করা নিতান্ত সহজ হয় । সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসাবে  এই পদ্ধতি বারে বারে যে অনুসৃত হয়েছে সে সাক্ষ্য তো ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়ানো । বিশ্বায়নের বাজারকেন্দ্রিক অভিযান তাই সংস্কৃতিহীনতার এক বাতাবরণ তৈরিতে তৎপর । প্রতিটি ভাষাই আজ , এমনকি ইংরেজিও , কোন না কোন ভাবে এই বাজার কর্তৃক আক্রান্ত । পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন ভাষা-সংস্কৃতিকে বেঁচে থাকতে হলে অতি অবশ্যই এই মুনাফা-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে । পরিবর্তে গড়ে তুলতে হবে মানুষ-কেন্দ্রিক এক নয়া বিশ্বায়নের চেতনা । এটা সম্ভব হতে পারে কেবল জাতিগুলির সামূহিক ঐক্যের ভিত্তিতে । আর , বলা বাহুল্য , সেরকমের ঐক্য গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্তই হল পরস্পরের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ।  

কিন্তু বিশ্বায়নের তুখোড় কৌশুলিরা দুনিয়াটাকে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিতে চায় বাজার দখলের স্বার্থে । মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ককে হটিয়ে দিয়ে ওরা চায় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক বহাল করতে  সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের এটাই মূল নীতি । মুশকিল হচ্ছে , আমাদের সমাজের অনেক জ্ঞানী গুণীও এই বিশ্বায়নের পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন , চার দেয়ালের নিরাপদ ঘেরাটোপে বসে বাতানুকুল তত্ত্ব হাজির করছেন । একদিকে বিশ্বজোড়া ক্রমবর্ধমান দারিদ্র , খাদ্য সংকট , আর আরেক দিকে ভোগ-বিলাস ও অন্যায় অপচয় । বিশ্বের বিক্ষুব্ধ মানুষ শোষণ বঞ্চনার দুর্গে ঐক্যবদ্ধ বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে বসে তার জন্যই ভাষা ও ধর্মের নামে দিশাহীন জাতিগোষ্ঠী গুলিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়ার নিকৃষ্ট রাজনীতিকে হাতিয়ার করা হচ্ছে । আর অন্যদিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের নাটকীয় আয়োজনের মাধ্যমে মুনাফাখোর মুখগুলিকে খানিকটা মানবীয় আদল দেবার হাস্যকর প্রয়াস নজরে আসছে ।   

 

            তবে এও ঠিক যে , ভাষা কেন্দ্রিক বিভেদের রাজনীতি চোখে আঙুল দিয়ে এটাও দেখিয়ে দিচ্ছে যে বহুভাষিক ঐক্য ও বিবিধ সংস্কৃতির সমন্বয় বস্তুত সম্ভব । এই সম্ভাবনার উপলব্ধিটাই খুব জরুরি এসময় । ভাষার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্কটাও বুঝতে হবে ।  বুদ্ধদেব বসু বহুদিন আগে এ বিষয়ে সচেতন হতে বলেছিলেন তাঁর একটি নিবন্ধে । আধুনিক সমাজে ভাষাকে কেবলমাত্র মনের ভাব প্রকাশের উপায় বা মাধ্যম রূপে বিবেচনা করাটা যথার্থ বুদ্ধিমানের কাজ নয় । কেননা , জীবনযাপনের বর্ধিষ্ণু জটিলতা ভাষার ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে । মৌলিক ভাবগুলির বিনিময় ভাষার ব্যবহার ব্যতিরেকেও হয়তবা সম্ভব , কিন্তু ‘আমাকে ভোট দিন’ কথাটা বোঝাতে ভাষাটা চাই-ই । এই বাড়তি বোঝা কাঁধে চাপার দরুণ শুরু হল এক নয়া অধ্যায় – অন্যতর প্রয়োজনে ভাষার অ-স্বাভাবিক অ-মানবিক  ব্যবহার । প্রকৃত বিচারে ভাষার সংকটের মূল এখানেইদ্বন্দ্বটা আসলে জনসাধারণের ভাষার জনবিরোধী ব্যবহারের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত রাজনীতির কূট চাল এই দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত করে , যার অনিবার্য ফল অর্থহীন হানাহানি , অযথা রক্তপাত । এর হাত থেকে রেহাই  পেতে হলে আমাদের ব্যাপক অর্থে ‘ভাষায় এক ভালবাসায় এক মানবতায় এক’ হতেই হবে । বিশ্বের সব ভাষার মানুষই যেন আজ নিজস্ব শব্দমালায় ‘occupy wall street’ কথাটা দেয়ালে দেয়ালে লিখে দিতে চায় ।  এই প্রেক্ষাপট মনে রেখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত ও সঙ্কল্প যদি গৃহীত হয় তবেই তা আনুষ্ঠানিক আবেগের মঞ্চ-প্রদর্শনী না হয়ে উপযুক্ত মাত্রা লাভ করতে পারে । নতুবা উনিশের ভূমিতে একুশের চেতনা  একদিন  নূতন ঊষার সংবাদ বয়ে আনবে সে আশা  দুরাশা হয়েই থেকে যাবে!

 

 

        

 

 

 

 

 

 

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

সৌন্দর্যের বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সৌন্দর্য


সৌন্দর্যের বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সৌন্দর্য
মৃন্ময় দেব

রামধনুর সাতটা রঙের কথা প্রকাশ করায় নিউটনের ওপর বেজায় চটেছিলেন কবি জন কীটস। তাঁর বক্তব্য এই ছিল যে, এর দরুণ রামধনুর রহস্য (সৌন্দর্য) নাকি হারিয়ে গেল এবং তা নিয়ে নাকি আর কবিতা লেখা যাবে না। কথাটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, যেহেতু রামধনু নিয়ে তার পরেও কবিতা লেখা হয়েছে, আজও লেখা হচ্ছে। কথাটা কেন এলো বলি। বহুদিন যাবৎ একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে শিল্প ও সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কটি বুঝি বৈরিতার। এরকম ধারণা প্রচলিত হওয়ার মূলে বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের ধারণা, মতামত এবং মন্তব্য বহুলাংশে দায়ী। কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীত কিংবা চিত্রশিল্পীদের অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করেন যে শিল্প ও বিজ্ঞান হচ্ছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরস্পরবিরোধী এলাকা। ইংরেজিতে যাকে বলে water-tight compartment সেরকম বদ্ধ কক্ষ যেন, একটি থেকে অন্যটিতে প্রবেশের পথ চিররুদ্ধ। ঘটনা কিন্তু আসলে তা নয়। অভিজ্ঞতাও সে সাক্ষ্য দেয় না। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণের পক্ষে (শিল্পী-সাহিত্যিকরাও এক্ষেত্রে সাধারণ বর্গেরই অন্তর্ভুক্ত) বুঝে ওঠা হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর সৌন্দর্যবোধ বা শিল্পবোধ থাকা সম্ভব নয় এমন কথা আহাম্মকেও নিশ্চয় বলবে না। আইনস্টাইন থেকে শুরু করে আমাদের জগদীশ চন্দ্র বসু-মেঘনাদ সাহা চন্দ্রশেখর-রামানুজন-এর মত বিজ্ঞানীরা তার দৃষ্টান্ত।
সৌন্দর্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত। মানুষ, সে যে কোনো স্তরের হোক না কেন, নিজের কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। শিল্পীও না, বিজ্ঞানীও না। কিন্তু সৌন্দর্যবোধ বস্তুটি আসলে কী? সে কি কেবল বিষয়ীগত ব্যাপার? ‘সুন্দর যদি করে গো তোমারে আমার আঁখির ভুল, বলো তাহে কার ক্ষতি’ কিংবা ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’ মার্কা ব্যাক্তিগত বোধের নৈপুণ্য? এই বিষয়টাকেই নাহয় একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক। তবে সে প্রসঙ্গে যাবার আগে আরেকটা কথাও বলে নেওয়া দরকার। সৌন্দর্যের (এবং সাধারণ ভাবে শিল্পকলারও) নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, মানবমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার নিরিখেই সৌন্দর্যের ও সৃজনশীলতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয় মূলত। কবি কীটস কিন্তু সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে অন্যত্র বলেছিলেন – Beauty is truth, truth is beauty.- অথচ রামধনুর সাত রঙা বৈজ্ঞানিক সত্যের কাছে এসে তাঁর নিজের মন্তব্য ও সত্যের উপলব্ধি হোঁচট খেয়েছে। তর্কের একগুঁয়েমিতে হয়ত বলা যায় যে এ হচ্ছে ‘বস্তুর সত্য’, শিল্পের সত্য ভিন্ন বস্তু (?)। বোঝা যায় না, উপলব্ধির জিনিস।
তো আমরা এ নিয়ে সেরকম কোনো গূঢ় তর্কে সময় নষ্ট না করে বরং মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফুল-পাখি-গাছ-লতা-পাতা-নদী-পাহাড়-সমুদ্র সদৃশ যে সমস্ত মূর্ত বস্তু কিংবা কবিতা-গান-ছবি-নাচ ইত্যাদি যেসব বিমূর্ত বস্তু আমাদের কাছে সুন্দর বলে প্রতিভাত হয় তার মধ্যে একটা বিশেষ বিন্যাস (pattern) লক্ষ্য করা যায়, সাংগঠনিক এক সুষমতা (harmony) দৃষ্টিগোচর হয়। অর্থাৎ, আকার ও বিন্যাসগত বৈশিষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম ক্ষেত্রে বস্তু সমূহের বর্তমান রূপ বিবর্তিত রূপ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়ত্ত করে নেওয়ার একটা ব্যাপার রয়েছে যদিও এই আয়ত্ত করে নেওয়ারও এক বিবর্তন মূলক ইতিহাস রয়েছে। গুহা চিত্র থেকে আধুনিক চলচ্চিত্র অবধি যার বিস্তার। একই ভাবে রঙ-বেরঙের ফুলও যে বেঁচে থাকার ও প্রজাতি সংরক্ষণের তাগিদেই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রঙীন হয়ে কীট-পতঙ্গকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা লাভ করেছে সে তথ্যও আর অজানা নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা আদৌ বিষয়ীগত কিছু নয়। সেই যে এক শিল্পী বন্ধু একটা সুন্দর ফুল দেখিয়ে বিজ্ঞানীকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, কী সুন্দর ফুল! কিন্তু আপনি তো (কৌতুহল মেটানোর জন্য) এক্ষুনি এর পাপড়িগুলোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে এর সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলবেন’। উত্তরে, মৃদু হেসে বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘আপনি এখানেই ভুল করছেন, বাইরের এই সৌন্দর্যটা আমিও দেখছি, কিন্তু আমরা আরো গভীরে, অণু-পরমাণু স্তরে পৌঁছে এর এক একটা কোষ কীভাবে বিন্যস্ত হয়ে পাপড়িগুলোর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তাও দেখি। আমরা এর ভেতরের সৌন্দর্যটাও দেখতে পাই, আপনি যা কল্পনাও করতে পারেন না’।
কল্পনার কথা যখন এলো তখন বলি, কবি-শিল্পী মানুষেরা মেধার সঙ্গে কল্পনাশক্তির মিশেল দিয়েই শিল্প সৃষ্টি করে থাকেন, এবং তার জন্য তাদের অহমিকাও বর্তমান। তাই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা ‘নির্মাণ’ কথাটা ব্যবহার করেন এবং শিল্পের বেলায় ‘সৃষ্টি’ কথাটা ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। বাস্তবে কিন্তু একজন বিজ্ঞানীকেও প্রাথমিক ভাবে কল্পনায় ভর করেই এগোতে হয়, কল্পনাশক্তি বিহনে কোনো আবিষ্কারই বোধহয় সম্ভব হত না, সম্ভব নয়। রাতের আকাশে যে তারাটির দিকে তাকিয়ে গবেষণায় মগ্ন হন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তাকে কিন্তু কল্পনা করে নিতে হয় যে ওই তারাটি থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছতে কেটে গেছে কত লক্ষ লক্ষ বৎসর! তাহলেই বুঝুন, যেমন ভাবা হয়, শিল্প আর বিজ্ঞান তেমন কোন বিভাজিত জল-আঁট (water tight) কক্ষ নয় মোটেই। আকাশে ওড়ার অদম্য স্বপ্ন যদি না থাকত উড়োজাহাজের নির্মাণ কি বাস্তবে সম্ভব হত! আসলে সাহিত্য-সঙ্গীত-চিত্রকলা ইত্যাদি শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার ক্ষেত্রে যে সৃষ্টিশীলতা ক্রিয়াশীল থাকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনেও সেই একই মানবিক সৃষ্টিশীলতা বর্তমান। এটা বুঝতে না-পারার ফলেই ভুল ধারণা ঘাঁটি গেড়ে বসে মনের কোণে।
সৌন্দর্যের প্রতি, শিল্প-বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং বস্তুতে সৌন্দর্য আরোপ করা এক মানবিক প্রবণতা। যে কোনো সুন্দর বস্তু, মূর্ত কিংবা বিমূর্ত যাই হোক না কেন, মানুষের (মস্তিষ্কের) ওপর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া করে। আনন্দের উপলব্ধি ঘটে। এবারে ‘আত্মা’, ‘ঈশ্বর’ গোছের বিশ্বাসের (যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই) বশবর্তী না হলে এরকম প্রতিক্রিয়া কেন হয়, কিভাবে হয় ইত্যাদি প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে গত্যন্তর নেই। আর ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিল্পবস্তুর কিংবা সৌন্দর্যের আবেদন সৃষ্টিতে মস্তিষ্কের ভূমিকার বিষয়টি। প্রাণের উদ্ভব থেকে শুরু করে সমাজ বিকাশের ধারা তথা মানবিক বৈশিষ্ট ও বৃত্তি সমূহকে (শিল্প ও সৌন্দর্যের প্রতি অনুরাগও তার অন্তর্গত) বিবর্তনের নিয়ম গুলোর সাহায্যে বহুদূর অব্দি অনুধাবন ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি যে বস্তুত পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোকে (laws of physics) অনুসরণ করে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য কেবল এটা দেখানো যে আমাদের সৌন্দর্যের ধারণা (sense of beauty) ‘আকাশ থেকে পড়া’ কিংবা ‘ঈশ্বর প্রদত্ত’ বস্তু নয় আদৌ। বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য দুই মেরুতে অবস্থান করে না, এবং সম্পর্করহিতও নয়। অথচ এই ‘মিথ’ তৈরিতে আজও ইন্ধন যুগিয়ে চলেছেন বহুজনশ্রদ্ধেয় গুণী জনেরাও –অজ্ঞানে অথবা সজ্ঞানে।
এবারে বক্তব্যের সপক্ষে কিছু সাক্ষী-সাবুদ পেশ করা যাক। গর্ভস্থ ভ্রূণেও সঙ্গীতের (music) মূর্ছনা যে সাড়া জাগায় তা আজ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়ও প্রমাণিত (এবং সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতা বোঝাতে এ দৃষ্টান্ত সঙ্গীতপ্রেমীরাই প্রায়শ হাজির করেন)। বিবর্তনবাদ ছাড়া এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব? বিশ্বের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ধ্রুপদী এবং আধুনিক সঙ্গীতের স্বর-বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে গাণিতিক নিয়মানুসারে সেগুলোকে সূত্রবদ্ধ করা সম্ভব। বস্তুত সঙ্গীত এবং কোলাহলের মধ্যে পার্থক্য তো এই যে প্রথমটি সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত; আর দ্বিতীয়টি অবিন্যস্ত, বিশৃঙ্খল। নিসর্গ-চিত্র আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়। তা কি নিরাপদ স্থলভূমির নির্বাচন ও অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়? হিংস্র শ্বাপদকুলের হাত থেকে বাঁচতে প্রজাতি হিসেবে মানুষ যে সমতল ভূমিকেই বাছাই করেছিল সে তো দিনের আলোর মত স্পষ্ট। এই সাক্ষীসাবুদ পেশের অর্থ অবশ্য এ নয় যে শিল্প উপভোগের জন্য এসব বিষয় জানা জরুরি। স্বাদু আহারের স্বাদ গ্রহণের জন্য রসনার অস্তিত্বই যথেষ্ট, রন্ধনপ্রণালী সম্পর্কে জ্ঞান অপরিহার্য নয়। যেমন, স্পর্শের অনুভূতি আমাদের ত্বকে সাড়া জাগায় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে, সে তথ্য জানা না থাকলেও সাড়া জাগে। নদীতে অবগাহনে যে আনন্দ তা যদি কোন অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিকে নদীর উৎস-সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে তাতে অবগাহনের আনন্দ মাটি হয় না নিশ্চয়। একজন বিজ্ঞানী এই অনুসন্ধিৎসা নিয়েই সুন্দরের প্রতি নিবিষ্ট হন, সৌন্দর্যের ঘাতক হিসেবে নয় –যেরকম ভাবা হয়ে থাকে বহুক্ষেত্রে। আইনস্টাইন তাই ভায়োলিন বাজান, বলতে পারেন "Pure mathematics is, in its way, the poetry of logical ideas." জগদীশ চন্দ্র বসু ‘কবিতা ও বিজ্ঞান’ নামে প্রবন্ধ লেখেন, এমন কি একালের বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরও ‘Truth and Beauty’ রচনা করেন।

কাজেই সৌন্দর্যবোধ (এবং শিল্পবোধও) সম্পূর্ণ বিষয়ীগত (subjective) ব্যাপার নয়। একটা বিষয়গত (objective) দিকও বর্তমান রয়েছে। আপাতভাবে বিষয়ীগত মনে হলেও তার মূলে রয়েছে কার্য-কারণ সম্পর্ক (cause effect relation)। এই দিকটা খেয়াল থাকে না বলেই বহু মানীগুণী মানুষও ভুল বোঝেন, ভুল বোঝান। যুক্তির বদলে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেবার জন্যই এমনটা ঘটে। এও ঠিক যে নিরেট যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না, আবেগেরও প্রয়োজন আছে। তবে যে আবেগ বেগ কেড়ে নেয় তা নয়, বরং যে আবেগ জীবনপ্রবাহকে সমাজকে সজীব ও সতেজ রাখে সেই আবেগ প্রয়োজন। যুক্তির, বৈজ্ঞানিক যুক্তি পরম্পরার অবিহনে সে সজীবতা সতেজতা লভ্য নয়। মানবেতর জীব আবেগ-সর্বস্ব, কিন্তু মানুষের চেতনা আছে। মানবিক আবেগ তাই যুক্তি বর্জিত নয়, মানবিক যুক্তিও আবেগশূন্য নয়। বিজ্ঞানে যদি যুক্তির প্রাধান্য, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে-চিত্রকলায় তবে আবেগের প্রাচুর্য। দুয়ে মিলেই সম্পূর্ণ সত্তা। শিল্প ও বিজ্ঞান তাই একে অন্যের পরিপূরক, পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিজ্ঞান রহস্য-উন্মোচন করে সৌন্দর্য হরণ করে না, বরং এক পা এগিয়ে নতুন রহস্যের দুয়ারে এনে দাঁড় করায়। সৃজনশীল মনের জন্য, শিল্পীর তুলির জন্য যেমন, বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের জন্যও নতুন রসদ যোগায়। কেননা, জানার তো শেষ নেই, এক জানা অনেক অজানাকে সামনে নিয়ে আসে।
পৃথিবী জুড়ে আজ চারুকলা ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে, সৌন্দর্যবোধ তথা শিল্পবোধ নিয়ে চিন্তা উদ্রেককারী নানান ভাবনা-চিন্তা, গবেষণা চলছে। যেসব তথ্য উঠে আসছে তাতে সৌন্দর্য ‘বোঝার নয়, উপলব্ধির বিষয়’ –Beauty is to be perceived, not understood – জাতীয় উক্তির ক্লিশে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বিজ্ঞানের নয়া শাখা Computational Aesthetics তৈরি হয়েছে এই বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য। Science of Aesthetics আজ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক স্বীকৃত ও জরুরি বিষয় হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ, কবি, লেখক, নাট্যকার, আবিষ্কারক, ‘The Ascent of Man’ গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানী Jacob Bronowski-র অসাধারণ একটি মন্তব্য উদ্ধার করার লোভ সম্বরণ করা গেল না কিছুতেই – ‘‘We re-make nature by the act of discovery, in the poem or in the theorem. And the great poem and the deep theorem are new to every reader, and yet are his own experiences, because he himself re-creates them. They are the marks of unity in variety; and in the instant when the mind seizes this for itself, in art or in science, the heart misses a beat.”
ওই একটি ‘বীট’ (beat)যাতে ফসকে না যায় তার জন্যই এই ‘অফ-বীট’ রচনা। এছাড়া এ লেখার সপক্ষে আর কোনো কৈফিয়ত নেই।



মানুষ বনাম প্রকৃতি


ভণিতা

প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে ভাবতে বসলে বৃক্ষরোপণ আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কথাই মনে আসে এটা প্রায় বাঁধা গতে পরিণত হয়ে গেছে বলা যায় আর এই ওয়ার্মিং-এর জন্য দায়ী করা হয় মানুষকেই এতে ভুল নেই হয়ত, কিন্তু এর মধ্যে পুরো সত্যও নেইযদি পৃথিবীর গড় তাপ আজকের চেয়ে ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যায়,যার প্রবল   সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে,তাহলেও বহু লক্ষ বা বহু কোটি বছর পর এই গ্রহে নতুন প্রাণের উদ্ভব সম্ভব,  বায়োডাইভারসিটিও ফিরতে পারে। কিন্তু তা হবে মানুষের ধরা ছোঁয়া এমন কি কল্পনারও বাইরে পার্মিয়-ট্রায়াসিক (Permian-Triassic) যুগে,অর্থাৎ ২৫ কোটি বছরেরও বেশি আগে,প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রাণ - উদ্ভিদ,পশু সবই - ধ্বংস হয়ে যায়। পৃথিবীর বায়োডাইভারসিটি তার পুরোনো স্তরে ফিরতে পেরেছিল ৫ কোটি বছর পরে। বিশ্ব উষ্ণায়ণ হলে সভ্যতা ভেঙে পড়বে। এবং তার ফলে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হবে। শুধু তাই নয়,দ্রুত পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রজাতির মৃত্যু হবে।

এই যে বিনাশের,সভ্যতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কথা বলা হল, সে সভ্যতার জয়যাত্রা কিন্তু সম্ভব  হয়েছে প্রতিবেশের সঙ্গে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক ও সংযোগের ফলেইএকথাও অবশ্য সত্য যে, এই যাত্রা পথে সৃষ্টি হয়েছে  অনিবার্য সংঘাতেরও। মানুষ যেদিন থেকে আগুনের ব্যবহার আয়ত্ত করেছে সেদিন থেকেই দহন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে দম বদ্ধ করা ধোঁয়ারও। পরিবেশ দূষণের সেই শুরু। তারপর একে একে এসেছে কল-কারখানা, মায় পারমাণবিক চুল্লী অবধি দূষণের উৎস অঢেল। আজকের নগর-সভ্যতায় ‘অর্জন’ ও ‘বর্জন’ সমানুপাতিক নয়। বর্জ্য বস্তুর স্তূপে পরিণত হয়ে পড়ছে গোটা পৃথিবী। এক কথায় ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে, হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পরিণাম যে দুর্বিষহ সে তো দেখতেই পাচ্ছি সবাই।  সংকটের ভয়াবহতা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই তেমন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সঙ্কট থেকে মুক্তির উপায় কী?  কী ভাবে পাওয়া যাবে পরিত্রাণ? পরিত্রাণ পেতে হলে বুঝতে হবে সমস্যার ব্যাপ্তি ও চরিত্র, জানতে হবে মানুষ এবং পরিবেশের মধ্যে দেয়া-নেয়ার প্রক্রিয়াটিওসে চেষ্টাই আমরা করব এখানে, সীমিত সামর্থ্যে। 

 

মানুষ ও পরিবেশ   

মানুষ ও প্রকৃতির পাস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে একথা অনায়াসে বলা যায় যে, প্রকৃতি যেখানে মানব দেহ নয়,সেখানে প্রকৃতি মানুষের অজৈব দেহ। মানুষ প্রকৃতির দ্বারাই জীবনধারণ করে,এবং প্রকৃতির সঙ্গে ধারাবাহিক কথোপকথন তাকে চালাতেই হয়অর্থাৎ, সোজা কথায় মানুষের শারীরিক ও মানসিক জীবন প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্তএ কথা বলার অর্থ কেবল,প্রকৃতি নিজের সঙ্গে যুক্ত,কারণ মানুষ প্রকৃতির একটি অঙ্গ। মানবদেহ পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পরিবেশও মানবদেহের উপর প্রভাব ফেলে। এই  পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে উভয়েরই পরিবর্তন ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী,পরিবেশ নিস্ক্রিয় নয়প্রাণী অথবা জীব মাত্রেই,যাদের মধ্যে মানুষও পড়ে,মানুষের সামাজিক ক্রিয়াও পড়ে,তারা সকলে সকলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত তারা ধারাবাহিকভাবে একে অপরের সঙ্গে আদান-প্রদান ঘটায় এবং একে অপরকে রূপান্তরিত করে। আমরা যখন বলি, ‘অমুক প্রজাতি অমুক পরিবেশগত স্থান দখল করেছে’ (has occupied an environmental niche) তখন এমন একটা ধারণা তৈরি হয়,যেন ঐ স্থান বা niche-টি এমনিতেই তৈরি ছিল,আর ঐ প্রাণীটি পথ চলতে চলতে হঠাৎ সেটি দেখতে পেয়ে আনন্দের সঙ্গে নিজেকে সেখানে প্রবিষ্ট করে ফেলছেবস্তুত,প্রাণীদের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রথম থেকে মাথায় না রাখলে ‘পরিবেশ’ কথাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে

পরিবেশবাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য এক সহযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা। লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও গোল বাঁধছে লক্ষ্যপূরণের পদ্ধতিগত প্রশ্নে। মানুষের স্বার্থ আর প্রকৃতির স্বার্থে দেখা দিচ্ছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। একপক্ষের কাছে মানুষের স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে, অপর পক্ষের কাছে প্রধান হয়ে উঠছে প্রকৃতি। মানুষ ও প্রকৃতি যেন দুই যুযুধান পক্ষ। আবার ‘পরিবেশ বাঁচাও’-বাদীদের কারো কারো হাবভাব এমন যে প্রকৃতিকে ‘যেভাবে যেমন আছে সেভাবেই’ (in virgin state) টিকিয়ে রাখতে হবে, মানে ‘দাও ফিরে সেই অরণ্য’ আর কি ! তাতে চাই কি মানুষকে উৎসর্গ যদি করতে হয় তবে তাও সই। অর্থাৎ, মানুষ এবং প্রকৃতি যেন দুটো আলাদা বা পৃথক সত্তা। আর এই দুই সত্তার সম্পর্ক বুঝি সর্বাংশে বৈরিমূলকগোলমাল বাঁধছে তাই, প্রকৃতি-প্রেমিকের দৃষ্টিতে মানুষ হয়ে  পড়েছে খলনায়কমানুষের জন্য নয়, মানুষের কাছ থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করাই বুঝি এদের লক্ষ্য ও অভীষ্টঅর্থাৎ, মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে, বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটা প্রবণতা রয়েছে এক্ষেত্রে। সমস্যার মূলও সেখানেই নিহিত, এই ভুল বিভাজনের মধ্যে। মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ, এবং  এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থে যে মানুষ অন্যান্য প্রাণীকুলের মত ‘প্রকৃতির হাতের পুতুল’ মাত্র নয়। প্রকৃতির নিয়ম গুলোকে বোঝার সদিচ্ছা ও সামর্থ্য তার আছে। আর আছে বলেই প্রতিকূল পরিবেশ পরিবর্তিত হতে পারে অনুকূল পরিবেশে-মানুষেরই সামর্থ্যে, শুভবোধ, দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার দৌলতে।   

 

স্বল্প মেয়াদি লাভ, দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা  

আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, এমন এক যুগে বসবাস করছি যে-যুগে একদিকে প্রাচুর্য ও অপচয় অগাধ, অন্যদিকে শুধুই অভাব – খাদ্যের অভাব, পানীয় জলের অভাব, শুদ্ধ ও মুক্ত বায়ুর অভাব, শক্তি(energy)-র অভাব। এইসব অভাব-মোচনের মাধ্যমে জীবনযাপনে সুখ আমদানির নানাবিধ প্রচেষ্টা চলছে নিরন্তর। ফলাফল যে সব সময় সুখদায়ক হচ্ছে তা নয়, বরং বহুক্ষেত্রে যে অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা বলা বাহুল্য মাত্র। (অহেতুক তথ্য  ভারাক্রান্তির পথ পরিহারের সদিচ্ছা সত্ত্বেও) সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা বুঝতে খানিকটা সুবিধে হবে ভেবেই কয়েকটা বিষয় বাধ্যত উল্লেখ করছি। যেমন ধরুন, প্রতিদিন বিশ্বে যে পরিমাণ জল ব্যবহৃত হয় তা প্রকৃতির প্রদান ক্ষমতা থেকে ১০% বেশি।  অর্থাৎ, ওই অতিরিক্ত ১০% জল জোর জবরদস্তি করে প্রকৃতিকে শোষণের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যদিও তা অপরিহার্য নয় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ এখান থেকেই শুরু হচ্ছে।  

আবার ধরুন, বিভিন্ন রাসায়নিক সার, কীটনাশক  ইত্যাদির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিমাণগত ভাবে ফসলের বৃদ্ধি ঘটানো হল, কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল যে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে বহুলাংশে। অর্থাৎ, সাময়িক লাভ সামগ্রিক লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। প্রযুক্তি-নির্ভর তথাকথিত উন্নয়নের জন্য ‘শক্তি’(energy)-র চাহিদা বিরাট। প্রচুর মজুত সত্ত্বেও কয়লার ব্যবহার কিঞ্চিৎ, কারণ এ হচ্ছে ‘নোংরা জ্বালানি’-পেট্রোল-ডিজেল-এর বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় আদৌ। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৬০% ব্যয় হয় কেবল পরিবহনের জন্য। খাদ্যশস্য থেকে জ্বালানি নির্মাণ প্রকল্পের ( ‘fuel for food’ policies’) ফলে উদ্ভুত সমস্যার একটি দৃষ্টান্ত দিই – যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টা (corn)-র মূল্যবৃদ্ধি ঘটার অন্যতম কারণ হল কৃষিপণ্যজাত ইথানল তৈরির জন্য ভর্তুকি  প্রদান। এদেশেও জেট্রোফা থেকে ডিজেল তৈরির প্রয়াস একই সমস্যা সৃষ্টি করবে হয়ত অদূর ভবিষ্যতেঅথচ বিকল্প শক্তির উৎস গুলোকে ব্যবহারের সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। স্বল্প মেয়াদি লাভ এভাবেই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি করে। খাদ্য, জল ও শক্তি ক্ষেত্রে যা ঘটে তা অনিবার্য কারণেই পরিবেশকে প্রভাবিত করে, পক্ষান্তরে পরিবেশে যে বদল ঘটে তা আবার পূর্বোক্ত তিনটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করে।  

আজকের পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যার মূলে রয়েছে এক শ্রেণির মানুষের অত্যধিক লোভ-লালসা এবং আশু ফল লাভের অপরিণামদর্শী মানসিকতা। এক শতাব্দীর বেশি আগে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস শ্রেণিবিভক্ত সমাজে স্বল্পমেয়াদি   স্বার্থসিদ্ধি ও  তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা উদ্রেকের নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমরা মানুষরা প্রকৃতির উপর যে বিজয় অর্জন করেছি তা নিয়ে নিজেদের বেশি পিঠ চাপড়ানি দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি  আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। একথা ঠিক যে প্রতিটি বিজয় প্রথমত,আমরা যে ফল চেয়েছিলাম,তা এনে দিয়েছে ;কিন্তু দ্বিতীয়ত এবং তৃতীয়ত,ভিন্ন,অপ্রত্যাশিত ফল দেখা দিয়েছে,যা অনেক ক্ষেত্রে প্রথমটির নেতি ঘটিয়েছে।” এই তো কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডে যা ঘটে গেল তাকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ (natural calamity) মানতে নারাজ অনেকেই, পরিবেশবাদীরা তো বটেই। পরিবর্তে এই দুর্ঘটনাকে ‘মানুষের তৈরি দুর্যোগ’ (man made disaster)হিসাবেই বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ। কথাটা মিথ্যে নয় অবশ্যই ।

দৃষ্টান্ত ইচ্ছে করলেই বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োজন বোধহয় নেই। কেননা, মূল কথাটা এর থেকেই পাঠকের কাছে নিশ্চয় পরিষ্কার হয়ে যাবেসে যা-ই হোক, আপাতত সে প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে আমরা পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাটিকে একটু নেড়ে চেড়ে দেখতে চেষ্টা করব। একথা নিশ্চয় অনস্বীকার্য যে পরিবেশগত পরিবর্তন মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এক ভয়ানক সঙ্কটের সূচনা করেছে এবং এর থকে বেরুনোর পথ খুঁজতে ব্যস্ত সব পক্ষই। যদিও খোঁজার ধরনে পার্থক্য বর্তমান। পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতার মূলে যে ব্যাপার বা উদ্দেশ্যটি রয়েছে তা তো আসলে মানুষের বেঁচে থাকা, জীবনযাপনের পথটাকে সহজ সুগম করার উপায় বের করার নিরন্তর প্রয়াস ছাড়া অন্য কিছু নয়। অথচ অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন  যে মানুষ যেন ‘যে ডালে বসে আছে সে ডালটিকেই কাটতে চাইছে’ বোকার মতন।

 

সমস্যার মূল কোথায় ?

কিন্তু এই অপরিণামদর্শিতার হেতু কী ? মানুষ তো বোকা নয়, বুদ্ধিমান জীব ! তাহলে ? এই আত্মঘাতী প্রবণতার মূল কোথায় ? মানুষ মাত্রেই কী এই আত্মঘাতের জন্য সমভাবে দায়ী ? এইসব সাধারণ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাধানের সূত্রটিও। উত্তর খোঁজা যাক তবে ! মানুষের কাজের দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে মানুষ কেন তাকে যথাযথভাবে দেখে নি ? এর কারণ হল,শ্রেণীবিভক্ত সমাজে,একদিকে রয়েছে শাসক-শোষক শ্রেণী,যাদের কাছে (অন্তত সাধারণভাবে) গচ্ছিত আছে জ্ঞান,অথচ তারা সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করতে চায় নিছক নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে;আর অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষ,যারা বিকল্প চায়,কিন্তু বিকল্প সম্পর্কে তাদের ধারণা সব সময় স্বচ্ছ নয়। একারণেই,গণচেতনা-গণবিদ্রোহকে নতুন উদীয়মান উচ্চবর্গীয়রা অনেক ক্ষেত্রেই কুক্ষিগত করে ফেলতে সমর্থ হয় ইউরোপে সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ে শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-ছোটো চাষী সকলেই সামিল হলেও নেতৃত্ব দিতে এই জন্যই   সক্ষম হয়েছিল বুর্জোয়া শ্রেণী। আর বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের ফলেই দীর্ঘমেয়াদী ফল বিশ্লেষণ করার চেষ্টা শিকেয়   উঠে গেল। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের এক প্রসিদ্ধ উক্তি হল,‘in the long run we will all be dead’ - অর্থাৎ,আমরা তো সবাই একদিন মরব, অতএব, বেশি দীর্ঘমেয়াদী ফলের কথা ভেবে কী হবে ?

 

‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’

এই বহুশ্রুত বচনটিতে ‘বীরের দল’ আসলে কারা ? সেটা জানা ও বোঝা দরকার। সামাজিক বিবর্তনের ফলে একটা পর্যায়ে আদিম সাম্যের  মানবিক নীতি পরাস্ত হবার ফলে সম্পদের গোষ্ঠী (সামাজিক) মালিকানার বদলে উদ্ভব  হল ব্যক্তি-মালিকানার। বিভাজিত হল মানুষ, মানুষের সমাজ। বিভিন্ন শ্রেণির জন্ম হল। দেখা দিল শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, শ্রেণিসংঘাত। শোষক-শোষিত শাসক-শাসিতে  বিভাজিত হল দুনিয়া। পৃথিবীকে ভোগ করার সামাজিক ছাড়পত্র নিয়ে শাসক-শোষকের দলটিই হয়ে উঠল বীরের দল। দলের মধ্যেও এল দলাদলি, কাড়াকাড়ি – ভোগ্য বস্তুর দখলদারি নিয়ে। এরই চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে  পেলাম, দেখতে পাচ্ছি বাজার দখলের জন্য সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মধ্যে। ওই যে কথায় আছে না, ‘যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়, উলু খাগড়ার প্রাণ যায়’-এখানে উলু খাগড়া হচ্ছে শোষিত-শাসিত আমজনতা, আর অতি অবশ্যই আমাদের ধাত্রী ধরিত্রী, প্রকৃতি।

এই বীরের দল প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করার জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে না শুধু, একেবারে তছনছ করে ছাড়ে। সৃজনশীল শ্রমকে শোষণ করার মাধ্যমে যেমন ছিবড়ে করে ফেলে তাবৎ শ্রমজীবী মানুষকে। অর্থাৎ, এই শ্রেণির মানুষের লোভ-লালসার বলি হয় সাধারণ মানুষ, যারা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে না জ্ঞানত, বরং বেঁচে থাকার স্বার্থে জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করে। করেছে আজন্ম, আজও করে চলেছে। এই সত্য উপলব্ধি করা যায় এখনো, বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রার প্রণালী লক্ষ্য করলে। নদীকে যারা চেনে, পাহাড়কে যারা জানে, জঙ্গল যাদের আবাসভূমি তারা জানে প্রকৃতির সঙ্গে সহবাসের রীতিনীতি। সাম্প্রতীক সময়ে এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত তো  আমাদের সবারই জানা, যে, আন্দামানের আদিবাসীদের একজনও প্রাণ হারান নি প্রলয়ংকর সুনামির ফলে। সমস্যা হল, এই না-যুদ্ধবাজ মানুষেরা পেরে ওঠে না ‘আধুনিক লুঠেরা বীরপুঙ্গবদের’ সঙ্গে লড়াইয়ে, প্রতিরোধ করতে পারে না প্রতিহত করতে পারেনা তাদের বিবিধ ও বিধ্বংসী আক্রমণ। 

 

প্রতিবাদ প্রতিরোধের কড়চা

কিন্তু একেবারেই কি পারে না ! একে বারেই পারে না তা নয়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রচেষ্টা চলছে, চলছেই। চলতেও থাকবে নিশ্চয়, কেননা এ আসলে জীবন সংগ্রামেরই অঙ্গ। বাঁচার লড়াই থেকে আলাদা নয়। ‘চিপকো’ আন্দোলনের (১৯৭৩) কথাই স্মরণ করুন, সুন্দরলাল বহুগুণা-র নেতৃত্বে এই গণ-আন্দোলন যখন চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল সে সময় এদেশে পরিবেশবাদীদের অস্তিত্বও ছিল না। কিংবা ‘জঙ্গল বাঁচাও আন্দোলন’(১৯৮০), বিহারের সিংভূম জেলায় শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বৃহৎ নদী-বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে মেধা পাটেকরের নেতৃত্বাধীন ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’(১৯৮২) তো গোটা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও  কোকাকোলা-র বিরুদ্ধে যে স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছে এদেশের একেবারে সাধারণ মানুষ, অথবা এই সেদিন তামিলনাডুর মানুষ কুডানাকুলাম পারমাণবিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে যে গণ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তার মধ্যে নেই এই জীবনদায়িনী ধাত্রী ধরিত্রীকে লুঠেরাদের হাত থেকে রক্ষা করার অদম্য সংকল্প ?

দৃষ্টান্তের অভাব নেই। আসলে, আমরা, যারা বছরের কোনও এক বিশেষ দিনে নির্ধারিত ভাষণ শেষে বৃক্ষরোপণের কর্মসূচী পালন করে আলোকচিত্রিত হই সহাস্যে, পরিবেশ চেতনার দারুণ নিদর্শন হাজির করি সদম্ভে, সেই আমরা বহুযোজন দূরের ওই লড়াইগুলো সম্পর্কে জানতেও চেষ্টা করি না। যদি বা জানিও, সে লড়াইয়ের মর্মে পৌঁছতে পারি না কিছুতেই, কোনও ভাবে। সংযুক্ত হওয়া তো দূর অস্ত। আর এখানেই মস্ত সুযোগ পেয়ে যায়  ক্ষমতান্ধ  লুঠেরার দল। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের টুঁটি টিঁপে ধরার অঢেল অবকাশ পেয়ে যায় তারা। আমাদেরই উদাসীনতায়, অসচেতনতায়, কিংবা সচেতন নিষ্ক্রিয়তার দরুণ। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যে লড়াই আমাদের লড়ার কথা জীবন দিয়ে সে লড়াই চালিয়ে যায়  সামাজিক বিচারে শিক্ষায়-দীক্ষায় অনেক পেছনের সারির মানুষেরা। যারা এনভায়রনমেন্ট, বায়োডাইভারসিটি, ইকো-ফ্রেণ্ডলি ইত্যাদি শব্দের মানে জানে না, ধারও ধারে না। সে প্রয়োজনও পড়ে না তাদের। কারণ, শিক্ষিত সমাজ যে তত্ত্বের  বড়াই করে, তার ধারাবাহিক অনুশীলন করে চলে এরা জীবন জুড়ে, প্রজন্মের পর  প্রজন্ম জুড়ে।  এই হচ্ছে বাস্তব চিত্র, দেশে দেশে, সারা বিশ্বে।

 

বিশ্বায়নের বিষবাস্প       

ধনতন্ত্র যেহেতু ক্রমাগত বাড়তে চায়, তাই তার ক্রমাগত বেশি শক্তির প্রয়োজন, দরকার অজস্র কাঁচামালের। পুঁজিবাদীরা যদিও দাবি করে,তারা অধিক দক্ষ ভাবে কাঁচামাল ব্যবহার করছে,তবু বর্জ্য পদার্থ বেড়েই চলেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলির অর্থনীতি সম্পর্কে ২০০০ সালে পাঁচটি বড় গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, সম্পদ ব্যবহার বাড়ছে বই কমছে না, এবং অর্থনীতিতে বার্ষিক যত সম্পদ প্রবেশ করছে তার অর্ধেক থেকে তিন চতুর্থাংশ এক বছরের মধ্যে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে পরিবেশে ফিরে আসছেএই কারণেই মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল তাঁবেদার  রাষ্ট্রকে ‘বর্জ্যের বদলে ডলার’ দিয়ে থাকে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি মানুষ ও পৃথিবীর মধ্যে বিপাকীয় (metabolic) আদান-প্রদানে ব্যাঘাত ঘটায়;অর্থাৎ,মানুষ খাদ্যবস্তুরূপে জমির যে সব উপাদান গ্রহণ করে,সেগুলোকে জমিতে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা দেয়। তার ফলে ধনতন্ত্র জমির ধারাবাহিক উর্বরতা রক্ষার শর্তাবলীকে লঙ্ঘন করে। শ্রম প্রক্রিয়াসমূহের সামাজিক সংযোগ ও সংগঠন পর্যবসিত হয় শ্রমিকের ব্যক্তিগত প্রাণশক্তি, মুক্তি ও স্বাধীনতাকে চুরমার করে দেওয়ার এক সংগঠিত পদ্ধতিতে উপরন্তু ধনতান্ত্রিক কৃষিতে সব প্রগতিই হল একাধারে শ্রমিক এবং জমি, উভয়কেই লুন্ঠন করে এমন এক প্রযুক্তিগত  প্রগতি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমির উর্বরতাবৃদ্ধিতে যে প্রগতি,তা হল দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ঐ উর্বরতা বিনষ্ট করার উৎসের দিকে যাত্রার প্রগতি। জমি ও শ্রম, উভয়কেই শোষণ করা এই প্রগতির অনিবার্য পূর্বশর্ত।

 

পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন যে ভোগবাদের জন্ম দিয়েছে তার কুফল ব্যক্তি থেকে ব্যষ্টি-জীবনে, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সর্বত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মানুষকে মানবিকতা-বিযুক্ত করার পাশাপাশি এই বিশ্বায়ন প্রকৃতিকেও করে তুলছে অ-প্রকৃতিস্থ।  প্রকৃতির প্রতিশোধ অনিবার্য হয়ে দেখা দিচ্ছে। যেমন অনিবার্য হয়ে উঠছে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। প্রলয়ের, মহাপ্রলয়ের আয়োজন সুসম্পন্ন প্রায়। ‘ধরণী, দ্বিধা হও, তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে আত্মরক্ষা করি’ বলার উপায় পর্যন্ত নেই আমাদের। প্রতিদিনের হীন-বাণিজ্য আমাদের এনে দাঁড় করিয়েছে এক মহা সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। সিদ্ধান্ত নিতে হবে মানুষকেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত; বেছে নিতে হবে চূড়ান্ত পথ, অন্তর্বর্তী পথ বলে কিছু নেই আরবলা বাহুল্য, সে পথ এক নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের পথ। সে যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সাম্যের লক্ষ্যে, সে যুদ্ধ মানুষকে প্রকৃতি থেকে মানবিক প্রবৃত্তি থেকে বিযুক্ত করার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, শেষ বিচারে পরিবেশ বাঁচানোর সংগ্রামটাও আসলে আলাদা লড়াই নয়, মানুষের অন্য সব রকমের মানবিক সংগ্রামের অংশ মাত্র। সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের লড়াইয়ের অন্তর্গত এক সার্বিক লড়াই, এক বিশ্বজনীন যুদ্ধ। মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেমন নিজস্ব শোষণ-প্রক্রিয়া বজায় রাখে ও লুঠতরাজ চালিয়ে যায়, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে সাম্য ও মুক্তির অন্যতর প্রয়াস সমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার মতাদর্শ ও তত্ত্ব প্রচার করেও তেমনি স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পাকা বন্দোবস্ত করতে উদগ্রীব ধূর্ত শাসকের দল। এই বিষয়টা স্পষ্ট না হলে ‘প্রকৃতি বাঁচাও’ ‘পরিবেশ বাঁচাও’ জাতীয় স্লোগানগুলো শেষ পর্যন্ত শত্রু শিবিরের মুখগুলোকে মুখোসে ঢেকে দেবার ভূমিকা পালনের অতিরিক্ত কোনও দায় পালনে সক্ষম হবে না। এই কারণে,আমাদের গ্রহকে যদি তার বর্তমান অবস্থায়,বর্তমান প্রাণীজগতকে নিয়ে বাঁচতে হয়,তাহলে পুঁজিবাদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য, অবশ্যম্ভাবী


সমাধানের সম্ভাব্য সূত্র :বিকল্প বিশ্বায়ন

 

       ধনতন্ত্র ও তার পৃষ্ঠপোষক বুর্জোয়া সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রে এক আপাত স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি বা বড়াই করলেও আসলে প্রত্যেকটি খণ্ডের বিচ্ছিন্নতাই একমাত্র সত্য ও বাস্তব। কডওয়েল এই বিচ্ছিন্নতাকেই বুর্জোয়া সমাজের সবরকম চিন্তার মধ্যে এক সাধারণ সমস্যা বা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। শ্রম থেকে শ্রমিককে, যন্ত্র থেকে যন্ত্রীকে, প্রকৃতি থেকে মানুষকে, চিন্তা থেকে কর্মকে বিচ্ছিন্ন করেই ব্যবস্থাটি টিকে থাকে। এ তার চারিত্রিক গঠনের অঙ্গ। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সমাজ  তাই একপেশে যুক্তিসর্বস্বতার আশ্রয় নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অবাস্তব দাবির মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু  সমাজ ও সংস্কৃতিকে বাঁচাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। ধনতান্ত্রিক বিশ্বায়ন এই প্রয়াসের অনিবার্য অনুষঙ্গ বই আর কিছু নয়।  

এমন নয় যে সমাধানের উপায় আমাদের হাতে নেই, পরিবেশ কেন্দ্রিক সমস্যার যথার্থ সমাধানের জ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের হাতেই আছে, কিন্তু যাদের হাতে রয়েছে তারা তার উপযোগে উৎসাহী নয় মোটেই। সমস্যা এখানেই। বিশ্বায়ন আমরাও চাই, তবে তেমন বিশ্বায়ন চাই না যেখানে কেউ একজন অথবা একদল কিংবা কোন একটি দেশ মোড়লি করবে শুধুপুঁজিবাদী বিশ্বায়ন নয়, আমরা চাই মানবিক বিশ্বায়ন। মানুষের বিশ্বকে বিশ্বের মানুষের জন্য পেতে চাই, যে বিশ্বে খাদ্য-খাদকের সম্পর্কের বদলে ‘বাঁচো, এবং বাঁচতে দাও’ (Live and let live) নীতি-ই হবে মূল   সামাজিক চালিকাশক্তি, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে সংযম ও মিতব্যয়িতা হবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক রীতি, যুদ্ধের বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠাই যেখানে মুখ্য হবে। মানুষে মানুষে তো বটেই,  সেখানে  মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যেও থাকবে না কোনো যুযুধান ব্যবধান, বিরোধএ পৃথিবী সত্যি অর্থে বাসযোগ্য হয়ে উঠবে তখনই।

কাজটা দুরূহ ও দুঃসাধ্য নিশ্চয়, কিন্তু সাধ্যাতীত নয়। আদিম মানুষ থেকে আজকের আধুনিক মানুষে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে মানুষেরই অদম্য উৎসাহে, অপরিসীম নিষ্ঠায়যে বিবর্তনের ফলে এই অভাবনীয় পথ-পরিক্রমা সম্ভব হয়েছে তা তো থেমে যায়নি। সে প্রক্রিয়া তো চলছে এখনো, আমাদের স্থূল দৃষ্টির অন্তরালে। চলমান প্রক্রিয়াটিকে বোধের গভীরে  অনুধাবন করে অন্তরে আত্মস্থ করে নিতে যদি পারি, তাহলেই চিনে নিতে পারব পথের নিশানা। তবে তার জন্য প্রয়োজন আছে আরেক আত্মযুদ্ধের, ‘আপন হতে বাহির হয়ে’ বাইরে দাঁড়াবার শক্তি এবং সাহসের। মানুষ হয়ে মানুষের সারিতে দাঁড়াবার দরকার এখন। ভেতর থেকে বদলাতে হবে প্রথমে, আত্মকেন্দ্রিকতার গহ্বর থেকে বেরুতে হবে সর্বাগ্রে, তবেই ‘বাহিরে’ বদল ঘটানো সম্ভব হবে, সহজ হবে। অন্তর্গত পরিবেশ না পাল্টালে বাইরের পরিবেশ পাল্টাবে না কিছুতেই, এই উপলব্ধি সবচেয়ে জরুরি এসময়। অর্থাৎ, এক সামাজিক রূপান্তর ছাড়া আমাদের গ্রহের রূপান্তর বস্তুত অসম্ভব।

 


 

 

  

একালের একলব্য স্মরণে

 

(স্মরণ)


সুজিৎ চৌধুরী !

এই একটি মাত্র নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যতখানি মান ও মান্যতা বরাক উপত্যকার আর কোনও সামাজিক ব্যক্তিত্বকে তার ধারে কাছেও পৌঁছতে দেখিনি, বিগত দুই দশকে। এ অর্জন কেবল বৈদগ্ধের নয়, অন্তর্বৈভবেরও। প্রায় দেড় দশকের অনুপম সান্নিধ্যে যেটুকু দেখেছি, জেনেছি, বুঝেছি তাতে মানুষটিকে জানার আগ্রহ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে ক্রমে। ব্যক্তিত্বের এমন সহজ অথচ সাবলীল আত্মপ্রকাশ সচরাচর চোখে পড়ে না। কখনো সমাজ ব্যক্তিকে তুলে ধরে, আবার কখনো ব্যক্তি সমাজ মনস্কতার মাধ্যমে নিজেকে   অপরিহার্য করে তোলেন সমাজে। সুজিৎ চৌধুরীর ক্ষেত্রে এ দুয়ের এক বিরল সংযোগ ঘটেছিল। ব্যাষ্টি এবং সমষ্টির মধ্যে দেয়া-নেয়া, আদান-প্রদান যখন  সঙ্গতি ও সংহতির ভেতর দিয়ে পথ খুঁজে পায়, তখন অবশ্যই  ব্যতিক্রমী উদ্ভাস দৃষ্টিগোচর হয়। বরাক উপত্যকার বঙ্গ সমাজ ও সংস্কৃতি আত্মপ্রকাশের এক বিশেষ পথ খুঁজে পেয়েছে ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীর সংস্পর্শে, তাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রে, দৌলতে। একথা    অবশ্যই অতিশয়োক্তি নয়। আবার একথাও মিথ্যে নয় যে, এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজ-কর্ম ব্যক্তি সুজিৎ  চৌধুরীর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ও অনিবার্য ছিল। ঐতিহাসিক কারণেই। এটা আপতিক কোনও ঘটনা নয়  মোটেই যে, তিনি শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ইতিহাস লিখতে শুরু করবেন। অধ্যয়নের বিষয় ইতিহাস হলেই স্ব-ভূমির ইতিহাস রচনায় সচরাচর আগ্রহী হয় না কেউ, তার মূলে থাকে ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন অনুষঙ্গ।   

সুজিৎ চৌধুরীর ক্ষেত্রে অনুষঙ্গটি অবশ্যই দেশভাগ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যে বেদনা বয়ে বেড়িয়েছেন মানুষটি। মর্মান্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট মর্মবেদনা ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে আমৃত্যু। এমন নয় যে, দেশভাগের দরুণ তাঁর পরিবার সাঙ্ঘাতিক বিপর্যয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।  দেশের বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হওয়ার জন্য যন্ত্রণা তো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু (তাঁর ক্ষেত্রে) এই   যন্ত্রণাবোধের মাত্রা ও পরিধি ছিল বহু গভীর এবং ব্যাপক। ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন সে বেদনার স্বরূপ। এর মূলে রয়েছে এক সামূহিক বোধ, সামাজিক বিপর্যয়কে নিজের ভেতর ধারণ করার দায়। এক্ষেত্রে পারিবারিক এক উত্তরাধিকার তাঁর অবশ্য ছিল।   পারিবারিক পরিমণ্ডলে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ও বহনের আবহ বর্তমান ছিল। পিতা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন গোড়া থেকেই। সেই সূত্রে পারিবারিক পত্রিকা ‘যুগশক্তি’-র জন্ম। সে পত্রিকার সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়া বাহুল্য মাত্র। স্বাধীনোত্তর সময়ে, আরো সঠিক ভাবে দেশভাগের পর, অতঃপর যে-মানসিকতা অনিবার্য হয়ে দেখা দিল সেটা মূলত আত্মপরিচয় খোঁজার, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথের অন্বেষণ। ছিন্নমূল মানুষের থিতু হওয়ার জন্য যে সংগ্রাম, চিন্তা ও মননের দিক থেকে অন্তত, তার শরিক হওয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ। তাঁর সারা জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছোট্ট কথায় বোধহয় বর্ণনা করা যায় ‘ছিন্নমূলের শিকড়  সন্ধান’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে। এবং সেটা ভুলও নয়। ‘ভাষা আন্দোলন’ থেকে ‘বিদেশী বিতাড়ন’, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ সে সাক্ষ্য বহন করছে।  

না, সুজিৎ চৌধুরীর সৃষ্টি ও কর্মের মূল্যায়ন করতে বসিনি আমি, সে সাধ কিংবা সাধ্য কোনটাই নেই আমার। তাঁর সাহচর্যে যেভাবে যতটুকু (তাঁকে) জানার এবং বোঝার সুযোগ পেয়েছি তার শরিক করতে চাইছি পাঠকদের। কথায় বলে, ফলের ভার বেশি হলে বৃক্ষ নুয়ে পড়ে। বৈদগ্ধের এমন প্রাচুর্য সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য রকমের নিরহঙ্কার ছিলেন মানুষটি। রাগ-দ্বেষ-হিংসা-ঘৃণা তাঁর ব্যক্তিত্বের ত্রিসীমায় ঘেঁষতে পারেনি, অন্তত আমার নজরে আসেনি। মন-প্রাণ খুলে কথা বলা যেত যে-কোনও বিষয়ে, আলোচনা করা যেত অনায়াসে।  গুরুত্ব সহকারে শুনতেন সবার কথাই। বয়সের বাধা ছিল না কোনও, ছেলের বয়সীদের সঙ্গেও চুটিয়ে আড্ডা দিতে পারতেন। সুজিৎ-দা হয়ে পড়েছিলেন অল্পদিনে, সে সুবাদেই। ছিল অসাধারণ রসবোধ। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রসিকতায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। শিল্প-সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত তরুণ ব্রিগেডকে অযাচিত অকুন্ঠ প্রশংসায় ভাসাতে এমন আর কাউকে দেখিনি। উৎসাহিত করতেন ভীষন রকম। উপদেশ নয়, পরামর্শ দিতেন বন্ধুর মতন। ব্যক্তিগত ভাবেও তেমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছি। নিজের ক্ষেত্রেও প্রশস্তি শুনে বিব্রত বোধ করেছি যেমন, উৎসাহিতও হয়েছি। গর্বিতও যে হইনি কিছু পরিমাণে তা বললে মিথ্যে ভাষণ হবে। এখানে একটা কথা বলা জরুরি যে, ভাষা-সাহিত্য চর্চাকে তিনি আত্মানুসন্ধানের, আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর সে কারণেই সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত পশ্চিমবঙ্গীয় অতিথির বক্তব্যে পত্র-পত্রিকা কবি-লেখকদের নিয়ে কটাক্ষের জবাবে সুজিৎ চৌধুরী অনায়াসে বলতে পারেন, ‘এরা প্রত্যেকে এক একজন ভাষা-সৈনিক, আমাদের বাস্তবতায় সেনার সংখ্যা যত বেশি হয় তত লাভ। গুনগত মানের বিচার আপাতত গৌণ’। লড়াইয়ের ময়দানে থাকলে কুশলী হতে দেরি হবে না এই ছিল তাঁর  যুক্তি। সুজিৎ চৌধুরী ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারতেন এমন কথা !

 সভা-সমিতিতে, নির্ধারিত বক্তা হিসেবে যেখানেই সুজিৎ চৌধুরীর নাম থাকত সেখানেই, আমরা, ‘ঋত্বিজ’-এর কয়েকজন বিশেষত, হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। নতুন কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষায়। সভাশেষে মতামত জানতেও চাইতেন অনেক সময়, ‘ঠিক আছে তো!’ সংশয় নিরসন করতে চাইতেন বা সমর্থন চাইতেন তা নয়, এ তাঁর বদান্যতা, স্বভাবের অঙ্গ।  এই দরাজ স্বভাবের জন্যই যে কোনও সভাস্থলে তাঁকে ঘিরে আরেকটা অণু-সভা শুরু হওয়া ছিল প্রায় অবধারিত। সভাপতি  হিসেবে যখন মঞ্চালোকিত করতেন তখনও, সভাপতির  ভাষণে তাঁর অসামান্য সার সঙ্কলন শোনার অধীর অপেক্ষায়  বসে থাকতাম। প্রতিটি যুক্তি যেন ছুরির ফলার  মত ধারালো। সাধারণত বিশিষ্ট জনদের কাছে ঘেঁষা প্রায় দুষ্কর, সেখানে সুজিৎ চৌধুরী কাছে ডেকে নিতেন  অবলীলায়। মেয়েদের মর্যাদা সম্পর্কে এতটা সচেতন ছিলেন যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আমল দিতেন না মোটেই, সেরকম ক্ষেত্রে সচরাচর মেয়েদের পক্ষ নিতেন। ঘরে-বাইরে, সর্বত্র। কাছাকাছি থেকেছি যখন, এসব চারিত্রিক গুণাবলী নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি কিছু, গুরুত্ব দিইনি সে অর্থে। আজ যখন মানুষটি চিরতরে দূরে, তখন উপলব্ধি করতে পারি যে, এ হেন গুণাবলী অর্জনের নেপথ্যে ছিল এক নির্দিষ্ট জীবনচর্চা। শ্রম ও মেধার বিনিময়ে অর্জিত। ‘প্রাচীন ভারতে মাতৃতান্ত্রিকতাঃ কিংবদন্তীর পুনর্বিচার’ গ্রন্থ লেখা তাই সম্ভব ছিল তাঁর পক্ষেই। অনিবার্যও ছিল হয়তবা!

ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক ছিলেন। ইতিহাস তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল, নিঃসন্দেহে। সাহিত্যের প্রতি  অনুরাগ তা বলে এক বিন্দু কম ছিল না। সাহিত্যের এমন নিবিষ্ট পাঠক সহজে মেলে না। কেবল ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে আপত্তি করতেন না, তবে সাহিত্যের লোক নন ভাবলে ক্ষুণ্ণ হতেন। অন্তরঙ্গ  মুহূর্তে প্রকাশও করেছেন সে ক্ষোভ। ইতিহাস ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা তাঁর প্রধান এবং অন্যতম বিচরণ ক্ষেত্র হলেও সৃষ্টিশীল রচনায়ও রেখে গেছেন পরাক্রমী স্বাক্ষর। তাঁর গদ্য যেমন ঝরঝরে, তেমনি প্রাঞ্জল। প্রতিটি শব্দ ব্যবহারে অসাধারণ মনোযোগী। বক্তৃতার ভাষাও ছিল একই রকম সরল, অথচ অর্থবহ। শ্রোতাবান্ধব। বৈদগ্ধের প্রকাশ থাকত, কিন্তু পাণ্ডিত্যের প্রবলতা নয়। রসবোধ ছিল সূক্ষ্ম। ‘ধূমপায়ীর   জবানবন্দী’ যারা পড়েছেন তারা অবশ্যই তার পরিচয় পেয়ে থাকবেন। যেমন ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, তেমনি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ভাষা, সাহিত্য, লোক-সংস্কৃতি, রাজনীতি কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন অসাধারণ সব রচনা। ইতিহাস হোক কিংবা ভাষা-সাহিত্য, যে-কোন বিষয়ে সংশয় উপস্থিত হলে  আমরা তো বটেই, আরো অনেকেই কড়া নাড়তেন সুজিৎ-দার দরজায়।    

 

 খাপছাড়া ভাবে এই যে কথাগুলো বললাম, তা থেকে সুজিৎ চৌধুরী সম্পর্কে একটা আভাস মাত্র হয়ত পাওয়া যাবে। সেটা আমি জানি, তবু লিখতে বসে যেহেতু বহু কথাই মনে আসছে, তার থেকেই তুলে আনছি কিছু কিছু। আঁজলাভরা জলে সমুদ্রের আস্বাদ মেলে না জেনেও। অন্য উপায় যে নেই আর! তাঁর লেখালেখি,   গবেষণা, কাজ-কর্ম, চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আগামীতে যোগ্য ব্যক্তিরা নিশ্চয় মূল্যবান আলোচনা করবেন। কিন্তু যে সময়সীমা জুড়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন সে সময়ের বরাক উপত্যকার সমাজ ও রাজনীতি বুঝতে হলে সুজিৎ চৌধুরীকেও জানতেই হবে। এতে সংশয়ের অবকাশ নেই কোনও। তাঁর ভাবনা-চিন্তা, মতামতের সঙ্গে একমত  নাও যদি হই, তবু গুরুত্ব দিতে হবে বৈকি! দিতে হবে দুটো কারণে। এক, তথ্যের খাতিরে এবং দুই, মৌলিকতার জন্য। তথ্য থেকে সত্যে বা সিদ্ধান্তে পৌঁছবার চেষ্টা করতেন সব সময়, এবং সে পদ্ধতিটিও ছিল মৌলিক। একটা কথা তিনি সব সময় বলতেন যে, প্রান্তবাসীদের সুযোগের অভাব থাকলেও একটা মস্ত বড় সুবিধাও আছে, বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কাজ করতে হয় বলে চিন্তাচর্চায় মৌলিকতা আসে। কথাটা তাঁর ক্ষেত্রে শুধু সত্য নয়, আখরে আখরে সত্য। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছত্রছায়ায় লালিত হন নি তিনি। লেখালেখির প্রায় পুরোটাই মাতৃভাষা বাংলায়, ইংরেজি লেখা সে তুলনায় খুব কম যদিও বিষয় এবং বিশ্লেষণের নিরিখে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেই। নামী প্রকাশকের দৃষ্টিগোচর হয়নি বলেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে অপরিচিত রয়ে গেছেন এই মেধাবী মানুষটি। উত্তর প্রজন্মের দায় রয়েছে সেসব সংকলিত করে বৃহত্তর পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেবার।   

তাঁর মতামত মেনে নিতেই হবে এ জাতীয় গোঁড়ামি ছিল না একটুও। বক্তব্যের বিরোধিতা কেউ করলে বিচলিত হতেন নিশ্চয়, ক্ষোভও প্রকাশ করতেন কখনো-সখনো। আবার বুঝতেও চাইতেন বিরুদ্ধ মতের  যুক্তি-পরম্পরা, ভাবনা প্রবাহকে। সে ঔদার্য পুরোপুরি বজায় রেখেছিলেন শেষ দিন অবধি। কোনও বিষয়ে মতানৈক্য হলে ফোন করে ডাক দিতেন, ‘তোমার লগে দরবার আছে’। বহু ক্ষেত্রে ও বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে  বহুবার, ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাইতেন, একমত না হতে পারলেও অবজ্ঞা করতেন না মোটেই। পত্র-  পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হলে পড়েছি কিনা যেমন জানতে চাইতেন, তেমনি অনেক সময় নতুন লেখা ডাকে দেবার আগে ডেকে পড়াতেনও। আলোচনা করতেন। সেসব স্মৃতি ভোলার নয়। ভোলার নয়, কারণ সেসব আলোচনার সূত্রে নিজের অপরিণত চিন্তা-ভাবনা পরিণত হওয়ার সুযোগ পেত। যুক্তি বুদ্ধিতে মাঝে মাঝে শান দেওয়া দরকার , তাঁর সান্নিধ্যে শান দেওয়ার কাজটা খুব সহজে ও সুচারু ভাবে সম্পূর্ণ হত। তাঁর কাছে যাবার, আড্ডা দেবার, বিতর্ক উসকে দেবার একটা তাগিদ তাই থাকত। কত ভাবে যে উপকৃত ও লাভবান হয়েছি সে বলে বোঝানোর নয়। দেশভাগ নিয়ে তাঁর তীব্র যন্ত্রণা ও তথ্যনিষ্ঠতার একটা দৃষ্টান্ত দেবার লোভ হচ্ছে খুব। সকলেই জানেন যে  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ঔপন্যাসিক, তাঁকে বিভূতিভূষণ-বিশেষজ্ঞ বললেও ভুল  হবে না, কিন্তু ‘দেশভাগের অলিখিত উপন্যাস’ প্রবন্ধে (ঋত্বিজ সাময়িকী, ২০০৫ জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘দেশভাগ ও বাংলা উপন্যাস’ গ্রন্থে সংকলিত)  দেশভাগ নিয়ে বিভূতিভূষণের চিঠি থেকে উদ্ধৃতি হাজির করে (‘ নতুন বঙ্গ ভাগ হয়ে গেল ভালই হ’ল। বাঙালী হিন্দুরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। আমাদের ভয় নেই, হিন্দুস্তান, পাকিস্তান দুজায়গাতেই বাড়ী আছে’) লেখকের  হিন্দুত্ববাদী অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না,  রেয়াত করেননি বিভূতিভূষণকেও, তথ্যই ছিল শেষ কথা।    

ছিন্নমূলের শিকড় সন্ধানের যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম, টের পেতাম, আশিরনখর জুড়ে ছিল সেই  এক ভাবনা, চিন্তা। শিল্প-সাহিত্যের প্রাঙ্গনে ঋত্বিক ঘটক কিংবা জীবনানন্দকে যেমন নদী-মাঠ শোভিত গ্রাম বাংলার প্রকৃতির মায়ায় জড়িয়ে থাকতে দেখি, সেই একই মায়ায় ডুবে থাকা জলজ্যান্ত যে মানুষকে আমি দেখেছি তিনি সুজিৎ চৌধুরী। তাঁর মতন এমন আর কাউকে আমি অন্তত দেখিনি। বাংলা ভাষা, বাঙালি ও বাংলাদেশ ছিল তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। লিখেওছিলেন, ‘... রেখেছ মানুষ করে, বাঙালি করোনি’। ‘হারানো স্বদেশ’ ঘিরে এই আবেগ নিয়ে একবার অনুযোগ করে বলেছিলাম যে, আমরা যারা স্বাধীনতার পর জন্মেছি তাদের তো কোনও ‘হারানো স্বদেশ’-এর স্মৃতি নেই, তাহলে এই শোকগাঁথা শুনে আমরা কী করব? উত্তরে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, ‘কত বড় ক্ষতিটা হয়েছে তোমরা বুঝবে না। তোমরা তো জানো না, হেমাঙ্গ বিশ্বাস যখন ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রায় অচল, তখন একটা ‘দেশের বাড়ি’ ছিল বলেই মাস কয়েকের বিশ্রামে স্বাস্থ্যোদ্ধার করে পূর্ণোদ্যমে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পেরেছিলেন’। চুপ করে গেছি, কিছু বলতে পারিনি, বলার ছিল না। বুঝতে  পেরেছি যে, এ বেদনা তো ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির গর্ভজাত নয়, তার শিকড় অন্যত্র, ও বহুদূর বিস্তৃত।  

রাজনীতির পাশা খেলায় পাল্টে যাওয়া বঙ্গভূমির মানচিত্রে নতুন করে থিতু হওয়ার, শিকড় প্রোথিত করার ঐকান্তিক প্রয়াসেই তাই নিয়োজিত হয়েছে তাঁর শ্রম এবং মেধা। কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, ‘আমি তো লেখালেখি শুরু করেছি সে অর্থে অনেক দেরিতে, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে, প্রয়োজনের তাগিদে।’ সত্যিই তাই, লেখক হিসেবে যশোপ্রার্থী তিনি ছিলেন না। ‘শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ইতিহাস’ থেকে শুরু করে ‘ধর্ম,  রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতাঃ উৎস ও পটভূমি’ পর্যন্ত তাঁর তাবৎ মসী-চালনা  এক অর্থে অসি-চালনার সামিল।  বরাক উপত্যকার বাঙালির ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্য লড়াইয়ে তথ্যের তরবারি হাতে ’৬১র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৮০র বিদেশি-খেদা আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়সীমা জুড়ে তাত্ত্বিক  লড়াই  প্রায় একাই লড়েছেন মানুষটি। আসলে ইতিহাস চর্চা তাঁর কাছে ‘অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ’ মাত্র ছিল না, ছিল নিজের সময়কে বোঝার যাচাই করার কষ্টিপাথর। দেশভাগের যন্ত্রণা এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী   অবস্থান তাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে অসামান্য সব রচনা। সুজিৎ চৌধুরী ও সুজিৎ চৌধুরীর  সময় এভাবেই একাকার হয়ে আছে। তাঁর যাবতীয় লেখালেখি আসলেই ‘সময়ের পদাবলী’ রচনা। নাগরিক পঞ্জি নবায়ন নিয়ে হালে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, উদ্ভুত হয়েছে যে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির, তার পরিপ্রেক্ষিতে সুজিৎ চৌধুরীর অনুপস্থিতি তীব্র ভাবে অনুভূত হচ্ছে। বরাকের, বিশেষ করে করিমগঞ্জের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে বরাক তথা গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতি বিরাজ  করছে সে প্রসঙ্গে বিশেষ করে মনে পড়ছে তাঁর ‘গোরু ও আমরা’ রসরচনাটির কথা। অবশ্য সে রচনার রসাস্বাদনে এ মুহূর্তে কতজন উৎসাহী সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। পরিস্থিতি এমনই।

বরাক উপত্যকার সমাজ-গঠন প্রক্রিয়া অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে এই ছিল তাঁর সুচিন্তিত অভিমত। এ নিয়ে লিখেছেনও বিস্তর। ইতালির প্রসঙ্গ টেনে গ্রামশ্চির উল্লেখ করে বরাক উপত্যকায় যে ‘অরগ্যানিক    ইন্টেলেকচ্যুয়াল’ (organic intellectual)শ্রেণীর উদ্ভব হয়নি তেমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কথাটা সর্বাংশে  মিথ্যেও নয়। বরাক উপত্যকার প্রথম পর্বের সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় কলকাতা-মুখিনতা, সামান্য দু’একটি     ব্যতিক্রম বাদ দিলে যে প্রায় সর্বব্যাপ্ত ছিল সে সম্ভবত সে কারণেই। কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার প্রবণতা ও মানসিকতার সমালোচনা করেছেন, এর ক্ষতিকারক ভূমিকা বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলতেন প্রায়শ। মৌলিক চিন্তাচর্চাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ধারণার কথা সভয়ে সসঙ্কোচে বলে ফেলি। এ অঞ্চলের সাহিত্যচর্চা এবং অন্যান্য লেখালেখি বিষয়ে সুজিৎ চৌধুরী খুঁটিনাটি খবর পর্যন্ত রাখতেন। পাঠক হিসেবে অভাবনীয় মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য করেছি যে, কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, এক কথায় গদ্যরচনার প্রতি তাঁর উৎসাহ বেশি ছিল। নতুন প্রজন্মের দু’একজন কবি সম্পর্কে অবশ্য দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, কলকাতা-মুখিনতা কবিতার ক্ষেত্রেই অধিকতর প্রকট ছিল। এ অবশ্যই আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত। হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া বরাকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার লোক সংখ্যায় কম তার জন্য তাঁকে আক্ষেপ করতেও দেখেছি। এই অভাব মোচনের গুরুদায়িত্ব ও গুরুভার তিনি একার সামর্থ্যে বহন করেছেন বহুলাংশে। এ কথা বললে বোধহয়  একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না যে ‘অরগ্যানিক বুদ্ধিজীবী’র উদ্ভবের প্রক্রিয়াটি এ উপত্যকায় শুরু হয়েছে সুজিৎ চোধুরীর হাত ধরেই। প্রদত্ত কোনও দৈব গাণ্ডীব অথবা অক্ষয় তূণ তাঁর হাতে ছিল না সত্য, শরসন্ধানে শরযোজনায় তিনি অর্জুনের সমকক্ষ ছিলেন না, ছিলেন একলব্যের সমগোত্রীয়। স্বভূমি-সন্ধানের মনোস্তাত্ত্বিক ভিত তৈরি করে দিয়ে গেছেন একার সামর্থ্যে। উপত্যকার ছিন্নমূল বাঙালির শিকড় সন্ধানের, বিবিধ বিড়ম্বনার  হাত থেকে নিষ্কৃতির দিগদর্শন রেখে গেছেন উত্তর প্রজন্মের জন্য। তাঁর জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা এখানেই। ...  

‘ঋত্বিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আজীবন সদস্য হিসেবে আমরা আর সবার চেয়ে খানিকটা বেশি অধিকার খাটাতাম তাঁর ওপর, তিনিও প্রশ্রয় দিতেন। মনে আছে, আমাদের ছোট্ট অফিস ঘরে তাঁকে ‘আজীবন সদস্য’ ঘোষণা করে নিজেদের ছাব্বিশ ইঞ্চি ছাতিকে যখন ছাপ্পান্ন ভাবতে প্ররোচিত হচ্ছি সুজিৎ-দা তাঁর   বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আজীবন সদস্য তাকেই করা হয় যার জীবনের আয়ু আর বেশি নেই।’ এটাই ছিল সুজিৎ-দার স্টাইল। সিনেমা হয়ত সেভাবে বেশি দেখতেন না, কিন্তু আমাদের বাৎসরিক চলচ্চিত্র উৎসবে আসতেন আড্ডা দিতে, রাধা সিনেমা হলের সেই সব জমাটি আড্ডার মুহূর্তগুলো ঝিনুকের মাঝে মুক্তোর মত  সঞ্চিত থাকবে স্মৃতিকোঠায়। আজীবন। ঋত্বিজের ডাকে অসুস্থ শরীর নিয়েও উপস্থিত হয়েছেন। আসলে কেউ নতুন কিছু করতে চাইছে দেখলে সর্বাগ্রে উৎসাহ যোগাতেন সুজিৎ-দা। চলচ্চিত্র সে অর্থে তাঁর বিচরণভূমি ছিল  না, তা সত্ত্বেও আমাদের দাবি মিটিয়েছেন অসামান্য সব রচনা দিয়ে। সেদিক থেকে আমরা অবশ্যই এক  বাড়তি অহঙ্কারের দাবিদার, এই কারণে যে, সুজিৎ-দার বহুমুখী মেধার পরিচয় পেয়েছেন  উপত্যকার বহু  মানুষ, ঘনিষ্ঠ জনেরা তো বটেই, কিন্তু ‘ঋত্বিজের সুজিৎ-দা’ আর কারো ন’ন, কোন ভাবেই সে ‘কপিরাইট’ কেউ কোনোদিন ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ঋত্বিজের রজত জয়ন্তী বর্ষে এই অহঙ্কারী উচ্চারণের মধ্য দিয়েই  হোক আমাদের ‘সুজিৎ চৌধুরী স্মরণ’।

আক্ষেপ কেবল এই যে, দেশ হারানোর হাহাকার বুকে করে যিনি লিখে গেলেন সারা জীবনের  যাপনকথা, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁকে দ্বিতীয়বার ‘দেশ’ (করিমগঞ্জ) ছাড়তে হয়েছে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই। করিমগঞ্জ ছেড়ে যেতে মন সায় দেয়নি, ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তিন-চার দিন আগে দূরভাষে জানিয়েওছিলেন ফিরে আসার দিনক্ষণ। কিন্তু ফেরা হল না আর, মৃত্যুর নিঠুর হানায়। ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’-এর লেখক নিজেই আজ ‘হারানো মানুষের’ সারিতে বটে। কিন্তু সে তো  শারীরিক ভাবে  হারিয়ে যাওয়া, স্বাভাবিক জৈবিক নিয়মে। উপত্যকার অধিবাসীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে ও প্রসঙ্গে তাঁর আত্মিক উপস্থিতি কি এত সত্বর হারিয়ে যাবার! আলবৎ নয়। এ অঞ্চলের বাঙালির  আত্মপরিচয় খুঁজে নেবার এবং অধিকার অর্জনের আগামী লড়াইয়ের শরিক হয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আরো বহুকাল। প্রেরণা ও সাহস যুগিয়ে যাবেন অবিরত। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক যে ইচ্ছা করলেও তাঁকে উপেক্ষা করার জো নেই। অস্তিত্বের সঙ্কট মোচনের খাতিরেই বারবার ফিরে যেতে হবে  সুজিৎ চৌধুরীর কাছে, সুজিৎ চৌধুরীর কালে। এ আমাদের ভবিতব্য। ‘ব্যর্থ-চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণ’ নিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন,  শিয়রে শুশ্রূষার হাত রেখে আত্মজন যেমন থাকেন সঙ্কট কালে। একালের একলব্যকে এভাবেই স্মরণ করবেন উপত্যকার আপামর মানুষ। আরো বহুকাল।

       

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

শিল্প বনাম বিজ্ঞানঃ সৃষ্টি বনাম নির্মাণ





শিল্পীসাহিত্যিকদের পাড়ায় যাদের নিত্য আনাগোনা তারা নিশ্চয় ‘সুন্দরের ধ্যান’ ‘সুন্দরের আরাধনা’ ইত্যাদি শব্দবন্ধের সঙ্গে সুপরিচিত। এবম্বিধ বাক্যাংশের সাথে পরিচয়ের সূত্রে অনেকেই পুলকিত বোধ করে থাকেন। এতে অবশ্য দূষণীয় কিছু নেই । কথাটা এখানে তোলা হল একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে, ভিন্নতর আলোচনার স্বার্থে। সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত। আহারের নিশ্চিতি পেলে সে আহার্যের পাত্রটিকেও রমণীয় করে তোলার চেষ্টা করে। প্রয়োজনের অতিরিক্তের প্রতি এই আগ্রহ থেকেই নাকি আসে সৃষ্টিকর্মের অনুপ্রেরণা। শিল্পসাহিত্য সৃষ্টির এটাই হচ্ছে গোড়ার কথা। আমরা কিন্তু এ বিষয়ে কোন অযথা বিতর্কে প্রবেশ করার বদলে ভিন্ন এক সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করব। কথাটা হচ্ছে এই যে, সভ্য সমাজে মানুষের বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চার ক্ষেত্র যদিও বিবিধ এবং বিস্তৃত তা সত্ত্বেও একমাত্র শিল্পীসাহিত্যিকরাই ‘সুন্দরের পূজারী’ এরকম একটা ধারণার পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা যায় অধিকাংশকে। বিজ্ঞান সহ বৌদ্ধিক চর্চার অন্যান্য ক্ষেত্রে নিয়োজিত মানুষদের সরাসরি ‘অসুন্দরের পূজারী’ বলা না হলেও তাদের কাজকর্মকে ‘জড়ের সাধনা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা যে হয় না তাও নয়। 

সৃষ্টি আর নির্মাণ –এ দুয়ের পার্থক্য নির্দেশ করেই ক্ষান্ত হন না অধিকাংশ সমালোচক, দুয়ের মান নির্ধারণেও তারতম্য করে থাকেন। এই বিভাজনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়ে যায় স্কুলের গণ্ডী অতিক্রম করতে না করতেই। দু দলে, দুটো শিবিরে ভাগ করে ফেলা হয় শিল্পী ও বিজ্ঞানীদের। ‘অঙ্ক আমার মাথায় ঢোকে না’, ‘আমি শিল্প-টিল্প ঠিক বুঝি না’ গোছের বাক্যালাপের অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস আমাদের মধ্যে অনেকেরই আছে। লক্ষণীয় বিষয় এটাই যে অক্ষমতা(!) প্রকাশের এজাতীয় বয়ানে আক্ষেপের ছিটেফোঁটাও কিন্তু থাকে না, বরং এক ধরনের শ্লাঘাই অনুভব করেন বক্তা। অর্থাৎ, নিজস্ব ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী এক বিশেষ শিবিরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে শ্লাঘা বোধ করেন। এই শিবির বিভাজনের প্রেক্ষিত ও প্রক্রিয়াটিকে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়ে আমরা বুঝতে চাইব এটা কতটা সঙ্গত কিংবা যুক্তিসম্মত। 

এখানে আরেক রকম সমস্যার সূত্রপাতও ঘটতে পারে। শিল্পসাহিত্য ঠিক যুক্তি-বুদ্ধির আওতাধীন নয়, এমন কথা বলার লোকেরও অভাব হবে না। শিল্পবস্তুর শিল্পত্ব হৃদয় দিয়ে উপলব্ধির জিনিস, গুরু মস্তিষ্কের কূট-কচালি এক্ষেত্রে কোনও কাজে আসে না। ‘Beauty lies in the eye of beholder’-এ তো প্রায় আর্ষ বাক্যে পরিণত। ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ...’ – এর মধ্যে কতটা সার সত্য, কতটাই বা আত্মপ্রবঞ্চনা তারও হিসেব করা যেতেই পারে। শিল্পের অন্দরমহলেও কেউ কেউ যে সে অঙ্ক কষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে চাইছেন সে খবরও চাউর হয়েছে বেশ কিছুদিন। সৃষ্টিকর্মে জড়িতদের অনেকেই ইদানীং নির্মাণ-কুশলতার দিকে ঝুঁকেছেন দেখতে পাই। শিল্প বিচারে আবেগসর্বস্বতা (কিংবা মননের দৈন্য) দোষ হসেবেই বিবেচিত হচ্ছে ইদানীং। ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী’। -এই রহস্যঘন উচ্চারণের কাছে আত্মসমর্পণই কি শেষকথা? এ প্রশ্ন উঁকি দেয় এই অভাজনদের মনের আনাচে কানাচেও! 

সৌন্দর্যের কিংবা শিল্পের যথার্থ সংজ্ঞা নিরূপণ এক দুরূহ কর্ম। মানবমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার নিরিখেই মূলত সৌন্দর্য তথা সৃজনশীলতার অস্তিত্ব কবুল করে নেওয়া হয়। কবি কীটস যত সহজে ‘Beauty is truth, truth is beauty’ বলে ল্যাঠা চুকিয়ে দিতে চেয়েছেন তত সহজে ঝামেলা মেটার নয়। তিনিই (জন কীটস) কিন্তু রামধনুর সাতটা রঙের রহস্য উদ্ঘাটন করায় নিউটনের ওপর বেজায় চটেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল যে, এই উন্মোচনের দরুণ রামধনুর রহস্য (সৌন্দর্য) নাকি হারিয়ে গেছে এবং তা নিয়ে নাকি আর কবিতা লেখা যাবে না। কথাটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, যেহেতু রামধনু নিয়ে তার পরেও কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে। রামধনুর সাত-রঙা (বৈজ্ঞানিক) সত্যের ধাক্কায় তাঁর নিজের মন্তব্য ও সত্যের উপলব্ধি হোঁচট খেয়েছে। তর্কের একগুঁয়েমিতে কিংবা চাতুর্যের চূড়ায় বসে হয়ত বলা যায় যে, এ হচ্ছে ‘বস্তুর সত্য’, শিল্পের সত্য ভিন্ন বস্তু (?)। বোঝা যায় না, উপলব্ধির জিনিস। যেন ব্যক্তিগত বোধের নৈপুণ্য কেবল, অর্থাৎ, বিষয়ীগত ব্যাপার! কিন্তু সত্যিই কি তাই? 

বহুদিন যাবৎ একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে শিল্প ও সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কটি বুঝি বৈরিতার। এরকম ধারণা প্রচলিত হওয়ার মূলে বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের ধারণা, মতামত এবং মন্তব্য বহুলাংশে দায়ী। কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীত কিংবা চিত্রশিল্পীদের অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করেন যে শিল্প ও বিজ্ঞান হচ্ছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরস্পরবিরোধী এলাকা। ইংরেজিতে যাকে water-tight compartment বলা হয় সেরকম বদ্ধ কক্ষ যেন, একটি থেকে অন্যটিতে প্রবেশের পথ প্রায় রুদ্ধ। ঘটনা কিন্তু আসলে তা নয়। অভিজ্ঞতাও সে সাক্ষ্য দেয় না। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণের পক্ষে (শিল্পী-সাহিত্যিকরাও এক্ষেত্রে সাধারণ বর্গেরই অন্তর্ভুক্ত) বুঝে ওঠা হয়ত সম্ভব নয়। একই ভাবে শিল্পবস্তুর খুঁটিনাটি বিষয়ে সবার অভিজ্ঞতা সম পর্যায়ের না হতেই পারে। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর সৌন্দর্যবোধ বা শিল্পবোধ থাকা সম্ভব নয় এমন কথা আহাম্মকেও নিশ্চয় বলবে না। আইনস্টাইন থেকে শুরু করে আমাদের জগদীশ চন্দ্র বসু-মেঘনাদ সাহা চন্দ্রশেখর-রামানুজন-এর মত বিজ্ঞানীরা তার দৃষ্টান্ত। 

আমরা এ নিয়ে সেরকম কোনো গূঢ় তর্কে সময় নষ্ট না করে বরং মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফুল-পাখি-গাছ-লতা-পাতা-নদী-পাহাড়-সমুদ্র সদৃশ যে সমস্ত মূর্ত বস্তু কিংবা কবিতা-গান-ছবি-নাচ ইত্যাদি যেসব বিমূর্ত বস্তু আমাদের কাছে সুন্দর বলে প্রতিভাত হয় তার মধ্যে একটা বিশেষ বিন্যাস (pattern) লক্ষ্য করা যায়, সাংগঠনিক এক সুষমতা (harmony) দৃষ্টিগোচর হয়। অর্থাৎ, আকার ও বিন্যাসগত বৈশিষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম ক্ষেত্রে বস্তু সমূহের বর্তমান রূপ বিবর্তিত রূপ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়ত্ত করে নেওয়ার একটা ব্যাপার রয়েছে যদিও এই আয়ত্ত করে নেওয়ারও এক বিবর্তন মূলক ইতিহাস রয়েছে। গুহা চিত্র থেকে আধুনিক চলচ্চিত্র অবধি যার বিস্তার। একই ভাবে রঙ-বেরঙের ফুলও যে বেঁচে থাকার ও প্রজাতি সংরক্ষণের তাগিদেই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রঙীন হয়ে কীট-পতঙ্গকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা লাভ করেছে সে তথ্যও আর অজানা নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা আদৌ বিষয়ীগত কিছু নয়। একটা বিষয়গত দিকও রয়েছে। সেই যে এক শিল্পী বন্ধু একটা সুন্দর ফুল দেখিয়ে বিজ্ঞানীকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, কী সুন্দর ফুল! কিন্তু আপনি তো (কৌতুহল মেটানোর জন্য) এক্ষুনি এর পাপড়িগুলোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে এর সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলবেন’। উত্তরে, মৃদু হেসে বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘আপনি এখানেই ভুল করছেন, বাইরের এই সৌন্দর্যটা আপনার মত আমিও দেখছি, কিন্তু আমি/আমরা আরো গভীরে, অণু-পরমাণু স্তরে পৌঁছে এর এক একটা কোষ কীভাবে বিন্যস্ত হয়ে পাপড়িগুলোর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তাও দেখি। আমরা এর ভেতরের সৌন্দর্যটাও দেখতে পাই, আপনি যা কল্পনাও করতে পারেন না’। ধ্রুপদী সঙ্গীতের সাধারণ মুগ্ধ শ্রোতা ও সুর-তাল-লয় ইত্যাদির জ্ঞানসম্পন্ন শ্রোতার মধ্যে যে পার্থক্য এও সেরকম। 

সৌন্দর্যের প্রতি, শিল্প-বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং বস্তুতে সৌন্দর্য আরোপ করা এক মানবিক প্রবণতা। যে কোনো সুন্দর বস্তু, মূর্ত কিংবা বিমূর্ত যাই হোক না কেন, মানুষের (মস্তিষ্কের) ওপর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া করে। আনন্দের উপলব্ধি ঘটে। এবারে ‘আত্মা’, ‘ঈশ্বর’ গোছের বিশ্বাসের (যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই) বশবর্তী না হলে এরকম প্রতিক্রিয়া কেন হয়, কিভাবে হয় ইত্যাদি প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে গত্যন্তর নেই। আর ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিল্পবস্তুর কিংবা সৌন্দর্যের আবেদন সৃষ্টিতে মস্তিষ্কের ভূমিকার বিষয়টি। প্রাণের উদ্ভব থেকে শুরু করে সমাজ বিকাশের ধারা তথা মানবিক বৈশিষ্ট ও বৃত্তি সমূহকে (শিল্প ও সৌন্দর্যের প্রতি অনুরাগও তার অন্তর্গত) বিবর্তনের নিয়ম গুলোর সাহায্যে বহুদূর অব্দি অনুধাবন ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি যে বস্তুত পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোকে (laws of physics) অনুসরণ করে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য কেবল এটা দেখানো যে আমাদের সৌন্দর্যের ধারণা (sense of beauty) ‘আকাশ থেকে পড়া’ কিংবা ‘প্রদত্ত’ বস্তু নয় আদৌ। বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য দুই মেরুতে অবস্থান করে না, এবং সম্পর্করহিতও নয়। অথচ এই ‘মিথ’ তৈরিতে আজও ইন্ধন যুগিয়ে চলেছেন বহুজনশ্রদ্ধেয় গুণী জনেরাও –অজ্ঞানে অথবা সজ্ঞানে। 

কবি-শিল্পী মানুষেরা মেধার সঙ্গে কল্পনাশক্তির মিশেল দিয়েই শিল্প সৃষ্টি করে থাকেন, এবং তার জন্য তাদের অহমিকাও বর্তমান। তাই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা ‘নির্মাণ’ কথাটা ব্যবহার করেন এবং শিল্পের বেলায় ‘সৃষ্টি’ কথাটা ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। বাস্তবে কিন্তু একজন বিজ্ঞানীকেও প্রাথমিক ভাবে কল্পনায় ভর করেই এগোতে হয়, কল্পনাশক্তি বিহনে কোনো আবিষ্কারই বোধহয় সম্ভব হত না, সম্ভব নয়। রাতের আকাশে যে তারাটির দিকে তাকিয়ে গবেষণায় মগ্ন হন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তাকে কিন্তু কল্পনা করে নিতে হয় যে ওই তারাটি থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছতে কেটে গেছে কত লক্ষ লক্ষ বৎসর! তাহলেই বুঝুন, যেমন ভাবা হয়, শিল্প আর বিজ্ঞান তেমন কোন বিভাজিত জল-আঁট (water tight) কক্ষ নয় মোটেই। আকাশে ওড়ার অদম্য স্বপ্ন যদি না থাকত উড়োজাহাজের নির্মাণ কি বাস্তবে সম্ভব হত! আসলে সাহিত্য-সঙ্গীত-চিত্রকলা ইত্যাদি শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার ক্ষেত্রে যে সৃষ্টিশীলতা ক্রিয়াশীল থাকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনেও সেই একই মানবিক সৃষ্টিশীলতা বর্তমান। এটা বুঝতে না-পারার ফলেই ভুল ধারণা ঘাঁটি গেড়ে বসে মনের কোণে। এবারে বক্তব্যের সপক্ষে কিছু সাক্ষী-সাবুদ পেশ করা যাক। গর্ভস্থ ভ্রূণেও সঙ্গীতের (music) মূর্ছনা যে সাড়া জাগায় তা আজ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়ও প্রমাণিত (এবং সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতা বোঝাতে এ দৃষ্টান্ত সঙ্গীতপ্রেমীরাই প্রায়শ হাজির করেন)। বিবর্তনবাদ ছাড়া এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব? বিশ্বের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ধ্রুপদী এবং আধুনিক সঙ্গীতের স্বর-বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে গাণিতিক নিয়মানুসারে সেগুলোকে সূত্রবদ্ধ করা সম্ভব। বস্তুত সঙ্গীত এবং কোলাহলের মধ্যে পার্থক্য তো এই যে প্রথমটি সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত; আর দ্বিতীয়টি অবিন্যস্ত, বিশৃঙ্খল। নিসর্গ-চিত্র আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়। তা কি জীবনধারণের প্রশ্নে নিরাপদ স্থলভূমির নির্বাচন ও অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়? হিংস্র শ্বাপদকুলের হাত থেকে বাঁচতে প্রজাতি হিসেবে মানুষ যে সমতল ভূমিকেই বাছাই করেছিল সে তো দিনের আলোর মত স্পষ্ট। এই সাক্ষীসাবুদ পেশের অর্থ অবশ্য এ নয় যে শিল্প উপভোগের জন্য এসব বিষয় জানা জরুরি। স্বাদু আহারের স্বাদ গ্রহণের জন্য রসনার অস্তিত্বই যথেষ্ট, রন্ধনপ্রণালী সম্পর্কে জ্ঞান অপরিহার্য নয়। যেমন, স্পর্শের অনুভূতি আমাদের ত্বকে সাড়া জাগায় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে, সে তথ্য জানা না থাকলেও সাড়া জাগে। নদীতে অবগাহনে যে আনন্দ তা যদি কোন অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিকে নদীর উৎস-সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে তাতে অবগাহনের আনন্দ মাটি হয় না নিশ্চয়। একজন বিজ্ঞানী এই অনুসন্ধিৎসা নিয়েই সুন্দরের প্রতি নিবিষ্ট হন, সৌন্দর্যের ঘাতক হিসেবে নয় –যেরকম ভাবা হয়ে থাকে বহুক্ষেত্রে। আইনস্টাইন তাই ভায়োলিন বাজান, বলতে পারেন, ‘Pure mathematics is, in its way, the poetry of logical ideas.’ জগদীশ চন্দ্র বসু ‘কবিতা ও বিজ্ঞান’ নামে প্রবন্ধ লেখেন, এমন কি একালের বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরও ‘Truth and Beauty’ গ্রন্থ রচনা করেন। 



তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সৌন্দর্যবোধ (এবং শিল্পবোধও) সম্পূর্ণ বিষয়ীগত (subjective) ব্যাপার নয়, যেমনটা ভাবা হয়। একটা বিষয়গত (objective) দিকও বর্তমান রয়েছে। আপাতভাবে বিষয়ীগত মনে হলেও তার মূলে রয়েছে কার্য-কারণ সম্পর্ক (cause -effect relation)। এই দিকটা খেয়াল থাকে না বলেই বহু মানী-গুণী মানুষও ভুল বোঝেন, ভুল বোঝান। যুক্তির বদলে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেবার জন্যই এমনটা ঘটে। এও ঠিক যে নিরেট যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না, আবেগেরও প্রয়োজন আছে। তবে যে আবেগ বেগ কেড়ে নেয় তা নয়, বরং যে আবেগ জীবনপ্রবাহকে সমাজকে সজীব ও সতেজ রাখে সেই আবেগ প্রয়োজন। যুক্তির, বৈজ্ঞানিক যুক্তি পরম্পরার অবিহনে সে সজীবতা সতেজতা লভ্য নয়। মানবেতর জীব আবেগ-সর্বস্ব, কিন্তু মানুষের চেতনা আছে। মানবিক আবেগ তাই যুক্তি বর্জিত নয়, মানবিক যুক্তিও আবেগশূন্য নয়। বিজ্ঞানে যদি যুক্তির প্রাধান্য, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে-চিত্রকলায় তবে আবেগের অগ্রাধিকার। দুয়ে মিলেই সম্পূর্ণ সত্তা। শিল্প ও বিজ্ঞান তাই একে অন্যের পরিপূরক, পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিজ্ঞান রহস্য-উন্মোচন করে সৌন্দর্য হরণ করে না, বরং এক পা এগিয়ে নতুন রহস্যের দুয়ারে এনে দাঁড় করায়। সৃজনশীল মনের জন্য, শিল্পীর তুলির জন্য যেমন, বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের জন্যও নতুন রসদ যোগায়। কেননা, জানার তো শেষ নেই, এক জানা অনেক অজানাকে সামনে নিয়ে আসে। 

পৃথিবী জুড়ে আজ চারুকলা ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে, সৌন্দর্যবোধ তথা শিল্পবোধ নিয়ে চিন্তা উদ্রেককারী নানান ভাবনা-চিন্তা, গবেষণা চলছে। যেসব তথ্য উঠে আসছে তাতে সৌন্দর্য ‘বোঝার নয়, উপলব্ধির বিষয়’ –Beauty is to be perceived, not understood –জাতীয় উক্তির ক্লিশে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বিজ্ঞানের নয়া শাখা Computational Aesthetics তৈরি হয়েছে এই বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য। Science of Aesthetics আজ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক স্বীকৃত ও জরুরি বিষয় হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ, কবি, লেখক, নাট্যকার, আবিষ্কারক, ‘The Ascent of Man’ গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানী Jacob Bronowski-র অসাধারণ একটি মন্তব্য উদ্ধার করার লোভ সম্বরণ করা গেল না কিছুতেই – ‘‘We re-make nature by the act of discovery, in the poem or in the theorem. And the great poem and the deep theorem are new to every reader, and yet are his own experiences, because he himself re-creates them. They are the marks of unity in variety; and in the instant when the mind seizes this for itself, in art or in science, the heart misses a beat.” 



বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞানের অগ্রগতি এমন স্তরে পৌঁছেছে যে মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও প্রবৃত্তিগুলি, যেমন নৈতিকতা-যৌনতা ইত্যাদি বুঝতে এবং ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। সৌন্দর্য, শিল্প, নীতিবোধ ইত্যাদির আবির্ভাব মানুষের মনে (মস্তিষ্কে) এবং সর্বাঙ্গীন মানুষ যেহেতু বিবর্তনের ফসল কাজেই এই প্রবৃত্তিগুলোও তাই। এগুলো (ঈশ্বর)প্রদত্ত নয়। প্রেম-ভালোবাসা, ফুল বা নারীর সৌন্দর্যকে ‘স্বর্গীয়’ আখ্যা দিতেই পারি, কিন্তু তা শিল্প ও সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের অনুরাগ প্রকাশের ভাষাগত কারুকার্য কেবল। ভাষিক অলঙ্কার মাত্র। দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে এই সাধারণ অনুরাগ জন্মানোর পেছনে বিবর্তন ছাড়া আর কোনও কারণ কি থাকা সম্ভব! এখন ‘আত্মা’য় পুরোপুরি ‘আত্মস্থ’ না হলে মানুষ (এবং মানুষের মস্তিষ্কও) যে বিবর্তনের ফসল সেই অবিতর্কিত ঘটনার বিরুদ্ধাচরণ করা অসম্ভব। আর বিবর্তন যেহেতু প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলির (মূলত পদার্থবিদ্যার) ফল কাজেই মানবিক প্রবৃত্তি ও বৈশিষ্ট সমূহও তাই। শিল্প ও সঙ্গীত এবং তার প্রতি আকর্ষণের উৎসের সন্ধানে আমাদের পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলির কাছেই শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু শিল্প উপভোগের জন্য তার প্রয়োজন নেই, অত গভীরে যাবার। একটা সফটওয়্যারের কর্মপদ্ধতি যেমন ব্যবহারিক সঙ্কেত থেকেই বুঝে নেওয়া যায়, অন্তর্গত সংগঠনের বিশ্লেষণ আবশ্যক হয় না; ঠিক সেরকম মানবিক বৈশিষ্ট ও প্রবৃত্তিগুলিকেও বিবর্তনের নিয়মগুলির (প্রাকৃতিক নির্বাচন, অভিযোজন ইত্যাদির) সাহায্যেই বোঝা সম্ভব। 

পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো মানুষের সৃষ্ট নয়, সে কারণে কেউ যদি ‘স্বর্গীয়’ আখ্যা দিতে চান তো আলাদা কথা। মূর্ত ও বিমূর্ত বস্তুতে সৌন্দর্য আরোপ এক সর্বজনীন মানবিক প্রবণতা। ফুল-পাখি মনি-মানিক্য কিংবা কবিতা-গান-ছবি সে যাই হোক না কেন এদের মধ্যে সাধারণ ব্যাপার হচ্ছে যে এরা কিছু তথ্য, আদল বা বিন্যাসের মাধ্যমে একটা অর্থ প্রকাশ করে এবং পরিণতিতে আমাদের মস্তিষ্কের আনন্দের কেন্দ্রটিকে উত্তেজিত করে। এর শেকড় নিঃসন্দেহে রয়েছে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়। সুকুমার বৃত্তিগুলি হয় সরাসরি বিবর্তনমূলক অভিযোজনের ফল, নতুবা জীবন-সংগ্রামের ক্ষেত্রে গৃহীত অভিযোজন-কৌশলের পার্শ্বক্রিয়া মাত্র। Evolutionary psychology-র ভাষায় একে বলা হয় spandrel effect - Spandrel হচ্ছে কোন খিলানের থামগুলোর অন্তর্বর্তী শূন্যস্থান (space) যা খিলানের নক্সার অভিপ্রেত অংশ নয় অথচ এক অনিবার্য পরিণতি যা এড়ানো সম্ভব নয়। বিবর্তনমূলক অভিযোজনের ক্ষেত্রেও এরকম পার্শ্বক্রিয়ার ঢের দৃষ্টান্ত রয়েছে। 

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের মূলে যে কারণ তাকে যৌন-সৌন্দর্য বলা যেতে পারে। এই সৌন্দর্য বস্তুত যৌনস্বাস্থ্যের সূচক। নারীর যৌন-সৌন্দর্য (আবেদন!), যাকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে অবিস্মরণীয় সব শিল্পকর্ম, তা আসলে যৌনসক্ষমতার বা উর্বরতার প্রতীক ছাড়া কিছু নয়। জীবনের প্রবাহকে সচল রাখার জন্য যা অপরিহার্য এবং বিবর্তনের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেঁচে থাকা বা উদ্বর্তনের (survival) মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জিনগত সংকেত (genetic code) পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত করা। সন্তানের জন্ম দিয়ে অর্থাৎ জিনগত সংকেত প্রসারিত করে কেউ মারা গেলেও বিবর্তনবাদের বিচারে সেই ব্যক্তি বেঁচে থাকে। শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নয় এখানে, জিনগত সংকেত -পার্থিব দেহ যার অস্থায়ী আস্তানা মাত্র – চালান করাই মুখ্য। ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব বেঁচে থাকে’ প্রজাতি সংরক্ষণের সে প্রক্রিয়ায়, আর সে কারণেই জীবনানন্দের এই পঙক্তিও বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে। আমাদের নান্দনিক বোধেরও যে বিবর্তন আছে, ক্রমবিকাশের ধারাটি যে অব্যাহত সে তো বিভিন্ন শিল্প-আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভূত শিল্পতত্ত্বের দৃষ্টান্ত থেকেও স্পষ্ট। এবং এই বিবর্তন যে জৈববিজ্ঞানের পরিভাষায় প্রাকৃতিক নির্বাচন ও অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কথা স্বীকার করে নিতে পারলে নিবন্ধের শিরোনামে বিভাজন সংক্রান্ত যে ‘মিথ’-এর ইঙ্গিত সেই মিথটিকে ভেঙ্গে আমাদের বৌদ্ধিক চর্চা অন্যতর মাত্রা লাভ করতে পারে। 



ব্লগ সংরক্ষাণাগার