চলচ্চিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চলচ্চিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ক্রসিং ব্রীজেসঃ এক সৎ , অভিসন্ধিহীন যাত্রা

 

 

           

 দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনের ঠিক প্রাক-মুহূর্তে ভাজপা’র ভিশন ডকুমেন্টে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে Immigrants from north-east শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে হাওয়া বেশ গরম হয়েছে। ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডের প্রেক্ষিতে  উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবস্থান তথা এখানকার মানুষের পরিচয় নিয়ে নানান প্রশ্ন ও সংশয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ক্ষোভের বহির্প্রকাশও  ঘটেছে স্বাভাবিক কারণেই। অনেক অবাঞ্ছিত প্রশ্নচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে ভাবুক মনের আনাচে-কানাচে। এসব সবারই জানা, নতুন করে বলার নয়। তবু এখানে এ প্রসঙ্গের অবতারণার এক ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।

না, কোনও রাজনৈতিক নিবন্ধের প্রস্তাবনা হিসাবে উপরের কথাগুলো বলা হয়নি। কথাগুলো  মনে এসেছে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অরুণাচল প্রদেশের  Sange Dorjee Thongdok  নির্মিত  Crossing Bridges সিনেমাটি দেখতে দেখতে। এই অসাধারণ সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই আমার সাথে একমত হবেন যে আত্মপরিচয় সংক্রান্ত অনিবার্য এবং জরুরি কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ ফিল্মটির অস্থি-মজ্জায় জড়িয়ে আছে। অথচ এই ভিন্ন গোত্রের অসামান্য ফিল্মটির বিষয়ে অনেকেই জানেন না, এমনকি সিনেমা-প্রেমীদের অনেকেও! এ নিয়ে আমাদের এই অঞ্চলেও তেমন আলোচনা লক্ষ্য করা যায়নি সেভাবে। এটা শুধু দুর্ভাগ্যের নয়, লজ্জারও। উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রসঙ্গে মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যে অবহেলা-উদাসীনতার অভিযোগ নিয়ে আমরা সতত সোচ্চার, সেই আমরাই কি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে ফিরে তাকাই আমাদের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতি ? দর্শকের উদ্দেশ্যে এই জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিতেও ইতস্তত করেন না ফিল্মের পরিচালক।     

আমাদের সিনেমা দেখার এ পর্যন্ত অর্জিত যাবতীয় অভিজ্ঞতা মুখ থুবড়ে পড়ে Crossing Bridges  দেখতে গিয়ে। কীরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তার সামান্যতম পূর্বানুমান দীক্ষিত দর্শকের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। না, এর নেপথ্যে নেই নির্মিতির কোনো কেতাদুরস্ত কায়দা, কিংবা দর্শককে বোকা বানানোর ফিল্মি চাতুরি। নেই নাটকীয় উপাদান, রোমাঞ্চকর কোনো  উন্মোচনও নেই। তবু, দেখতে দেখতে অরুণাচল প্রদেশের অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যেতে হয়  সহজ সরল জীবনযাত্রার গহনে। এক অভূতপূর্ব প্রশান্তি সিনেমাটির অনন্য সম্পদ। ফিল্মের কাহিনি বলতে মহানগরের এক কর্মচ্যুত যুবকের ঘরে ফেরা ও শেকড় খুঁজে পাওয়ার মর্মস্পর্শী মানবিক বিবরণ। যাত্রা বলাই সঙ্গত, নিজস্ব শেকড়ের দিকে এক অভিসন্ধিহীন যাত্রা। আর সে যাত্রার অনুষঙ্গে  Crossing Bridges  নামকরণও এক ভিন্ন মাত্রা অর্জন করে। 

ওয়েব ডিজাইনার তাসি (Tashi) এক বছর যাবৎ মুম্বাইতে বেকারজীবন কাটানোর পর অনন্যোপায় হয়েই গ্রামে ফিরে আসে,  যে গ্রামের সঙ্গে তার সংযোগ ছিন্ন হয়েছে বছর আটেক। গ্রামের মন্থর জীবন পদ্ধতিতে অসহায় বোধ করে তাসি, যদিও তার পরিবারের সবার ইচ্ছে সে গ্রামেই থাকুক, খামারের দেখাশোনা করুকতাসি অপেক্ষা করে আইনজীবী বন্ধু অমিতের ফোনের, যে তাকে নতুন কর্ম সংস্থানের সুসংবাদ জানাবে। গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। কেবল বিশেষ এক স্থানে, পাহাড় চূড়োয় বৌদ্ধ মঠের কাছে তা পাওয়া যায়। মুম্বাই মহানগরের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামটির প্রান্তিক অবস্থান এতেই প্রতিষ্ঠা পায়তাসি স্বভাবত হাঁফিয়ে ওঠে,  সময়  কাটানোর জন্য একটা ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন (যেহেতু গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি থাকে দু’দফায় মাত্র ঘন্টা দুয়েক) কিনে নিয়ে আসে বন্ধুর সহায়তায়। তাসির বাবা শুরুতে বিরক্তি প্রকাশ করলেও ক্রমে টিভির নেশা তাকেই পেয়ে বসে। এ নিয়ে মৃদু কৌতুকও উপভোগ্য। 

এরই মধ্যে তাসি, গ্রামের স্কুলে পরিবর্ত-শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়,‌ কিছুদিনের জন্যশিশুদের কারো  কারো সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে  হিমসিম খায়, প্রশ্ন জাগে নিজের মনেও। সহকর্মী মেয়েটির (অনিলা) সাথে হৃদ্যতা বাড়ে। জানা যায়, মুম্বাইতে  চাকরি হারানোর সূত্রে তাসি তার প্রেমিকাকেও খুইয়েছে। মহানগরে সবকিছু খুইয়ে ফিরে আসা তাসি একটু একটু করে ক্রমশ গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে থাকে। ল্যাপটপে চ্যাপলিনের সিনেমা দেখিয়ে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বড় আপনার জন হয়ে ওঠে সেঅন্যতর অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করে জীবনের। প্রায় অলক্ষ্যে, গোপনে এই অন্তর্বিপ্লব ঘটতে  থাকে। যেন, বদলটা হয় অন্ধকারে। একদিন অনিলাও চলে যায় অন্যত্র, কিন্তু তাসির অন্তরে অন্য আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। পাহাড়ি নদীর উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে তৈরি ব্রীজ অন্যের হাত ধরে পার হতো অনভ্যস্ত তাসি, অথচ সেই  ব্রীজের উপর দিয়েই এখন সে স্বচ্ছন্দে ও অনায়াসে নদী পার হয় গ্রামের মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযুক্তি ঘটে তার, খুঁজে পায় অস্তিত্বের শিকড়, আত্ম-আবিষ্কারের অনুষঙ্গ । অমিতের কাছ  থেকে সুসংবাদ ও ডাক এলেও তাই আর সাড়া দিতে পারে না তাসি, মহানগরের  মায়াবী হাতছানি (গ্রামের মানুষের লৌকিক বিশ্বাস অনুসারেই যেন) এখন আর প্রলুব্ধ করে না তাকে। সে খুঁজে পেয়েছে তার হারানো স্বদেশ, স্বভূমি।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 Crossing Bridges is a 2013 Indian film directed by Sange Dorjee Thongdok. It is the first feature film ever to be made in the language of Shertukpen, which is an indigenous dialect native to the state Arunachal Pradesh in India. The film premiered on 27 September at the Mumbai International Film Festival in 2013.

   
Music by: Anjo John
 Produced by: Sange Dorjee Thongdok, Tenzing Norbu Thongdok
                                                                              Release date: 27 September 2013 (MIFF), 29 August 2014 (India)
                                                                                                              Starring: Anshu Jamsenpa,Phuntsu Khrime      -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ফিল্ম শুরু হয় দারুণ এক লং শট দিয়ে। একটি নিঃসঙ্গ ব্রীজের দৃশ্য। মুহূর্ত কয়েক পরেই, ব্রীজের ওপারে পাহাড়ের গা  ঘেঁষে, অসামান্য এক নিসর্গ দৃশ্যের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট পরিবহন নিগমের রঙচটা বাসটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে আসতে দেখা যায় বাসের জানলায় তাসির মুখ। শুরুতেই একটা মুড তৈরি করে দেন পরিচালক, অবলীলায় ১০২ মিনিটের যাত্রার সঙ্গী করে নেন দর্শককে। সাত আট বছর আগে ছেড়ে যাওয়া নিস্তরঙ্গ নিষ্কলুষ গ্রামটিতে তাসি প্রবেশ করে পর্যটকের মতন। ক্যামেরা স্থির ও ঋজু ভঙ্গিতে ধরে গ্রামের প্রায় স্থবির জীবনযাত্রাকে। মায়ের দেওয়া চা বিস্বাদ লাগে তাসি-র, গ্রামের জীবন ও সংস্কৃতি অচেনা মনে হয়স্মৃতিভ্রষ্ট সে, স্বর্গচ্যুত(দর্শকের আশা আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েই) পর্দায় এর অতিরিক্ত ও ‘দারুণ’ কিছু ঘটে না। কোনো উত্তেজক মুহূর্ত, কোনো নাটকীয়তা খুঁজে পাবেন না দর্শক। গ্রামের মানুষগুলোর ঘটনাবিহীন একঘেয়ে জীবনযাত্রার টুকরো-টাকরা ছবি, লৌকিক বিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কারের  পাশাপাশি এক চিলতে অস্ফূট প্রেম, ইত্যাদি উপাদান সম্বল করেই তাসির রূপান্তরের ইতিবৃত্ত বিবৃত হয় সহজ সাদামাটা ভাষায়ভঙ্গি দিয়ে ভোলানোর বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই, এমনই সরাসরি, সোজাসাপটা ন্যারেশন। তা সত্ত্বেও পরের দৃশ্যটি সম্পর্কে অগ্রিম অনুমান একেবারেই অসম্ভবপরিচালকের স্বকীয়তা এখানেই।   

অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফী এ ছবির সম্পদ। এই কৃতিত্বের দাবিদার অবশ্যই পূজা গুপ্তে। Canon 5D ক্যামেরায় শ্যুট করা এ  ছবি। সংলাপ ভৌমিকের সম্পাদনা যথাযথ। অরুণাচলের মন মাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। প্রকৃতি এ ছবিতে পটভূমি মাত্র নয়, জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে যেন১০২ মিনিট দৈর্ঘের এ ছবি ভীষণ স্বল্পবাক, নৈসর্গিক প্রশান্তি খর্ব হয় তেমন মুখরতা সচেতন ভাবেই বর্জিত। খুব ছোট অথচ অর্থবহ সব সংলাপ। অরুণাচলের আঞ্চলিক ডায়লেক্টে (Shertukpen) তৈরি প্রথম ফিচার ফিল্ম এটি। একেবারেই স্বল্প বাজেটের। যতটা জানা গেছে, দায়বদ্ধতা থেকেই আর্থিক দায়ও বহন করেছেন দর্জির পরিবার। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতার বদলে না-অভিনেতাদের দ্বারাই রূপায়িত হয়েছে অধিকাংশ চরিত্র।              

আমি স্থির নিশ্চিত, ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে এই অব্দি যারা পাঠ করেছেন তারা নির্ঘাৎ ভাবছেন যে এর মধ্যে এমন ‘আহা মরি’ কী-ই বা আছে। না, কাহিনির যে প্লট উপরে বর্ণিত হয়েছে তার চিত্রায়ণেও, সিনেমায়, আপনারা খুঁজে পাবেন না কোনো পরিচিত ফর্মূলা, অথবা কোনো ধ্রুপদী উৎকর্ষের নিদর্শন। কোন নাটকীয় মুহূর্ত, মেলোড্রামা, আবেগের উচ্ছ্বল ক্ষণ, কিংবা তাক লাগিয়ে দেবার মতো বিচ্ছিন্ন কোন অসাধারণ শট অথবা কম্পোজিশন।  কিন্তু পেয়ে যাবেন অপলক তাকিয়ে দেখার অমল অবকাশ। নিতান্ত সহজ ও সরল, অথচ সাবলীল এক ফিল্মি ভাষায় জটিল জীবনের জলছবি এঁকে যান Dorjee , SRFTI (Satyajit Ray Film Institute), Kolkata প্রত্যাগত এই তরুণটি ! সমগ্র ছবিটি জুড়ে থাকে অনুভবী ক্যামেরার মরমি পরশ। রাতের কলি যেমন অজানিতে ভোরের ফুল হয়ে ফোটে, আর আমরা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখি, এও ঠিক সেরকম। আমাদের দৃষ্টির সামনে অথচ আমাদের অজানিতেই, যেন এক সামুদ্রিক সমগ্রতা নিয়ে, এক প্রাণময় প্রশান্তি নিয়ে পরতে পরতে উন্মোচিত হতে থাকে অপাপবিদ্ধ প্রকৃতি ও জীবন হতবাক করে দেয়   দর্শককে। এ কেবল মুগ্ধ ও মোহিত হওয়া নয়, তারও অতিরিক্ত কিছু, অন্যতর কিছু। এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাঠক, মার্জনা করবেন, সে অভিজ্ঞতার শাব্দিক অনুবাদ বর্তমান কলমচির সাধ্যাতীত। তবু, নিবন্ধ রচনার এই ব্যর্থ প্রয়াসের পেছনে যুক্তি শুধু এই যে,  ঘটনাচক্রে ঘরের পাশে ধানের শীষে যে শিশির বিন্দু দেখেছি তার সংবাদ সংবেদনশীল হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার অতিরিক্ত কিছু নয় !        

 

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

ডিপার্চারসঃ মৃত্যুর মোহনায় জীবনের গান






মৃত্যু! এই শব্দটি উচ্চারিত হওয়া মাত্র শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। চতুর্দিক অন্ধকারময় মনে হয়। এর কারণ বোধ হয় এই যে, মৃত্যুকে মেনে নেওয়া খুব সহজ নয়। সে যতই ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান’ গীত গাওয়া হোক না কেন! ইয়োজিরো তাকিতা নির্মিত ‘ডিপার্চারস’ ফিল্মের নায়িকাও তাই মেনে নিতে পারেনি তার প্রেমিকের পেশাকে। মৃতের প্রসাধন করাকে কেউ পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারে সে তার সুদূর কল্পনাতেও আসে না। সিনেমা কিন্তু শুরু হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আখ্যান দিয়ে। ওই প্রেমিক দম্পতির মত আমাদের কল্পনায়ও ঘুণাক্ষরে ধরা দেয় না কাহিনির গতি কোন দিকে অগ্রসর হতে চলেছে। গল্পের নায়ক এক সাদামাটা সেলো বাদক, সাধারণ এক অর্কেষ্ট্রার দলে কাজ করে। শ্রোতাও নগণ্য, এদিকে-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো। অর্কেষ্ট্রার দল বন্ধ হয়ে যায় অর্থের অভাবে। ছেলেটি প্রেমিকাকে জানায় সব কথা, নিজের ছেড়ে আসা গ্রামে ফিরে যেতে চায় । এর মধ্যে গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতন সে আবার অতিরিক্ত দাম দিয়ে নতুন একটা সেলো কিনেছে। প্রেমিক যুগলের জীবন ও জীবিকার এই ক্রাইসিস নিয়েই শুরু হয় গল্প। পরিচালকের মুনশিয়ানায় অনন্য ভ্রমণের সঙ্গী হয়ে এক অপূর্ব আবিষ্কারের সাক্ষী হই আমরা। আর এই আবিষ্কার ঘটে মৃত্যুর অনুষঙ্গে। 

জাপানি সিনেমায় মৃত্যু এক প্রিয় বিষয় হিসেবে বারবার ধরা দিয়েছে। সে কুরোসাওয়ার ‘ইকিরু’, কিংবা ওজোশিকি’র ‘দ্য ফিউনারেল’ অথবা ওজু’র ‘টোকিও স্টোরি’ বা কোরে এদাস-এর ‘আফটার লাইফ’ যা-ই হোক না কেন। কিন্তু বিশেষত্ব এই যে এই পরিচালকেরা মৃত্যুকে নিরীক্ষণ করেন চলিষ্ণু জীবনের স্বার্থে ও শর্তেই। তাই ছবিগুলোতে শোকের ছায়া আছে যদিও হতাশা ও বিলাপের অস্তিত্ব নেই। পরজন্মের প্রতি অকারণ মনোযোগও কেন্দ্রীভূত হয় না এদের নির্মাণে, বরং দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে জীবিতের অবস্থানে, সদ্য মৃতের মর্যাদার প্রতি। ডিপার্চারস দেখতে দেখতে সেকথাই আরো একবার অনুভব করা গেল। অনুভব করা গেল যে, প্রথা-ভাঙা স্টাইল বা সাংঘাতিক শৈল্পিক বয়ান নয়, গল্প বলার উপযুক্ত দক্ষতাই সিনেমার ক্ষমতা ও আবেদন ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রকৃত সহায়ক। 

দাইগো (Masahiro Motoki) ও মিকা (Ryoko Hirosue) – এই প্রেমিক যুগলের সংসারে যখন দুর্যোগ নেমে আসে, তখন অনন্যোপায় হয়ে দাইগো স্থির করে যে মায়ের মৃত্যুর পর ছেড়ে আসা গ্রামেই ফিরে যাবে তারা। দামী সেলোটি বিক্রি করে পথ-খরচ যোগাড় হয়। এই পরাজয়ের গ্লানি নিয়েই শুরু হয় নতুন আশায় ঘর বাঁধা। অর্থাভাব সত্ত্বেও ছোট্ট সংসারে তৃপ্ত ছিল উভয়ে, পরস্পরের প্রতি সংলগ্ন ছিল। ‘কর্ম খালি’ বিজ্ঞাপন দেখে দাইগো আবেদন পাঠায়, ডাকও পেয়ে যায়। বিজ্ঞাপন দেখে প্রথমে সে ভেবেছিল কোনও ট্র্যাভেল এজেন্সির কাজ হবে বোধহয়। সাদামাটা সাক্ষাৎকার শেষে সে যখন জানতে পারে যে কাজটা শেষকৃত্যের আগে মৃতের পরিচর্যার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতস্তত করে ঠিক তখনই তাকে প্রক্রিয়াটি সচক্ষে প্রত্যক্ষ্য করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে একটা শিক্ষামূলক ভিডিও নির্মাণের পর্ব চলছিল। খানিক বাদেই দাইগোকে হাতে-কলমে কাজ আরম্ভ করতে হয়। খুব দ্রুত ঘটে যায় ঘটনাগুলো। 

শোক সন্তপ্ত পরিজনদের সম্মুখে একটি মাদুরের ওপর শায়িত মৃতদেহের পরিচর্যা শুরু হয়। স্নান করানো থেকে পোশাক পরানোর কাজগুলো সমাধা করা হয় অতি সন্তর্পণে, মৃতের মর্যাদার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় আড়াল তৈরি করা হয়। মুখাবয়বের প্রসাধন করা হয় সযত্নে এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, প্রায় নিখুঁত ভাবে। পরিবারের মানুষজন নীরব-নিশ্চুপ, জানু পেতে অবস্থান করে। কখনো-সখনো অবশ্য শোকের প্রকাশ ঘটে বুকফাঁটা কান্নার আওয়াজে, রূঢ় সত্যের উদ্ঘাটন হয় কখনো বা। অতঃপর শবদেহ প্রবেশ করানো হয় কাঠের কফিনে। প্রস্তুতির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচারের রূপ পায়। শুরু হয় দাইগোর জীবনের ‘নয়া পাঠ’। নিজের কাজের ব্যাপারটা মিকার কাছে খোলসা করে না দাইগো, সে মেনে নিতে পারবে না জানে বলেই। জাপানী সমাজে মৃতের পরিচর্যার কাজটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ যদিও, সম্মানজনক নয় মোটেই। মৃতদেহের স্পর্শ মাত্র অবাঞ্ছিত বিবেচিত হয়, স্নান-শুদ্ধি জরুরি হয়ে পড়ে। 

গ্রামের ছোট্ট বাড়িটিতে প্রেমিক যুগলের শান্তিতেই দিন গুজরান হয়। বাবার ফেলে যাওয়া এল পি রেকর্ড বাজিয়ে গান শোনে, ছেলেবেলায় ছেড়ে চলে যাওয়া যে বাবার কথা মোটেও ভাবতে চায় না দাইগো, বরং বিরক্তি প্রকাশ করে সে। সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু গোলমাল বাঁধল একদিন। ঘটনাচক্রে মিকা জেনে গেল দাইগোর কাজের বিষয়ে, ঘৃণায় দূরে সরে গেল। মৃতের পরিচর্যায় রত মানুষের ছোঁয়া পর্যন্ত সে বাঁচিয়ে চলতে চায়। একা হয়ে যায় দাইগো। কাহিনি মোড় নেয় অন্যদিকে। মৃত্যুকেন্দ্রিক সংস্কার ও মৃতদেহের সঙ্গে যুক্ত পেশার বাস্তব মূল্য –এ দুয়ের বৈপরীত্যে তৈরি হয় এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। 

ঠাস বুনোটের এক অসাধারণ স্ক্রীপ্ট মুহূর্তের জন্যও দর্শকের মনোসংযোগ বিঘ্নিত হতে দেয় না। অসাধারণ আবহ সঙ্গীত এমন এক মুড তৈরি করে দেয় যে মূল কাহিনির মধ্যে প্রবিষ্ট অনু-কাহিনি গুলো আলাদা করে নজরে পড়ে না দর্শকের দৃষ্টিতে। মৃত পত্নীর অনুপস্থিতিতে বিষণ্ণ সাসাকি (Tsutomu Yamazaki), অফিসের সহায়ক চরিত্রটির করুণ কাহিনি, সাধারণ স্নানাগার চালানো মহিলা ও তার গ্রাহক চরিত্রটি কিংবা গোরস্থানের সেই মানুষটি –সব যেন জাদুবলে মূল গল্পের প্লটের সঙ্গে জুড়ে যায় অনায়াসে। আমরা জেনে নিই তাদের জীবনের নানা কথা, কাহিনি। সব শেষে আসে দাইগোর সেই সহকারী, শান্ত সমাহিত কন্ঠে যে জানিয়ে দেয় যে, এই কাজের জন্যই জন্মেছে সে, তার ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই কোনো। দাইগোও কাজ না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন, সেটা দর্শককে বলে দেবার প্রয়োজন পড়ে না। দাইগোর মত দর্শকেরও বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এই জীবিকা তার কাছে অর্থবহ হয়ে উঠছে ক্রমে। 



ডিপার্চারস ফিল্মটি নিয়ে বলা যায় অনেক কথাই। বিভিন্ন সমালোচক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা করেছেন, গুরুত্বের কথা বলেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের ‘মোক্ষ’, এমন কি ‘সনাতন’ (? হিন্দু) ধর্মের ‘কর্ম’ ইত্যাদি প্রসঙ্গ জুড়েও আলোকপাত করা হয়েছে। সেরকম পোস্টমোর্টেমে আমাদের উৎসাহ নেই। সাধারণ দর্শক হিসেবে ফিল্মটি ভালো লাগার অভিজ্ঞতাই ভাগ করার চেষ্টা করব মাত্র। (প্রসঙ্গত, মুখ্য অভিনেতা ২৭ বছরের মোতোকি-র মাথায় চিন্তাটা কিন্তু আসে ভারত ভ্রমণে এসে গঙ্গার তীরে এক শবযাত্রা ও শবদাহের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ্য করার পর। দশ বছর লেগে যায় ডিপার্চারস তৈরি হতে।) দেশ-কাল নির্বিশেষে শবযাত্রা সংক্রান্ত লোকাচার সমূহ কিন্তু সব সমাজেই সব সময় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কেননা এর সঙ্গে ‘মৃত’ প্রিয়জনের ‘অন্যলোকে’ যাত্রার লোকবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। এর আড়ালে নিশ্চিত যে প্রবণতাটি বর্তমান তা হল জীবনচক্রে মৃত্যু ‘অনিবার্য’ জেনেও মৃত্যুকে ‘অস্বীকার’ করার প্রচণ্ড মানবিক তাগিদ। আর এটাই সম্ভবত জীবনের সব থেকে বড় চালিকা শক্তি । ডিপার্চারস ফিল্মের পরিচালক যেন সে কথাই জোরের সঙ্গে বলেছেন। ফিল্মে মৃতের পরিচর্যার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের বিবিধ আচারের উপস্থিতি থাকলেও ধর্ম কখনো প্রধান হয়ে ওঠেনি। বরং কতটা যত্নে এবং নিষ্ঠায় তা পালিত হচ্ছে সেটাই মুখ্য হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত মানুষটি কোন বিশেষ ধর্মের তা অবান্তর হয়ে পড়েছে, গুরুত্ব পেয়েছে মানুষ। মৃত মানুষ, এবং তার মর্যাদা। 



ডিপার্চারস ফিল্মটি নিয়ে বলা যায় অনেক কথাই। বিভিন্ন সমালোচক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা করেছেন, গুরুত্বের কথা বলেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের ‘মোক্ষ’, এমন কি ‘সনাতন’ (? হিন্দু) ধর্মের ‘কর্ম’ ইত্যাদি প্রসঙ্গ জুড়েও আলোকপাত করা হয়েছে। সেরকম পোস্টমোর্টেমে আমাদের উৎসাহ নেই। সাধারণ দর্শক হিসেবে ফিল্মটি ভালো লাগার অভিজ্ঞতাই ভাগ করার চেষ্টা করব মাত্র। (প্রসঙ্গত, মুখ্য অভিনেতা ২৭ বছরের মোতোকি-র মাথায় চিন্তাটা কিন্তু আসে ভারত ভ্রমণে এসে গঙ্গার তীরে এক শবযাত্রা ও শবদাহের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ্য করার পর। দশ বছর লেগে যায় ডিপার্চারস তৈরি হতে।) দেশ-কাল নির্বিশেষে শবযাত্রা সংক্রান্ত লোকাচার সমূহ কিন্তু সব সমাজেই সব সময় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কেননা এর সঙ্গে ‘মৃত’ প্রিয়জনের ‘অন্যলোকে’ যাত্রার লোকবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। এর আড়ালে নিশ্চিত যে প্রবণতাটি বর্তমান তা হল জীবনচক্রে মৃত্যু ‘অনিবার্য’ জেনেও মৃত্যুকে ‘অস্বীকার’ করার প্রচণ্ড মানবিক তাগিদ। আর এটাই সম্ভবত জীবনের সব থেকে বড় চালিকা শক্তি । ডিপার্চারস ফিল্মের পরিচালক যেন সে কথাই জোরের সঙ্গে বলেছেন। ফিল্মে মৃতের পরিচর্যার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের বিবিধ আচারের উপস্থিতি থাকলেও ধর্ম কখনো প্রধান হয়ে ওঠেনি। বরং কতটা যত্নে এবং নিষ্ঠায় তা পালিত হচ্ছে সেটাই মুখ্য হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত মানুষটি কোন বিশেষ ধর্মের তা অবান্তর হয়ে পড়েছে, গুরুত্ব পেয়েছে মানুষ। মৃত মানুষ, এবং তার মর্যাদা। 

ছুটে চলা প্রযুক্তির এই যুগে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। এমন কি পরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডিতেও সম্পর্ক যেন মৃতের শরীরের মতই ঠাণ্ডা, শীতল। ফিল্মে তাই দেখতে পাই যে, স্বামী জানেনা মৃত স্ত্রীর পছন্দের লিপস্টিক কোনটি, মা-বাবা সন্তানের মনের খোঁজ না নিয়ে যৌনতা নিয়ে তর্কে মাতেন, মা যে সাধারণ স্নানাগার চালান তার থেকে সুবিধা নেওয়া ছাড়া ছেলের অন্য চিন্তা নেই। এমনকি প্রোটাগোনিস্ট চরিত্রটি, দাইগো, সেও নিতান্ত অল্প বয়সেই পিতার সাহচর্য থেকে বঞ্চিত। ক্ষয়িষ্ণু সমাজের এক মানবিক ব্যবচ্ছেদ দেখি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে। নিজের পরিবারের সঙ্গেই মানুষের বেড়ে যাওয়া দূরত্ব, শীতল থেকে ক্রমে আরো শীতল হয়ে পড়া সম্পর্ক যে একাকীত্ব, যে নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয় সেও তো মৃত্যুরই সামিল। মৃতের প্রসাধনের দৃশ্যগুলোতে তাই দেখতে পাই অনুতপ্ত পরিজনদের যন্ত্রণা-ক্লিষ্ট মুখ, বেঁচে থাকতে যত্ন না নেওয়ার প্রায়শ্চিত্ত করতেই তারা যেন ‘শেষ যাত্রা’র সাজসজ্জা নিখুঁত দেখতে চায়। আর তাদের চাওয়াকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে প্রাণ-মন ঢেলে নিজের কাজ করে চলে দাইগো। কাজটা আর অস্বাভাবিক মনে হয় না, বরং দায়িত্ব বা কর্তব্য হয়ে ওঠে। সে কারণেই অন্য কোনো (স্বাভাবিক) পেশা খুঁজে নেবার কথার উত্তরে মিকাকে সে দৃঢ় স্বরে বলে, বলতে পারে, ‘মৃত্যু তো স্বাভাবিক’। এক নিদারুণ মানবিক সত্যের উন্মোচন ঘটান পরিচালক এই দৃশ্যগুলির পরিকল্পনায়, ডিটেল সমেত। 

পরিবারের আশ্রয় আসলে ভালোবাসার আশ্রয়। যে ভালোবাসা ছাড়া জীবন অর্থহীন। একটু বিস্তৃত করে যদি বলা হয়, তো বলা যায় যে, মানুষ মানুষের স্পর্শ চায়, মানবিক পরিবেশ চায়। ডিপার্চারস আসলে ছেড়ে যাওয়ার নয়, ফিরে আসার গল্প। ঘরে ফেরার, মূলের কাছে ফিরে আসার। দাইগোও তাই ফেলে আসা গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়, প্রিয়জনকে হারিয়ে পরিবার-বিমুখ মানুষ আবার পরিবার-মুখী হয়। গর্ভে সন্তান নিয়ে মিকা যেমন ফিরে আসে। টোকিও অর্কেস্ট্রায় যে সেলো নিয়ে বিটোফেনের নাইন্থ সিম্ফোনিতে অংশ নিয়েছে, অর্থের অভাবে বেচে দিতে বাধ্য হলেও সেই প্রিয় সেলোই আবার হাতে ওঠে আসে দাইগোর। গর্ভে সন্তান এসেছে টের পেয়ে মিকাও শেষ চেষ্টা করে প্রিয়তমের কাছে ফিরে যাবার, সন্তান গর্বিত হতে পারে তেমন একটা জীবিকা খুঁজে নেবার অনুরোধ করে। উভয়ের আলাপচারিতার মধ্যেই আসে ডাক, সহপাঠির মায়ের মৃত্যুর। কাছে থেকে মিকাও দেখে সেই অসামান্য প্রসাধন-প্রক্রিয়া। ভুল ভাঙে, বোধোদয় ঘটে। ভালোবাসার আশ্রয়ে ফিরে আসে আবার, আরো বেশি হৃদয়ের বিশ্বাসে। 

বাবার মৃত্যুর খবর জেনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্য গ্রামে যায় দাইগো। প্রথমে বাবার মৃতদেহ সনাক্ত করতে পারেনা সে, অথচ শেষকৃত্যের প্রস্তুতিতে রত কর্মীদের দায়সারা কাজে ক্ষুব্ধ হয়, নিজেই পরিচর্যায় হাত দেয়। যে বাবার প্রতি রাগ-অভিমান, ক্ষোভের সীমা নেই, তার অবমাননা অসহ্য ঠেকে। হাতের মুঠোয় ধরা ছেলেবেলায় দেওয়া পাথর-লিপি আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে বাবাকেই যেন পুনরাবিষ্কার করে, ফিরে পায়। সম্পর্কের এই জটিল অথচ মানবিক উৎসারের দৃশ্যায়ন সহজ নয়, সচরাচর দেখাও যায় না। 

মিকাকে বাবার দেওয়া এক টুকরো পাথর, প্রস্তর-লিপি (stone-letter) দেখিয়ে দাইগো যখন বলে যে চিঠির আদান-প্রদানেরও আগে মানুষ পাথরের মাধ্যমেই হৃদয়ের কথা ও অনুভব, ভালোবাসার উত্তাপ পৌঁছে দিত প্রিয়জনের কাছে, এবং সেই পাথরের টুকরোটি যেভাবে (গর্ভের সন্তানকে উদ্দেশ্য করে) মিকার শরীরে ছোঁয়ায় তখন সে দৃশ্যকল্পনা যেন পরিণতির আশ্চর্য শিখর স্পর্শ করে, ভিন্ন মাত্রা পায়। সিনেমাটিও, দর্শকের সাথে যেন প্রায় নিঃশব্দেই এক অমোঘ সংযোগ প্রবাহ তৈরি করে। ছেড়ে যাওয়ার, -মৃত্যু তো প্রকৃত অর্থে ছেড়ে যাওয়াই,- সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার দৃশ্য ঘুরে ফিরে বারবার এসেছে ফিল্মে , কিন্তু কোথাও পুনরুক্তিদোষে বিরক্তি উদ্রেককারী হয়নি। বরঞ্চ, ভিন্ন অনুষঙ্গে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। মূল গল্পের ভেতর অনু-গল্প গুলো যেমন। 





বলা নিষ্প্রয়োজন, এজাতীয় যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয় যে সৎ সিনেমা তার নির্মিতি নিয়ে পৃথক প্রশস্তির অবকাশ থাকে না। শট কিংবা সিকোয়েন্স, কাট অথবা মন্তাজ, আলো ও সঙ্গীত, স্ক্রীপ্ট থেকে শুরু করে অভিনয় ও সিনেমাটোগ্রাফি যে জায়গায় যে মাত্রায় পৌঁছলে এমন সিদ্ধিলাভ হয় তা সচরাচর চোখে পড়ে না। ডিপার্চারস সেই গোত্রের সৃষ্টি যা দর্শককে হাত ধরে সুন্দরের দরবারে নিয়ে যায়, জীবনের আনন্দযজ্ঞে নিয়ত নিমন্ত্রণ পাঠায়। শেষ হয়েও শেষ হয় না এ ছবি। প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হয় ডিপার্চার নয়, এ ছবির মর্মে আছে অ্যারাইভালের ইশারা। প্রস্থানের, পরাজয়ের কাহিনি এ নয় –এর মর্মে রয়েছে প্রত্যাবর্তনের মানবিক আকুতি, স্বপ্ন ও অঙ্গীকারের প্রতীকী ব্যাঞ্জনা। মৃতের শিয়রে বসে আকাঙ্ক্ষার জীবন খুঁজে নেওয়া। খুঁজে পাওয়া। মৃত্যুতে জীবনের পরিসমাপ্তি হলেও জীবনপ্রবাহের মৃত্যু নেই। তাই এ সিনেমায় সব মৃতের মুখ জীবনের দিকে ফেরানো । 

ডিপার্চারস সিনেমাটির সাফল্যের মূলে যে বস্তুটি তা হচ্ছে স্বর এবং সুরের সঙ্গতি। গল্প কথনের মৃদু স্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঁধা হয়েছে সুর। সেলো বাদন সেখানে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে। পরিচালক তাকিতা বাদ্যযন্ত্রটি ও মৃতের শেষকৃত্যের মধ্যে সমান্তরাল চিহ্ন এঁকেছেন, তাঁর বর্ণনায় – 

... ironically, there is something similar between the process of encoffinment and the act of playing the cello. When you play the cello, the instrument has a human, curvaceous form. The cellist embraces that form when playing the instrument, very loving, affectionate. That's very similar, physically, to the actions of the encoffiner, cradling the body, being tender and gentle with it. 

অসামান্য এক মন্তাজে (montage),যে দৃশ্যে দাইগো, প্রকৃতির কোলে খোলা আকাশের নিচে ছেলেবেলার সেলোটি হাতে নিয়ে বাজায় তার সঙ্গে মৃতদেহ কফিনবন্দী করার দৃশ্য জুড়ে দিয়ে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেন তা এক কথায় অতুলনীয়। ওপরের মন্তব্যটিই যেন চলচ্চিত্রের ভাষায় শরীরী হয়ে ওঠে। 

মোতোকি, ইয়ামাজাকি, রাইয়োকো সদৃশ অভিনেতাদের কাজের পৃথক উল্লেখ বাহুল্য মাত্র। দৃশ্য পরিকল্পনার অভিনবত্ব যে সংবেদনশীলতার জন্ম দেয় তা দর্শককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, গ্রামের নির্জনতা ও সাধারণ স্নানাগারের অন্তরঙ্গ ভিড়ের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিঘাত তৈরি করে। ফিল্ম জুড়ে সাদা রঙের প্রাচুর্যও লক্ষ্য করার বিষয়। সাদার অনুষঙ্গে বরফ, ক্রিসেন্থিমাম ইত্যাদির সুপরিকল্পিত ব্যবহার অন্য মাত্রা যোগ করে। সাদা রঙ যেন সত্যের প্রতীক। তার সঙ্গে ধ্রুপদী সঙ্গীত ও মৃতের পরিচর্যার আচার-অনুষ্ঠানে অঙ্গসঞ্চালনের ধরণ মিলে মিশে একাকার হয়ে শেষকৃত্যের বিশুদ্ধতা ও পবিত্রতাকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করে। 



--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


Casting
Ryōko Hirosue, who had formerly worked with Takita, was cast as Mika.

Motoki, by then in his early 40s and having built a reputation as a realist, was cast as Daigo.[h][31] Veteran actor Tsutomu Yamazaki was selected for the role of Sasaki;[32] Takita had worked with Yamazaki on We Are Not Alone (1993).[33] Although the character of Mika was initially planned as being the same age as Daigo, the role went to pop singer Ryōko Hirosue, who had previously acted in Takita's Himitsu (Secret) in 1999.[i] Takita explained that a younger actress would better represent the lead couple's growth out of naivety.[32] In a 2009 interview, Takita stated that he had cast "everyone who was on my wish list".[34]

Motoki studied the art of encoffinment first-hand from a mortician, and assisted in an encoffining ceremony; he later stated that the experience imbued him with "a sense of mission ... to try to use as much human warmth as I could to restore [the deceased] to a lifelike presence for presentation to her family".[35] Motoki then drilled himself by practising on his talent manager until he felt he had mastered the procedure, one whose intricate, delicate movements he compared to those of the Japanese tea ceremony.[36] Takita attended funeral ceremonies to understand the feelings of bereaved families, while Yamazaki never participated in the encoffinment training.[37] Motoki also learned how to play a cello for the earlier parts of the film.[38]

To provide realistic bodies while preventing the corpses from moving, after a lengthy casting process the crew chose extras who could lie as still as possible. For the bath house owner Tsuyako Yamashita, this was not possible owing to the need to see her alive first, and a search for a body double was unfruitful. Ultimately, the crew used digital effects to transplant a still image of the actor during the character's funeral scene, allowing for a realistic effect.[34]









































বিকল্পের খোঁজে ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত ভাবনা








বিকল্প সিনেমা কথাটা হালে বেশ চালু হয়েছে। যথেচ্ছ ব্যবহারে হাল্কা হবার উপক্রমও যে হচ্ছে না সেও নয়। বিকল্প বলতে আসলে কী বুঝব? চলচ্চিত্র চর্চার আঙ্গিনায়, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের দৌলতেই মুখ্যত আমরা আর্ট মুভি, নিউ ওয়েভ কিংবা প্যারালাল সিনেমা ইত্যাদি শব্দবন্ধের সঙ্গে সকলেই কম বেশি পরিচিত। এও মিথ্যে নয় যে, ওরকম সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত ক্যাটাগরিতে একটু অথবা কিছুটা অন্যরকম, ভিন্নস্বাদের ফিল্ম বা সিনেমা আমরা উপভোগের সুযোগ পেয়েছি। বিকল্প সিনেমা কি একুশ শতকের সেরকম কোন ‘অন্যরকম’-এর রকমফের? না কি তার মানে একেবারে আলাদা কিছু ? মোটা দাগের একটা জবাব অবশ্য এভাবে দেওয়া যায় যে, মূলধারার বাইরের সিনেমা। মুলধারা মানে সোজা অর্থে বাণিজ্যিক সিনেমা। দোহাই পাঠক, বাণিজ্যিক মানে ‘মন্দ উপাখ্যান’ এমনটা আবার ভেবে বসবেন না যেন! সিনেমা নিয়ে সিরিয়াস ভাবনা-চিন্তা করতেন এমন নির্মাতা-পরিচালকদের এক সময় নানা সঙ্গত কারণেই এমনটা মনে হয়েছে যে নিজের মত করে ছবি করতে হলে একটা পাল্টা ব্যবস্থা চাই। যেহেতু সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে পুঁজি থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি স্টুডিও ইত্যাদির ওপর নির্ভরতা, নির্মাণের পর আবার প্রদর্শনের জন্য ডিস্ট্রিবিউটরের মুখাপেক্ষী হওয়া ইত্যাদি হ্যাপার ওপর আরেক বাড়তি খাঁড়া হিসেবে ছিল সেন্সর বোর্ড নামক মাস্তান। 

তো কেউ কেউ ভাবলেন এভাবে ভালো সিনেমা বানানো মুশকিল, অর্থাৎ স্বাধীন ভাবে তৈরি করা অসম্ভব। কথাটা মিথ্যেও নয়। আর এরকম ভাবনার ফলশ্রুতিতে ইণ্ডিপেণ্ডেন্ড ফিল্ম, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, অন্য সিনেমা ইত্যাদি বহু রকমের ফিল্মের কথা আমরা শুনলাম বটে, কিন্তু বাস্তবে কী বা কতটুকু পেলাম তা বলা মুশকিল। মেনস্ট্রিম সিনেমার বাইরে যারাই ছবি তৈরির প্রয়াস করেছেন তাদের অধিকাংশের কাছেই অর্থের যোগান বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। অনেকেই ধার করে বা চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে কিংবা ভবিষ্যতের নিজস্ব সঞ্চয় নিঃশেষ করে দুঃসাহসিক কিছু পদক্ষেপ নিলেন। কিছু অসাধারণ নির্মাণ আমরা পেলাম। কিন্তু একটা সাড়া জাগানো আন্দোলন বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু তৈরি হল না, অথবা করা গেল না। অনেকে আবার ফিল্ম তৈরি করেও দর্শকের দরবারে পৌঁছতে পারলেন না বিভিন্ন ডামাডোলে। আর্থিক দেনার দায়ে হতাশ হলেন কেউ কেউ। কোন রকম সমঝোতার মানসিকতা যাদের ছিল না তারা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেলেন। কেউ কেউ পরীক্ষা-নিরীক্ষার এমন সব কসরৎ করলেন যার জন্য নাচ-গান-নৌটঙ্কিতে অভ্যস্ত আমদর্শক তৈরি ছিল না। সামান্য কয়েকজন দড়ির ওপর ব্যাল্যান্সের খেলা দেখিয়ে টিকে গেলেন এবং ‘মিডল সিনেমা’ গোছের একটা ক্যাটাগরি তৈরি হল। সত্তর-আশির দশকে সরকারি সহায়তায়, এন এফ ডি সি ইত্যাদির কল্যানে কিছু ভিন্ন স্বাদের ভালো সিনেমা আমরা পেলাম যদিও অবস্থাটা খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না। টিভি-ভিডিও যুগ এসে চিরাচরিত সিনেমাকে কিছু পরিমাণে কোণঠাসা করে ফেলল। 

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঘটে গেছে তার ফলে সেলুলয়েড সিনেমার ক্ষেত্রে নয়া সংকট ঘনিয়ে এলো। ক্যানবন্দী রীল ধীরে ধীরে বিদেয় নিল, তার জায়গা নিল সিডি-ডিভিডি। এক সময় দল বেঁধে যারা সিনেমা হলে লাইন দিত, ব্ল্যাকে টিকিট কিনেও সিনেমা দেখার শখ মেটাতে দ্বিধা করত না তারা আস্তে আস্তে ঘরমুখী হতে আরম্ভ করল। ক্রমে সি ডি-ডি ভি ডি ইত্যাদির সহজলভ্যতার দৌলতে সিনেমা হলের কাউন্টারের সামনের দীর্ঘ লাইন হ্রস্ব হতে হতে একসময় প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একে একে বন্ধ হতে থাকল হল গুলো, প্রথমে বড় বড় শহরে, তারপর ছোট শহর ও শহরতলিতেও সেই মড়ক দেখা দিল। 



সিনেমার ক্ষেত্রে ‘শিল্প’ কথাটা, বাংলা ভাষায়, ‘আর্ট’ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি’ দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। যুক্তিসঙ্গত কারণেই পারে। ব্যবহৃত হয়েও থাকে। সিনেমার প্রযোজনা-পরিচালনা-পরিবেশনা-প্রদর্শন এই গোটা প্রক্রিয়াটাই শিল্পক্ষেত্রের (industry sector) সঙ্গে মেলে। তাছাড়া স্টুডিও-সেন্সরবোর্ড-সিনেমা হল নির্ভর যে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো সেও সমগোত্রের। সিনেমা তৈরির জন্য নিয়োজিত পুঁজির মূল লক্ষ্য অবশ্যই মুনাফা, এবং উপরে উল্লেখ করা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যা উৎপাদিত হয়ে থাকে তা যে বাজারের নিরিখে ‘ফিনিশড্ প্রোডাক্ট’ মাত্র সে বিষয়ে সন্দেহমাত্র থাকার কথা নয়। এই পণ্য বাজারে আসে, চলে, বাজার অর্থনীতির নিয়ম-নীতি মেনেই। অর্থাৎ সিনেমা সেই অর্থে আর দশটা পণ্যের মতোই একটা পণ্য মাত্র। অধিকাংশ বিনোদন-মূলক সিনেমা তাই। কিন্তু তাই যদি হয় তো সৃষ্টিশীল সিনেমা বা আর্ট সিনেমা নির্মাণের সম্ভাবনা কতদূর? আদৌ কি সম্ভব? এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখা দরকার এখানে আর্ট সিনেমা বলতে মূলত সৃষ্টিশীল সিনেমার কথাই বোঝানো হচ্ছে। এবং এও স্মর্তব্য যে, বিনোদনের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার বস্তুত মৌলিক কোনও সংঘাত নেই। চার্লি’র সিনেমা তার চরম দৃষ্টান্ত। 

এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের মধ্যে থেকে তেমন সিনেমা নির্মাণের সুযোগ ও স্বাধীনতা নিশ্চয়ই অবাধ নয়। সে সুযোগ, বলা অহেতুক, সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ। অবশ্য কোনো ব্যবস্থাই বোধহয় শিল্পসৃষ্টির সম্পূর্ণ বিরোধী হয় না, হতে পারে না। তবে এও মিথ্যে নয় যে, সাহিত্যিক-সঙ্গীতকার-চিত্রশিল্পী-নাট্যকার সৃষ্টি কর্মে যে পরিমাণ স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ পান একজন চিত্রনির্মাতা-চিত্রপরিচালকের স্বাধীনতা সে তুলনায় অনেকাংশে খণ্ডিত। মাধ্যম হিসাবে সিনেমার প্রভাব ও প্রতিপত্তি অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে বেশি ও বিস্তৃত বলে সরকারি-বেসরকারি সব তরফেই সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস অত্যধিক, এবং অব্যাহত। সেন্সর বোর্ড মার্কা খবরদারি কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রেই বর্তমান, শিল্পচর্চার অন্য ক্ষেত্রে নয়। সিনেমার শক্তিই তার দুর্বলতারও (বন্দীদশার) কারণ। একজন পরিচালককে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোতে হয়। আর ঠিক এখান থেকেই, সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও চলচ্চিত্র-চর্চার সীমা সম্প্রসারণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই শুরু হতে পারে বিকল্প সিনেমা ভাবনা, যেভাবে একদিন শুরু হয়েছিল ‘ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন’। 

ডিজিট্যাল প্রযুক্তির কল্যাণে আজকাল সিনেমা তৈরি করা থেকে প্রদর্শনের গোটা প্রক্রিয়ায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। নির্ধারিত স্থান নির্ধারিত সময় নির্ধারিত পদ্ধতি –এই ধারণাটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। দান-অনুদান-ঋণ ইত্যাদির ওপর আর্থিক ব্যাপারটা ছেড়ে দিয়ে পঞ্চাশ-ষাটের দশকেও যারা দুঃসাহসিক পরিকল্পনার রূপ দিতে পেরেছিলেন তাদেরও প্রদর্শনের ব্যাপারে পরনির্ভরতা ছিল অনিবার্য। এন এফ ডি সি’র মত সংস্থাও ফিল্ম প্রদর্শনের প্রসঙ্গটি এক হিসেবে উপেক্ষাই করেছে বলা যায়। ডিজিট্যাল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট সেদিক থেকে এক নয়া সুযোগ এনে দিয়েছে বলা যায়। কম খরচে ছবি তুলে ঘরে বসে সম্পাদনা করে প্রদর্শনের ক্ষমতা প্রায় হাতের মুঠোয় এসে গেছে। স্বল্পদৈর্ঘের সিনেমা নির্মাণে উৎসাহী হলেন অনেকেই, এবং একটা নয়া আন্দোলনও রূপ নিল বলা যায়। কিন্তু সেও সীমাবদ্ধ রইল একশ্রেণীর দর্শক এবং ফিল্ম সোসাইটি/ক্লাব ইত্যাদির মধ্যেই। মূলধারার সিনেমাও কিন্তু ডিজিট্যাল প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে, আরো সঠিক অর্থে দখল করে, অন্য চেহারায় হাজির করল সিনেমাকে। নগরে, সিটিতে গড়ে উঠতে লাগল মল- মাল্টিপ্লেক্স, সেখানে উন্নত প্রযুক্তিতে সিনেমা প্রদর্শনের আধুনিক ব্যবস্থা করা হল যদিও আম-দর্শক পকেটের জোরে সেথায় প্রবেশের পথ খুঁজে পেল না,পাচ্ছে না। প্রবেশের পথ পুরো দমে রুদ্ধ হয়ে গেল বললেও অত্যুক্তি হবে না। 

শিল্প বিপ্লবের (industrial revolution) ফলে যে নয়া শ্রমিকশ্রেণীর আবির্ভাব ঘটেছিল সেই শ্রেণীটির বিনোদনের প্রয়োজনে এক নতুন মাধ্যম ও ব্যবস্থা জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছিল। আর প্রযুক্তির হাত ধরে সে চাহিদা পূরণ করতে হাজির হয় মুভি, সিনেমা। কিন্তু হালের ডিজিট্যাল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের রমরমার যুগে মল-মাল্টিপ্লেক্সের বাড়বাড়ন্তের সময়ে মূলধারার মানে মেনস্ট্রিম সিনেমার দর্শক কিন্তু বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমরা যখন খুব কম বাজেটে সিনেমা নির্মাণের সুযোগের কথা বলছি ঠিক তখনই আলোচ্য হয়ে উঠছে কোটি কোটি অর্থ-ব্যয়ে ‘বিগ বাজেটের ছবি’। অর্থাৎ, একটা বিভাজন প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যায়। এমন কি নাগালের মধ্যে পাওয়া প্রযুক্তির কৃপায় আমরা যাকে ‘আমাদের এলাকা’ ভেবে তৃপ্তির শ্বাস নিতে অভ্যস্ত সেখানেও (বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকলে) কর্পোরেট প্রভুরা থাবা বসাচ্ছে। মেনস্ট্রিমের তাবড় তাবড় নামীদামী পরিচালকরাও এখন শর্ট ফিল্ম তৈরি করে ইউ টিউবে ছড়াচ্ছেন। যেহেতু মুঠোফোনেও আজকাল সিনেমা দেখা যায়, সফর করতে করতেও। সেই বাজারটাই বা ছাড়বে কেন! অনেকটা খুচরো (retail) ব্যবসায় সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের (FDI) মত ব্যাপার ঘটে চলেছে, ঘটছে। কোনও ক্ষেত্রই, মানে সূচ্যগ্র মেদিনীও এরা বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দিচ্ছে না, ছেড়ে দেবে না। এই বিষয়টা বুঝতে হবে আমাদের, অন্যথায় বিকল্পের ভাবনা অর্থহীন। 



এই জায়গা থেকেই বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। বিকল্প মানে তো প্রযুক্তির বিকল্প নয় শুধু, বিষয়গত বিকল্প ভাবনাও বটে। এর আগে আমরা বিকল্প হিসেবে যে ধারা গুলোর উল্লেখ করেছি তার প্রতিটিই কিন্তু তত্ত্বগত ভাবে এসেছে মূলধারার সাপেক্ষে, পাল্টা হিসেবে নয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষিতে বিকল্প হতে হলে চাই এক প্রতিস্পর্ধী পাল্টা ব্যবস্থা। নির্মাণ-বিতরণ-প্রদর্শন-এর এক বিকল্প ব্যবস্থা। সিনেমায় বৈশ্বিক (global) ও আঞ্চলিক (local) – এ দুয়ের পরস্পর স্থান বদল সহজ এবং স্বাভাবিক ব্যাপার। ‘আমাদের সিনেমা’ আর ‘ওদের সিনেমা’ বৈচিত্রে-বৈশিষ্টে আলাদা হওয়া চাই। আর এই পৃথকীকরণের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ- সিনেমার ভাষায় point-of-view –অর্থাৎ গণদৃষ্টিকোণ চাই। এমন কিছু বিষয় আছে মেনস্ট্রিম যেগুলো নিয়ে কাজ করে না, করবে না কখনোই, কিংবা করলেও বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করবে। আমাদের এমন সব বিষয় নির্বাচন করতে হবে যা অভিনব অথচ প্রাসঙ্গিক, এমন ভাবে হাজির করতে হবে যাতে শিল্পসম্মত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে সাবলীল ভাবে। বৈশিষ্টে আঞ্চলিক হয়েও যার আবেদন হবে বৈশ্বিক। এক কথায় নয়া ন্যারেটিভ চাই। মাল্টিপ্লেক্সের চৌহদ্দির বাইরে যে উন্মুক্ত দর্শককুল তাদের জন্য সিনেমাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। দর্শককে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হবে। নির্মাণের কলাকৌশলগত প্রযুক্তি এখন নাগালের মধ্যে, প্রয়োজন কেবল উদ্ভাবনী শক্তির। এক যৌথ প্রয়াসের। যৌথতার কোনও বিকল্প নেই। 

মনে রাখা দরকার যে ‘সিনেমা দেখা’ ব্যাপারটাই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে ক্রমশ। সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে ‘নির্ধারিত স্থান নির্ধারিত সময় নির্ধারিত পদ্ধতি’ সংক্রান্ত ধারণাটি আজ অবান্তর হয়ে পড়েছে। ভিউইং (viewing) ব্যাপারটা এখন আর আগের মত ritual act নয়, বরং বহুলাংশে interactive হয়ে উঠছে। তাছাড়া সিনেমা নির্মাণ থেকে প্রদর্শন অবধি যে hierarchy বর্তমান ছিল, সেও আর বজায় থাকছে না আজকের এই ইলেক্ট্রনিক এজ-এ। সিনেমা একদিন ট্র্যাডিশনাল আর্ট ফর্মগুলোর, যেমন চিত্রকলা এবং থিয়েটারের, পরিবর্ত হিসাবে জনসাধারণের হাতে নীতি ও মতাদর্শ প্রচারের এক নতুন ভাষারীতি তুলে দিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বিরাট লাফের ফলেই চলচ্চিত্রের সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল এবং তার দরুণ শিল্পকর্ম বিষয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছিল। আধুনিক সেই প্রযুক্তির কাছে মানুষ নিজেকে কীভাবে হাজির করবে তার মধ্যে নয়, বরং ফিল্মের বৈশিষ্ট নিহিত ছিল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটানো যায় সে প্রশ্নের মধ্যে। আজকে, ডিজিট্যাল টেকনোলজির মত আরেক প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনের ফলে সিনেমার এযাবৎ পরিচিত ও স্বীকৃত সংযোগসাধন রীতির কোন পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা কতটা বা আদৌ আছে কি না, কিংবা এর ফলে সিনেমার আবির্ভাবে যেমন ঘটেছিল সেরকম বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন গণসংযোগের ক্ষেত্রে ঘটবে কি না সেটাই বিচার্য। আমাদের সিনেমা সেটা পারবে কিনা তা নির্ভর করবে বাস্তবের প্রতিফলন কীভাবে কতটা ঘটাতে পারছে তার ওপর। বিকল্প প্রস্তাবে আমরা কতটা কী পরিমাণে বিশ্বস্ত ও গণমুখী হতে পারছি তার ওপর।

শরীরের ময়ূর - মহলে ঋতুপর্ণ

 


বাংলা চলচ্চিত্রের প্রায় দু’দশকের ‘ম্যাটিনি আইডল’ ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর অকাল মৃত্যু বাঙালি নাগরিক মানসকে প্রায় বিবর্ণ বিবশ করে দিয়ে গেছে বলা যায়। অন্তত বিভিন্ন গণমাধ্যমের বয়ান সেরকমই। বিগত প্রায় দু দশক জুড়ে  চলচ্চিত্রের অন্তর ও বাহির মহলে প্রয়াত ঋতুপর্ণের তুমুল উপস্থিতি অনস্বীকার্য নিশ্চয়। এমন নয় যে মানুষটি হঠাৎ করে  উড়ে এসে জুড়ে বসেছেনতবে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় যে জুড়ে বসেছিলেন সেকথা অস্বীকারের মানে হয় না কোনও ঊনিশটি সিনেমা তৈরি করে বারোটি জাতীয় পুরস্কার, চাট্টিখানি ব্যাপার নয় নিশ্চয়ই। এর আড়ালের রহস্য ও রসায়ন    নিয়ে ভাবতে গেলেই ধন্দ লাগে, সন্দেহ জাগে। বাঙালি দর্শক তবে কি রাতারাতি এতটা দীক্ষিত হয়ে উঠল যে ঋতুপর্ণকে প্রায় নগদ মূল্যেই অভিবাদন জানাতে এগিয়ে এলো। খটকা লাগে বৈকি! লাগে, কারণ তিনি তো আবার  ‘সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল’-এর যথার্থ উত্তরসূরী বলে কোন কোন মহলে স্বীকৃত ও প্রচার-প্রাপ্ত। এমনতর প্রচারে তাঁর  নিজেরও যে ভূমিকা তুচ্ছ ছিল তা নয়, বরং তাঁর সচেতন প্রশ্রয় এজাতীয় প্রয়াসকে উসকে দিয়েছে। সন্তান পিতৃসদৃশ হবে, সেটাই বাঞ্ছনীয় –এরকম মন্তব্য শুনেছি তাঁর মুখে, (অথচ তিনি নাকি সিনেমায় নারীর ‘নাড়ির যন্ত্রণা’ প্রকাশে তৎপর ছিলেন) এবং এও বলেছেন যে সত্যজিৎ রায়-ই তাঁর চলচ্চিত্র-গুরু, থুড়ি অভিভাবক অর্থাৎ, সাদৃশ্য যা তা ‘বাপ-বেটা’র (চেহারার) মিলের মতোই। এই দর্পিত আত্মপ্রচারের আড়ালে এই অসতর্ক স্বীকারোক্তিও বুঝি রয়ে গেছে, যে, মিলটুকু শুধু বহিরঙ্গেই, অন্তরঙ্গে নয়। সত্যজিৎ-ঋত্বিক তো বহুদূর, মৃণাল সেনের ‘দায়বদ্ধ সিনেমা’ নির্মাণের ব্যর্থ প্রয়াস সমূহের সঙ্গেও কি ঋতুপর্ণ কোনও ভাবেই তুলনীয়?    

প্রশ্নটা পাঠকের দরবারে আপাতত পেশ করা গেল শুধু। পরবর্তী অংশে এর উত্তর মিলবে তেমন দুরাশা, শ্রদ্ধেয় পাঠক, না করাই সমীচীন। কেননা, এ নিবন্ধকার আদৌ সমালোচক কিংবা শিল্পবোদ্ধা নন এবং এ নিবন্ধের উদ্দেশ্যও তা নয়। এর উত্তর কেবল দিতে পারে ভবিষ্যৎ , দেবেও হয়ত। আমরা বরং বাংলা চলচ্চিত্রে খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই সদ্য প্রয়াত পরিচালকের চলচ্চিত্র-পরিক্রমার প্রেক্ষিতটি অনুধাবনে প্রয়াসী হব। তাঁর নির্মাণের নেপথ্যের চাবিকাঠিটি   ঠিক কী ছিল যার দৌলতে এমন ঈর্ষণীয় গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা হাসিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি! এখানে একটা বিষয় স্মরণ রাখা ভালো যে, সিনেমা নির্মাণের যে কলাকৌশল (technicalities) সেটা ঋতুপর্ণ আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন কম বয়সেই, পিতার কর্মসূত্রেই। যে কারণে অনায়াসে বলেছেনও যে সিনেমা বানানোটা তেমন কিছু কঠিন বলে মনে হত না তাঁর। (জানিনা, ‘সিনেমা বানানো’ নিয়ে এরকম ভাবনার সময় ‘শোলে’ আর ‘পথের পাঁচালী’র মৌলিক প্রভেদ বিষয়ে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন! সাতবার ‘শোলে’ আর পাঁচবার ‘পথের পাঁচালী’ দেখার মধ্যে একটা ফারাক  তো নিশ্চয়ই রয়েছে)। সে যা হোক, নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালক হিসেবে, অন্তত বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে তিনি যে প্রায় একশ’ শতাংশ পেশাদারিত্বের দাবি করতে পারেন সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই। এই পেশাদারিত্ব (professionalism) বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে নেহাৎ আনকোরা, এবং ঋতুপর্ণের দ্বারাই আমদানীকৃত সে বিষয়ে সন্দেহ মাত্র নেই। এর যতটা সুফল কুড়নো সম্ভব টলিউড তা কুড়িয়েছেও। ঋতুপর্ণের আবির্ভাব তাই টলিউড ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রীর কাছে ছিল সত্যি সত্যিই এক ‘শুভ মহরৎ’তবে বাংলা সিনেমায় ঋতুপর্ণীয় ঋতুবদল নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা জরুরি বলেই  মনে হয় আমাদের। এ লেখার কৈফিয়ত কেবল এটুকুই।  

ঋতু-র প্রথম ফিল্ম হীরের আংটি’ (১৯৯২), দ্বিতীয় ফিল্ম ‘উনিশে এপ্রিল’ (১৯৯৪) এবং দারুণ ‘হিট’। সময়টা লক্ষ্য করুন, উত্তমকুমারের প্রয়াণ ঘটে গেছে, সত্যজিত-ঋত্বিক লিগ্যাসি ফিকে হয়ে আসছে,–সবকিছু মিলিয়ে আশির  দশককে বাংলা সিনেমার খরার দশক বলা যায় অনায়াসে। ‘শ্বশুর বাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’দের দাপটে বাংলা ফিল্মের ঘর-বার জেরবার, নাভিশ্বাস উঠছে। অন্যদিকে, নব্বুইয়ের দশক থেকেই আমরা বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রেও এক পট পরিবর্তনের সাক্ষীগ্লোবেলাইজেশন-এর তোড়ে পালটে যাচ্ছে ধ্যান-ধারণা, জীবনযাপনের ধরন- ধারণ, আধুনিকতার বাণের তোড়ে যৌথ-পরিবার ভেঙেছে আগেই, এবারে নয়া-সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও পরিকল্পনা   পরিবারকেও টুকরো করে ফেলতে উদ্যোগী হয়ে ভোগবাদী দর্শনের পাশাপাশি নিয়ে এল এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশবলা বাহুল্য, চলচ্চিত্রে তার করাল ছায়া অনিবার্য ছিলপুঁজিবাদ যে নাগরিক শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল তার বিনোদনের প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে ও তাগিদেই মুখ্যত উদ্ভব হয়েছিল প্রযুক্তি নির্ভর সিনেমার। নয়া ‘উদারনীতি’ পুরনো মূল্যবোধকে হটিয়ে দিতে নিয়ে এল আত্মভুক এক ভোগবাদ -‘খাও-পিয়ো-মৌজ মানাও’। মতাদর্শের প্রশ্ন-টশ্ন    হাসির খোরাক হয়ে পড়ল উত্তর-আধুনিক ডামাডোলে। পালে হাওয়া যোগালো হরেক প্রচার মাধ্যম। সিনেমা সে প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নেবে তা নিতান্ত স্বাভাবিক। আর এই তত্ত্ব চালান করার উপযুক্ত কাউকে দরকার হয়ে পড়েছিল টলিউডেরও। ঋতুপর্ণের আবির্ভাব সেই মাহেন্দ্র ক্ষণে, বিজ্ঞাপনের জন্য ভিস্যুয়াল নির্মাণের অভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়েসামান্য প্রারম্ভিক সতর্কতা অবলম্বন ব্যতীত বিশেষ বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। মাঠ ফাঁকা ছিল, গোলটা করা গেল সহজেই। ঊনিশে এপ্রিল, দহন, অসুখ, বাড়িওয়ালি’র মত ফিল্মগুলি সেই সতর্ক নির্মাণের সাক্ষী। পরিচালক মাপজোখ- করা হালকা ঝুঁকি নিয়েই উপোষী দর্শকের হাততালি কুড়িয়ে নিলেন। বিষয় কিংবা গল্প বলার অভিনবত্বে ততটা নয়, যতটা ‘চাহিদা পূরণের সুপরিকল্পিত আয়োজনে, কারিগরি দক্ষতায়’। ন্যাকা-ন্যাকা সংলাপ ও দৃশ্যের বদলে ফিল্মে এল  স্মার্ট কথাবার্তা, ভিস্যুয়াল ইত্যাদি। জায়গাটা পাকা হল, জাতীয় পুরস্কার আর আন্তর্জাতিক উৎসবের ছোঁয়ায় একলাফে ‘সেলিব্রিটি’, ক্যারিয়ার গ্রাফ তারপর  নিম্নগামী হয়নি আর।

তবে কি তিনি গল্প বলার ধরণে কোন নতুনত্ব আমদানি করেছিলেন ? না, বরং বাঙালি দর্শক ফিল্মের যে ন্যারেটিভে চিরকাল অভ্যস্ত ঋতুপর্ণ তা থেকে এক পা-ও সরে আসেন নি, বরং সচেতন ও সতর্ক ভাবে সেই অভ্যস্ত ন্যারেটিভের উপর নির্ভরশীল থেকেছেন। বিষয়বস্তুতেও তো নূতনত্ব দেখিনা সে অর্থে, তাহলে! হ্যাঁ, একটা নতুনত্ব অবশ্যই আমদানি করেছেন ঋতুপর্ণ, আর তা হল যৌনতা। বাংলা সিনেমায় যৌনতার এই অভিষেক এক কথায় অভূতপূর্ব। যৌনতা ‘শিল্পের বিষয় হতে পারে না বা হওয়া উচিত নয়’- মার্কা ছুঁৎমার্গিতা আমাদের অবশ্যই নেই। যৌন-   জীবন জীবনেরই অংশ, কাজেই তা শিল্পসাহিত্যের বিষয় হতেই পারে, হওয়া দরকারও। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও স্মরণ  থাকা প্রয়োজন যে শরীরী সঙ্গম অথবা সংঘর্ষই জীবনের সার কথা নয়, শেষকথা নয়। শরীর ঘিরে সংস্কার হয়ত স্বাস্থ্যকর  নয়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে উদোম-শরীর মানেই সংস্কারমুক্তি। যে শরীরী সম্পর্ককে ঘিরে ‘আবহমান’ কাল ধরে বিবর্তিত হয়েছে মানুষ-মানুষীর সম্পর্ক, প্রবাহিত ও প্রভাবিত হয়েছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্রোতস্বিনী তা নিয়ে শিল্প- সৃষ্টি বড় একটা সহজ কাজ নয়। অথচ এই দুরূহতম কাজটিই ঋতুপর্ণ করতে চেয়েছেন অবলীলায়, ‘খেলা’চ্ছলেঋতুপর্ণ  কী নিয়ে সিনেমা করেন সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যেতে পারে দ্বিধাহীন দুটি মাত্র শব্দে - নারী এবং যৌনতা। এতে তাঁর একান্ত অনুরাগী কেউও আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না।  

আসলে ঋতুপর্ণের ক্যামেরা যে গল্প বলে তার কেন্দ্রে থাকে নারী, আরো সঠিক ভাবে যদি বলি তাহলে বলতে হয় নারীর যৌন-কামনা (sexual desire) - তাঁর ফিল্মের  বিষয়বস্তুআর যে গল্প তিনি বলেন তার সারাৎসার তো এই যে, নারী মাত্রই পিতৃতন্ত্রের দ্বারা পিষ্ট, আর পরিচালক সে নারীদের মুক্ত ও স্বাধীন বিচরণের জন্য একটা ‘স্পেস’ (space) তৈরি করে দিতে চান (যদিও সেই ‘স্পেস’টা যে কী, তার স্বরূপ সম্পর্কে সামান্য ধারণা তিনি দিতে চেষ্টা   করেন না কখনোই, প্রয়োজনও বোধ করেন না ), আর সে জন্যই তিনি যৌন-স্বাধীনতার দাবি তোলেন এবং সেই সূত্রে ও অবকাশে যৌনতার অভিষেক ঘটান। বলা বাহুল্য, ভারতীয় বাণিজ্যিক ফিল্মে নারীর যে আদল প্রতিষ্ঠিত সে আদল ভাঙতে চেয়ে তিনি ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বঁধু...’ সম্বোধনে আপ্লুত হলেন বটে, কিন্তু বিকল্প সম্বোধনের অবর্তমানে   নাম-গোত্র-হীন এই নব্য নারীদের যৌন-বাজারে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। খোলা বাজারে খোলা শরীর নিয়ে খোলামেলা বিচরণের (?স্বাধীন) ‘স্পেস’ তৈরি করে দিলেন। ‘খুলে দে মা লুটে পুটে খাই’ নীতির পরিপূরক ‘শিল্প’ প্রয়াস। তথাকথিত ভদ্র-শিক্ষিত-মার্জিত-রুচিবান-আধুনিক (নাকি উত্তর-আধুনিক!) বাঙালি আহ্লাদে আটখানা হল আর্ট সিনেমার(?) বোদ্ধা কিংবা শিল্পিত দর্শক সেজে হলিউডি যৌনতার সস্তা টলিউডি-সংস্করণের আস্বাদে মাতোয়ারা হল -‘সাবানের সঙ্গে শেভিং ক্রীম ফ্রী’ পাওয়ার আনন্দেমন্দ নয় অবশ্যই।      

কাজটা ঋতুপর্ণ করেছেন চরম চাতুর্যের সাথে। বাঙালি দর্শক সে অর্থে ততটা সাহসী নয়, আধুনিক সাজ পরিধানের পশাপাশি ঐতিহ্যের পিছুটানও তার কম নয়। আসলে আমাদের আধুনিকতার গোড়াতেই রয়ে গেছে গলদ।  আমাদের আধুনিকতার ধার-করা-ধারণাটির জন্ম পুঁজিবাদের ঔরসে সামন্তবাদের গর্ভে। ঋতুপর্ণ তা বিলক্ষণ জানতেন, তাই স্লো ডোজ দিয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়েছে তাঁকে – উনিশে এপ্রিল, দহন, অসুখ, তিতলি-র মত ফিল্ম দিয়ে  শুরু করে। পরবর্তী পর্যায়ের ঋতুময়তায় পৌছনোর আগে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ সেরে নিতে হয়েছে ‘চোখের বালি’ নামিয়ে, বাঙালি  দর্শকের চোখ কতটা কচকচ করে অথবা আদৌ করে কি না তার আন্দাজ পেতে। তবে রিস্ক নেন না মোটেই, ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথকে, আবার বাজার মাত করতে ব্যবহার করেন ঐশ্বর্য রাই-এর শরীরী আবেদনকে। আর খাপ খাইয়ে নিতে ‘নয়া উদারনীতি’ অনুসরণে ফিল্মের পরিণতিকে উপন্যাসের পরিণতি থেকে পৃথক করতেও পিছপা হন না (এই  যুক্তিতে যে, উপন্যাসের পরিণতি নিয়ে রবিঠাকুর পরবর্তীতে তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। তা   হয়ত করেছিলেন, কিন্তু  সংশোধন  করেন নি, সে দায়িত্বও বোধহয় কাউকে দিয়ে যান নি)। সে যা হোক, এ অবধি দর্শকের মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি তেমন। একটা নয়নসুখকর মোড়কে নারীমুক্তির বিজ্ঞাপন সহকারে যৌনতাকে  বাজারজাত করার ক্ষেত্রে এ পর্যায়ে মোটামুটি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তিনিবাণিজ্যিকরণের জরুরি অনুষঙ্গ হিসেবে  সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছেন ‘আনন্দলোক’ মার্কা গসিপ ম্যাগাজিনের, মগজ ধোলাইয়ের পন্থা হিসেবে ‘কলাম লিখিয়ে’ সেজেছেন, প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করতে ও প্রচারের আলোয় থাকতে টিভি চ্যানেলের অ্যাঙ্কর নিয়োজিত করেছেন নিজেকে – এসব কিছুর মধ্যে যোগসূত্র তো এই যে, এগুলো সবই বাজারের সংজ্ঞায় ‘প্রোমোশন্যাল অ্যাক্টিভিটি’ মাত্র। প্যাকেজিং-এর মতই প্রয়োজনীয় ভীষণ। এই দারুণ ‘প্যাকেজিং’এর জন্যই দর্শকের বাহবা যেমন পেয়েছেন, প্রচার মাধ্যমের পিঠ চাপড়ানোও উপভোগ করেছেন। বলিউড স্টারদের নেকনজরে থেকেছেন। আর সেটাই কাল হয়েছে, ক্রমশ ‘দুঃসাহসী’ হয়ে উঠেছেন তার পর থেকে।

 বাজার দখল করে ফেলার পর বিজ্ঞাপন একটা নিয়মমাফিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়ঋতুপর্ণের বেলায়ও তাই ঘটেছে। নারীমুক্তির মহানাগরিক বৌদ্ধিক আচ্ছাদন আস্তে আস্তে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, ঘোমটা খসে পড়ার পর জমে ওঠে যৌনতার ভরপুর আসর, ‘অন্তরমহল’-এ বাঙালি দর্শকদের একাংশ মেতেছেন সে ‘উৎসব’-এ। সমালোচনাও করেছেন অবশ্য কেউ কেউ। সেখান থেকে ‘চিত্রাঙ্গদা’ পর্যন্ত একই চিত্র, একই পরিভ্রমণ। বিষয় কেবল যৌনতা, যৌনতাই কেবল বিষয় হিসেবে ‘বিষ’ নয় হয়ত, কিন্তু যৌনতা ‘অবসেশন’-এ পরিণত হয়ে পড়ায় পরিবেশটা বিষাক্ত হয়ে যায়যৌনতা প্রদর্শনের জন্য নারীচরিত্রের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে এল এরপর স্বাভাবিক যৌনতার পরিবর্তে এবার হাজির করলেন  অস্বাভাবিক যৌনতা। বিষয় হিসেবে উঠে এল সমকামীতাহবে না-ই বা কেন, বারাক ওবামা পর্যন্ত যখন ক্ষমতাবান আসনটি অক্ষত রাখতে সমলিঙ্গ-বিবাহের সমর্থনে প্রকাশ্যে বয়ানবাজি করছেন, দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে এদেশেও যখন সমকামীতার অপরাধমুক্তি (decriminalization of homosexuality) ঘটছে (যদিও সমস্যাটি আইনি নয় মোটেই) সে সময় ঋতুপর্ণের মত তুখোড় পরিচালকেরা যে ‘যৌনগন্ধী রুমাল’ শুঁকিয়ে দর্শকদের বুঁদ করে ফেলার সুযোগ লুফে নেবেন সে আর আশ্চর্য কী!  

এবারে দেখা যাক ঋতুপর্ণের নির্মাণে যৌনতার প্রকাশ কীভাবে ঘটেছে ও সিনেমাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় জাতিয়তাবাদী চিন্তাচর্চায় নারী-পুরুষ (female-male) বিভাজনের সামাজিক প্রতিরূপটি হচ্ছে ঘর-বাহির (home-world)-এর বিভাজন, আর সে বিভাজনে নারীর স্থান নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট হয়েছে গৃহকোণে, অন্দরমহলে। যৌনতার  ভাল-মন্দও (good sex-bad sex) এসেছে সেই সূত্রে - বাণিজ্যিক সিনেমায় ‘হিরোইন-ভ্যাম্প’ মেরুকরণের মাধ্যমে যার প্রকাশ স্পষ্ট বাণিজ্যিক ফিল্মের good sex হচ্ছে নায়িকা বা হিরোইনের সেই (যৌন)ধর্ম, যা বস্তুত  পিতৃতন্ত্রের কাছে সমর্পণ ছাড়া কিছু নয়। পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে যৌনতাকে ব্যবহার করতে গিয়ে ঋতুপর্ণ এই সরল  সমীকরণটিকে উলটে দেন ও প্রোটাগোনিস্ট নারীচরিত্রকে জুড়ে দেন বাণিজ্যিক সিনেমার মন্দ-যৌনতার (bad sex) সাথে, যা আসলে কামনার  (desire) প্রতীক এবং ভ্যাম্পদের বৈশিষ্টশুধু তাই নয়, কৌশলে দর্শকের সমর্থন আদায়ের জন্য এক নারী-দৃষ্টিকোণও আমদানী করেন কাহিনি-বিন্যাসে। নারী চরিত্রের সঙ্গে যৌনতার সংযুক্তি (association) ঋতুপর্ণের ফিল্মে এক আপাত বিদ্রোহের আবহ তৈরি করে মাত্র, যেহেতু পিতৃতন্ত্রের গণ্ডির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। পিতৃতন্ত্রকে প্রত্যাহবান করে না কদাচ। বরং অন্তিমে পিতৃতন্ত্রের কাছেই সমর্পণ করে বহু ক্ষেত্রে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিরোধ (resist) করার প্রয়াস করে মাত্র এবং তার ভেতর দিয়ে আরেকটু বাড়তি স্পেসের জন্য দর কষাকষি (negotiate) করে কেবল। সেও ওই আরেকটু প্রশস্ত গৃহকোণের (domestic space) আকাঙ্ক্ষায়, ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখতেও বস্তুত অপারগ এই ‘বিদ্রোহী’ নারীচরিত্ররা (‘ঘরে বাইরে’র বিমলাকে মনে পড়ে!)  বাণিজ্যিক সিনেমায় নারীর যে আদল (woman ideal) তার সঙ্গে যেমন বাস্তবের নারীর (real woman) মিল নেই, একই সরলীকরণের পথ বেয়ে উঠে আসা ঋতুপর্ণের নারীচরিত্রগুলোও সেরকম অবাস্তবআর সে কারণেই মনে হয়, যৌনতার এই উপস্থাপনার মূলে শিল্পের দায় যত না বাণিজ্যিক প্রয়োজন তার চেয়ে অধিকএকারণেই চরিত্রকে ছাপিয়ে ওঠে যৌনতা, voyeurism-এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়।   

স্মরণ করুন,‘চোখের বালি’-র সেই দৃশ্য যেখানে সাদা থান পরিহিত সালঙ্কারা বিনোদিনী হাজির হয়েছে বিহারীর দুয়ারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে (বিবাহ নামক পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করে পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক পুরুষের কাছে শরীর সঁপে দিতে), পরিচালকের ব্যাখ্যায় অলঙ্কারগুলো অবদমিত কামনার প্রতীক, এর সঙ্গে মিলিয়ে নিন অনুরূপ সাজে পরিচালকের আত্ম-প্রদর্শনী‘রীল লাইফ’ তবে বদলে দিচ্ছে ‘রিয়াল’ লাইফকেও! নাকি  লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ঋতু নিজেই তাড়িত হচ্ছিলেন কোন ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’-এ! হয়ত তাই, হয়ত নয়, কিন্তু অবসেশনে যে ভুগছিলেন সে অবধারিত। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ কিংবা ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’এ অভিনয়ের সূত্রে কে জানে নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধে মেতেছিলেন কি না, কোন এক অন্তিম বোঝাপড়ার আশায়! একটা অস্থিরতা যে ছিল তা বহুক্ষেত্রে ফিল্মের ট্রিটমেন্ট লক্ষ্য করলেও বোঝা যায়। আর সে কারণেই বোধহয় মাঝখানে ‘রেনকোট’, ‘নৌকাডুবি’-র রিলিফ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। নতুবা ‘চোখের বালি’-র পর ‘নৌকাডুবি’তে  প্রত্যাবর্তনের  মানে হয় না।  পরিচালক নিজেও তা স্বীকার করেছেন। অবশেষে ‘চিত্রাঙ্গদা’-পর্ব, তাঁর নির্মাণপর্বের(!) পূর্ণাহুতি, যৌন চিন্তনেরও। তা আত্মজৈবনিক কি না সে তর্ক অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি ঋতুপর্ণের ‘নারীসুলভ’ আচরণ নিয়ে কানাঘুষো ছিল, এবারে শুরু হল সচেতন ভাবে নিজেকে পূর্ণ(?) নারী করে তোলার বিবিধ আয়োজন –সাজসজ্জা থেকে সালঙ্কারা বিচরণ, মায় ‘হরমোন থেরাপি’ পর্যন্ত। চিত্রাঙ্গদা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তাই যোদ্ধা যু্বকের সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল তাঁকে, আর ফিল্মে সব রকম যৌনতার সপক্ষে  বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক যুক্তি হাজির করতে ঋতুপর্ণকে ভিন্নবেশ ভিন্নসাজ ধারণ করতে হয়েছে। ক্ষমতার স্বার্থে চিত্রাঙ্গদাকে পুরুষোচিত করে তোলার প্রয়াস, আর শিল্পের বাণিজ্যিকরণের স্বার্থে  ঋতুপর্ণ নিজেই বাজারে এসে দাঁড়ান শরীর ‘সম্বল’ করেপরিণতি? ট্র্যাজিক তো বটেই, স্রষ্টা এবং সৃষ্টি দুয়ের ক্ষেত্রেই।  

সিনেমা শেষ পর্যন্ত technical art , কিন্তু তার মানে এই নয় যে একজন দক্ষ technician আর স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য নেই। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, চিত্রনাট্য রচনা থেকে শুরু করে গল্প বলা সহ ফিল্মের যাবতীয়  শৈলী আয়ত্তাধীন থাকা সত্বেও ঋতুপর্ণ শেষ পর্যন্ত ‘কারিগর’ ও ‘শিল্পী’-র মধ্যবর্তী আলপথ ধরেই বরাবর হেঁটে গেলেন, অন্য কোন কৌণিকতায় পা বাড়াবার সযত্ন প্রয়াস করলেন না। এক সময় মার্গো সাবানের  বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিলেন ঋতুঃ ‘দেখতে খারাপ, মাখতে ভালো’। বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রেও ঋতুপর্ণ তার চেয়ে বেশিদূর এগোতে   পারলেন না। সাধ্য ছিল না এমন নয়, সে সাধ তাঁর ছিল না। ‘He had blurred the distinction between commercial and art cinema’ - ঋতুপর্ণের বহু গুণগ্রাহী এমন প্রশংসাবাণী বিলিয়েছেন বিভিন্ন সময়। এতে আমরা দ্বিমত পোষন করি না মোটেই, হালের বাজারকেন্দ্রিক মূল্যায়নের এটাই রীতি। তবে মুড়ি-মুড়কির এক দর সাব্যস্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় কি না তা অবশ্যই বিবেচ্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির পরিবর্তে সাহিত্য কিংবা ইতিহাস নিয়ে পড়লে সিনেমা পরিচালক   হিসেবে লাভবান হতেন বেশি - এরকম কথা বলেছিলেন একটি সাক্ষাৎকারে। অর্থনীতি নিয়ে পড়লেও নয়ের দশকে শুরু  হওয়া অর্থনৈতিক সংস্কার-জনিত সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণে অসমর্থ হয়েছেন তিনি। একটি পরিবর্তনশীল সময়ে শিল্পীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে সংশয় ছিল হয়ত, আক্রান্ত সময়ে প্রতিরোধের যথার্থ পথ খুঁজে পাননি। তাই চিন্তা ও মননের দৈন্য এবং যাপনের আত্মঘাতী রীতি ও প্রবণতা তাঁর শারীরিক মৃত্যুকেই কেবল ত্বরান্বিত করেনি, যাবতীয় শিল্প-সম্ভাবনারও করুণ পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ‘সতর্কীকরণের চিহ্ন’ হিসেবেই নিশ্চয় সনাক্ত হবে   

    ++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

 

 

রূপোলি পর্দা কি রূপ বদলাচ্ছে ?

সিনেমার আবির্ভাবটা ছিল বেশ হৈ চৈ বাধানো, জমকালো ধরনের। ছবি নড়ছে-চড়ছে, কথা বলছে এটাই ছিল এক সাংঘাতিক ব্যাপার। যেন বা ম্যাজিক। প্রাথমিক পর্যায়ে আকর্ষণটা ছিল জাদু বা ম্যাজিকের প্রতি আকর্ষণের মতোই। সিনেমার নেপথ্যের কারিকুরি, নির্মাণ-কলাকৌশল বিষয়ে অজ্ঞতা বা ধারণা না থাকার কারণে পুরো ব্যাপারটাই দর্শকের কাছে ভোজভাজি মনে হতো। স্বপ্নের জগতে বিচরণ, স্বপ্নস্বর্গবাস। স্বপ্নদর্শনে যেমন, ছদ্ম-স্বাধীনতার অনুভূতি দর্শকের কাছ থেকে আড়াল করে রাখত নেপথ্যের সকৌশল ও কড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। বঞ্চিত দর্শক অতঃপর তৃপ্তির হাসি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে যেত। ম্যাজিক দেখে ‘বোকা বনে যাওয়া’ মানুষ যে তৃপ্তি পায়, বারে বারে পেতে চায়, সিনেমার প্রতি সাধারণ দর্শকের টান অনেকটা সেই গোত্রের। সস্তা ও সহজলভ্য বিনোদনের উপকরণ হিসাবে বাস্তব জীবনে বঞ্চিত মানুষের কাছে সিনেমার আকর্ষণ তাই হয়ে ওঠে দুর্নিবার। মাধ্যম হিসাবে সিনেমার এই অসাধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল সিনেমাকে বিভিন্ন কারণে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে শুরু করল। প্রাথমিক ভাবে বিনোদন-ই মুখ্য ছিল যদিও, ধীরে ধীরে প্রচার এবং প্রোপাগাণ্ডার জন্যও সিনেমার ব্যবহার শুরু হল। গণমত গঠনে এর উপযোগিতা লক্ষ্য করে রাষ্ট্রও আর নিস্পৃহ রইল না, সিনেমার ওপর ‘সরকারি নিয়ন্ত্রণ’ এতে যোগ করল অন্য মাত্রা।
এর বাইরে, অর্থাৎ ব্যবসায়িক, বিনোদনমূলক, তথ্যজ্ঞাপন বা তথ্যসম্প্রচার কিংবা সরকারি প্রচার ইত্যাদি উদ্দেশ্যের বাইরে, সিনেমাকে সৃষ্টিশীল ভাবে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য ভাবিত হলেন, উদগ্রীব হলেন কিছু মানুষ। দেখা দিল সিনেমার শিল্প-সম্ভাবনা। সিনেমা শিল্প কি না এ নিয়ে তর্ক করে কেটে গেছে অর্ধ শতাব্দিরও অধিক কাল, সে তর্ক বর্তমানে, সঙ্গত কারণেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তবে সিনেমার ক্ষেত্রে ‘শিল্প’ কথাটা, বাংলা ভাষায়, ‘আর্ট’ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি’ দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। যুক্তিসঙ্গত কারণেই পারে। ব্যবহৃত হয়েও থাকে। সিনেমার প্রযোজনা-পরিচালনা-পরিবেশনা-প্রদর্শন এই গোটা প্রক্রিয়াটাই শিল্পক্ষেত্রের (industry sector) সঙ্গে মেলে। তাছাড়া স্টুডিও-সেন্সরবোর্ড-সিনেমা হল নির্ভর যে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো সেও সমগোত্রের। সিনেমা তৈরির জন্য নিয়োজিত পুঁজির মূল লক্ষ্য অবশ্যই মুনাফা, এবং উপরে উল্লেখ করা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যা উৎপাদিত হয়ে থাকে তা যে বাজারের নিরিখে ‘ফিনিশড্ প্রোডাক্ট’ মাত্র সে বিষয়ে সন্দেহমাত্র থাকার কথা নয়। এই পণ্য বাজারে আসে, চলে, বাজার অর্থনীতির নিয়ম-নীতি মেনেই। অর্থাৎ সিনেমা সেই অর্থে আর দশটা পণ্যের মতোই একটা পণ্য মাত্র। অধিকাংশ বিনোদন-মূলক সিনেমা তাই। কিন্তু তাই যদি হয় তো সৃষ্টিশীল সিনেমা বা আর্ট সিনেমা নির্মাণের সম্ভাবনা কতদূর? আদৌ কি সম্ভব? এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখা দরকার এখানে আর্ট সিনেমা বলতে মূলত সৃষ্টিশীল সিনেমার কথাই বোঝানো হচ্ছে। এবং এও স্মর্তব্য যে, বিনোদনের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার বস্তুত মৌলিক কোনও সংঘাত নেই। চার্লি’র সিনেমা তার চরম দৃষ্টান্ত।
সৃষ্টিশীলতা বিষয়ক যে প্রশ্নটি তোলা হল তার উত্তরে সোজাসুজি বলা যায় যে সৃষ্টিশীল বা যাকে অনেকেই আর্ট সিনেমা বলতে উৎসুক তা নির্মাণ অসম্ভব নয়। অসম্ভব যে নয় তার প্রমাণস্বরূপ বহু নিদর্শন হাতের কাছেই রয়েছে। বিশ্বের এবং এদেশেরও বহু সিনেমা তার সাক্ষ্য দেবে। তবে হ্যাঁ, এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের মধ্যে থেকে তেমন সিনেমা নির্মাণের সুযোগ ও স্বাধীনতা নিশ্চয়ই অবাধ নয়। সে সুযোগ, বলা অহেতুক, সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ। কোনো ব্যবস্থাই বোধহয় শিল্পসৃষ্টির সম্পূর্ণ বিরোধী হয় না, হতে পারে না। তবে এও মিথ্যে নয় যে, সাহিত্যিক-সঙ্গীতকার-চিত্রশিল্পী-নাট্যকার সৃষ্টি কর্মে যে পরিমাণ স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ পান একজন চিত্রনির্মাতা-চিত্রপরিচালকের স্বাধীনতা সে তুলনায় অনেকাংশে খণ্ডিত। মাধ্যম হিসাবে সিনেমার প্রভাব ও প্রতিপত্তি অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে বেশি ও বিস্তৃত বলে সরকারি-বেসরকারি সব তরফেই সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস অত্যধিক, এবং অব্যাহত। সেন্সর বোর্ড মার্কা খবরদারি কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রেই বর্তমান, শিল্পচর্চার অন্য ক্ষেত্রে নয়। সিনেমার শক্তিই তার দুর্বলতারও (বন্দীদশার) কারণ। একজন পরিচালককে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোতে হয়। আর ঠিক এখান থেকেই, সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও চলচ্চিত্র-চর্চার সীমা সম্প্রসারণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই শুরু হয়েছিল ‘ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন’।
‘আন্দোলন’ কথাটা ছিল যদিও সে অর্থে সিনেমার ক্ষেত্রে এদেশে তা কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে তার হিসেব নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একেবারেই কিছু যে হয়নি তাও নয়। সব থেকে বড় লাভ যা হয়েছে তা হল আমরা এমন কিছু পরিচালকের আবির্ভাব ও উত্থান দেখলাম যাঁরা বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সিনেমার ক্ষেত্রে অসামান্য সৃষ্টিশীল ভূমিকা পালন করে শিল্প-স্বীকৃতি কেড়ে আনলেন। কিন্তু আমদর্শকের ওপর তার কোনো প্রভাব পড়েনি স্বাভাবিক কারণেই। কারণ সে আন্দোলন ছিল শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ আন্দোলনের ফলে দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখার/প্রদর্শনের একটা বিকল্প বা সমান্তরাল উপায় পাওয়া গেল। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলো ছিল সিনেমার যোগানদার। এক্ষেত্রেও কিন্তু পছন্দের ব্যাপার তেমন ছিল না যেহেতু ‘যা পাওয়া যায়’ তাই দেখতে ও দেখাতে হত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। সোসাইটি গুলো সেমিনার-টেমিনার আয়োজন করত, সিনেমার কাগজ-টাগজ বের হত দু’চারটে। এসব ক্রিয়াকান্ডের সবটাই ছিল এক নির্দিষ্ট গণ্ডী ও গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চলচ্চিত্র বা সিনেমা বোদ্ধা নামক এলিট শ্রেণীর এক আলাদা গোষ্ঠী গড়ে উঠল। যাদের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের কোনো সংস্রব অথবা যোগাযোগ ছিল না, গড়ে তোলার সদর্থক প্রয়াসও ছিল বলে মনে হয় না। কোন কোন সোসাইটি স্বাভাবিক কারণেই নিছক ‘ফিল্ম বা সিনে ক্লাবে’ পরিণত হল যার দৌলতে ‘আন-সেন্সর্ড’ বিদেশি সিনেমা উপভোগের সুবিধে মেলে এবং ‘এলিট ক্লাস’-এর সভ্য হওয়া যায় সহজেই। পপুলার সিনেমার দর্শক থেকে এরা (সময়ে সময়ে পপুলার সিনেমার দর্শকের ভিড়ে মিশে গেলেও) নিজেদের আলাদা শ্রেণি ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন। মেনস্ট্রিম সিনেমার ক্ষতিবৃদ্ধি বিশেষ হল না এ আন্দোলনের ফলে, কোন কোন ক্ষেত্রে বরং কিছু ফায়দা হল বলা যায়। ঋত্বিক ঘটক, এম এস সথ্যু, আদুর গোপালকৃষ্ণণের মত পরিচালকদের সিনেমাকে পৌঁছে দেওয়া গেল না সাধারণ দর্শকের দরবারে। কুমার সাহনি, মণি কাউলদের মত পরিচালকদের পক্ষে সিনেমা নির্মাণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো।
দূরদর্শনের আবির্ভাব তৈরি করল নতুন সমস্যা ও সংকটের। এক সময় দল বেঁধে যারা সিনেমা হলে লাইন দিত, ব্ল্যাকে টিকিট কিনেও সিনেমা দেখার শখ মেটাতে দ্বিধা করত না তারা আস্তে আস্তে ঘরমুখী হতে আরম্ভ করল। ক্রমে সি ডি-ডি ভি ডি ইত্যাদির সহজলভ্যতার দৌলতে সিনেমা হলের কাউন্টারের সামনের দীর্ঘ লাইন হ্রস্ব হতে হতে একসময় প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একে একে বন্ধ হতে থাকল হল গুলো, প্রথমে বড় বড় শহরে, তারপর ছোট শহর ও শহরতলিতেও সেই মড়ক দেখা দিল। নগরে, সিটিতে গড়ে উঠতে লাগল মল-মাল্টিপ্লেক্স, সেখানে উন্নত প্রযুক্তিতে সিনেমা প্রদর্শনের আধুনিক ব্যবস্থা করা হল যদিও আম-দর্শক পকেটের জোরে সেথায় প্রবেশের পথ খুঁজে পেল না,পাচ্ছে না। এই যখন হাল-হকিকৎ, ঠিক তখনই, সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়ে গেল ভারতীয় সিনেমার ‘সেন্টিনারি’। কিন্তু শতবর্ষ উদযাপনের উৎসাহে কোথায় যেন ছিল এক উৎকন্ঠা, প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিংবা ভবিষ্যতের সিনেমা নিয়ে। এই অর্বাচীন শিল্প-মাধ্যমটির ‘পপুলার সিনেমা’ হিসাবে টিঁকে থাকা না-থাকার প্রশ্নে যে অনিশ্চয়তা চক্ষুগোচর হচ্ছে তার থেকে নিষ্ক্রমণ কোন পথে হতে পারে তা নিয়ে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই সে চিন্তা-ভাবনার শরিক হতে হবে।


সংকটের প্রেক্ষিতটি সম্পর্কে একটা ধারণা এতক্ষণে আমরা হয়ত দিতে পেরেছি। কিন্তু অন্য আরেক দিক থেকেও ঘনীভূত হচ্ছে সঙ্কট। আর সে সঙ্কটের চরিত্র বৈশ্বিক, কিন্তু ধরন ভিন্ন। আমরা জানি যে, সিনেমা হচ্ছে চূড়ান্ত ভাবে প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প। আর যে সঙ্কটের কথা আমরা বলছি তা আসছে ওই আধুনিক প্রযুক্তির দিক থেকেই। একদিন যে আধুনিক মাধ্যমটি সাহিত্য ও শিল্পের সব কটি শাখা থেকে রস ও রসদ সংগ্রহ করেছে, সম্পূর্ণ আত্মীকরণ করতে সক্ষম না হলেও অন্তত আত্মসাৎ করে হয়ে উঠেছে এক আধুনিক মিশ্র শিল্প, শতবর্ষ পার না হতেই সেই ‘আধুনিক’ মাধ্যমটি বুঝি ‘ট্র্যাডিশন’-এ পরিণত হতে বসেছে। আর কেউ কেউ এমনও ভাবতে শুরু করেছেন যে ‘ট্র্যাডিশনাল সিনেমা’র যুগ শেষ হয়ে বুঝি সূচনা হতে চলেছে সিনেমার নূতন আরেক যুগ। একদল বলছেন ‘ট্র্যাডিশনাল সিনেমা’র মৃত্যু আসন্ন, অন্য দলের ভাবটা অনেকটা ‘সাদা পর্দার ফ্যাসিজমের পাট’ চুকিয়ে সিনেমার মুক্তি বুঝি এসেই গেল। ব্যাপারটা একটু খোলসা করা যাক এবারে। কেন, কোন প্রেক্ষিতে এরকম চিন্তাচর্চা দানা বাঁধছে তা খতিয়ে দেখা যাক।
আমরা যে যুগে বাস করছি তাকে এক কথায় বলা যায় ‘ডিজিট্যাল এজ’ (Digital Age)। এই ডিজিট্যাল টেকনোলজি-ই হচ্ছে দুশ্চিন্তার মূল উৎস। এই প্রযুক্তির সহায়তায় এমন সব কান্ড ঘটানো হচ্ছে যে তাজ্জব বনে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। সিনেমার ক্ষেত্রেও এই ডিজিট্যাল টেকনোলজি অবিশ্বাস্য সব কান্ড ঘটাচ্ছে। এমনকি সিনেমা তৈরি থেকে প্রদর্শন অবধি যে সাবেকি প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতা তার মূল ধরেই যেন টান দেবার উপক্রম হয়েছে। ডিজিট্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমা এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। খুব ছোট, হাতের মুঠোয় ধরা যায় এমন ক্যামেরা, অতি সস্তা এবং ফ্রি এডিটিং সফটওয়্যার, কম্প্যুটার ইত্যাদির দৌলতে সিনেমা তৈরি অনেক সহজ ব্যাপার এখন। অন্তত অর্থের যোগান কে দেবে সে দুশ্চিন্তা আর মুখ্য নয়। বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজনও ততটা নেই, কেননা ক্যামেরার পেছনে ‘মানুষের চোখ’ (Human Eye) প্রায় অপসৃত হতে চলেছে। হালের ক্যামেরা-কম্প্যুটারের কৃত্রিম বুদ্ধি (artificial intelligence) এর মধ্যেই সে জায়গা দখল করে নিয়েছে। Star Wars কিংবা Artificial Intelligence (AI) –এর মত হলিউডি ফিল্ম তার প্রমাণ। Machinimia পদ্ধতিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী, সেট, লাইট ইত্যাদি ছাড়াই সিনেমা তৈরি সম্ভব। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা আজ বাস্তব। এক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী, সেট ইত্যাদির জন্য ভিডিও গেম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। Virtual imageকে অ্যানিম্যাশনের সাহায্যে জীবন্ত বা জীবন-সদৃশ করে তোলা হয়।
বিতরণ-প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও নয়া প্রযুক্তি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি সিনেমার অসংখ্য নকল (copy) , মূল (original)-এর সঙ্গে যার কোন পার্থক্য নেই, সহজেই পাওয়া যায়। ইন্টারনেট (internet)-এর মাধ্যমে তা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া যায় নামমাত্র এবং এমন কী বহুক্ষেত্রে বিনা খরচেও। বিরাট পুঁজির পরিবর্তে সামান্য পুঁজি সম্বল করেও সিনেমা বানিয়ে ফেলা তাই আজ আর দুঃসাধ্য নয় এই আধুনিকতম প্রযুক্তির দৌলতে। শুধু তাই নয়, প্রদর্শনের জন্য তা একেবারে দর্শকের শোবার ঘরে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাও হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট মারফত, নাম মাত্র খরচে। এমন কি ইন্টারনেটে ফিল্ম-উৎসব পর্যন্ত হচ্ছে আজকাল। অর্থাৎ, এখানে প্রতিষ্ঠানের খবরদারি খাটছে না আর। এটা ফিল্মের কারবারিদের করে তুলেছে শঙ্কিত, আবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী অনেক স্রষ্টার জন্য খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার হাজার-দুয়ার। একটা দৃষ্টান্ত দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে মনে হয়। ২০০০ সালে Miike Figgis বলে একজন Time code নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, নিজস্ব প্রযোজনাও বলা যায়। এতে পরীক্ষামূলক ভাবে এক বিকল্প অথবা সমান্তরাল ন্যারেটিভ (narrative) স্টাইল গ্রহণ করা হয়। তা সম্ভব হয় ডিজিট্যাল প্রযুক্তি এবং ক্যামেরার ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ ব্যবহার করে। এতে বাস্তবতার এক অতিরিক্ত মাত্রা সংযোজিত হয় গল্প বলার অভিনব কায়দায়। স্বতন্ত্র ভাবে ক্রিয়াশীল অথচ স্থানিক ভাবে বিচ্ছিন্ন চারটি আলাদা ফ্রেমে বিষয়বস্তুকে হাজির করা হয় দর্শকের কাছে। শুধু তাই নয়, সিনেমাটির নির্মাতা দর্শককে সক্রিয়তার অংশীদার হতে সাহায্য করেন দুভাবে। ডিভিডি-র মাধ্যমে দর্শককে ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তার ধরন পাল্টে দেবার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, এবং সেই সঙ্গে দর্শককে তার নিজস্ব পচ্ছন্দ বা ইচ্ছানুসারে যে কোন ফ্রেমে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার ছাড়পত্রও দেওয়া হয়। এমনকি দেখার সময় ফ্রেমটি এডিট করার সুযোগও থাকে। পরিচালক চারটে ক্যামেরাকে সিঙ্ক্রোনাইজ করে চারটি আলাদা স্থানে বসিয়ে চারটি স্বতন্ত্র ঘটনা রেকর্ড করেন এবং এই চারটি আলাদা স্থানে, চারটি পৃথক সাউন্ড ট্র্যাকে রেকর্ড করা চারটি ‘অ্যাকশন’ দর্শকের সামনে হাজির করেন চার ভাগে বিভক্ত পর্দায়।

‘সিনেমা দেখা’ ব্যাপারটাই এর দরুণ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে ক্রমশ। সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে ‘নির্ধারিত স্থান নির্ধারিত সময় নির্ধারিত পদ্ধতি’ সংক্রান্ত ধারণাটি আজ অবান্তর হয়ে পড়েছে। ভিউইং (viewing) ব্যাপারটা এখন আর আগের মত ritual act নয়, বরং বহুলাংশে interactive হয়ে উঠছে। তাছাড়া সিনেমা নির্মাণ থেকে প্রদর্শন অবধি যে hierarchy বর্তমান ছিল, সেও আর বজায় থাকছে না আজকের এই ইলেক্ট্রনিক এজ-এ। সিনেমা একদিন ট্র্যাডিশনাল আর্ট ফর্মগুলোর, যেমন চিত্রকলা এবং থিয়েটারের, পরিবর্ত হিসাবে জনসাধারণের হাতে নীতি ও মতাদর্শ প্রচারের এক নতুন ভাষারীতি তুলে দিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বিরাট লাফের ফলেই চলচ্চিত্রের সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল এবং তার দরুণ শিল্পকর্ম বিষয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছিল। আধুনিক সেই প্রযুক্তির কাছে মানুষ নিজেকে কীভাবে হাজির করবে তার মধ্যে নয়, বরং ফিল্মের বৈশিষ্ট নিহিত ছিল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটানো যায় সে প্রশ্নের মধ্যে। আজকে, ডিজিট্যাল টেকনোলজির মত আরেক প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনের ফলে সিনেমার এযাবৎ পরিচিত ও স্বীকৃত সংযোগসাধন রীতির কোন পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা কতটা বা আদৌ আছে কি না, কিংবা এর ফলে সিনেমার আবির্ভাবে যেমন ঘটেছিল সেরকম বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন গণসংযোগের ক্ষেত্রে ঘটবে কি না সেটাই বিচার্য। Jean Cocteau যেমন ভেবেছিলেন, -‘Film will only become an art when its materials are as inexpensive as pencil and paper.’- একুশ শতকের নয়া প্রযুক্তি কি সিনেমার ‘শিল্প সম্ভাবনা’র সেরকম ইঙ্গিত বয়ে আনছে ! রূপোলি পর্দা কি তবে রূপ বদলাচ্ছে ? রূপান্তর ঘটছে তার! হয়ত তাই, হয়ত নয় - সময়ই তার সঠিক জবাব দেবে, যথা সময়ে।

ব্লগ সংরক্ষাণাগার