শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

রূপোলি পর্দা কি রূপ বদলাচ্ছে ?

সিনেমার আবির্ভাবটা ছিল বেশ হৈ চৈ বাধানো, জমকালো ধরনের। ছবি নড়ছে-চড়ছে, কথা বলছে এটাই ছিল এক সাংঘাতিক ব্যাপার। যেন বা ম্যাজিক। প্রাথমিক পর্যায়ে আকর্ষণটা ছিল জাদু বা ম্যাজিকের প্রতি আকর্ষণের মতোই। সিনেমার নেপথ্যের কারিকুরি, নির্মাণ-কলাকৌশল বিষয়ে অজ্ঞতা বা ধারণা না থাকার কারণে পুরো ব্যাপারটাই দর্শকের কাছে ভোজভাজি মনে হতো। স্বপ্নের জগতে বিচরণ, স্বপ্নস্বর্গবাস। স্বপ্নদর্শনে যেমন, ছদ্ম-স্বাধীনতার অনুভূতি দর্শকের কাছ থেকে আড়াল করে রাখত নেপথ্যের সকৌশল ও কড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। বঞ্চিত দর্শক অতঃপর তৃপ্তির হাসি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে যেত। ম্যাজিক দেখে ‘বোকা বনে যাওয়া’ মানুষ যে তৃপ্তি পায়, বারে বারে পেতে চায়, সিনেমার প্রতি সাধারণ দর্শকের টান অনেকটা সেই গোত্রের। সস্তা ও সহজলভ্য বিনোদনের উপকরণ হিসাবে বাস্তব জীবনে বঞ্চিত মানুষের কাছে সিনেমার আকর্ষণ তাই হয়ে ওঠে দুর্নিবার। মাধ্যম হিসাবে সিনেমার এই অসাধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল সিনেমাকে বিভিন্ন কারণে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে শুরু করল। প্রাথমিক ভাবে বিনোদন-ই মুখ্য ছিল যদিও, ধীরে ধীরে প্রচার এবং প্রোপাগাণ্ডার জন্যও সিনেমার ব্যবহার শুরু হল। গণমত গঠনে এর উপযোগিতা লক্ষ্য করে রাষ্ট্রও আর নিস্পৃহ রইল না, সিনেমার ওপর ‘সরকারি নিয়ন্ত্রণ’ এতে যোগ করল অন্য মাত্রা।
এর বাইরে, অর্থাৎ ব্যবসায়িক, বিনোদনমূলক, তথ্যজ্ঞাপন বা তথ্যসম্প্রচার কিংবা সরকারি প্রচার ইত্যাদি উদ্দেশ্যের বাইরে, সিনেমাকে সৃষ্টিশীল ভাবে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য ভাবিত হলেন, উদগ্রীব হলেন কিছু মানুষ। দেখা দিল সিনেমার শিল্প-সম্ভাবনা। সিনেমা শিল্প কি না এ নিয়ে তর্ক করে কেটে গেছে অর্ধ শতাব্দিরও অধিক কাল, সে তর্ক বর্তমানে, সঙ্গত কারণেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তবে সিনেমার ক্ষেত্রে ‘শিল্প’ কথাটা, বাংলা ভাষায়, ‘আর্ট’ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি’ দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। যুক্তিসঙ্গত কারণেই পারে। ব্যবহৃত হয়েও থাকে। সিনেমার প্রযোজনা-পরিচালনা-পরিবেশনা-প্রদর্শন এই গোটা প্রক্রিয়াটাই শিল্পক্ষেত্রের (industry sector) সঙ্গে মেলে। তাছাড়া স্টুডিও-সেন্সরবোর্ড-সিনেমা হল নির্ভর যে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো সেও সমগোত্রের। সিনেমা তৈরির জন্য নিয়োজিত পুঁজির মূল লক্ষ্য অবশ্যই মুনাফা, এবং উপরে উল্লেখ করা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যা উৎপাদিত হয়ে থাকে তা যে বাজারের নিরিখে ‘ফিনিশড্ প্রোডাক্ট’ মাত্র সে বিষয়ে সন্দেহমাত্র থাকার কথা নয়। এই পণ্য বাজারে আসে, চলে, বাজার অর্থনীতির নিয়ম-নীতি মেনেই। অর্থাৎ সিনেমা সেই অর্থে আর দশটা পণ্যের মতোই একটা পণ্য মাত্র। অধিকাংশ বিনোদন-মূলক সিনেমা তাই। কিন্তু তাই যদি হয় তো সৃষ্টিশীল সিনেমা বা আর্ট সিনেমা নির্মাণের সম্ভাবনা কতদূর? আদৌ কি সম্ভব? এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখা দরকার এখানে আর্ট সিনেমা বলতে মূলত সৃষ্টিশীল সিনেমার কথাই বোঝানো হচ্ছে। এবং এও স্মর্তব্য যে, বিনোদনের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার বস্তুত মৌলিক কোনও সংঘাত নেই। চার্লি’র সিনেমা তার চরম দৃষ্টান্ত।
সৃষ্টিশীলতা বিষয়ক যে প্রশ্নটি তোলা হল তার উত্তরে সোজাসুজি বলা যায় যে সৃষ্টিশীল বা যাকে অনেকেই আর্ট সিনেমা বলতে উৎসুক তা নির্মাণ অসম্ভব নয়। অসম্ভব যে নয় তার প্রমাণস্বরূপ বহু নিদর্শন হাতের কাছেই রয়েছে। বিশ্বের এবং এদেশেরও বহু সিনেমা তার সাক্ষ্য দেবে। তবে হ্যাঁ, এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের মধ্যে থেকে তেমন সিনেমা নির্মাণের সুযোগ ও স্বাধীনতা নিশ্চয়ই অবাধ নয়। সে সুযোগ, বলা অহেতুক, সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ। কোনো ব্যবস্থাই বোধহয় শিল্পসৃষ্টির সম্পূর্ণ বিরোধী হয় না, হতে পারে না। তবে এও মিথ্যে নয় যে, সাহিত্যিক-সঙ্গীতকার-চিত্রশিল্পী-নাট্যকার সৃষ্টি কর্মে যে পরিমাণ স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ পান একজন চিত্রনির্মাতা-চিত্রপরিচালকের স্বাধীনতা সে তুলনায় অনেকাংশে খণ্ডিত। মাধ্যম হিসাবে সিনেমার প্রভাব ও প্রতিপত্তি অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে বেশি ও বিস্তৃত বলে সরকারি-বেসরকারি সব তরফেই সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস অত্যধিক, এবং অব্যাহত। সেন্সর বোর্ড মার্কা খবরদারি কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রেই বর্তমান, শিল্পচর্চার অন্য ক্ষেত্রে নয়। সিনেমার শক্তিই তার দুর্বলতারও (বন্দীদশার) কারণ। একজন পরিচালককে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোতে হয়। আর ঠিক এখান থেকেই, সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও চলচ্চিত্র-চর্চার সীমা সম্প্রসারণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই শুরু হয়েছিল ‘ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন’।
‘আন্দোলন’ কথাটা ছিল যদিও সে অর্থে সিনেমার ক্ষেত্রে এদেশে তা কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে তার হিসেব নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একেবারেই কিছু যে হয়নি তাও নয়। সব থেকে বড় লাভ যা হয়েছে তা হল আমরা এমন কিছু পরিচালকের আবির্ভাব ও উত্থান দেখলাম যাঁরা বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সিনেমার ক্ষেত্রে অসামান্য সৃষ্টিশীল ভূমিকা পালন করে শিল্প-স্বীকৃতি কেড়ে আনলেন। কিন্তু আমদর্শকের ওপর তার কোনো প্রভাব পড়েনি স্বাভাবিক কারণেই। কারণ সে আন্দোলন ছিল শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ আন্দোলনের ফলে দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখার/প্রদর্শনের একটা বিকল্প বা সমান্তরাল উপায় পাওয়া গেল। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলো ছিল সিনেমার যোগানদার। এক্ষেত্রেও কিন্তু পছন্দের ব্যাপার তেমন ছিল না যেহেতু ‘যা পাওয়া যায়’ তাই দেখতে ও দেখাতে হত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। সোসাইটি গুলো সেমিনার-টেমিনার আয়োজন করত, সিনেমার কাগজ-টাগজ বের হত দু’চারটে। এসব ক্রিয়াকান্ডের সবটাই ছিল এক নির্দিষ্ট গণ্ডী ও গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চলচ্চিত্র বা সিনেমা বোদ্ধা নামক এলিট শ্রেণীর এক আলাদা গোষ্ঠী গড়ে উঠল। যাদের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের কোনো সংস্রব অথবা যোগাযোগ ছিল না, গড়ে তোলার সদর্থক প্রয়াসও ছিল বলে মনে হয় না। কোন কোন সোসাইটি স্বাভাবিক কারণেই নিছক ‘ফিল্ম বা সিনে ক্লাবে’ পরিণত হল যার দৌলতে ‘আন-সেন্সর্ড’ বিদেশি সিনেমা উপভোগের সুবিধে মেলে এবং ‘এলিট ক্লাস’-এর সভ্য হওয়া যায় সহজেই। পপুলার সিনেমার দর্শক থেকে এরা (সময়ে সময়ে পপুলার সিনেমার দর্শকের ভিড়ে মিশে গেলেও) নিজেদের আলাদা শ্রেণি ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন। মেনস্ট্রিম সিনেমার ক্ষতিবৃদ্ধি বিশেষ হল না এ আন্দোলনের ফলে, কোন কোন ক্ষেত্রে বরং কিছু ফায়দা হল বলা যায়। ঋত্বিক ঘটক, এম এস সথ্যু, আদুর গোপালকৃষ্ণণের মত পরিচালকদের সিনেমাকে পৌঁছে দেওয়া গেল না সাধারণ দর্শকের দরবারে। কুমার সাহনি, মণি কাউলদের মত পরিচালকদের পক্ষে সিনেমা নির্মাণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো।
দূরদর্শনের আবির্ভাব তৈরি করল নতুন সমস্যা ও সংকটের। এক সময় দল বেঁধে যারা সিনেমা হলে লাইন দিত, ব্ল্যাকে টিকিট কিনেও সিনেমা দেখার শখ মেটাতে দ্বিধা করত না তারা আস্তে আস্তে ঘরমুখী হতে আরম্ভ করল। ক্রমে সি ডি-ডি ভি ডি ইত্যাদির সহজলভ্যতার দৌলতে সিনেমা হলের কাউন্টারের সামনের দীর্ঘ লাইন হ্রস্ব হতে হতে একসময় প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একে একে বন্ধ হতে থাকল হল গুলো, প্রথমে বড় বড় শহরে, তারপর ছোট শহর ও শহরতলিতেও সেই মড়ক দেখা দিল। নগরে, সিটিতে গড়ে উঠতে লাগল মল-মাল্টিপ্লেক্স, সেখানে উন্নত প্রযুক্তিতে সিনেমা প্রদর্শনের আধুনিক ব্যবস্থা করা হল যদিও আম-দর্শক পকেটের জোরে সেথায় প্রবেশের পথ খুঁজে পেল না,পাচ্ছে না। এই যখন হাল-হকিকৎ, ঠিক তখনই, সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়ে গেল ভারতীয় সিনেমার ‘সেন্টিনারি’। কিন্তু শতবর্ষ উদযাপনের উৎসাহে কোথায় যেন ছিল এক উৎকন্ঠা, প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিংবা ভবিষ্যতের সিনেমা নিয়ে। এই অর্বাচীন শিল্প-মাধ্যমটির ‘পপুলার সিনেমা’ হিসাবে টিঁকে থাকা না-থাকার প্রশ্নে যে অনিশ্চয়তা চক্ষুগোচর হচ্ছে তার থেকে নিষ্ক্রমণ কোন পথে হতে পারে তা নিয়ে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই সে চিন্তা-ভাবনার শরিক হতে হবে।


সংকটের প্রেক্ষিতটি সম্পর্কে একটা ধারণা এতক্ষণে আমরা হয়ত দিতে পেরেছি। কিন্তু অন্য আরেক দিক থেকেও ঘনীভূত হচ্ছে সঙ্কট। আর সে সঙ্কটের চরিত্র বৈশ্বিক, কিন্তু ধরন ভিন্ন। আমরা জানি যে, সিনেমা হচ্ছে চূড়ান্ত ভাবে প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প। আর যে সঙ্কটের কথা আমরা বলছি তা আসছে ওই আধুনিক প্রযুক্তির দিক থেকেই। একদিন যে আধুনিক মাধ্যমটি সাহিত্য ও শিল্পের সব কটি শাখা থেকে রস ও রসদ সংগ্রহ করেছে, সম্পূর্ণ আত্মীকরণ করতে সক্ষম না হলেও অন্তত আত্মসাৎ করে হয়ে উঠেছে এক আধুনিক মিশ্র শিল্প, শতবর্ষ পার না হতেই সেই ‘আধুনিক’ মাধ্যমটি বুঝি ‘ট্র্যাডিশন’-এ পরিণত হতে বসেছে। আর কেউ কেউ এমনও ভাবতে শুরু করেছেন যে ‘ট্র্যাডিশনাল সিনেমা’র যুগ শেষ হয়ে বুঝি সূচনা হতে চলেছে সিনেমার নূতন আরেক যুগ। একদল বলছেন ‘ট্র্যাডিশনাল সিনেমা’র মৃত্যু আসন্ন, অন্য দলের ভাবটা অনেকটা ‘সাদা পর্দার ফ্যাসিজমের পাট’ চুকিয়ে সিনেমার মুক্তি বুঝি এসেই গেল। ব্যাপারটা একটু খোলসা করা যাক এবারে। কেন, কোন প্রেক্ষিতে এরকম চিন্তাচর্চা দানা বাঁধছে তা খতিয়ে দেখা যাক।
আমরা যে যুগে বাস করছি তাকে এক কথায় বলা যায় ‘ডিজিট্যাল এজ’ (Digital Age)। এই ডিজিট্যাল টেকনোলজি-ই হচ্ছে দুশ্চিন্তার মূল উৎস। এই প্রযুক্তির সহায়তায় এমন সব কান্ড ঘটানো হচ্ছে যে তাজ্জব বনে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। সিনেমার ক্ষেত্রেও এই ডিজিট্যাল টেকনোলজি অবিশ্বাস্য সব কান্ড ঘটাচ্ছে। এমনকি সিনেমা তৈরি থেকে প্রদর্শন অবধি যে সাবেকি প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতা তার মূল ধরেই যেন টান দেবার উপক্রম হয়েছে। ডিজিট্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমা এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। খুব ছোট, হাতের মুঠোয় ধরা যায় এমন ক্যামেরা, অতি সস্তা এবং ফ্রি এডিটিং সফটওয়্যার, কম্প্যুটার ইত্যাদির দৌলতে সিনেমা তৈরি অনেক সহজ ব্যাপার এখন। অন্তত অর্থের যোগান কে দেবে সে দুশ্চিন্তা আর মুখ্য নয়। বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজনও ততটা নেই, কেননা ক্যামেরার পেছনে ‘মানুষের চোখ’ (Human Eye) প্রায় অপসৃত হতে চলেছে। হালের ক্যামেরা-কম্প্যুটারের কৃত্রিম বুদ্ধি (artificial intelligence) এর মধ্যেই সে জায়গা দখল করে নিয়েছে। Star Wars কিংবা Artificial Intelligence (AI) –এর মত হলিউডি ফিল্ম তার প্রমাণ। Machinimia পদ্ধতিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী, সেট, লাইট ইত্যাদি ছাড়াই সিনেমা তৈরি সম্ভব। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা আজ বাস্তব। এক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী, সেট ইত্যাদির জন্য ভিডিও গেম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। Virtual imageকে অ্যানিম্যাশনের সাহায্যে জীবন্ত বা জীবন-সদৃশ করে তোলা হয়।
বিতরণ-প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও নয়া প্রযুক্তি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি সিনেমার অসংখ্য নকল (copy) , মূল (original)-এর সঙ্গে যার কোন পার্থক্য নেই, সহজেই পাওয়া যায়। ইন্টারনেট (internet)-এর মাধ্যমে তা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া যায় নামমাত্র এবং এমন কী বহুক্ষেত্রে বিনা খরচেও। বিরাট পুঁজির পরিবর্তে সামান্য পুঁজি সম্বল করেও সিনেমা বানিয়ে ফেলা তাই আজ আর দুঃসাধ্য নয় এই আধুনিকতম প্রযুক্তির দৌলতে। শুধু তাই নয়, প্রদর্শনের জন্য তা একেবারে দর্শকের শোবার ঘরে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাও হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট মারফত, নাম মাত্র খরচে। এমন কি ইন্টারনেটে ফিল্ম-উৎসব পর্যন্ত হচ্ছে আজকাল। অর্থাৎ, এখানে প্রতিষ্ঠানের খবরদারি খাটছে না আর। এটা ফিল্মের কারবারিদের করে তুলেছে শঙ্কিত, আবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী অনেক স্রষ্টার জন্য খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার হাজার-দুয়ার। একটা দৃষ্টান্ত দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে মনে হয়। ২০০০ সালে Miike Figgis বলে একজন Time code নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, নিজস্ব প্রযোজনাও বলা যায়। এতে পরীক্ষামূলক ভাবে এক বিকল্প অথবা সমান্তরাল ন্যারেটিভ (narrative) স্টাইল গ্রহণ করা হয়। তা সম্ভব হয় ডিজিট্যাল প্রযুক্তি এবং ক্যামেরার ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ ব্যবহার করে। এতে বাস্তবতার এক অতিরিক্ত মাত্রা সংযোজিত হয় গল্প বলার অভিনব কায়দায়। স্বতন্ত্র ভাবে ক্রিয়াশীল অথচ স্থানিক ভাবে বিচ্ছিন্ন চারটি আলাদা ফ্রেমে বিষয়বস্তুকে হাজির করা হয় দর্শকের কাছে। শুধু তাই নয়, সিনেমাটির নির্মাতা দর্শককে সক্রিয়তার অংশীদার হতে সাহায্য করেন দুভাবে। ডিভিডি-র মাধ্যমে দর্শককে ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তার ধরন পাল্টে দেবার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, এবং সেই সঙ্গে দর্শককে তার নিজস্ব পচ্ছন্দ বা ইচ্ছানুসারে যে কোন ফ্রেমে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার ছাড়পত্রও দেওয়া হয়। এমনকি দেখার সময় ফ্রেমটি এডিট করার সুযোগও থাকে। পরিচালক চারটে ক্যামেরাকে সিঙ্ক্রোনাইজ করে চারটি আলাদা স্থানে বসিয়ে চারটি স্বতন্ত্র ঘটনা রেকর্ড করেন এবং এই চারটি আলাদা স্থানে, চারটি পৃথক সাউন্ড ট্র্যাকে রেকর্ড করা চারটি ‘অ্যাকশন’ দর্শকের সামনে হাজির করেন চার ভাগে বিভক্ত পর্দায়।

‘সিনেমা দেখা’ ব্যাপারটাই এর দরুণ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে ক্রমশ। সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে ‘নির্ধারিত স্থান নির্ধারিত সময় নির্ধারিত পদ্ধতি’ সংক্রান্ত ধারণাটি আজ অবান্তর হয়ে পড়েছে। ভিউইং (viewing) ব্যাপারটা এখন আর আগের মত ritual act নয়, বরং বহুলাংশে interactive হয়ে উঠছে। তাছাড়া সিনেমা নির্মাণ থেকে প্রদর্শন অবধি যে hierarchy বর্তমান ছিল, সেও আর বজায় থাকছে না আজকের এই ইলেক্ট্রনিক এজ-এ। সিনেমা একদিন ট্র্যাডিশনাল আর্ট ফর্মগুলোর, যেমন চিত্রকলা এবং থিয়েটারের, পরিবর্ত হিসাবে জনসাধারণের হাতে নীতি ও মতাদর্শ প্রচারের এক নতুন ভাষারীতি তুলে দিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বিরাট লাফের ফলেই চলচ্চিত্রের সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল এবং তার দরুণ শিল্পকর্ম বিষয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছিল। আধুনিক সেই প্রযুক্তির কাছে মানুষ নিজেকে কীভাবে হাজির করবে তার মধ্যে নয়, বরং ফিল্মের বৈশিষ্ট নিহিত ছিল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটানো যায় সে প্রশ্নের মধ্যে। আজকে, ডিজিট্যাল টেকনোলজির মত আরেক প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনের ফলে সিনেমার এযাবৎ পরিচিত ও স্বীকৃত সংযোগসাধন রীতির কোন পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা কতটা বা আদৌ আছে কি না, কিংবা এর ফলে সিনেমার আবির্ভাবে যেমন ঘটেছিল সেরকম বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন গণসংযোগের ক্ষেত্রে ঘটবে কি না সেটাই বিচার্য। Jean Cocteau যেমন ভেবেছিলেন, -‘Film will only become an art when its materials are as inexpensive as pencil and paper.’- একুশ শতকের নয়া প্রযুক্তি কি সিনেমার ‘শিল্প সম্ভাবনা’র সেরকম ইঙ্গিত বয়ে আনছে ! রূপোলি পর্দা কি তবে রূপ বদলাচ্ছে ? রূপান্তর ঘটছে তার! হয়ত তাই, হয়ত নয় - সময়ই তার সঠিক জবাব দেবে, যথা সময়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ব্লগ সংরক্ষাণাগার