সমাজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমাজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ন্যায় : প্রাতিষ্ঠানিক বনাম সামাজিক


 

Injustice anywhere is a threat to justice everywhere.  Martin Luther King, Jr.

 

কাজটা ঠিক ন্যায়সঙ্গত হল না’-এরকম বাক্য আমরা হামেশাই শুনে থাকি। এখানে বক্তার এক ঔচিত্যবোধ প্রত্যক্ষ করা যায়। অর্থাৎ যা হওয়া উচিত নয় তাই অন্যায়, অসঙ্গত। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে এই উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায় বোধ কিভাবে জন্মায়! ন্যায় (justice) শব্দটা আপাতভাবে খুব সহজ ও সাধারণ এবং বোধগম্য মনে হলেও ন্যায় বিধান কিন্তু তত সহজ নয়। মানুষের সমাজ যেদিন সৃষ্টি হয়েছে সেদিন থেকেই বিষয় হিসেবে ন্যায় বিশেষভাবে চর্চিত হয়ে আসছে। কেননা এর সঙ্গে  অধিকারের প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে। ন্যায়ের ধারণাটি মূলত এক সামাজিক প্রয়োজনে সৃষ্ট। যে কোন সমাজে ব্যক্তি এবং সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বর্তমান থাকে। এই বিরোধ মীমাংসা করা সম্ভব না হলে সমাজের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। সামাজিক রীতি-নীতি গুলো হচ্ছে এই বিরোধ মেটানোর এক প্রয়োজনীয় এবং সর্বসম্মত উপায়। এক কথায় বলা যায় যে, ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে এ এক অলিখিত চুক্তি। যার শর্ত সমূহের পালন ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। এই শর্ত লঙ্ঘন করা অন্যায়, অসঙ্গত। একই সঙ্গে এটাও এই অলিখিত চুক্তির অন্তর্গত বিষয় যে ব্যক্তির যা প্রাপ্য (ন্যায্য পাওনা) সমাজ তা অস্বীকার করতে পারে না বা তা থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করতে পারে না। বলা বাহুল্য যে, সমাজ ভেদে এই অলিখিত শর্ত সমূহ পৃথক ও ভিন্ন, ফলে ন্যায়ের ধারণা ও অধিকারের সীমানাও আলাদা। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ন্যায়-বোধ ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ন্যায়ের ভাবনা কোনো অর্থেই এক বা সমতুল্য নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের ন্যায়-সম্পর্কিত ধারণাও বদলেছে (সে বদল হিতকর কি অ-হিতকর হয়েছে তার বিচার এখানে অপ্রাসঙ্গিক) এবং সে বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি চলমান     

এই ন্যায়ের ধারণার মূলে কিন্তু এক (সামাজিক) সাম্যের ভাবনা ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ, সমাজের দিক থেকে সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখার চিন্তাEquals should be treated equally and unequals unequally’- প্রায় দু’হাজার বছর আগে অ্যারিস্টটল ন্যায়ের মৌলিক নীতি সূত্রবদ্ধ করেছিলেন এভাবেই। এটা হচ্ছে এক অ-ঘোষিত নীতি, -লিখিত চুক্তির মত। বাস্তবে সেটা  কিভাবে কতটা পালন করা হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কি না সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। একটা দৃষ্টান্ত দেখা যাক, ধরা যাক এবং দুজন মোটামুটি সমগোত্রীয় ও সমগুণসম্পন্ন ব্যক্তি। মনে করা যাক উভয়ে কোন একটি কাজের জন্য শ্রমদান করেছেন এবং পারিশ্রমিক পেয়েছেন পারিশ্রমিক সমান হওয়া উচিত অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিৎ। কিন্তু যদি দেখা যায় যে, ব্যক্তি দুজনের একজন মহিলা  বলে কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন তো সেটা অ-ন্যায় সাব্যস্ত হবে নিশ্চয়। (চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঠিক এরকম অন্যায়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে।) এই উদাহরণ কেবল এটা বোঝানোর জন্য যে সাম্যের ধারণাটি সর্বত্র সব সমাজে এক নয়, এমনকি একই সমাজেও ভিন্ন হতে পারে। ফলে অধিকারের স্তর ও পরিসীমাও পৃথক হয়ে পড়ে। আমাদের বর্ণ-বিভাজিত ভারতীয় সমাজেও সেটা চোখে পড়ে। প্রাচীন কালে একজন ব্রাহ্মণ ও একজন শূদ্রের অধিকার সমান ছিল না। উভয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গীও অনিবার্য কারণে আলাদা ছিল। আদিম সাম্যবাদী সমাজে সাম্যের যে ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল আর এ যুগের আধুনিক মানুষের যে  সাম্যের বোধ তার মধ্যে যে জমিন-আসমান ফারাক রয়েছে সেকথা আলাদা করে উল্লেখের নিশ্চয় প্রয়োজন নেই। তাহলেই দেখুন, ন্যায় ব্যাপারটা মোটেই সহজ-সরল নয়, বরং বেশ গোলমেলে। আর গোলমেলে  বলেই তা নিয়ে চিন্তা-চর্চা, তর্ক-বিতর্ক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেই আদ্যিকাল থেকেই চলছে। বলা যায়, সভ্যতার শুরু থেকেই ন্যায় সম্পর্কিত ভাবনা দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। (প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী) এটা যে পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনায় কেবল অগ্রাধিকার লাভ করেছে  এমন নয়, প্রাচ্যের চিন্তা-চর্চায়ও যে ন্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মর্যাদা লাভ করেছিল তার দৃষ্টান্তের অভাব নেই। আমাদের দেশে তো ন্যায় দর্শনসশরীরে বিদ্যমান। প্লেটোর রিপাব্লিকথেকে শুরু করে রাউলস-এর ‘অ্যা থিয়োরি অব জাস্টিস’ অব্দি চিন্তাবিদদের চিন্তা ও কাজে ন্যায় সংক্রান্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি জটিল থেকে  জটিলতর হয়েছে ন্যায় বিধানের ও ন্যায় প্রদানের প্রক্রিয়া। 

গোষ্ঠীতন্ত্রে গোষ্ঠী সমূহের বিশ্বাস অনুসারে কিছু রীতি-নীতি প্রচলিত ছিল যার ভিত্তিতে সাধারণত ন্যায়িক সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হত। পরবর্তীতে সে স্থান দখল করে ধর্মাচরণ। ধর্ম যা অনুমোদন করত সেটাই ন্যায়সঙ্গতবিবেচিত হত। রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী পর্যায়ে সমাজে আইন সে স্থান অধিকার করে নিয়েছে। কিন্তু সামাজিক সাম্যের প্রেক্ষিতে দেখলে আইনি ন্যায়সব সময় সামাজিক ন্যায়নিশ্চিত করে না। Earl Warren তাই মন্তব্য করেছেন, ‘It is the spirit and not the form of law that keeps justice alive.’ এই আইনও আবার রাষ্ট্রভেদে আলাদা। যেমন, সমকামিতা বহু দেশে আইনসম্মত, আবার অনেক দেশে দণ্ডনীয়।  যে  স্পিরিট’-এর কথা ওয়ারেন উল্লেখ করেছেন, দেখা যাচ্ছে যে তার অবিসংবাদী কোনো ধারণা মানব সমাজে অবর্তমান। সমাজ ভেদে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে অ-সাম্যের উপস্থিতি অস্বীকারের উপায় নেই। বস্তুত, উৎপাদন-পদ্ধতি, উৎপাদনের উপকরণের ওপর আধিপত্য ও শ্রম-সম্পর্ক, ইত্যাদি বহু জটিল বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়ের ধারণা। অতএব, সামাজিক সাম্য ব্যতিরেকে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে সাম্যের আশা দুরাশা মাত্র। আপাতত, আমাদের আইন-নির্ভরতা ছাড়া ন্যায় বিতরণের ভিন্ন পথ নেই।   

এবারে দেখা যাক, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় ন্যায়ের যথার্থ স্বরূপটি কেমন। কোন ব্যক্তির (individual) ক্ষেত্রে প্রাপ্য কিংবা উপযুক্ত ন্যায়যেভাবে সাব্যস্ত হয় তার ভিত্তিতে ন্যায় (justice) হতে পারে তিন ধরনের। Distributive  justice : যার লক্ষ্য হল যতদূর সম্ভব নাগরিকের হিতাধিকার (benefits) ও দায়ভার (burden) যথাক্রমে বিস্তৃত ও নির্দিষ্ট করা দাস ব্যবস্থা সে হিসেবে ন্যায়সম্মত ছিল না নিশ্চয়। Retributive or corrective justice – এর লক্ষ্য হল কোন অপরাধের শাস্তি কতটা হওয়া উচিত তা স্থির করা - চোখের বদলে চোখকিংবা চুরির অপরাধে  অপরাধীর হাত কেটে ফেলাটা যেহেতু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।  Compensatory justice  হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ন্যায্যতা ও পরিমাণ স্থির করে (ক্ষতি যাদের দ্বারা হয়েছে তাদের কাছ থেকে) তা আদায় দেওয়া। ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা সেরকম একটি দৃষ্টান্ত।  রাউলস অবশ্য ন্যায়কে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘প্রায়োগিক’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন। ন্যায়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক স্থিরতা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম মর্যাদা। সামাজিক স্থিরতা নির্ভর করে সমাজের সদস্যরা ন্যায্য ব্যবহার কতটা পাচ্ছে বা পাচ্ছে না তার নিরিখে। সমাজের কোনও অংশ যখন অনুভব করে যে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে তখন সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়, বিক্ষোভ মাথা চাড়া দেয়। রাউলসের ভাবনায় সমাজের সদস্যরা পরস্পরের  উপর নির্ভরশীল, এবং সামাজিক ঐক্য ততক্ষণ বজায় থাকে যতক্ষণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দেখিয়েছেন যে, সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী ও দাবিদার। বিমূর্ত ও অসম্পর্কিত কারণে বৈষম্য মূলক আচরণ অতএব মৌলিক মানবিক অধিকার লঙ্ঘন বৈ  কিছু নয়।

ন্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিকতা ও বিবেকের প্রশ্ন। ন্যায়ের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে নীতিশাস্ত্র। যে কোন নৈতিক সিদ্ধান্ত  গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা আবশ্যক যে আমরা প্রত্যেককে সমান নজরে দেখছি কি না! যদি তা না হয়, তাহলে যেসব শর্তের  ভিত্তিতে ভিন্ন, অর্থাৎ বিষম আচরণ করা হচ্ছে তা যুক্তিপূর্ণ ও যথার্থ কি না সেও দেখা কর্তব্য! কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিষম ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত বলে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, যেমন দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারীদের বেলায় যে ছাড় দেওয়া হয় তা। কিংবা কোনো প্রকল্পে কারো অবদান অন্যদের তুলনায় বেশি হওয়ার দরুণ অধিক প্রাপ্তি ঘটলে আমরা তা মেনে নেই। এ কথা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে  না যে, ন্যায় হচ্ছে পারস্পরিক মর্যাদার স্বীকৃতি এবং পরস্পর নির্ভরশীল সমাজে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপনের প্রাথমিক  শর্ত হচ্ছে আচরণগত সমতা। ব্যাপক অর্থে ন্যায়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামাজিক সাম্যের স্থাপনা। অমর্ত্য সেনও সামাজিক ন্যায় (social justice)-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সভ্য সমাজ সেই সামাজিক ন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়াবে নিশ্চয়। আপাতত, সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক (ন্যায্য)অধিকার সুনিশ্চিত করাই ন্যায়ের লক্ষ্য হোক।  

  

 

 

 

    

  

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

আশা-আশঙ্কার ঘেরাটোপে উত্তরপূর্বের ভবিষ্যৎ


(প্রসঙ্গঃ লুক ইস্ট পলিসি) 




    ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ড উত্তরপূর্বকে যথেষ্ট কিংবা ন্যায্য গুরুত্ব দেয় না এমন অভিযোগ বহু দিনের। ‘কেন্দ্রৰ বৈষম্য’ জাতীয়তাবাদী চিন্তাচর্চায় এক মুখ্য ও অনিবার্য আলোচ্য বিষয়। অনেকটা বরাক উপত্যকায় ‘দিসপুরের বিমাতৃসুলভ আচরণ’ গোছের মনস্তত্ত্ব বর্তমান রয়েছে এর গভীরে। একেবারে অযৌক্তিক অথবা অসঙ্গতও বলা যাবে না একে। এই সেদিনও, উত্তর ভারতে, বিশেষত দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উত্তরপূর্বের যুবক-যুবতীকে ‘চিঙ্কি’ বলে চিহ্নিত ও হেনস্থার শিকার হতে দেখা গেছে। কেন্দ্র-প্রান্তের সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতার এক বোধ সক্রিয় রয়েছে। আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত, উভয়ক্ষেত্রেই, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তরপূর্বের সাদৃশ্যের চাইতে বৈসাদৃশ্য বহুলাংশে দৃশ্যমান। ফলে সামাজিক মানসিকতায় ‘অপরতা’ ফুটে ওঠে অনায়াসে। রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসও অতএব প্রচার এবং প্রশ্রয়ের সুযোগ ও পথ খুঁজে পায় অবলীলায়। কেন্দ্রীয় দৃষ্টিতে এগুলো বহুদিন পর্যন্ত ‘আইনশৃঙ্খলা’ (law & order) জনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে এবং অঞ্চলটি ‘উপদ্রুত প্রান্ত’ হিসেবে প্রশ্রয়ও পেয়েছে যতদিন না রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরকম এক বাস্তবতায় ১৯৯০ সালে ‘পূবে তাকাও’ (look east)নীতি গৃহীত হয়। মূলত দুটো কারণে। এক, প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর প্রাচুর্য এবং দুই, গণমানসে ধারাবাহিক ‘বঞ্চনা’ জনিত চরম ক্ষোভ। 

    লুক ইস্ট পলিসির উদ্ভবের মূলে ছিল পূর্বীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অধিক পরিমাণে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও আদান-প্রদানে নিয়োজিত হওয়ার উচ্চাশা। বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, নয়া উদারতাবাদ ইত্যাদি ইতোমধ্যেই তার যথার্থ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। ভারতীয় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সংযুক্তির প্রশ্নে উত্তর পূর্বাঞ্চল বাণিজ্যিক ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে প্রতীয়মান হল। দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ‘এক ঢিলে দুই শিকারের’ এ হেন সস্তা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেন-ই বা কী করে! সরল অঙ্ক কষে বোঝানো গেল যে যোগাযোগ ব্যবস্থার (সড়ক, রেল, আকাশ ও সমুদ্রপথ) উন্নতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের জোয়ার বইবে ও রোজগারের পথ প্রশস্ত হবে। বঞ্চনার ক্ষোভ যাবে ধুয়ে মুছে, ফলে সন্ত্রাসেরও চিরসমাপ্তি ঘটবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামোর উন্নতির ফলে ইতিবাচক প্রভাবের ধারণা ও সম্ভাবনা অমূলক নয় যদিও উত্তরপূর্বের প্রেক্ষিতে ততটা সরলও নয়, বরং বিবিধ জটিলতাপূর্ণ। তাই সে সম্ভাবনা কতটা আশাব্যঞ্জক একটু যাচাই করা যেতেই পারে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে উত্তরপূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ বস্তুত এই লুক ইস্ট নীতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। 

    বর্তমান সরকার ‘পূবে তাকাও’ (look east) নীতির অনুক্রমেই তড়িঘড়ি করে ‘পূর্ব বিহিত’ (act east) নীতি ঘোষণা করে এমন এক সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভরকেন্দ্র এশিয়ায় স্থানান্তরের (Pivot to Asia) ঘোষণা দিচ্ছে। ঘটনাটি বস্তুতই তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্বপ্রান্তের প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন, কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ সমূহ সহ সুদূর পূর্বপ্রান্তীয় দেশ, যেমন, জাপান ও ভিয়েতনামের সাথে প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে বলা চলে। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে, লুক ইস্ট পলিসি কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণেই শুধু নয়, সামরিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। 

    মোটাদাগের সরলরৈখিক ভাবনায় এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে বাজারে প্রবেশাধিকার পেলে ‘বঞ্চনা’ জনিত ক্ষোভ প্রশমিত হবে ও শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির চাকা তরতর করে ঘুরবে। এই তত্ত্বের সফল প্রয়োগ তখনই সম্ভব যদি না জনগোষ্ঠী সমূহের এই প্রকল্পে যোগদান সর্বাত্মক হয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এই সেতুবন্ধনের উপযুক্ত পরিসর অনুপস্থিত এবং তা গড়ে তোলার যথার্থ প্রচেষ্টা দিল্লির তরফেও সেভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জাতিগোষ্ঠী সমূহের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করা যায়, যেখানে জাতিসত্তাগুলোর দাবিদাওয়া সমূহ বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তো নয়ই, বরং প্রাক-বাজার যুগের, তবেই ফাঁক-ফোকর গুলো স্পষ্ট ধরা পড়বে। দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও সংযুক্তি বলা বাহুল্য দিল্লির নীতিবাগীশদের জন্য আহ্লাদের কারণ। কিন্তু নীতির শর্তাবলী যদি উত্তরপূর্বাঞ্চলের জাতিসত্তার সহমতের ভিত্তিতে স্থিরীকৃত না হয় তাহলে পথ প্রশস্ত হওয়ার পরিবর্তে কানাগলিতে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেবার নয়। উত্তর পূর্বের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে। আহ্লাদের বিপরীতে অপর পক্ষে আশঙ্কার কারণ ঘটেছে। মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে রেললাইন বিস্তারের বিরোধিতা তার জ্যান্ত দৃষ্টান্ত।    

    প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও নিষ্কাশনের প্রশ্নে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন জাতিসত্তা বরাবর প্রতিরোধী অবস্থানে থেকেছে। আশির দশকের ‘তেজ দিম, তেল নিদিম’ শ্লোগান এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতেই পারে। যোগাযোগের বিস্তৃতি এবং প্রসারের ফলে শ্রমের বাজারে অনিবার্য প্রভাব পড়বে এবং প্রব্রজনের প্রবাহও নিশ্চিত বৃদ্ধি পাবে। বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে প্রব্রজন কেন্দ্রিক রাজনীতি এতদঞ্চলে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে, আসছে। ‘নাগরিকপঞ্জি নবীকরণ প্রক্রিয়া’ সমাপ্ত হলে ‘নাগরিক অধিকার বঞ্চিত’ তথাকথিত বিদেশির (?বাংলাদেশি) এক বিপুল সংখ্যা নিশ্চিতই ‘সস্তা শ্রম’ হিসেবে পুঁজির উদরপূর্তির সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বর্ধিত মাত্রায় প্রব্রজনের আশঙ্কার দরুণ ‘খিলঞ্জিয়া’র অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনও দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই দুশ্চিন্তার বিষয়টি সিনেমার মত জনপ্রিয় মাধ্যমেও উঠে এসেছে। সম্প্রতি মণিপুরি একটি ফিল্মে, 2023 Century, দেখানো হয়েছে যে ভবিষ্যতের মণিপুরি সমাজে অভিবাসী অ-মণিপুরিরাই নির্ণায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ। ইনার লাইন পারমিটের কথাও তাই উঠছে। আই এল পি (ILP)বস্তুত পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক সাময়িক সন্ধিপত্র মাত্র, অন্য ক্ষেত্রে, জমির অধিকার ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে গোষ্ঠীগুলো যুযুধান পক্ষ। ব্রিটিশ আমলে আই এল পি চালু হয়েছিল পুঁজি ও প্রাক-পুঁজি পৃথকীকরণের স্বার্থে ও নিয়ন্ত্রণ-অসাধ্য ‘অসভ্য’ এলাকা চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে। উপনিবেশোত্তর উদার পরিকল্পনায়, যেমন ভাবা গিয়েছিল, এই বিভাজন দূর হওয়ার পরিবর্তে বরং আরো দৃঢ় হয়েছে যার ফলে আই এল পি দাবির মধ্যে অনগ্রসর জাতিসত্তাগুলোর তরফে ‘অপরতা’ অটুট রাখার প্রতিধ্বনিই শোনা যাচ্ছে। 

    লক্ষনীয় যে, এই জাতীয় দাবি উত্থাপনের ফলে ভারতীয় রাষ্ট্রের অথবা তার সংগে সংযুক্ত পুঁজির কর্তৃত্ব কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ বা খর্ব হচ্ছে না, বরং এসবের মূল লক্ষ্য অভিবাসী শ্রমজীবী শ্রেণী, যারা আদিবাসীদের অধিকার ও আধিপত্যের প্রতি হুমকি স্বরূপ বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তির একরৈখিকতা এমন যে উত্তরপূর্বের জাতিগোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, ব্যবহার না করে ‘সম্পদের স্তুপের উপর বসে থাকা’ মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিপত্তিকামী একটি অংশ সম্পদ নিষ্কাশনী প্রকল্পের শরিক হওয়ার মাধ্যমে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহী হলেও গোষ্ঠীর নিঃশর্ত সমর্থন আদায়ে অসমর্থ। প্রাক-বৃটিশ পর্বের মত একটা গোটা জাতিকে একই মতাদর্শ কিংবা জীবনপ্রণালীর স্বপক্ষে দাঁড় করানো আজ বস্তুত অসম্ভব। ফলে প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীর সরলরৈখিক যুক্তিতর্ক প্রত্যাহবানের সম্মুখীন হচ্ছে। অর্থাৎ, শ্রেণী-চেতনার উন্মেষ প্রাপ্য পরিসর দাবি করছে। এমতাবস্থায় উত্তরপূর্বাঞ্চলের অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শ্রেণী এবং জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা বিশ্লেষণে পুরনো ছাঁচটির বিনির্মাণের জটিল কাজটিও জরুরি হয়ে পড়েছে। জমাকৃত মূলধনের সঙ্গে অনগ্রসর অঞ্চলের অধিবাসীর নৈকট্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলে তা লক্ষণীয় হবে নিশ্চয়। প্রব্রজিত পুরুষ-শ্রমের আধিক্য শ্রমের বাজারে ও উত্তরপূর্বের সমাজে লিঙ্গ বৈষম্যের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আমদানি করবে সেও চিন্তনীয় বইকি! . 

    অন্যতর সমস্যাও রয়েছে। শ্রম সংক্রান্ত সম্পর্ক ও শর্তের পুনর্বিন্যাসের ফলে বর্ধিত ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে এবং মহানগরের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারীদের জমির অধিকার নিয়ে আন্দোলন যখন দানা বাঁধতে শুরু করেছে (স্থায়ী পাট্টার দাবিতে আন্দোলন স্মর্তব্য) সেক্ষেত্রে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ প্রকল্প কতটা প্রয়োগসফল হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া উক্ত প্রকল্পে স্থানীয় মানুষজনের অংশগ্রহণ সম্ভব বা বাস্তবায়িত হতে পারছে না দক্ষ শ্রমিকের অপ্রতুলতার কারণে, বরং অ-দক্ষ শ্রমশক্তি প্রব্রজিত হচ্ছে অঞ্চলের বাইরে। উগ্র আঞ্চলিক রাজনীতির সোপান বেয়ে একশ্রেণীর তোলাবাজদের মাধ্যমে বিবিধ প্রকল্প থেকে তোলা আদায়ে তৎপর এক সিন্ডিকেট রাজ কায়েম হয়েছে । বিভিন্ন জাতিসত্তা গুলোর অন্তর্কলহও সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে ক্রমাগত। প্রাদেশিক সীমা কেন্দ্রিক অসম-নাগাল্যাণ্ড, নাগাল্যাণ্ড-মণিপুর বিবাদ নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে পড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশপথ হিসেবে উত্তরপূর্বাঞ্চলের দ্বার উন্মুক্ত করে দেবার প্রকল্প কতটা ফলপ্রসূ হবে বলা কঠিন। পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নে সেতুবন্ধের দায় পালন করবে না অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মতভেদ গভীরভাবে প্রকট করবে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা নেই কোনো। অন্যবিধ বিপদের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেবার নয় মোটেই। গোটা অঞ্চলটিই মাদক পাচার, যৌনবাজার, মানব পাচার ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজের আন্তর্জাতিক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার আশংকাও অমুলক নয়। এ আসলে দুমুখো সাপের নীতি। সে কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের স্টিলওয়েল রোড খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছনো সম্ভব হয় না, পি এম-এর চীন সফরের পাশাপাশি ডোকলাম কেন্দ্রিক অস্বস্তিও বহাল তবিয়তে বিরাজ করে। এমনতর জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে কেবল এটুকুই আপাতত বলা যেতে পারে যে, লুক ইস্ট পলিসি উত্তরপূর্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংক্রান্ত ও আর্থসামাজিক দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসা্র লক্ষ্যে কোন পথ গ্রহণ করে তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। আপাতত, এটি একটি সম্ভাবনা মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। 

.      পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শ্রেণীর উপস্থিতি যদি গুরুত্ব পায় তো আরো কিছু বিষয় প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। গোটা দেশে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা উত্তরপূর্বেও বিস্তৃত হতে পারে, যেহেতু এখানে মজুরির হারের তারতম্য আদিবাসী ও অভিবাসী বিভাজনেরও বড় উপাদান। শ্রেণী-রাজনীতি জাতিগত নির্ণায়কবাদকে হটিয়ে দেবার পরিস্থিতি তৈরি করবে আমরা অবশ্যই তেমন কথা বলছি না, এটুকুই কেবল বলছি যে শ্রেণী এবং গোষ্ঠী-চেতনা বর্তমানে সহাবস্থানে রয়েছে এবং বিভাজনের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করবে ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা সমূহের নিরসনের প্রশ্নে কোন পদ্ধতি গৃহীত হয় তার ওপর। অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিও তার নিরিখেই গতি করবে। একথা অনস্বীকার্য যে সংযোগ বিস্তৃত ও প্রসারিত হলে বাণিজ্যের বহর বাড়বে, প্রাক-দেশভাগ-পর্বে যেমন ঘটেছিল। সমস্যা হচ্ছে ’৪৭ পরবর্তী এবং উদারনীতির পরবর্তী, উভয় পর্যায়েই, অঞ্চলবাসীর সামাজিক সমর্থন ও পরামর্শের বিষয়টিকে পাশ কাটানো হয়েছে। এরকম অবস্থায় উত্তরপূর্বের প্রান্তিকায়িত জনগোষ্ঠীগুলি, যেমন চর অঞ্চলের বাঙালি মুসলমান অভিবাসী, বাঙালি হিন্দু ডি ভোটার, অরুণাচলের চাকমা সম্প্রদায় কিংবা ত্রিপুরার রিয়াং গোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও জমির অধিকার বিষয়ক সমস্যা কীভাবে কিংবা আদৌ মীমাংসা করা যাবে কিনা তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। উল্লিখিত প্রশ্নসমূহ আসলে বৃহত্তর ক্ষেত্রে অধিকার ও ন্যায়ের (rights and justice) সঙ্গে সংযুক্ত, উত্তরপূর্বাঞ্চলে যা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। কেবল রাষ্ট্রের দ্বারাই নয়, এক জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা অপর জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও। উত্তরপূর্বে যে কোন নীতি অথবা কর্মপ্রণালী ফলপ্রসূ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়, সম্ভবত, পরিচয় এবং নাগরিকত্ব কেন্দ্রিক সমস্যা নিরসনের প্রশ্নে মতানৈক্য। ‘নাগরিকপঞ্জি নবীকরণ প্রক্রিয়া’ এবং ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধেয়ক’ সে অনৈক্যের ভিতকেই শক্তিশালী করবে, সন্দেহ নাই। 





ঐতিহাসিক ভুলঃ হিন্দুত্ববাদী এবং সাম্যবাদীরা / ময়ূর চেতিয়া

 

মূল অসমিয়া থেকে অনুবাদঃ মৃন্ময় দেব

(লেখাটি আংশিক ভাবে শেয়ার করা যাবে না, শেয়ার করতে হলে পুরোটাই লেখকের নাম সহ শেয়ার করতে হবে।)

১৯২০ দশকের আশে পাশে হিন্দুত্ববাদী ও সাম্যবাদী – এই দুই মতাদর্শ ভারতবর্ষে সাংঠনিক রূপ পরিগ্রহ করতে আরম্ভ করে। একদিকে গড়ে উঠছিল কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দুস্তান সোসিয়েলিস্ট রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশন, ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্টস পার্টির মত দলগুলো, আর অন্যদিকে হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ইত্যাদি সংগঠনসমূহ।

আজ প্রায় নয় দশক পার হওয়ার পর হিন্দুত্ববাদীরা দেশ শাসন করছে। অপর দিকে সাম্যবাদী দল সমূহ দেশের কতকগুলো বিশেষ অঞ্চল তথা গণ-আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিপ্লব দূর অস্ত, ভারতীয় সাম্যবাদীরা আজ অব্দি কেন্দ্রে একটি কল্যাণকামী সরকার গঠন করতেও সক্ষম হয়নি। এই অক্ষমতার অন্তর্নিহিত কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন বইকি!  একটা কথা অবশ্য মনে রাখা দরকার যে, কোনো একটি সংগঠন ক্ষমতা দখলে সমর্থ হলেই সংগঠনটির মতাদর্শের শুদ্ধতা সাব্যস্ত হয় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজ মধ্য প্রাচ্যের এক বিরাট অংশ আইসিস, আল নুসরা, বোকো হারাম ইত্যাদি দক্ষিণপন্থী-ইসলামিক-মৌলবাদী   শক্তির হাতে রয়েছে। সেই যুক্তিতে এরকম শক্তিগুলোকে শুদ্ধ ও সঠিক বিবেচনা করার কারণ নেই। মধ্য-প্রাচ্যে গণতন্ত্র আজ পরাজিত যদিও সেখানে গণতান্ত্রিক প্রমূল্যকে নাকচ করে দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব নয়। সামাজিক সত্য বৈজ্ঞানিক সত্যের মত নয় যে একসময় নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্নও। সে যা হোক, হিন্দুত্ববাদীদের জয় এবং সাম্যবাদীদের পরাজয় আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। [এ বিষয়েও নিশ্চয় আলোচনা হওয়া উচিত, এবং হচ্ছেও]আমরা বরং সাম্যবাদী এবং হিন্দুত্ববাদীদের কতকগুলো ঐতিহাসিক ভুল সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করব যে ভুল গুলো  নিয়ে আজও আলোচনা হয়ে থাকে। ভূমিকা অহেতুক দীর্ঘায়িত না করে বরং মূল বিষয়ে আসা যাক।

১) পাকিস্তান ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গঃ পাকিস্তানের দাবির মূলে এই ধারণাটি বর্তমান ছিল যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান – এই দুটো সম্প্রদায় আসলে দুটো ভিন্ন ভিন্ন জাতি (nation) গঠন করেছে। মজার ব্যাপার যে, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগ  উভইয়েই নীতিগত ভাবে এই কথা মেনে নেয়। হিন্দুত্ববাদীরা আজও ধর্মভিত্তিক জাতির বিষয়টিকে মান্যতা দেয়। এক্ষেত্রে তারা আজকাল কেবল হিন্দু ধর্মের পরিবর্তে হিন্দু সংস্কৃতি কথাটা ব্যবহার করে। যা হোক, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের মধ্যে পার্থক্যটা এই ছিল যে মুসলিম লীগ তাদের জাতির স্বায়ত্ত্বতা দাবি করেছিল, আর হিন্দুত্ববাদীরা ভারতে হিন্দু জাতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম জাতিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমান-এই দুটো যে দুটো আলাদা  জাতি- সে বিষয়ে উভয়ের মনে বিশেষ কোনো মতভেদ ছিল না। মতভেদ ছিল কেবল এই নিয়ে যে দুটি জাতির অস্তিত্বের বিষয়টি কী উপায়ে মীমাংসা করা হবে?

সবের বিপরীতে, সংস্কৃতির বিপরীতে কমিউনিস্টরা সর্বদাই আর্থিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের পোষকতা করে  এসেছে। এক্ষেত্রে পথ-প্রদর্শকের ভূমিকায় ছিলেন ১৯ শতকের কিছু ভারতীয় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী-যারা বৃটিশ শাসনের ঔপনিবেশিক-আর্থিক শোষণের দিকটি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন। কীভাবে ভারতের সম্পদরাশি লুন্ঠন করে ব্রিটেনের  উদ্যোগীকরণের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছিল (drain of wealth), কীভাবে কৃষিক্ষেত্রে অত্যধিক খাজনা জনগণের টুঁটি চেপে  ধরেছিল সে বিষয়ে তাঁরা বিস্তৃত লিখে গেছেন। রমেশ চন্দ্র দত্ত, দাদাভাই নৌরজী প্রভৃতি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরাই আর্থিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটি নির্মাণ করেছিলেন যার খানিকটা সংশোধন করে কমিউনিস্টরাও পরবর্তীতে গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু চল্লিশ দশকের আশে পাশে কতকগুলো জটিলতার সৃষ্টি হল। চল্লিশের প্রথম ভাগে মুসলিম লীগ তাদের লক্ষ্য হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি পেশ করল। কংগ্রেস দলের প্রতি আনুগত্য থাকা মুসলমানের সংখ্যা যথেষ্ট হ্রাস পেল। লক্ষণীয় যে ১৯৪৭ সালের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জিন্না তাঁর কল্পনায় অধিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক দেশটির কোনও মানচিত্র হাজির করতেও সক্ষম হতে পারেন নি। Ayesha Jalal দের মত কিছু সংখ্যক উদারপন্থী ইতিহাসবিদদের মতে জিন্না আসলে স্বাধীন ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলমানের সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (proportional representation) দাবি জানিয়েছিলেন। [ প্রসঙ্গ গ্রন্থঃ ‘The Sole Spokesman: Jinnah and the Movement for Pakistan’ by Ayesha Jalal, Oxford University Press, 1994]। পাকিস্তানের দাবি আসলে জিন্নার জন্য এক বাগাড়াম্বরসর্বস্ব দাবি (rhetorical demand) ছিল যার মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসকে কোনঠাসা করে বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে মুসলমানের জন্য সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আদায় করার চেষ্টা করেছিলেন। কংগ্রেস বরাবর এক শক্তিশালী কেন্দ্রিয় সরকার-অর্থাৎ কেন্দ্রিকৃত ভারতের কল্পনা করেছে, অন্যদিকে জিন্না কল্পনা করেছিলেন আমেরিকা সদৃশ এক ফেডারেল গোছের ভারতবর্ষের- যেখানে ফেডারেল প্রদেশ সমূহের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা বর্তাবে। অর্থাৎ, বঙ্গ, পাঞ্জাব প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মুসলমানের স্বার্থ রক্ষিত হবে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দুটি প্রদেশের অস্তিত্বের ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে হিন্দুরা মুসলমানের ওপর অত্যাচার চালাতে পারবে না। সে যাই হোক, এই পর্যায়ে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশীর ভাষায় “ বিশ এবং ত্রিশের দশকে হিন্দু জনগণকে গান্ধীজী যেভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন, আজ জিন্নার অধীনে মুসলমান জনগণও একই ভাবে স্বাধীনতার জন্য জেগে উঠেছে। কাজেই মুসলিম লীগকেও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশীদার হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে।”

চল্লিশের সময়কার কমিউনিস্ট পার্টির ডকুমেন্টগুলো পড়লে বার বার একটি পঙক্তি/বক্তব্য নজরে আসে-“ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে  কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে একটা সমঝোতা হওয়া উচিত এবং সত্বর দেশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমাদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুক্তফ্রন্টে সামিল হওয়া আবশ্যক।” ১৯৪৫-৪৭ সময়সীমায় কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন কৃষক এবং শ্রমিক আন্দোলন গুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে পড়ে। ভারতীয় নাবিকদের বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও কমিউনিস্টরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। কংগ্রেস, লীগ এবং কমিউনিস্টদের লাল পতাকা নাবিকরা উত্তোলন করে। কমিউনিস্টরা বারংবার বলেছে-দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে লীগ এবং কংগ্রেসকে বোঝাপড়ায় আসা উচিত। বৃটিশের ভারত ত্যাগ করার ক্ষেত্রে ১৯৪৫-৪৭ সময়সীমার কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেরও বিশেষ ভূমিকা ছিল। [প্রসঙ্গ গ্রন্থঃ “Modern India” by Sumit Sarkar, Oxford University Press]

অর্থাৎ শর্তসাপেক্ষ ভাবে কমিউনিস্টরা মুসলিম লীগের ন্যায্যতা স্বীকার করে নেয়। অবশ্য মনে রাখা দরকার, পাকিস্তান যে একটি পৃথক দেশ হবে সেটা ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। স্বয়ং জিন্নাও পাকিস্তানের একটি আলাদা মানচিত্র জনগণের সামনে পেশ করতে পারেন নি। ভারত বিভাজনের সময় লক্ষ লক্ষ লোক নিহত ও গৃহহারা হওয়ার অন্যতম কারণ ছিলঃ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভারত এবং পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমা কী হবে - কিংবা দুটো আলাদা দেশ হবে না একটা দেশ হবে - সে সম্পর্কে সবার - এমন কি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্ব- নিশ্চিত ছিল না।  হঠাৎ আসা বিভাজনের করাল গ্রাসে সব কিছু ধুয়েমুছে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

যাই হোক না কেন, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর কমিউনিস্ট পার্টি এই ভুলের সমালোচনা করল। সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য কিছু বিশেষ রক্ষাকবচ দাবি করার প্রশ্নে আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু তাই বলে ‘মুসলমানরা এক জাতি - এক নেশন - গঠন করেছে’ বলাটা মারাত্মক কথা। চল্লিশের দশকের বিভিন্ন দাঙ্গার সময় পাকিস্তানের দাবির ফলে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এইক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য আলাদা কিছু সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দাবি করে পাকিস্তানের মত সাম্প্রদায়িক দাবির মোকাবিলা সফল ভাবে করতে না পারাটা কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য এক বিরাট ব্যর্থতা ছিল।

অবশ্য কমিউনিস্টদের এই বিচ্যুতি ছিল সাময়িক বিচ্যুতি। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজস্ব লাইন ঠিক করে  নিয়েছিল। তার বিপরীতে হিন্দু মহাসভা, আর এস এস প্রভৃতি আজও ধর্মভিত্তিক জাতির ধারণাটিতে বিশ্বাস করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লীগের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদেরও সমান ভূমিকা ছিল।

ভারত বিভাজনের কোনও বিকল্প ছিল কি? জিন্না কথিত দুর্বল কেন্দ্রিয় সরকার তথা শক্তিশালী আঞ্চলিক সরকারের ফেডারেল আর্হিরে দেশটিকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভবপর ছিল কি? ‘ধর্মভিত্তিক জাতি’র ধারণাটির সমালোচনা করেও সংখ্যালঘুদের জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচের দাবি রক্ষা করা কি সম্ভব ছিল কি? এই প্রশ্নগুলো আজও ইতিহাসবিদদের ব্যতিব্যস্ত  করে। [ অসমীয়া হিসাবে মাঝে মধ্যে ভাবি-দুর্বল কেন্দ্র ও শক্তিশালী আঞ্চলিক সরকার যদি হত তাহলে ‘কেন্দ্র অসমকে মাসিমা’র চোখে দেখছে’-এই জাতীয় ধারণারও অবসান ঘটত !! ]

 

 

সাম্যবাদীদের শর্তসাপেক্ষে মুসলিম লীগকে সমর্থনের প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে হিন্দুত্ববাদীরা এমন এক চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করে যেন  তা কমিউনিস্টদের কোনও ষড়যন্ত্র ছিল। কমিউনিস্টারা ভুল করেছিল তা ঠিক। কিন্তু লীগের প্রতি কমিউনিস্টদের সমর্থন কখনোই শর্তহীন ছিল না। বরং কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের মতই লীগকে এক জাতীয় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু একটি পৃথক পাকিস্তানের জন্য কমিউনিস্টরা কখনো রাস্তায় বেরোয়নি, আন্দোলন করেনি।

অথচ এর বিপরীতে হিন্দু মহাসভার মত সংগঠন সমূহের ভূমিকা কী ছিল? ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রাক-মুহূর্তে,  প্রাদেশিক সরকারগুলো থেকে কংগ্রেসের পদত্যাগের সময়, তারা মুসলিম লীগের সঙ্গে একত্রে বঙ্গ, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রদেশ এবং সিন্ধ প্রদেশে সরকার গঠন করেছিল। কমিউনিস্টদের লীগ-প্রীতির কথা হিন্দুত্ববাদীরা বলতে ভোলে না, অথচ তারা লীগের সঙ্গে মিলে রাজভোগ করেছিল। কমিউনিস্টরা অন্তত লীগের প্রতি সমর্থনের বিনিময়ে কোনও বৈষয়িক সুবিধা লাভ করেনি, আশাও করেনি।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনঃ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের একটা পুরোনো অভিযোগ ছিল যে, কংগ্রেস কোনও একটা আন্দোলন আরম্ভ করে মাঝপথে আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। কখনো হিংসা প্রয়োগের অজুহাতে (চৌরি চৌরা প্রসঙ্গ), কখনোবা সরকারি প্রতিশ্রুতি লাভের পর (আইন অমান্য আন্দোলন প্রসঙ্গ) আন্দোলন স্থগিত করা হয়। কংগ্রেসের বিপরীতে কমিউনিস্টারা স্বাধীনতা লাভ না করা পর্যন্ত লাগাতার আন্দোলন করার পক্ষে ছিল। অথচ ১৯৪২ সালে সত্যি সত্যি সেই সুযোগ যখন হাতের কাছে  এলো তখন কমিউনিস্টদের স্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। এর কারণ বুঝতে হলে খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে।

১৯১৩ সালঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক-মুহূর্ত। লেলিন, রোজা লুক্সেমবার্গ-এর মত কমিউনিস্ট নেতারা ঘোষণা করলেন যে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ কারো কল্যাণ সাধন করতে পারে না। কাজেই সকল দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর উচিত নিজ নিজ দেশের সরকার গুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অবশ্য ইউরোপের বেশির ভাগ সাম্যবাদী দল লেলিন-রোজাদের কথা শোনেনি। ফলে বিশ্বযুদ্ধে এক দেশের কৃষক সৈন্য অন্য দেশের কৃষক সৈন্যের রক্তে হাত লাল করল। যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তিকামী আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে। উন্মাদ জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয়।

বাম আন্দোলনের এই দশার প্রতি লক্ষ্য রেখে রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা সিদ্ধান্ত নেয় যে এখন থেকে ভ্রাতৃত্ববোধের খাতিরে বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যাতে দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তিতে সমবেত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে তেমন একটি মঞ্চ গঠন করা উচিত। কমিনটার্ন নামের এই মঞ্চটির সিদ্ধান্তসমূহ সব কটি কমিউনিস্ট দলের উপর বাধ্যতামূলক ভাবে প্রযোজ্য হল। সে কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপরীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পৃথিবীর সমুদয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর উপর কমিনটার্নের সিদ্ধান্ত সর্বোপরি হল।

কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে চরিত্রগত ভিন্নতা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ। এতে কোনো পক্ষকে ভালো কিংবা মন্দ বলার স্থল ছিল না। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল ফ্যাসীবাদ এবং মানব সভ্যতার মধ্যেকার যুদ্ধ। সে সভ্যতা বুর্জোয়া হবে-না সমাজবাদী হবে- সে প্রশ্ন ছিল গৌণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু পূর্বে ১৯৩৪ সাল থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশকে জার্মান ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে এক মৈত্রী জোট গঠনের জন্য আহবান জানিয়ে আসছিল। জওহরলাল নেহরুর মত দূরদর্শী নেতার নেতৃত্বে সোভিয়েত ফ্যাসীবাদ বিরোধী লীগ গঠন করেছিল। কিন্তু সোভিয়েতের সমস্ত আহবান অরণ্য রোদনে পরিণত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কুঁজো হয়ে পড়া বৃটেন এবং ফ্রান্স কোনোভাবেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। হয়ত তারা এরকমও ভেবেছিল যে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলে ফ্যাসীবাদ এবং কমিউনিজম-এই দুই শত্রুর কবল থেকে তারা নিস্তার পাবে। সেজন্যই হিটলারকে নিরন্তর তোষামোদ করা হয়েছে, একটার পর একটা দেশে অভিযান চালানো সত্ত্বেও তারা নীরব থেকেছে।

অবশেষে অবস্থা সঙ্গীন দেখে স্তালিন স্বয়ং হিটলারের সঙ্গে এক সন্ধিপত্রে সাক্ষর করেন। ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত হওয়া মলটভ-বিবেনট্রপ সন্ধি অনুসারে জার্মানী এবং রাশিয়া একে অপরকে আক্রমণ না করার ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। অবশ্য স্তালিন-হিটলার উভয়েই জানতেন যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সে কারণেই সন্ধি পর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত গতিতে যুদ্ধ-প্রস্তুতি চালিয়ে যায়। হাজার হাজার ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়, অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়, এরোপ্লেন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী কালে স্তালিনগ্রাদে জার্মানীর বিরুদ্ধে বিজয় হাসিল করার জন্য এই সন্ধি-পর্ব যে বিশেষ ভাবে জরুরি ছিল সেটা প্রমাণিত হয়।

সন্ধির দু’বছর পর ১৯৪১ সালের জুন মাসে জার্মানী রাশিয়া আক্রমণ করে। তারপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এক নতুন মাত্রা অর্জন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, বৃটেন,আমেরিকা প্রভৃতি দেশের মধ্যে অবশেষে ফ্যাসীবাদ বিরোধী এক মিত্রজোট গঠিত হয়।

ভারতীয় কমিউনিস্টরা এই সমগ্র সময় জুড়ে ফ্যাসীবাদের বিপদ সম্পর্কে তুমুল অভিযান চালিয়েছিল। এক্ষেত্রে তাদের বিশেষ বন্ধু ছিলেন নেহরু। দেখতে গেলে কমিউনিস্টরাই হিটলার সম্পর্কে ভারতীয় জনগণকে সচেতন করে তোলে। কিন্তু এর পর ভারতীয় কমিউনিস্টরা বিশ্ব ইতিহাসের এক কুটিল পাক চক্রে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়। অথচ ফ্যাসীবাদ বিরোধী মিত্রশক্তির যুদ্ধ তখন তুঙ্গে অবস্থান করছে। এই পর্বে অন্য একটি উপাদান যুক্ত হয়ঃ সে হচ্ছে জাপান, হিটলারের বন্ধু জাপান। Indivar Kamtekar নামের একজন অ-মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ‘Shiver of 1942’ শীর্ষক এক সাম্প্রতীক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে ১৯৪২-এর কালসীমা বস্তুত ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আবেগের বিপরীতে ভীষণ জাপান-ভীতির কাল ছিল। ভারত ছাড়ো আন্দোলন খুব তাড়াতাড়ি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ভয়ার্ত বৃটিশ সরকার আগের বিপরীতে এবার প্রথমেই সব কংগ্রেসী নেতাকে বন্দি করে বসে। আন্দোলন হয়ে পড়ে দিশাহারা। ফলে হিংসার বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা এই সময়ে সব চেয়ে বেশি ঘটতে দেখা যায়। সেই অনুসারে সরকারি দমনও ছিল অতি ভয়ানক রকমের। কয়েক মাসের মধ্যেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের যবনিকাপাত হয়।

এর বিপরীতে ১৯৪২এর পরবর্তী সময়কাল ছিল প্রচণ্ড জাপান-ভীতির সময়। জাপান কখন ভারত আক্রমণ করে, তার কোনও ঠিক নেই। কলকাতার ভদ্রলোকেরা বলতে শুরু করেঃ “ আমরা প্রথমে বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে লিখেছি, মুসলমান আসার পর ডান দিক থেকে বাঁয়ে লিখতে শিখলাম। এখন [জাপানী এলে] উপর থেকে নিচের দিকে লিখতে শিখতে হবে।” জাপানীর ভয়ে কলকাতা সহ  অন্যান্য শহর থেকে মানুষ দ্রুত পালাতে আরম্ভ করে। ইতিমধ্যেই জাপানীদের দখল করা রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি অঞ্চল থেকে হাজার হাজার ভারতীয় কলকাতায় এসে উপস্থিত হয়। তাদের মুখ থেকে স্থানীয় মানুষেরা জাপানীদের অপরাজেয়তা বিষয়ে ভীষণ গুজব-রটনা শুনতে পায়। মানুষের বিশ্বাস জন্মায় যে, বৃটিশ সাম্রাজ্যের ইতিমধ্যে পতন ঘটেছে।   

কিছু মজার ঘটনাও ঘটেছিল। বিভিন্ন চিড়িয়াখানার বাঘ, ভালুক প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগুলোকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল, কেননা জাপানী বোমা চিড়িয়াখানায় পড়লে বাঘ-ভালুক মুক্ত হয়ে শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করার সম্ভাবনা ছিল। এমনকি মাদ্রাজ, বোম্বের মত শহরগুলোতেও জাপানী ভীতি বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। শ্রমিকরা ফ্যাক্টরির কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল, দিল্লীর জিমখানা ক্লাবের সদস্যরা আধা মস্করা-আধা গম্ভীর ভাবে সাব্যস্ত করছিল – আমাদের এখুনি জাপানী শিখে ফেলাটা ভাল হবে কি? জাপানীরা ইতিমধ্যেই বঙ্গ সাগরে ১০০টিরও বেশি ছোটখাটো বৃটিশ জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। ভারতীয় অফিসারদের ভয় ছিল-জাপানীরা  কোনোভাবে স্থল পথের পরিবর্তে জলপথে এগিয়ে এলে বৃটিশ ভারতের পরাজয় নিশ্চিত কেননা ওই সময় বৃটিশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো পূর্ব আফ্রিকার কাছাকাছি অঞ্চলে ব্যস্ত ছিল।

...

ভারতের প্রতিবেশী দেশ চীনের বহুলাংশ ইতিমধ্যেই ১৯৩০এর দশক থেকেই জাপান অধিকার করে রেখেছিল। লক্ষ লক্ষ চীনা মানুষ জাপানীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছিল। বিচার করতে গেলে বৃটিশদের থেকেও হাজারগুণ ভয়াবহ ছিল জাপানীরা। বৃটিশরা অন্তত এক  উদারবাদী সংসদীয় পরম্পরায় বিশ্বাস করত। সেই গুণে ১৯০৯ সাল থেকেই নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিনিধি চয়ন করার  প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়েছিল। তার বিপরীতে জাপানী সৈন্যবাদ ছিল এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল তথা আক্রামক শাসনতন্ত্র। বৃটিশ অধিকৃত  ভারত এবং জাপান অধিকৃত চীনের তুলনা করলেই দুয়ের পার্থক্য বোঝা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জাপানের দখল করা অঞ্চলসমূহে কমিউনিস্টরাই কিন্তু  প্রতিরোধ সংগ্রামে অগ্রভাগ নিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের চীন বিপ্লবের অন্যতম কারণ ছিল জাপান-বিরোধী সংগ্রামে চীনা কমিউনিস্টদের ভূমিকা। ঠিক সেভাবেই, জাপানীদের বিরোধিতা করেই বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, জাভা, ফিলিপাইন্স ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৯৪২ সালে জাপানের ভারত-জয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল। জাপানীরা জয়ী হলে হয়ত কমিউনিস্টরাই জাপান-বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে জাপানীরা পরাজিত হয় এবং কমিউনিস্টরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য দেশ জুড়ে নিন্দিত হয়। ১৯৪৩ সালে কমিনটার্ন ভেঙ্গে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই কোনও আন্তর্জাতিক মঞ্চের দ্বারা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে প্রত্যক্ষ নির্দেশ দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ  হয়। এই নীতি গ্রহণ করা হয় যে কোনও একটি দেশের পার্টি কী ধরনের রণনীতি পালন করবে তা সে দেশের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব নিজেই স্থির করবে।

...

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আত্মসমালোচনা করে এই কথাই বলল যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া উচিত হয়নি। এই বিষয়ে আমাদেরও নিজস্ব কিছু মন্তব্য আছে, তবে তার আগে হিন্দুত্ববাদীরা বিশ্বযুদ্ধের সময় কী ভূমিকা নিয়েছিল দেখা যাক। হিন্দু মহাসভার মত সংগঠন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে বৃটিশ সরকারের সমর্থনে দাঁড়ালো। সরকার যুক্তি দিল-এই সময় যতটা সম্ভব হিন্দুদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া প্রয়োজন যাতে পরবর্তীতে মুসলমানের সাথে ভাল করে যুদ্ধ করা যায়। একই সময়ে তারা আবার ক্ষমতার লোভে তিনটি প্রদেশে-বঙ্গ, সিন্ধ এবং উত্তর পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলে সরকারও গঠন করল।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ১৯৪২এর সময় কালে নিজেদের ভূমিকার সমালোচনা করে এসেছে, কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা ১৯৪২এ নিজেদের ভূমিকা বিষয়ে কোনো সমালোচনা করার কথা আজ পর্যন্ত আমাদের কর্ণগোচর হয়নি। তারা বরং এই কথাটা চেপে রাখতেই  সচেষ্ট। ১৯৪২ সালে হিন্দুত্ববাদী ও সাম্যবাদী-উভয় মতাদর্শের মানুষেরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করেনি। কিন্তু উভয়ের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন ছিল। কার উদ্দেশ্য মহান ছিল-পাঠক নিজেই বিচার করবেন।

ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের মনে হয় ১৯৪২ সালে জাপান জয়ী হবে কি হবে না সে বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থা কোনও পক্ষেরই ছিল না। ইতিমধ্যেই পূর্ব এশিয়ার সমস্ত অঞ্চল জাপান দখল করে নিয়েছিল। অন্যদিকে বৃটেনকে বাদ দিয়ে সমগ্র ইউরোপ হিটলারের দখলে ছিল। সে হিসেবে বিচার করলে এমন ধারণা হয় যে ওই সময় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঘোষণা এক ভুল ঘোষণা  ছিল। কমিউনিস্টদের পার্টি লাইন কোনো সোভিয়েত রাশিয়ার দালালি করার জন্য নির্মিত হয়নি, প্রকৃতার্থে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে তাদের লোকসানই বেশি হয়েছিল। কিন্তু যখন বিশ্বে আপনার সম্মুখে ‘ফ্যাসীবাদ বনাম মানব সভ্যতা’ এই দ্বি-চয়ন সৃষ্টি হয়েছিল সেক্ষেত্রে বৃটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করাটাই উত্তম ছিল। আজ বহু বছর অতিক্রম করে এসে কমিউনিস্টদের সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু সেই সময়ের পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখলে আপনিও হয়ত এই ধরনের সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতেন।

একটা কথা ঠিক যে কমিউনিস্টরা কোন সংকীর্ণ অর্থে জাতীয়তাবাদী নয়। তাদের দৃষ্টি সব সময় বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে নিবদ্ধ থাকে। কখনো তাদের ভুল হতেই পারে, হয়েছেও। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের মূলে থাকা নীতিগুলোকে আমাদের সম্মান জানাতেই হবে। মনে রাখা ভালো, বিশ্বকে ফ্যাসীবাদ-মুক্ত করার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা কিন্তু স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধই নিয়েছিল। ফ্যসীবাদীদের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বে কমিউনিস্টরাই সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল। সমগ্র পূর্ব ইউরোপ, অ্যালবেনিয়া, য়ুগোস্লাভিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে কমিউনিস্ট বিজয়ের অন্তরালে জার্মানী-জাপান বিরোধী কমিউনিস্ট প্রতিরোধ সংগ্রামের ভূমিকাই ছিল। ইতালি, ফ্রান্স, গ্রীস ইত্যাদি দেশে জার্মানীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার সুনামের দরুণ কমিউনিস্ট দলগুলো ব্যাপক গণভিত্তি থাকা দলে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব এশিয়ার  বিভিন্ন দেশে-বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতিতে কমিউনিস্ট দল সংগঠনের ... ভিত তৈরি হয়েছিল জাপান বিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের উদ্যোগীকরণের প্রয়োজনে পুঁজি এবং যন্ত্রপাতি/মেশিন সস্তায় যোগান দিয়েছিল সোভিয়েত  ইউনিয়ন-ই। কমিউনিস্টদের বিভিন্ন কারণবশত সমালোচনা করা যায় নিশ্চয়, কিন্তু তাই বলে তাদের দেশ-বিরোধী আখ্যা দেওয়া হাস্যকর বইকি!         

 

  

                   

অ-ধার্মিকের ধর্মকথা








“Religion, a medieval form of unreason, when combined with modern weaponry becomes a real threat to our freedoms” ~ Salman Rushdie. 

ধর্মযুদ্ধ ! 

শব্দটা বেশ ধন্দ জাগানিয়া। ধর্ম শব্দটা কর্ণগোচর হওয়া মাত্র আমাদের মনে ঈশ্বর-আল্লা-গড হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-মুসলমান-শিখ-ইসাই থেকে শুরু করে বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-কোরআন-ত্রিপিটক-জেন্দআবেস্তা-গ্রন্থসাহেব সহ নানা শাস্ত্র, আচার-বিচার মন্দির-মসজিদ-গীর্জা ইত্যাদি বহু কিছু মনে এলেও কোনও ভাবে কোনও কারণেই যুদ্ধের কথা মাথায় আসে না। অথচ ‘ধর্মযুদ্ধ’ কথাটা আমাদের মস্তিষ্কে সেই কোন কাল থেকে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে ! সামাজিক মানুষ কিন্তু সাধারণত ও স্বভাবত যুদ্ধবিরোধী। কিন্তু ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে ধর্মের নামে যুদ্ধকে নির্বিরোধ মানুষের কাছে গ্রহণীয় করে তোলার প্রয়াস হয়েছে, আজও হয়, হচ্ছে। মহাভারতেও আমরা দেখি যে জ্ঞাতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গররাজি অর্জুনকে প্রভাবিত করতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম কথা শোনাচ্ছেন, ধর্মের পাঠ পড়াচ্ছেন। এও দেখা গেছে, বিশেষ প্রেক্ষিতে মানুষ এমন কি ধর্মের খাতিরে নিজের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতেও পিছপা হয় না। একবিংশ শতাব্দীতেও তা আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি, দেশে-বিদেশে। এ থেকে এটাই সপ্রমাণিত যে ধর্মকে আম আদমি সমধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় মানুষকে স্বভাব-বিরুদ্ধ কাজে নিয়োজিত কিংবা অবস্থান গ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয় সে এক ধন্দ। 

ধর্ম কী ? এ প্রশ্নের কোনো সহজ সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর বিদ্বজ্জনের কাছেও পাওয়া যাবে না। জলের ধর্ম আগুন বা বাতাসের ধর্ম ইত্যাদি বলতে আমরা যা বুঝি আর আমরা যে ধর্ম নিয়ে কথা বলছি তা, বলা বাহুল্য, এক নয়। প্রথম ক্ষেত্রে ধর্ম বলতে ইংরেজি ‘প্রোপার্টি’ (property) শব্দটি বুঝি এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ধর্ম বলতে ‘রিলিজিয়ন’ (religion) বোঝানো হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের ধারণায় ধর্ম বলতে এক ধরনের প্রশ্নহীন বিশ্বাস ও আনুগত্য বিরাজ করে। ধর্ম তাদের কাছে ‘অবশ্য পালনীয়’ এক কর্তব্য। মজার কথা হচ্ছে ধর্ম ঠিক এই বস্তুটিই দাবি করে। কেবল দাবি করে না, আদায়ও করে নেয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বহুক্ষেত্রে ধর্মের দাবিকে হাজির করা হয়ে থাকে ‘সাংস্কৃতিক নির্দেশাবলী’ (cultural instructions) হিসেবে। আরো কৌতুকজনক ব্যাপার হচ্ছে সামাজিক জীবনযাপনে ধর্মের আপাত হিতকর নির্দেশসমূহ প্রতিদিন লঙ্ঘিত হতে দেখেও, সাধারণ বয়ানে যা ‘অ-ধর্ম’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, কেউ বিশেষ বিচলিত হয় না। অর্থাৎ ধর্মের প্রচারিত কেতাবি ও নৈতিক(!) বিষয়গুলি উপেক্ষিত হয়ে থাকে, হতে থাকে। সব দেশে, সব ধর্মেই। ধর্ম-পালন সীমিত থাকে আচারসর্বস্বতায়, এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও শীতল যুদ্ধের মধ্যেই। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিবিধ কৌশলে অবস্থাটি টিকিয়ে রাখে। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ কথাটা যে বলা হয় সে ধর্মের এই সর্বব্যাপী এবং সর্বগ্রাসী বিস্তারের কারণেই। 

ধর্মীয় রীতিনীতি ও অনুশাসনের বিরোধিতা যে মানুষের সমাজে দেখা যায় না সেও নয়। সময়ে সময়ে তাই ধর্মীয় সংস্কারেরও প্রয়োজন পড়ে। অন্তর্গত বিরোধের ফলে পৃথক শাখা-সংগঠন তৈরি হয়, যেমন-মহাযান-হীনযান, ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান্ট ইত্যাদি। সামগ্রিক ভাবে ধর্মকে নাকচ করার প্রবণতাও অবর্তমান নয়। বিভিন্ন সমীক্ষকদের সমীক্ষায় এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে নাস্তিকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান এরকম ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির দরুণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিশেষ ক্ষতি হয়নি। বরং হালে গোটা বিশ্ব জুড়ে এক অস্বাস্থ্যকর ধর্মীয় উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ধর্মের নামে মারামারি-হানাহানি এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে বললেও একটুও বাড়িয়ে বলা হয় না। মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশে নাস্তিক ব্লগারদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড তার দৃষ্টান্ত। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ এই ভারতবর্ষেও ইদানীং একই ঘটনা ঘটতে দেখেছি আমরা। এক অসহিষ্ণু বাতাবরণ সৃষ্টির প্রাণান্তকর প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ সহিষ্ণুতা নাকি ধর্মের অন্তর্বস্তু, যা ধারণ করে তাই নাকি ধর্ম -এমন কথা অহরহ শুনতে পাওয়া যায়। মানে গেলানো হয়ে থাকে আর কি! কিন্তু ধৃ-ধাতু থেকে জাত ধর্ম শব্দটি যে কোন ধাতুতে গড়া সেটা মালুম হয় যখন দেখি যে মানবতাবিরোধী যুদ্ধকেও সে আলিঙ্গন করে নেয় অবলীলায়, অকাতরে। এযাবৎ পৃথিবীতে ধর্মযুদ্ধে (crusade) যে পরিমাণ রক্তপাত ঘটেছে অন্য সব যুদ্ধেও নাকি সে পরিমাণ রক্তক্ষয় হয় নি! এজাতীয় উচ্চারণ জ্ঞানী-গুণী জনের মুখ থেকেই নিঃসৃত হতে দেখা যায়। 

ধর্মযুদ্ধ, মানে ক্রুসেড থেকে হালের ৯/১১ পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এগুলোর মূলে ছিল বিশাল ষড়যন্ত্র, স্বার্থের সংঘাত। প্রথম ক্রুসেডের (১০৯৬-১১১২) কথাই যদি ধরা যায় তাহলে আমরা দেখব যে সে সময় সে যুদ্ধের প্রভাব জীবন ও সমাজে কতটা মারাত্মক ও সর্বগ্রাসী হয়ে পড়েছিল। ‘পবিত্র যুদ্ধের’ মোহে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয়েছে বুদ্ধিজীবীদেরও। শিল্প-সাহিত্যেও সে প্রভাবের ছাপ রয়ে গেছে। ‘পবিত্র ভূমি’ রক্ষার যুদ্ধে যোগদান না করার বা সামিল না হওয়ার একমাত্র পরিণতি ছিল সামাজিক ভাবে বর্জিত হওয়া, শাস্তিও প্রাপ্য ছিল। ‘হোলি ক্রস’ বহন করে যারা যুদ্ধে সামিল হয়েছে তাদের মোক্ষলাভ যে সুনিশ্চিত সেই মোক্ষম বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল সর্বাগ্রে, সর্বস্তরে। কেবল তাই নয়, আধ্যাত্মিক মুক্তির এই প্রলোভনের সমান্তরালে ছিল ইহজাগতিক পুরস্কারের বন্দোবস্তও। যেমন ঋণ মকুব, বকেয়া সুদ মাফ এবং এমন কি পূর্বের জঘন্য অপরাধের জন্য প্রাপ্ত শাস্তি মকুব কিংবা লঘু-দণ্ডের জন্য পৃথক বিচারশালার ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল। লঘু পাপে গুরু দণ্ড হয় শুনেছি, কিন্তু গুরু পাপে লঘু দণ্ডের নীতি গ্রাহ্য হয়েছিল কেবল ‘পবিত্র ভূমি’ রক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে নেওয়ার অন্যতম শর্তে। এর পেছনে যে সক্রিয় রাজনীতি ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সূক্ষ্ম রাজনৈতিক খেলা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ইদানীং কালের ইরাক যুদ্ধেও। মারণাস্ত্র খোঁজার অছিলায় জঘন্য এক ষড়যন্ত্রকে ‘অনন্ত ন্যায়ের যুদ্ধ’ নাম দেওয়া হয়েছিল। নির্বিচারে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে জনপদ, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সমূহ। মারণাস্ত্রের বিরোধিতার অছিলায় ব্যবহৃত হয়েছে সাংঘাতিক সব মারণাস্ত্র। অথচ আজ আর কারো অজানা নেই যে weapons of mass destruction- এর হদিশ পাওয়া যায়নি। শুধু মাত্র প্রোপাগাণ্ডার জোরে কী করে একটা মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায় এ তার উৎকৃষ্ট এবং সাম্প্রতীক উদাহরণ। ভাবুন তো, গোটা বিশ্বের তাবৎ বুদ্ধিমানেরা কত সহজেই না বশীভূত হয়েছিল সে অপপ্রচারে ! ধর্মের কাজই হচ্ছে মিথ্যার বেসাতি। এখানেই খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে Robert Pirsig-এর মন্তব্য -"when one person suffers from a delusion it is called insanity. When many people suffer from a delusion it is called religion." 

এগুলো আমরা জানি, কেবল ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে নয়, আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেও জানি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যুক্তি-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে কেন মানুষ এরকম স্রোতে গা ভাসায়! কীভাবে তা সম্ভব হয়! কেবল প্রোপাগাণ্ডার ফলে সাময়িক ভাবে একটা সময় জুড়ে তা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস তো সাময়িক ঘটনার নয়, দীর্ঘ সময়সীমা জুড়ে তার ব্যাপ্তি ও বিস্তার। একটু আগের দৃষ্টান্তে (অনন্ত ন্যায়ের যুদ্ধ) ‘অনন্ত’ শব্দটির ব্যবহার তার দীর্ঘসূত্রিতা, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাকেই কি সূচিত করে না ? ‘ন্যায়ের’ (জন্য) যুদ্ধ কথাটার মাধ্যমে ‘অন্যায়’ যুদ্ধকে বৈধতা দেবার প্রয়াস কি একান্ত গোপন ? ধর্ম ও ন্যায়, ন্যায়ধর্ম ইত্যাদি শব্দগুলো সব গুলিয়ে যায়, মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায় সবকিছু। অথচ ধর্মের সঙ্গে নৈতিকতার কিন্তু আসলেই কোনও সম্পর্ক নেই। সততার জন্য ঈশ্বর কিংবা ধর্মের প্রয়োজনও নেই। ‘ঈশ্বর নেই’ এই বার্তা রটে গেলে মানুষ খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধে ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন হাস্যকর যুক্তি কেউ খাঁড়া করতে উৎসাহী হবেন না নিশ্চয়! তা সত্ত্বেও ধর্ম যে চিন্তাশীল মগজকেও শর্তাধীন পরাবর্তের অধীন করে ফেলে সে তো স্পষ্ট। কিন্তু কীভাবে, কোন বিশেষ প্রক্রিয়ায় তা বোঝা দরকার, অন্তত বোঝার প্রয়াস জারি রাখা জরুরি। নতুবা সে বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসা দুষ্কর। 

ধর্ম আসলে এক দুরারোগ্য ব্যাধি। ধর্মাক্রান্ত মানুষ মাত্রেই অবশ্য নষ্ট কিংবা ভ্রষ্ট নয়। অসুস্থ মাত্র। র‍্যাবিড (Rabid) –জলাতঙ্ক রোগীর স্নায়ুতন্ত্র যেমন বিশৃঙ্খল ভাবে ক্রিয়া করে ধর্মাক্রান্ত মানুষও ঠিক তেমনি অসংযত অস্বাভাবিক আচরণ করে। অবশ্য তার বিবিধ স্তর এবং মাত্রা বর্তমান। এটা অনস্বীকার্য যে যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধর্মের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, হতে বাধ্য। Craig A James তাঁর বিখ্যাত বই The Religion Virus-এ মানবমনের ওপর ধর্মের প্রভাব ও আধিপত্য বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের সমাজে ধর্মের উৎপত্তি তথা বিভিন্ন ধারণা ও বিশ্বাসের জন্ম এবং প্রচার প্রসার নিয়ে চিন্তা-চর্চা গবেষণার অন্ত নেই। স্পিনোজা থেকে ভলতেয়ার, ফুয়েরবাক থেকে মার্ক্স পর্যন্ত অনেকেই ধর্ম নিয়ে এবং সমাজে এর ভূমিকা নিয়ে ভেবেছেন কিন্তু Richard Dwakins-এর ‘The God Delusion’ ও ‘Viruses of The Mind’ রচনার আগে জৈববৈজ্ঞানিকভাবে ধর্মের মডেলকে এত পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায়নি, বোঝা যায়নি কিভাবে এটি এপিডেমিওলজির প্রেক্ষাপটে অনেকটা ফ্লু-ভাইরাসের মতোই মানুষকে সংক্রমিত করে। এই বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী তাঁর রচিত ‘The Selfish Gene’ গ্রন্থে চিন্তা উদ্রেককারী বহু তথ্য ও তত্ত্ব পেশ করেছেন, যা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও অবহেলার উপায় নেই কোনো। 

ভাইরাস হচ্ছে এক ধরনের জীবাণু, যে নিজের খাদ্য তৈরি করতে পারে না, অন্য কোন প্রাণীদেহের আশ্রয় (Host) অবিহনে বাঁচতে পারে না ও বংশ বিস্তার করতে পারে না। প্রাণী দেহের বাইরের ভাইরাস আসলে নিরেট বস্তুপিণ্ড, জড় পদার্থ মাত্র। মাইক্রোবায়োলজির বইতে তাই ভাইরাস না-সজীব না-নির্জীব হিসেবেই বর্ণিত। অন্য প্রাণীর আশ্রয়েই ভাইরাস সজীব, তার বাইরে সে নির্জীব। ধর্মগ্রন্থ গুলো যেমন, যে কোনও গ্রন্থাগারের তাকে হাজার হাজার গ্রন্থের সারিতে তার আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, নেহাত নিরুপদ্রব গ্রন্থ মাত্র -যার নিজস্ব ক্ষমতা কিংবা স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। ধর্মেরও ঠিক ভাইরাসের মত হোস্ট-এর, অর্থাৎ একদল বিশ্বাসী, অনুগামীর আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া ধর্ম টিকে থাকতে পারে না, তার বৃদ্ধি ও প্রসার ঘটে না। ভাইরাস জীবকোষে প্রবেশ করে কোষ থেকেই বাঁচার রসদ সংগ্রহ করে, বংশবৃদ্ধি করে এবং আস্তে আস্তে কোষের দখল নেয়। জীবকোষের স্বাভাবিক ক্রিয়া বিনষ্ট হয় ও ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণে অস্বাভাবিক ক্রিয়া করতে আরম্ভ করে। মানুষের মস্তিষ্ক যখন যুক্তিহীন (ধর্ম)বিশ্বাসের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় তখনও সেই একই ব্যাপার ঘটে। কর্মের কর্তা হিসেবে মানুষ তার স্বাধীন কর্তৃত্ব হারিয়ে বসে। শুধু তাই নয়, সে যে বাস্তবে দাসসুলভ আচরণ করছে সে সম্পর্কে ধারণাও করতে পারে না। ধর্মীয় অনুশাসন, বিধিনিষেধ ইত্যাদি মগজে অনির্দিষ্ট কার্ফু জারি করে। 

বিভিন্ন জীবাণু যেমন পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার চেষ্টা করে ধর্মও ঠিক তেমনি অপর ধর্মের সঙ্গে অনাবশ্যক প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়। ধর্মের ধ্বজাধারীরা তাই নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন ও প্রচার করার জন্য যা কিছু করতে সচেষ্ট থাকে। ধর্মকে জীবনযাপনের পদ্ধতি নতুবা সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে। আমরা এইচ আই ভি-র (Human Immuno-deficiency Virus) কথা সবাই জানি। এইচ আই ভি শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষ করে দিয়ে শরীর-সংগঠনকে ভেঙ্গে দেয় ও ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ধর্মও ঠিক একই প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধি চিন্তা-চর্চার মানসিক-মানবিক প্রতিরোধ পদ্ধতি নিঃশেষ করে দিয়ে সামাজিক সংগঠনকে বিস্রস্ত বিশৃঙ্খল করে ফেলে। সে অর্থে ধর্মও আসলে আরেক এইচ আই ভি – Human Invented Virus । এই কারণেই ধর্মীয় আচার স্বরূপ নৃশংস বলি-প্রথা, কুরবানি ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক ন্যায্যতা লাভ করে। ধর্মের সন্ত্রাস কায়েম করে দশ জনের চোখের সামনে একজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটানো সম্ভব হয়। নেলী কিংবা গুজরাটের মত হত্যালীলা ঘটতে পারে। কয়েক শ’ মানুষের হত্যালীলা কয়েক হাজার মানুষ ঠেকাতে পারে না, নির্লিপ্ত ভাবে প্রত্যক্ষ করে কেবল। 

‘ধর্ম জানে, প্রতারণা করি নাই’ উচ্চারণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রতারণার মারাত্মক বীজ। ভাইরাসের সংক্রমণে সাধারণত দুরকমের ফল দেখা দিতে পারে। প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, এইচ আই ভি-র সংক্রমণে যেমন এইডস (Aquired Immuno Deficiency Syndrome) দেখা দেয়। আবার এমনও হয় যে শরীরে এইচ আই ভি রয়েছে অথচ রোগের কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। এরা হচ্ছে বাহক (carrier), এরা জেনে অথবা না-জেনে বীজাণুটিকে অন্যের শরীরে ছড়িয়ে দেবার কাজ করে চলে। রোগের কষ্ট অনুভব করতে হয় না বলে নিজেদের এরা সুস্থ মনে করে। ধর্মবিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। রোগের লক্ষণ তীব্র ভাবে প্রকাশ পেলে ধর্মীয় সন্ত্রাসের জন্ম হয়। আরেক দল ‘বাহক’ হয়ে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ছড়ায় সমাজদেহে, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। এদের ‘নিরাপদ শান্তিপ্রিয়’ মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে তা নয়, যেহেতু অবস্থাটি স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয় কখনোই। প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেলে একজন বাহকের শরীরেও রোগ-লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। ঠিক তেমনি আপাতভাবে শান্তিপ্রিয় ‘ধার্মিক’ মানুষটিও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদী বনে যেতে পারে অনায়াসে। কারো কারো শরীরে অবশ্য সারা জীবনেও রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। 

অর্থাৎ, এটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বাইরে থেকে কিছু টের পাওয়া না গেলেও ভাইরাস-আক্রান্ত কোষটিতে এক বিরামহীন যুদ্ধ চলতে থাকে। সমূহ শরীরতন্ত্র বিকল হয়ে পড়লে তবেই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নজরে আসে, বিধ্বস্ত চেহারা স্পষ্ট হয়। ধর্মের ভূমিকাও তদ্রূপ, ধর্মযুদ্ধ (!) ঘোষিত হবার পর যে ভয়ানক ও বীভৎস রূপ আমাদের অভিজ্ঞতায় ধরা দেয় তার প্রেক্ষাপট কিন্তু তৈরি হয়, হয়েছে যুগ যুগ ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে। মানুষের মগজ দখলের জন্য, মানব সমাজের গঠনতন্ত্রকে বিশৃঙ্খল করে দেবার লক্ষ্যে ধর্ম-বিশ্বাসের এই চোরাগোপ্তা হামলা চলতেই থাকে –নিয়ত, নিরন্তর। হালের গবেষণায় এটা প্রতিপন্ন হয়েছে যে শারীরিক প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটলে ‘আচরণগত বিশৃঙ্খলা’ও (Behavioural disorder) দেখা দিতে পারে। ‘অটিজম’ (autism) তার দৃষ্টান্ত। এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ আপাতত নেই। ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠায় আমরা ‘ধর্মযুদ্ধের’ বিবরণ পাঠ করি বটে, কিন্তু অন্তর্গত যুদ্ধের এই দীর্ঘ ও বিরামহীন বর্ণনা কিংবা ইতিহাস লেখা হয় না কোথাও। কিংবা, যেখানে যেভাবে লেখা থাকে সে ইতিবৃত্তের পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় না আমাদের পক্ষে। আমাদের উপলব্ধিতে তার নাগাল পাওয়া যায় না, মেলে না হদিশ। 

যুদ্ধের মূলে থাকে দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার। প্রথমিক স্তরে যা প্রতিযোগিতা হিসাবে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার মূলে থাকে সম্প্রসারণবাদ। আর প্রতিযোগিতার, সম্প্রসারণবাদের চরম ও চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে যুদ্ধ। কিন্তু মানুষের সমাজের, মানবিক সমাজের মূল ভিত্তি প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা। কাজেই যুদ্ধ স্বাভাবিক নয়, হতে পারে না, ধর্মযুদ্ধও না। রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, তখনই যুদ্ধের মহড়া শুরু হয়। আর অন্যায় অনৈতিক যুদ্ধকে ‘ধর্মযুদ্ধের’ মোড়কে হাজির করা গেলে আর কী চাই! কিন্তু মানুষের ধর্ম হচ্ছে মানবিকতা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই মানব-ধর্ম। ধর্মের নামে যুদ্ধের বিরুদ্ধেও। সহযোগিতার বর্মে আচ্ছাদিত হয়ে ধর্মকারার প্রাচীরে ব্জ্রাঘাত করা তাই জরুরি। যুদ্ধের উন্মাদনা থেকে বাঁচতে ও পৃথিবীকে বাঁচাতে একজোট হয়ে ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণাই আমাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আর সে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং উপযুক্ত হাতিয়ার হচ্ছে যুক্তি ও মানবিকতা। যুক্তিহীন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাই কামান দাগা চাই। তবে তারও আগে বিশ্বাসের শেকড় কী করে মননের ভিত ধ্বসিয়ে দেয় সেই প্রক্রিয়াটিকে বুঝতে হবে । নিরেট নাস্তিকতা দিয়ে তা বোঝা যাবে না, সেও মনে রাখা চাই। 

সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে বিভিন্ন প্রথা কিংবা বিশ্বাসের (ধর্মবিশ্বাসও যার অন্তর্ভুক্ত) শিকার হয়ে মানুষ সংঘটিত করেছে নৃশংস সব হত্যালীলা। ইতিহাসের পাতায় তার অজস্র-অসংখ্য বীভৎস দৃষ্টান্ত ছড়ানো। ডাইনি হত্যা থেকে শুরু করে ধর্মযুদ্ধের নামে চলা এইসব হত্যালীলার মূলে কিন্তু কোন-না-কোন বিশ্বাস, এবং বলা অহেতুক, এই বিশ্বাসের ভাইরাস আণবিক বোমার চেয়ে কোনো অংশে কম মারাত্মক, কম বিধ্বংসী নয়। জরুরি নয় যে কথাগুলো কেবল ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জাতীয়তাবাদ থেকে সন্ত্রাসবাদ, গণতন্ত্র থেকে মার্ক্সবাদ সর্বত্রই তর্ক-বিমুখ ‘বিশ্বাসে বশীভূত’ মানুষের সংখ্যা অসংখ্য, অগণন। আমাদের চারপাশে চোখ ঘোরালেও তার নজির পাওয়া যাবে। এটি একটি প্রক্রিয়া। বিজ্ঞাপনের জারিজুরিতে মানুষ যেমন ফর্সা হওয়ার ক্রীম কেনে এও তেমনি। ধর্ম সমেত যে-কোন ভ্রান্ত ধারণা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। বর্তমান জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তথা প্রবণতার প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে সামাজিক ভাবে সচেতন হওয়া যে খুব জরুরি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের’ প্রস্তুতি চাই। এসময়ের এটাই দাবি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই এই ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়া চাই।

ব্লগ সংরক্ষাণাগার