(প্রসঙ্গঃ লুক ইস্ট পলিসি)
ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ড উত্তরপূর্বকে যথেষ্ট কিংবা ন্যায্য গুরুত্ব দেয় না এমন অভিযোগ বহু দিনের। ‘কেন্দ্রৰ বৈষম্য’ জাতীয়তাবাদী চিন্তাচর্চায় এক মুখ্য ও অনিবার্য আলোচ্য বিষয়। অনেকটা বরাক উপত্যকায় ‘দিসপুরের বিমাতৃসুলভ আচরণ’ গোছের মনস্তত্ত্ব বর্তমান রয়েছে এর গভীরে। একেবারে অযৌক্তিক অথবা অসঙ্গতও বলা যাবে না একে। এই সেদিনও, উত্তর ভারতে, বিশেষত দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উত্তরপূর্বের যুবক-যুবতীকে ‘চিঙ্কি’ বলে চিহ্নিত ও হেনস্থার শিকার হতে দেখা গেছে। কেন্দ্র-প্রান্তের সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতার এক বোধ সক্রিয় রয়েছে। আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত, উভয়ক্ষেত্রেই, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তরপূর্বের সাদৃশ্যের চাইতে বৈসাদৃশ্য বহুলাংশে দৃশ্যমান। ফলে সামাজিক মানসিকতায় ‘অপরতা’ ফুটে ওঠে অনায়াসে। রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসও অতএব প্রচার এবং প্রশ্রয়ের সুযোগ ও পথ খুঁজে পায় অবলীলায়। কেন্দ্রীয় দৃষ্টিতে এগুলো বহুদিন পর্যন্ত ‘আইনশৃঙ্খলা’ (law & order) জনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে এবং অঞ্চলটি ‘উপদ্রুত প্রান্ত’ হিসেবে প্রশ্রয়ও পেয়েছে যতদিন না রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরকম এক বাস্তবতায় ১৯৯০ সালে ‘পূবে তাকাও’ (look east)নীতি গৃহীত হয়। মূলত দুটো কারণে। এক, প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর প্রাচুর্য এবং দুই, গণমানসে ধারাবাহিক ‘বঞ্চনা’ জনিত চরম ক্ষোভ।
লুক ইস্ট পলিসির উদ্ভবের মূলে ছিল পূর্বীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অধিক পরিমাণে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও আদান-প্রদানে নিয়োজিত হওয়ার উচ্চাশা। বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, নয়া উদারতাবাদ ইত্যাদি ইতোমধ্যেই তার যথার্থ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। ভারতীয় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সংযুক্তির প্রশ্নে উত্তর পূর্বাঞ্চল বাণিজ্যিক ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে প্রতীয়মান হল। দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ‘এক ঢিলে দুই শিকারের’ এ হেন সস্তা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেন-ই বা কী করে! সরল অঙ্ক কষে বোঝানো গেল যে যোগাযোগ ব্যবস্থার (সড়ক, রেল, আকাশ ও সমুদ্রপথ) উন্নতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের জোয়ার বইবে ও রোজগারের পথ প্রশস্ত হবে। বঞ্চনার ক্ষোভ যাবে ধুয়ে মুছে, ফলে সন্ত্রাসেরও চিরসমাপ্তি ঘটবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামোর উন্নতির ফলে ইতিবাচক প্রভাবের ধারণা ও সম্ভাবনা অমূলক নয় যদিও উত্তরপূর্বের প্রেক্ষিতে ততটা সরলও নয়, বরং বিবিধ জটিলতাপূর্ণ। তাই সে সম্ভাবনা কতটা আশাব্যঞ্জক একটু যাচাই করা যেতেই পারে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে উত্তরপূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ বস্তুত এই লুক ইস্ট নীতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
বর্তমান সরকার ‘পূবে তাকাও’ (look east) নীতির অনুক্রমেই তড়িঘড়ি করে ‘পূর্ব বিহিত’ (act east) নীতি ঘোষণা করে এমন এক সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভরকেন্দ্র এশিয়ায় স্থানান্তরের (Pivot to Asia) ঘোষণা দিচ্ছে। ঘটনাটি বস্তুতই তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্বপ্রান্তের প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন, কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ সমূহ সহ সুদূর পূর্বপ্রান্তীয় দেশ, যেমন, জাপান ও ভিয়েতনামের সাথে প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে বলা চলে। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে, লুক ইস্ট পলিসি কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণেই শুধু নয়, সামরিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
মোটাদাগের সরলরৈখিক ভাবনায় এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে বাজারে প্রবেশাধিকার পেলে ‘বঞ্চনা’ জনিত ক্ষোভ প্রশমিত হবে ও শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির চাকা তরতর করে ঘুরবে। এই তত্ত্বের সফল প্রয়োগ তখনই সম্ভব যদি না জনগোষ্ঠী সমূহের এই প্রকল্পে যোগদান সর্বাত্মক হয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এই সেতুবন্ধনের উপযুক্ত পরিসর অনুপস্থিত এবং তা গড়ে তোলার যথার্থ প্রচেষ্টা দিল্লির তরফেও সেভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জাতিগোষ্ঠী সমূহের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করা যায়, যেখানে জাতিসত্তাগুলোর দাবিদাওয়া সমূহ বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তো নয়ই, বরং প্রাক-বাজার যুগের, তবেই ফাঁক-ফোকর গুলো স্পষ্ট ধরা পড়বে। দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও সংযুক্তি বলা বাহুল্য দিল্লির নীতিবাগীশদের জন্য আহ্লাদের কারণ। কিন্তু নীতির শর্তাবলী যদি উত্তরপূর্বাঞ্চলের জাতিসত্তার সহমতের ভিত্তিতে স্থিরীকৃত না হয় তাহলে পথ প্রশস্ত হওয়ার পরিবর্তে কানাগলিতে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেবার নয়। উত্তর পূর্বের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে। আহ্লাদের বিপরীতে অপর পক্ষে আশঙ্কার কারণ ঘটেছে। মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে রেললাইন বিস্তারের বিরোধিতা তার জ্যান্ত দৃষ্টান্ত।
প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও নিষ্কাশনের প্রশ্নে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন জাতিসত্তা বরাবর প্রতিরোধী অবস্থানে থেকেছে। আশির দশকের ‘তেজ দিম, তেল নিদিম’ শ্লোগান এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতেই পারে। যোগাযোগের বিস্তৃতি এবং প্রসারের ফলে শ্রমের বাজারে অনিবার্য প্রভাব পড়বে এবং প্রব্রজনের প্রবাহও নিশ্চিত বৃদ্ধি পাবে। বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে প্রব্রজন কেন্দ্রিক রাজনীতি এতদঞ্চলে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে, আসছে। ‘নাগরিকপঞ্জি নবীকরণ প্রক্রিয়া’ সমাপ্ত হলে ‘নাগরিক অধিকার বঞ্চিত’ তথাকথিত বিদেশির (?বাংলাদেশি) এক বিপুল সংখ্যা নিশ্চিতই ‘সস্তা শ্রম’ হিসেবে পুঁজির উদরপূর্তির সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বর্ধিত মাত্রায় প্রব্রজনের আশঙ্কার দরুণ ‘খিলঞ্জিয়া’র অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনও দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই দুশ্চিন্তার বিষয়টি সিনেমার মত জনপ্রিয় মাধ্যমেও উঠে এসেছে। সম্প্রতি মণিপুরি একটি ফিল্মে, 2023 Century, দেখানো হয়েছে যে ভবিষ্যতের মণিপুরি সমাজে অভিবাসী অ-মণিপুরিরাই নির্ণায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ। ইনার লাইন পারমিটের কথাও তাই উঠছে। আই এল পি (ILP)বস্তুত পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক সাময়িক সন্ধিপত্র মাত্র, অন্য ক্ষেত্রে, জমির অধিকার ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে গোষ্ঠীগুলো যুযুধান পক্ষ। ব্রিটিশ আমলে আই এল পি চালু হয়েছিল পুঁজি ও প্রাক-পুঁজি পৃথকীকরণের স্বার্থে ও নিয়ন্ত্রণ-অসাধ্য ‘অসভ্য’ এলাকা চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে। উপনিবেশোত্তর উদার পরিকল্পনায়, যেমন ভাবা গিয়েছিল, এই বিভাজন দূর হওয়ার পরিবর্তে বরং আরো দৃঢ় হয়েছে যার ফলে আই এল পি দাবির মধ্যে অনগ্রসর জাতিসত্তাগুলোর তরফে ‘অপরতা’ অটুট রাখার প্রতিধ্বনিই শোনা যাচ্ছে।
লক্ষনীয় যে, এই জাতীয় দাবি উত্থাপনের ফলে ভারতীয় রাষ্ট্রের অথবা তার সংগে সংযুক্ত পুঁজির কর্তৃত্ব কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ বা খর্ব হচ্ছে না, বরং এসবের মূল লক্ষ্য অভিবাসী শ্রমজীবী শ্রেণী, যারা আদিবাসীদের অধিকার ও আধিপত্যের প্রতি হুমকি স্বরূপ বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তির একরৈখিকতা এমন যে উত্তরপূর্বের জাতিগোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, ব্যবহার না করে ‘সম্পদের স্তুপের উপর বসে থাকা’ মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিপত্তিকামী একটি অংশ সম্পদ নিষ্কাশনী প্রকল্পের শরিক হওয়ার মাধ্যমে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহী হলেও গোষ্ঠীর নিঃশর্ত সমর্থন আদায়ে অসমর্থ। প্রাক-বৃটিশ পর্বের মত একটা গোটা জাতিকে একই মতাদর্শ কিংবা জীবনপ্রণালীর স্বপক্ষে দাঁড় করানো আজ বস্তুত অসম্ভব। ফলে প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীর সরলরৈখিক যুক্তিতর্ক প্রত্যাহবানের সম্মুখীন হচ্ছে। অর্থাৎ, শ্রেণী-চেতনার উন্মেষ প্রাপ্য পরিসর দাবি করছে। এমতাবস্থায় উত্তরপূর্বাঞ্চলের অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শ্রেণী এবং জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা বিশ্লেষণে পুরনো ছাঁচটির বিনির্মাণের জটিল কাজটিও জরুরি হয়ে পড়েছে। জমাকৃত মূলধনের সঙ্গে অনগ্রসর অঞ্চলের অধিবাসীর নৈকট্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলে তা লক্ষণীয় হবে নিশ্চয়। প্রব্রজিত পুরুষ-শ্রমের আধিক্য শ্রমের বাজারে ও উত্তরপূর্বের সমাজে লিঙ্গ বৈষম্যের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আমদানি করবে সেও চিন্তনীয় বইকি! .
অন্যতর সমস্যাও রয়েছে। শ্রম সংক্রান্ত সম্পর্ক ও শর্তের পুনর্বিন্যাসের ফলে বর্ধিত ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে এবং মহানগরের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারীদের জমির অধিকার নিয়ে আন্দোলন যখন দানা বাঁধতে শুরু করেছে (স্থায়ী পাট্টার দাবিতে আন্দোলন স্মর্তব্য) সেক্ষেত্রে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ প্রকল্প কতটা প্রয়োগসফল হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া উক্ত প্রকল্পে স্থানীয় মানুষজনের অংশগ্রহণ সম্ভব বা বাস্তবায়িত হতে পারছে না দক্ষ শ্রমিকের অপ্রতুলতার কারণে, বরং অ-দক্ষ শ্রমশক্তি প্রব্রজিত হচ্ছে অঞ্চলের বাইরে। উগ্র আঞ্চলিক রাজনীতির সোপান বেয়ে একশ্রেণীর তোলাবাজদের মাধ্যমে বিবিধ প্রকল্প থেকে তোলা আদায়ে তৎপর এক সিন্ডিকেট রাজ কায়েম হয়েছে । বিভিন্ন জাতিসত্তা গুলোর অন্তর্কলহও সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে ক্রমাগত। প্রাদেশিক সীমা কেন্দ্রিক অসম-নাগাল্যাণ্ড, নাগাল্যাণ্ড-মণিপুর বিবাদ নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে পড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশপথ হিসেবে উত্তরপূর্বাঞ্চলের দ্বার উন্মুক্ত করে দেবার প্রকল্প কতটা ফলপ্রসূ হবে বলা কঠিন। পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নে সেতুবন্ধের দায় পালন করবে না অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মতভেদ গভীরভাবে প্রকট করবে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা নেই কোনো। অন্যবিধ বিপদের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেবার নয় মোটেই। গোটা অঞ্চলটিই মাদক পাচার, যৌনবাজার, মানব পাচার ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজের আন্তর্জাতিক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার আশংকাও অমুলক নয়। এ আসলে দুমুখো সাপের নীতি। সে কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের স্টিলওয়েল রোড খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছনো সম্ভব হয় না, পি এম-এর চীন সফরের পাশাপাশি ডোকলাম কেন্দ্রিক অস্বস্তিও বহাল তবিয়তে বিরাজ করে। এমনতর জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে কেবল এটুকুই আপাতত বলা যেতে পারে যে, লুক ইস্ট পলিসি উত্তরপূর্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংক্রান্ত ও আর্থসামাজিক দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসা্র লক্ষ্যে কোন পথ গ্রহণ করে তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। আপাতত, এটি একটি সম্ভাবনা মাত্র, তার বেশি কিছু নয়।
. পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শ্রেণীর উপস্থিতি যদি গুরুত্ব পায় তো আরো কিছু বিষয় প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। গোটা দেশে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা উত্তরপূর্বেও বিস্তৃত হতে পারে, যেহেতু এখানে মজুরির হারের তারতম্য আদিবাসী ও অভিবাসী বিভাজনেরও বড় উপাদান। শ্রেণী-রাজনীতি জাতিগত নির্ণায়কবাদকে হটিয়ে দেবার পরিস্থিতি তৈরি করবে আমরা অবশ্যই তেমন কথা বলছি না, এটুকুই কেবল বলছি যে শ্রেণী এবং গোষ্ঠী-চেতনা বর্তমানে সহাবস্থানে রয়েছে এবং বিভাজনের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করবে ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা সমূহের নিরসনের প্রশ্নে কোন পদ্ধতি গৃহীত হয় তার ওপর। অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিও তার নিরিখেই গতি করবে। একথা অনস্বীকার্য যে সংযোগ বিস্তৃত ও প্রসারিত হলে বাণিজ্যের বহর বাড়বে, প্রাক-দেশভাগ-পর্বে যেমন ঘটেছিল। সমস্যা হচ্ছে ’৪৭ পরবর্তী এবং উদারনীতির পরবর্তী, উভয় পর্যায়েই, অঞ্চলবাসীর সামাজিক সমর্থন ও পরামর্শের বিষয়টিকে পাশ কাটানো হয়েছে। এরকম অবস্থায় উত্তরপূর্বের প্রান্তিকায়িত জনগোষ্ঠীগুলি, যেমন চর অঞ্চলের বাঙালি মুসলমান অভিবাসী, বাঙালি হিন্দু ডি ভোটার, অরুণাচলের চাকমা সম্প্রদায় কিংবা ত্রিপুরার রিয়াং গোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও জমির অধিকার বিষয়ক সমস্যা কীভাবে কিংবা আদৌ মীমাংসা করা যাবে কিনা তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। উল্লিখিত প্রশ্নসমূহ আসলে বৃহত্তর ক্ষেত্রে অধিকার ও ন্যায়ের (rights and justice) সঙ্গে সংযুক্ত, উত্তরপূর্বাঞ্চলে যা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। কেবল রাষ্ট্রের দ্বারাই নয়, এক জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা অপর জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও। উত্তরপূর্বে যে কোন নীতি অথবা কর্মপ্রণালী ফলপ্রসূ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়, সম্ভবত, পরিচয় এবং নাগরিকত্ব কেন্দ্রিক সমস্যা নিরসনের প্রশ্নে মতানৈক্য। ‘নাগরিকপঞ্জি নবীকরণ প্রক্রিয়া’ এবং ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধেয়ক’ সে অনৈক্যের ভিতকেই শক্তিশালী করবে, সন্দেহ নাই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন