সাহিত্যঃ পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্যঃ পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২০

গল্পের ভুবনে নাগরিকত্ব, এনআরসি এবং…

           (একটি অসম্পূর্ণ পাঠ-প্রতিক্রিয়া)

 

        সমাজ ও সাহিত্যের সম্পর্কটি সুপ্রাচীন নয় কেবল, সুনিবিড়ও। সাহিত্য ছাড়া সমাজের চলতে পারে, কিন্তু সমাজ ছাড়া সাহিত্যের চলে না। প্রাণী জগতে মানুষ শ্রেষ্ঠ, এই কারণে নয় যে সে বুদ্ধিমান ; শ্রেষ্ঠ, কারণ মানুষের সমাজ আছে। সামাজিক সংযোগের জন্য আছে ভাষা। যে ভাষাকে হাতিয়ার করে অগ্রসর সমাজে সৃষ্টি হয় সাহিত্য। মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম যে ভাষা তার মূল উপাদান হচ্ছে শব্দ। শব্দ যদি হয় ব্যক্তিমানুষের অভিব্যক্তি, তবে সাহিত্যকে বলা যেতে পারে সমাজের  অভিব্যক্তি। আর এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্কে অনুঘটক হচ্ছে সময়। কোন বিশেষ সমাজে বিশেষ সময়ে বসবাসকারী মানুষের আচার-আচরণের প্রতিফলন অনিবার্য কারণেই সাহিত্যে ঘটে থাকে। সাহিত্যকে এ কারণে ‘সমাজের দর্পণ’ আখ্যা দেওয়া হলেও বিষয়টা ক্যামেরায় ছবি তোলার মত সরল ব্যাপার নয়। লেখক যেহেতু এক সজীব সংবেদনশীল সত্তার অধিকারী তাই বাস্তবের নেহাত প্রতিবিম্বায়ন বস্তুত অবান্তর, অভীষ্ট তো নয়ই। এই প্রতিবিম্বায়ন তাই বিশ্লেষণাত্মক কিংবা সমালোচনামূলক হওয়াই স্বাভাবিক। একে তাই সামাজিক প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করাই সঙ্গত। বলা অহেতুক, এই জটিল প্রক্রিয়ায় স্থান-কাল-পাত্র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা এক হলেও লেখক ভেদে ভাষ্য ভিন্ন হতে বাধ্য। স্থান-কাল একটি সাহিত্য কর্মকে যেমন স্বাতন্ত্র্য দেয়, তেমনি স্থান ও কালের বৃহত্তর পরিধি ও আবহমানতার সঙ্গেও তা কোন-না-কোন ভাবে সংযুক্ত-সংশ্লিষ্ট থাকে। অঞ্চল ভিত্তিক সাহিত্যের আলোচনায় এই কথাটি মনে রাখা বোধ করি জরুরি।  

অসমের বাংলা লেখালেখি নিয়ে কথা বলার সময়েও আমাদের সেটা মনে রাখতে হবে। অসমের জল-হাওয়ায় জারিত বলে যে স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য, যা-ই বলি না কেন, তা কিন্তু বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের পরিধির বিস্তার মাত্র, বিচ্ছিন্নতার অছিলা নয় কোন অর্থেই। ভিন্ন ভুবনে পায়চারি নয়। অসমের সাহিত্যে  বাঙালির অস্তিত্বের সংকট, ভাষিক সম্প্রসারণবাদী রাজনীতি, বিবিধ প্রতারণা ও দাঙ্গার প্রতিবেদন, এমনকি সাম্প্রতীক এন আর সি প্রসঙ্গ ইত্যাদি উঠে আসাটা নিতান্তই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, একথাও কিছু পরিমাণে সত্য যে, প্রথম পর্বের লেখালেখিতে এমনতর চিহ্ন হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে যা থেকে ধারণা হতে পারে যে লেখকের বাসভূমি ও মনোভূমি বুঝি এক নয়, পৃথক। একটা সময় ছিল যখন ‘ব্রীজ’ শব্দের উচ্চারণে একাংশের মনের পর্দায় শরাইঘাটের বদলে হাওড়া ব্রীজের ছবি ভেসে উঠত। হীনমন্যতার সে অধ্যায় আমরা সযত্নে অতিক্রম করে এসেছি, সজ্ঞানে তো বটেই, স্ব-সামর্থ্যেও। আর এই অতিক্রমণের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ চৌহদ্দিতে আমাদের অহঙ্কার এবং অবদান দুই-ই সাব্যস্ত হয়েছে। এই অর্জন বস্তুত অসমে বাঙালির অস্তিত্বের সংগ্রামেরই অঙ্গ, এবং অনুষঙ্গও।

বর্তমানে গোটা অসম জুড়ে বাঙালির যে সংঘাতময় সঙ্গীন অবস্থা, যার করাল ছায়া বর্তমানে রাজ্যের সীমা অতিক্রমণের অপেক্ষায় দিন গুনছে, সেখানে দাঁড়িয়ে যথার্থ সংবাদ পরিবেশনও যদি করতে হয় তো ‘বধ্যভূমি থেকে বলছি’-এই শিরোনাম ছাড়া অন্য কোনো শিরোনামে তা কদাচ সম্ভব নয়। যাদের ত্রিসীমানায় খবরের কাগজওয়ালাদের পা রাখার ঘটনা ঘটার নয়, সেই বুলু শব্দকর - খালু দাস - দুলালচন্দ্র পাল - অর্জুন নমঃশুদ্র’রা যখন রাষ্ট্রীয় বদান্যতায় ডি-ভোটার, ফরেনার্স  ট্রাইব্যুনাল, ডিটেনশান  ক্যাম্পের ঘাট মাড়িয়ে সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার অনিবার্য শিরোনাম হয়ে ওঠেন,  তাদের কারো কারো ‘লাশ’ নিয়ে যখন রচিত হয় প্রশাসনিক কু-নাট্য, তখন মানবতার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটি যে সারা হয় সাড়ম্বরে, তা কি অস্বীকার করা যাবে কোনো ভাবে! সংবেদনশীল কোন মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি? এরকম চরম ও চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিস্থিতিতে স্বভাবতই কি জিজ্ঞাসা উঠে আসে না - ‘কেন? কার স্বার্থে?’  উত্তরবিহীন এইসব প্রশ্নমালা খুবলে খাচ্ছে শরীর, সময়, সবকিছু – মাটি ও মানুষের। এ থেকে গা বাঁচিয়ে চলার সাধ্য কি আছে সাহিত্যের? সম্ভব কি? আত্মহননের অসহায় ঘটনাগুলো কি আত্মমননের প্রতি প্রত্যাহ্বান ছুঁড়ে দিয়ে যায় নি, যাচ্ছে না!

অসমের সাম্প্রতীক লেখালেখিতে, গল্পচর্চায় মূলত, হালের বাস্তবতার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে এবং তার স্বরূপটি কেমন একটু নাহয় ঝালিয়ে দেখা যাক। তবে সর্বাগ্রে একটা কৈফিয়ত পেশ করা বোধ হয় আবশ্যক। কথাটা এই যে, এই জরিপের প্রকল্পটি বস্তুতই অসম্পূর্ণ, এবং এলোমেলোও বটে। ইংরেজিতে random sampling বলে একটা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, গল্প নির্বাচনের  ক্ষেত্রে আমরা সেই এলোমেলো নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতিই বাধ্যত গ্রহণ করেছি। নির্বাচনের মাপকাঠি কোন ভাবেই গল্পের গুণগত মান কিংবা লেখক ভিত্তিক নয়। গুণাগুণ বিচারের সামর্থ্য নিবন্ধকারের বিন্দুমাত্র নেই। হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে এবং স্মৃতি-নির্ভরতা সম্বল করেই এক রকমের পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেশ করার প্রয়াস করা হয়েছে মাত্র। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

 

আশির দশকের আগে পর্যন্ত আঘাতটা ছিল প্রধানত ভাষা সংস্কৃতির ওপর। জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন-টান্দোলন করে রাজ্য সরকারকে চাপ দিয়ে অগণতান্ত্রিক ভাষানীতি চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আশির দশকে এসে ‘বিদেশি খেদা’ আন্দোলনের বকলমে আক্রমণটা সরাসরি ভাষাভাষী মানুষের ওপর শুরু হলো। নাগরিক পঞ্জি নবায়নের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বিষয়টাকে আইনি বৈধতা দেওয়া হলো। রাষ্ট্র চলে এল মূল ভূমিকায়। পার্শ্ব ভূমিকায় আদালত। উৎস কিন্তু বিদেশি খেদা আন্দোলন ও অসম চুক্তি। তো, আশির দশকেই ঝড়ের পূর্বাভাস যে আঁচ করা গেছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়ে গেছে মলয় কান্তি দে-র ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পে। সে গল্প নিয়ে আলোচনা এখানে অনাবশ্যক, কেননা সেটি ইতোমধ্যে মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পের সূত্রে একটা গৎ বাঁধা হয়ে গেছে।  তারপর থেকে অসমের গল্পকারদের আসরাফ আলী বুঝি নিরন্তর ‘দিচ্ছে ডাক’! সে ডাকে সাড়াও মিলছে যথেষ্ট, জোরদার সাড়া।

ধরা যাক জ্যোতির্ময় সেনগুপ্তের ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ গল্পটির কথাই। গল্পটি পড়তে গিয়ে একেবারে গোড়াতেই জোর ধাক্কা সামলে এগোতে হয়। বিধু সরকারের দাওয়ায় কারো হঠাৎ আগমণের বার্তা দিতে গিয়ে লেখক যখন লেখেন – ‘কাদা মাখানো একজোড়া পায়ের ছাপ পড়েই গেল’ তখন দুপুরের বিষণ্ণতা বস্তুত অপ্রতিরোধ্য হয়ে দেখা দেয়। ‘পড়েই গেল’ বাক্যাংশের সূত্রে উপায়হীনতার যে বিবৃতি, এবং তার অব্যবহিত পরেই ‘লক্ষ্মী না’!!? এই বিস্ময় জিজ্ঞাসার কোল ঘেঁষে পিসিমার ‘অ্যাঁ তুই !? উচ্চারণ এক নিমেষেই বাঙালি গেরস্থের আজন্ম লালিত আহ্লাদ ‘লক্ষ্মী এলো ঘরে’ মুখ থুবড়ে পড়ে। মায়ের দেওয়া দুগাছা  চুড়ি সম্বল করে কানাইয়ের বাপের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া লক্ষ্মী এত বছরে আর এমুখো হয়নি। তার এই অতর্কিত আবির্ভাবে প্রমাদ গুনে বাপ বিপিন। সিঁথির সিঁদুর আর হাতের নোয়া-শাঁখার অনুপস্থিতি পরখ করে অতঃপর বিপিনের খেদোক্তি – ‘জানতাম, আমি ঠিক জানতাম। এইরকমই কিছু একটা হইব’। না, বিপিন ঠিক জানত না। বিপিনের মত আমরাও জানতাম না স্বামী-হারা সন্তান কোলে বিধবা কন্যার অনন্যোপায় বাপের ভিটেয় উঠে আসার চিরাচরিত বিপন্নতার গল্প এ নয়। আরো এক মারাত্মক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ অপেক্ষা করে থাকে আমাদের তরে! দুবেলা দুমোঠো অন্নের ভরসায় নয়, লক্ষ্মী এসেছে অন্যতর গুপ্তধনের খোঁজে, কপাল জোরে যদি মেলে সেই দুরাশায়।            

শ্বশুর বাড়িতে অভাব অনটনের ঘাটতি ছিল না সত্য, তবে লক্ষ্মীমন্ত স্বামীর ঘরে অতৃপ্তির অসুখছিল না। অকস্মাৎ শমন   জারি হল, শ্বশুরের নাম থাকলেও ভোটার লিস্টে নাম কাটা গেল লক্ষ্মী আর কানাইয়ের বাপের। স্বামীকে টেনে-হেঁচড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে গেল সরকারি পেয়াদা। শ্বশুরকে যখন চিতায় ওঠানো হয় পুলিশ প্রহরায় মুখাগ্নি করার সুযোগ দেবার বদান্যতাটুকু অবশ্য দেখিয়েছে প্রশাসন। লক্ষ্মী তাই এসেছে বাপের বাড়িতে জিয়ন-কাঠির খোঁজে, নাগরিকত্ব প্রমাণের এক টুকরো কাগজও যদি মেলে। একটা গ্রুপ  ফটো ছিল বাড়িতে, যেখানে নেতাজীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন তার না-দেখা ঠাকুর্দাও। কিন্তু তার স্বদেশি হওয়ার প্রমাণ কি হবে তা দিয়ে! লক্ষ্মী জানে না। সর্বস্ব দিয়েও কানাইয়ের বাপকে ছাড়িয়ে আনতে অপারগ লক্ষ্মীর কাহিনি শেষ হয় সব অপমানের হাত থেকে মুক্তি খুঁজে নিতে সিলিং থেকে ঝুলে পড়া কানাইয়ের বাপের লাশ সনাক্ত করার ডাক পেয়ে। বাপ-হারা দু’টি কচি সন্তান নিয়ে লক্ষ্মী এনআরসি-র অ্যানার্কিতে ফেঁসে নিজেকেই যেন শনাক্ত করার পথ খুঁজে পায় না। এই মর্মান্তিক পাঁচালি লেখকের মুন্সীয়ানায় অসমের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর বাঙালি পাঠককেও নিশ্চয় ভারাক্রান্ত করে।  

ধীরাজ চক্রবর্তীর ‘সন্দেহজনক’ গল্পে পাই কাগুজে প্রমাণ খোঁজার আরেক ট্র্যাজিক কাহিনি। বছর পঁয়ত্রিশের মনসুর মিঞার মন্ত্রের জাদুতে কাজ হয় এরকম বিশ্বাস জন্মেছে বরপেটা জেলার হাউলি অঞ্চলের মানুষের। বংশানুক্রমেই সে শিখেছে তুকতাক, মন্ত্র-তন্ত্র। গ্রামের শেষ প্রান্তে প্রবীণ বটগাছটির নিচে হাটবারে সে তার মন্ত্রের ঝাঁপি খুলে বসে। মানুষের নানা সমস্যার চটজলদি সস্তা সমাধান আছে তার কাছে। মন্ত্র পড়া তাবিজ দেয় সে, মাঝে সাঝে জড়ি-বুটির ওষুধও। অথচ এন আর সি-র খাতায়  নাম তোলার রক্ষাকবচ এক টুকরো কাগজের জন্য মরীয়া সে। তার জন্ম পঁচাত্তরে, অথচ কাগজ চাই একাত্তরের পঁচিশ মার্চের আগের। বাপ হাসান আলি পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল যদিও সে অনেক আগে। কিন্তু নিজের নামে এক টুকরো কাগজ বানিয়ে রাখার কথা মনেও আসে নি আপনভোলা মানুষটির। পাগলের মত ছুটোছুটি করে মনসুর। বাপের এক সঙ্গীর কাছে খবরটা পেয়ে কিছুটা আশার আলো যেন দেখতে পায়। বাপ হাসান আলির গণনার ভীষণ সুখ্যাতি ছিল দূর-দুরান্ত পর্যন্ত। কোন বছর কতটা বৃষ্টি হবে, ফসল কেমন হবে, মাটির নিচে জল কোথায় পাওয়া যাবে গুনে সব বলে দিতে পারত অবলীলায়। পানিকাটা গ্রামে তাই ডাক পড়েছিল, আর হাসান আলির নির্দেশ মত কুয়ো খুঁড়ে জলের ভাণ্ডারও পাওয়া গেল। গ্রামের মানুষ হাসানকে দিয়েই কুয়ো উদ্বোধন করিয়ে পাথরে খোদাই করে দিয়েছিল - ‘উদ্বোধক হাসান আলি, কুয়া নির্মাণ ১৯৬০’।  

ওখানে দাঁড়িয়ে বাপের গর্বে মনসুরের ছাতি বুঝি ছাপ্পান্নকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। ফটোগ্রাফার ডেকে লেখাটার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি উঠিয়ে সেই ‘অকাট্য প্রমাণ’ তুলে দিয়েছিল উকিল বাবুর হাতে। কিন্তু উকিল বাবুর তাচ্ছিল্যের হাসি ও মস্করায় রাগে ক্ষোভে ফিরে আসতে হয় মনসুরকে। আন্দোলন ছাড়া অন্য পথ নেই আর। গজেন বর্মণদের শলা-পরামর্শে এনআরসি-র হয়রানির বিরুদ্ধে জেলা শাসকের অফিস ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত হয়। ২১শে জুলাই, ২০১০ সাল ডি-ভোটার সমস্যার সমাধান, এনআরসি  বাতিলের জন্য বিরাট সংখ্যক মানুষের মিছিল শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। তার মধ্যে  ‘হাসান আলির স্বীকৃতি চাই’ শ্লোগান শুনে মনসুরও ‘স্বীকৃতি চাই, স্বীকৃতি চাই’ বলে গলা মেলায় সমান তালে। আচমকা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়, বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিকে ওদিকে দৌড়তে থাকে সবাই, পুলিশের গুলিতে মনসুর সহ চার জনের মৃত্যু হয়। নিয়ম মাফিক ন্যায়িক তদন্ত ঘোষিত হয়, কিছুদিন পর জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে – ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’। হাসান আলি জল সরবরাহ প্রকল্প।

বিষয় নির্বাচনে, নির্মাণ কৌশলে অসাধারণ একটি গল্প। সমসাময়িক ঘটনার এমন আশ্চর্য রূপায়ন, সেও খুব স্বল্প পরিসরে, বস্তুতই বিরল। মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠার সামান্য পরিসরে অসমের অভিবাসী বাঙালি মুসলমানের অসামান্য অবদানের আখ্যানের পাশাপাশি তাদের প্রতি অবহেলা ও বঞ্চনার চিত্রও তুলে ধরেছেন অনুভবী ও কুশলী কলমে। যে গ্রামের জল পানের অযোগ্য হাসান আলির দৌলতে সে গ্রাম অমৃতবারি আবিষ্কার করে, ঠিক যেমন এক কালে চাষাবাদের অযোগ্য জমি সুফলা হয়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গ থেকে নিয়ে আসা কুশলী কৃষকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে। ২১শে জুলাই, ২০১০ এ শুরু হয়েছিল এনআরসি’র পাইলট প্রোজেক্ট, বরপেটা জেলায়। আর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বাস্তবিক মৃত্যু বরণ করেছিলেন চার তরুণ তুর্কী। কেন জানি না, পড়তে গিয়ে কেবলই মনে হয়েছে ধীরাজ বুঝি গল্পের সমাপ্তিতে ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’ নামকরণের তীব্র শ্লেষের মধ্য দিয়ে আমাদের উনিশ-একুশ লালিত চৈতন্যের প্রতিই এক শব্দভেদী শর নিক্ষেপ করেছেন।

কুশল ভট্টাচার্যের ‘খাঁচার পাখি ডাকে’ গল্পে ডিটেনশন ক্যাম্পের যে বস্তুনিষ্ঠ উৎপীড়ক বিবরণ প্রত্যক্ষ্ করি তাতে শারীরিক ভাবেই শিউরে উঠতে হয় পাঠক হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত অসাধারণ সিনেমাগুলোতে প্রদর্শিত হিটলার জমানার   কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ছবিই যেন ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। ক্যাম্পের অমানুষিক পরিবেশ ও প্রাত্যহিক নির্যাতনের মধ্যেও গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্পর্ক। ঠিকরে পড়ে মনুষ্যত্বের দ্যুতি। পরিবার-বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো যেন গড়ে নেয় আরেক নতুন পরিবার। ডিটেনশন ক্যাম্পে। লেখারু, লক্ষ্মী, খগেন, পুলিনের মা এবং ওদের মত আরো অনেকে মিলে নয়া সংসার। একে অন্যের সুখ-দুখের – না, সুখ তো এদের নাগালের বাইরে, দুঃখ ভরা জীবন সংগ্রামের খবর নেয়। ছিন্নমূল মানুষের শিকড় সন্ধানের কাহিনি গুলো কোথাও যেন একসূত্রে গাঁথা। এক অনিবার্য আত্মীয়তা তাই গড়ে ওঠে। পারস্পরিক কথোপকথনে, জীবন-সংলগ্ন  আলাপচারিতায় ফুটে ওঠে সে অমলিনতা। পরিচিত গ্রামের ভেতর থেকে আরেক গ্রাম, চেনা মানুষের ভেতর থেকে অন্য আরেক অচেনা মানুষ যেন জেগে ওঠে।

-আমার কী মনে হয় জানস? বাংলাদেশে গিয়া মুসলমান হইয়া যাওয়াই ভাল। তা হইলে অন্তত আমাগো উপর আর কেউ  অইত্যাচার করব না। ধর্ম ক আর ভাষাই ক, সব এক হইয়া যাইব। ঘর বাড়ি তো এইখানেও নাই, নাহয় হেইখানেও থাকব না। কিন্তু কাম কাজ কইরা খাওন তো জুটান যাইব? নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল লেখারু।

-হেই বুইলা বিধর্মী হইবা কাকা? লেখারুর কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠল লক্ষ্মী।

-আমাগো মতো গরিবের লেইগা জাতি-ধর্ম কুনো কামের না রে।

লেখারু আর লক্ষ্মীর এই অন্তরঙ্গ সংলাপ যেন অদৃশ্য চাবুক হয়ে পিঠে পড়ে। আর্থিক দুরবস্থা ও দুর্দশার জন্য সামান্য আক্ষেপ পর্যন্ত নেই, দায়ী করছে না সমাজ ব্যবস্থাকেও। কেবল একটু সম্মান নিয়ে বাঁচার প্রার্থনা। দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে এই আবেদন কি আন্তর্জাতিক স্বর হয়ে ওঠে না! ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ এমন প্রার্থনা-বিলাস তাদের এক্তিয়ারে নেই, তারা বড় জোর ভাবতে পারে - ‘আমার সন্তান যেন থাকে দেশে ভিতে’। কিন্তু সে আশার বুকেও এনআরসির ছুরি। একবার দেশ-ছাড়া মানুষের দেশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে দ্বিতীয়বার। তবে তফাৎ আছে, এই কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র এমনই নিঃশ্ছিদ্র যে অন্য কোথাও অন্য দেশে পালিয়ে যাবার সুযোগটাও নেই। আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার উদ্বাস্তু-জীবন ও বন্দিশিবিরের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য কি আছে? এ গল্প তাই অসমের দরিদ্র মানুষের নিপীড়নের ইতিবৃত্ত হয়ে থাকে না আর, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মেহনতি মানুষের ওপর সংঘটিত ধারাবাহিক নিপীড়নের ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হয়ে ওঠে।

যারা দিন আনে দিন খায় সেই সাধারণ মানুষগুলোর জীবন ধারণের পথটাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এই এনআরসি। অধিকাংশের স্পষ্ট ধারণাও নেই ব্যাপারটা আসলে কী! ‘তাবিজ’ গল্পের নিতাই দাসেরও নেই। পথে ঘাটে আর কোন আলোচনা নেই, কেবল এনআরসির প্রসঙ্গ, আলাপ। হাটবারে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাবিজ বিক্রি করা নিতাইয়ের ব্যবসায় ভীষণ মন্দা চলছে।  অসুখ-বিসুখ, বশীকরণ, বাণ মারা, গর্ভপাত কত রকমের সমস্যা সমাধানের তাবিজ আছে তার ঝুলিতে, কিন্তু খদ্দের কই! এনআরসি দানো যেন গ্রামের মানুষগুলোর সাপ-খোপ জল-আগুন সব কিছুর ভয় গিলে খেয়েছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে গোটা গ্রাম সন্ত্রস্ত, দিশাহারা। মাস্টার মশায়ের বোঝানোর চেষ্টা সত্ত্বেও নিতাই খুব ভালো বুঝে উঠতে পারে না এনআরসি’র আসল গ্যাড়াকল। বুলু শব্দকর না কাকে যেন ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে এবং সেখানেই নাকি সে মারা গেছে। সেই খবরটাই তার কাছে যা গুরুত্ব পায়। নাগরিত্বের সীল-মোহর দেওয়া কাগজ খুঁজছে সবাই হন্যে হয়ে। যেসব কাগজের কথা বলাবলি করে লোকে সেসবের কিছুই তো তার নেই! তবু, নিজের সংকট নিয়ে আদৌ ভাবনা নেই নিতাইয়ের। গ্রামের মানুষগুলো নিশ্চিন্ত  থাকলে সেও নিশ্চিন্ত। সাধন জেঠা জীবনকাকাদের তাই সে সরল ভাবেই সান্ত্বনা দেয় – ‘শোনো জেঠা, অত ভেবো না।  সবাই তো আছি গো আমরা। এ তো তোমার একার সমস্যা নয়’। এভাবেই ভরসা দিয়ে এসেছে নিতাই, এতদিন। ভিটেমাটি ছাড়া করে যে এনআরসি, সেটা তাহলে ভূত-প্রেত-জিন-পরি থেকে আলাদা কিছু নয়। তাহলে তো না পারার কিছু নেই, ভাবতে ভাবতে গ্রামের লোকগুলোর আতঙ্ক-আর্তনাদ সব নিজের মধ্যে পুঞ্জীভূত করে ভরসা গোটায় সে – আলতা দিয়ে লেখা পিচ বোর্ডের সাইন   বোর্ডে জুড়ে দেয় আরেকটা লাইন – ‘এখানে এনার্সি তাবিজ পাওয়া যায়।’ এ গল্পের সমাপ্তির নিষ্পাপ সারল্যে যে মর্মন্তুদ  অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস, যে আর্তি ব্যক্ত ও পরিব্যাপ্ত তার শাব্দিক সম্প্রসার অসাধ্য নয় শুধু, অসমীচিনও। মেঘমালা দে মহন্ত অসামান্য  দক্ষতায় এক নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। নতুন প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে মেঘমালা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং প্রতিশ্রুতিবান।

তাঁর ‘কাগজের স্বদেশ’ গল্পে খুঁজে পাই আরেক ভিন্ন প্রতিভাস। অসাধারণ বিশ্বস্ততায় সেখানে তুলে ধরা হয়েছে শহুরে মধ্যবিত্তের ফাঁপা মনস্তত্ত্ব, মেকী প্রতিবাদের চিরাচরিত চিত্র। ইন্দ্র, ইন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তার প্রতিনিধি। ছোট-বড় সবার ইন্দ্রদা।  অকৃতদার ইন্দ্র, অবিবাহিত বোনকে নিয়ে এই শহরের বাসিন্দা। শুধু বাসিন্দা বললে ঠিক বলা হয় না, শহরের এমন কোন ‘কবিরাজি’ নেই যেখানে ইন্দ্রনাথের নীরব কিংবা সরব উপস্থিতি নেই। মহিলা মজলিশ থেকে মশাল-মিছিল সর্বত্র তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। যুবা প্রজন্মের নজরে ইন্দ্রদা শহরের আইকন,  আই-কার্ড। ‘এই শহরটাই আমার বাড়ি’ এমন আত্মগর্বী উচ্চারণে অভ্যস্ত, প্রতিটি মিছিলের পুরোভাগে হাঁটা ইন্দ্রনাথ হাঁক পাড়ে – ‘দিচ্ছে ডাক’। একুশে ফেব্রুয়ারি’র আমন্ত্রণে সে যায় ওপার বাংলায়, পিতৃপুরুষের ভিটেয়। তার জন্মও সেখানে, বাবা-জেঠা’র মুখে শোনা ‘দেশের বাড়ি’র গল্প বলে বোন উজিকে।  মনোভূমি আর বাসভূমি’র মাঝখানে বুঝি  লুকিয়ে থাকে বিভাজনের সূক্ষ্ম রেখা। ইন্দ্রের নামেও আসে নোটিশ, ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে সে। তার ‘অবসরের গান’ ভেঙে চুরমার করে দেয় এক টুকরো কাগজ, ছিনিয়ে নিতে চায় আত্ম-পরিচয়। গণহারে ডি-নোটিশ জারি নিয়ে দেশভাগের মতই দু ভাগে ভাগ হয়ে যায় নাগরিক-প্রতিক্রিয়া। এলিট মধ্যবিত্ত, যারা ‘চরিত্রহীন’ প্রতিবাদী মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটে, তারা ব্যস্ত নথি-পত্র গুছিয়ে নিতে। আর আচ্ছে দিনের স্বপ্নে মশগুল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর হেলদোল নেই তেমন। এনআরসি তাড়িত মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে না পারার আত্মগ্লানি থেকে ইন্দ্রকে যেন মুক্ত করে বুক পকেটে রাখা কাগুজে নোটিশ। মনে মনে ইন্দ্র এখন নিজেকে তাদের দলভুক্ত দেখতে পায়। সবার প্রত্যাশা মত আজ আর মিছিলের সামনের সারিতে  আগের মত দাঁড়াতে পারে না ইন্দ্র, সঙ্কোচ হয়। অবস্থান পাল্টে পাল্টে এগিয়ে চলা মধ্যবিত্তের আত্মিক সংকট মূর্ত হয়ে ওঠে ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। এক নতুন লড়াইয়ের জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নেয় ইন্দ্র।   

    

 

এনআরসি’র মার কি শুধু গ্রাম শহরের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনকেই এলোমেলো করে দিয়েছে, সচ্ছল আপাত সুখী মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রায় আঁচড় কি লাগেনি একেবারে! দৌড়ঝাঁপ একটুও কি নেই? আতঙ্ক ততটা  গাঢ় নয় হয়তবা, তবে নিশ্চিন্ত বসে থাকার অবস্থাও নয়। ছেলে-বুড়ো যুবক-যুবতী সবার মুখেই কেবল এনআরসি। ফটো-তোলা, কাগজ জমা-দেওয়া এই নিয়েই ব্যস্ত সবাই। শহরের জানা-বোঝা মানুষের বেশির ভাগের হাতেই গোছানো কাগজ-টাগজ রয়েছে। তবু ঝামেলা একেবারে মিটে না যাওয়া অব্দি যেন স্বস্তি নেই। মধ্যবিত্ত ভাবালুতাও বুঝি থিতিয়ে গেছে। জীবনের উত্তাপ বলতেও কিছু নেই। রক্ত বুঝি জমে ঠাণ্ডা হবার জোগাড়, প্রেম-টেমও জমছে না তেমন। ‘ঠাণ্ডা রক্ত বা NRC–র দিনে প্রেম’ গল্পে মিথিলেশ ভট্টাচার্য তাঁর সুপরিচিত অথচ অননুকরণীয় গদ্য শৈলীতে সে আখ্যানই শোনান। যতীন-সিক্তার অতি সম্ভাবনাময় প্রেমের মাঝখানেও ঢুকে পড়ে এনআরসি। জমে ওঠা খেলায় হতে হতেও গোলটা না হওয়ার মত ‘ধেত্তেরি’ অবস্থা। সুযোগ ছিল হাতের মুঠোয়, তবু দুজনের একটা যুগল ফটো-সেশনের সম্ভাবনা মাঠে মারা গেল, সিক্তার অসম্মতিতে-‘আজ না, আরেক দিন’। যতীন টের পেয়েছে তার রক্ত ঠাণ্ডা, সিক্তার  ল্যাবরেটরিতে তাই টেস্ট করিয়ে কারণটা জেনে নিতে উৎসুক সে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের প্রতি এক তীব্র ও তির্যক শ্লেষ রয়েছে এ গল্পে।

   ‘উঁইপোকা’দের জীবন নিয়ে ইদানীং কালে গল্প কিন্তু খুব কম লেখা হয়নি এ অঞ্চলে। উল্লেখিত গল্পগুলো ছাড়াও ‘মানবরতন’ (স্বপ্না ভট্টাচার্য), ‘স্থায়ী ঠিকানা’ (রণবীর পুরকায়স্থ), হামারি অজিব কাহানি (দোঁলনচাঁপা দাস পাল), একটি গলিত স্থবির ব্যাং অথবা এলি তেলি মহম্মদ আলির জীবন বৃত্তান্ত (কান্তারভূষণ নন্দী) ইত্যাদি নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। এর বাইরে, ব্যক্তিগত পাঠ-পরিধির বাইরেও রয়ে গেছে আরো কত! নাগরিকত্ব-ডি-ভোটার-ডিটেনশন ক্যাম্প-ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কত  বিচিত্র গল্পই না লেখা হয়েছে এই অসময়ে, কত ভয়ানক তথ্য কত নির্মম সত্য খোদাই করা আছে পত্র-পত্রিকা বইপত্রের পাতায়  পাতায় তার সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা ও আলোচনার গুরু দায়িত্ব হয়ত নেবেন আগামীর কোনো সাহিত্য গবেষক। এটুকু আশা করা যেতেই পারে। আমাদের সাধ সীমাহীন, কিন্তু সাধ্য সীমিত। কাজেই দাঁড়ি টানার কথা ভাবতেহচ্ছে। স্থান সংকুলানের দায়ও  আছে। তবে শেষ করার আগে আরেকটি গল্পের কথা বলতেই হবে। না বললে গোটা উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে।

কান্তারভূষুণ নন্দীর ‘মাটিপোকাদের নিয়ে একটি না-গল্পের খসড়া’র কথা না বললে নিজেকেই কাঠগড়াতে দাঁড় করাতে হ। গল্পকার কান্তারভূষণ সম্পর্কে বলার কিছু নেই। এমনিতেই তাঁর গল্প না পড়াটা যে কোন গল্পরসিকের জন্য প্রায় অপরাধের  পর্যায়ে পড়ে। আর এনআরসির প্রসঙ্গে তো কথাই নেই। কেউ যদি একটি মাত্র গল্প পড়ে এনআরসি নিপীড়ণের সম্যক ধারণা পেতে আগ্রহী থাকেন তবে ‘মাটিপোকাদের ……’ তাকে পড়তেই হবে। কারণ এই গল্পে এনআরসি কেন্দ্রিক উথাল-পাথালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থনীতিক -রাজনীতিক-শাসনিক সব কটা দিকই উন্মোচিত হয়েছে। হয়েছে সুনিপুণ বিশ্বস্ততায়। এ গল্প এ সময়ের অসামান্য দলিল, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

রশিদ-মালতী আর তারক-ময়না দুই সংসারের ভোমরা-জুটি। কেবল পাশাপাশি বসবাস নয় এদের, বেঁচে থাকার  দৈনন্দিন কসরতে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনায় একে অন্যের অবিচ্ছিন্ন দোসর। এক পরিবারের কান্নার রোল তাই আরেক পরিবারের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কান্নার রোল আর ঘুম কেড়ে নেওয়ার মূলে সেই এনআরসি।  রশিদ বলে –

“জলপোকা দেখছস না, জলপোকা? আমরা হইলাম গিয়া মাটিপোকা। মাটির গভ্যে আমরার বাস, আমরার মরণ-বাঁচন। মাটি না হইলে আমরা থাকুম ক্যামনে?” তাইতো, কি করেই বা বাঁচবে! এই মাটিই কেড়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক-মানুষিক দুর্যোগ আসে ক্ষণে ক্ষণে। কোকড়াঝাড়ের দাঙ্গায় নিঃস্ব হয়ে রশিদ-মালতী এসে ওঠে গরজুলির পারে। সেখানেও বন্যার প্রকোপ, ঝড়ের দাপট। প্রাণ বাঁচানো দায়, তো কাগজ পত্তর! অথচ কাগজ না হলে ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে, এই আতঙ্কে অস্থির আদ্ধেক গ্রাম। কিন্তু শমন আসে তারকের নামেই, তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পায়ের তলায় এক চিলতে মাটির জন্য তাই মালতীরও হা-পিত্যেশ।

-“সাহাদা, একটা কথা কন তো। কুনোদিন যদি গরজুলির ভিতর থিইক্যা মাটি ভাইস্যা উঠে, চর পড়ে, অউ মাটি কি গরমেন্টের হইব? আমরা হউ চরো থাকতে পারবাম না?” ন্যায্য অধিকার নিয়েও সংশয় মালতীর কন্ঠে।

– “সব গরমেন্টের। কারও বাপের মাল না, বুঝছ ?” মহাদেব সাহা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানিয়ে দেয়, সাহার দলই গরমেন্ট কিনা! আগের গরমেন্ট ছিল বিরোধী দলের পাণ্ডা মোহিনী বরুয়াদের, তারককে তুলে নিয়ে যাবার সময় যে মোহিনী দাঁত কেলিয়ে বলেছিল – “তাঁহতৰ মহাদেব সাহাই কেনেকুৱা বঁচায় চাম নহয় কেলা।” নিখুঁত আঁচড়ে কান্তার খুলে দেন এনআরসি-রাজনীতির মুখোস। গণতন্ত্র-ন্যায়-মানবিকতা- সমানাধিকার শব্দগুলো ঠাট্টার মত শোনায়। এনআরসি’র দাবার ঘুঁটি রশিদ-তারক-ময়না-মালতী-সুমতিরা উপলব্ধি করে গরমেন্ট আসলে আরেক ভগবান, আর ভগবানের মর্জি না হলে কারও পক্ষেই কিছু করা  সম্ভব নয়।

মহাদেব সাহা মিটিং করে বুঝিয়ে দেয় দোষ তারকেরই, সস্তা দরে এক টুকরো মাটি তো সে দিয়েই দিচ্ছিল, কিন্তু নেমকহারাম তারক শুনল না। গ্রামের লোকের ভাল-মন্দের কিছুটা দায় তারও কি না! মহাদেবের টোপ গিলে মালতী ও রশিদ সাত হাজার আগাম দিয়ে মাটির স্বপ্নে বিভোর হয়। মহাদেব মাটিও দেয় না, টাকাও না। ফেরত দিতে বলায় তার চেলারা বাড়িতে হামলা চালায়, হাটবারে ওষুধ বিক্রির ‘অবৈধ’ ব্যবসা বন্ধ করার ফরমান জারি করে, ক্যাম্পে চালান করার হুমকিও দেয়। ভিটে-মাটির সাথে পেটের ভাতও কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কি? মহাদেবের মত ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’রা আবার ধর্মের মোড়কে রাজনীতি পুরে দেবার কায়দাটা রপ্ত করেছে ভালো। শ্যালক ভগীরথ দাসের বাড়িতে দুর্গা পুজো হবে, মিটিং করে চাঁদার হার সাব্যস্ত হয়, ‘মুখ্যমন্ত্রী আসবেন’ ঘোষণাও দেওয়া হয়। রোজকার দেখা পরিচিত রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ তৈরি হচ্ছে যেন। কিন্তু পুরুত ভবতোষ চক্রবর্তীর শাস্ত্র-বিধানে সংকট ঘনীভূত হয় - বেশ্যাদ্বারের মাটি চাই। ‘ক্যান লাগে’ তাও বুঝিয়ে দেন চক্কত্তি মশাই, জুতো খুলে অর্থাৎ তাবৎ পুণ্য ও পবিত্রতা দোরগোড়ায় রেখে বেশ্যার ঘরে প্রবেশ করতে হয় বলে যাবতীয় পুণ্য বেশ্যাদ্বারেই জমা হয়। তাছাড়া যেহেতু পুরুষই গণিকা তৈরি করে, আবার অস্পৃশ্যও করে রাখে বলে গণিকারা যাতে পুজোর বাইরে না থেকে যায় তাই-ই শাস্ত্রের এই মহান বিধান। আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! সব কা সাথ, সব কা বিকাশ! এমন বামুন ঠাকুর না হলে মহাদেব সাহার দোসর হওয়া সাজে! এক সুরে তাই ধ্বনিত হয় – আলবৎ চাই, ‘যিকান থিক্যা পার আন, কিন্তু মাটি লাগবই’।  

মালতী-ময়নাদের মাসকাবারি কাজ আর নেই, রশিদও জ্বরে জর্জর। কী করে হাঁড়ি চড়বে ভেবে কুল-কিনারা পায় না মালতী। বোবা বোনটির সঙ্গে শলা করে, সুমতিকে সাথে করে অন্ধকারে রওয়ানা হয় ভগীরথের বাড়িমুখো। এত রাতেও বাড়ির উঠোনে চলছে মিটিং। ভগীরথকে এক প্রান্তে ডেকে নিয়ে বলে,

–পাইসেন মাটি?

-না, পাই নাই।

-‘আমারে কন, আমি দিতে পারি’- বলে মাটি-ভর্তি কাচের বোতল এগিয়ে দেয় মালতী। ‘আমরার ঘরর মাটি। আমি  আর আমার বইন মিল্যা অনেকদিন থিক্যা গোপনে আপনাগো বড়ো বড়ো নেতারা জানে।’

মহাদেব সাহা-মোহিনী বরুয়াদের সমাজ সভ্যতার রঙ করা মুখের উপর একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় মালতী।

সার্টিফিকেট বানিয়ে দেবার শর্তে আর মাটির দাম নগদ পাঁচশো টাকা হতভম্ব মহাদেবের হাত থেকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে মালতী। অন্ধকার সাপ্টে ধরে। স্বামী-সন্তানের পাশে শুয়ে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বহুদূর থেকে আরও একটা চাপা কান্না যেন এসে মিশে যায় তার কান্নার সাথে। মালতী ঠিক শুনতে পায়। জীবনে প্রথম বার।  

 

কান্তারভূষণকে কুর্ণিশ, সার্বিক সামাজিক ধাপ্পাবাজির গালে এমন বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্ত থাপ্পড় কষানোর জন্য। ‘যুক্তি তক্কো   গপ্পো’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে ক্যামেরার লেন্সে নীলকন্ঠ বাগচি’র মদ ছুঁড়ে মারার দৃশ্য মনে পড়ে যায়। সাম্প্রতীক গল্পচর্চায় এমন  নিদর্শন বড় একটা মেলে না। কী অসাধারণ পর্যবেক্ষণ, কী অভাবনীয় প্রতিরূপ নির্মাণ! এ তো শুধু ভাষাশৈলীর দৌলতে সম্ভব নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু চাই। সেই অতিরিক্ত ধনে কান্তার ধনী।   

শেষ করার আগে একটা কথাই বলার। নাগরিকত্ব, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, এফ টি পীড়িত সাধারণ নাগরিকের জীবনের ভাষ্য কতটা সফল বা সার্থক ভাবে রূপায়িত হল তার নিরীক্ষা এ নিবন্ধের উদ্দিষ্ট নয় কোন ভাবেই। আলোচিত গল্প সমূহের সাহিত্যিক মূল্য কী ও কতটা তার বিচারের ভার আগামী কালের কাঁধেই নাহয় অর্পিত হোক। আলাদা করে প্রতিটি গল্পের  মূল্য নির্ধারণ অবান্তর, অর্থহীন। যেহেতু এই গল্পগুলো একে অপরের পরিপূরক, এক সমগ্রের অপরিহার্য অংশ। কোনোটিই তুচ্ছ নয়। সংযোজ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে বসবাস করেও আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। বিভাজনের ঘৃণ্য রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গল্পগুলো মানবিক প্রমূল্য প্রতিষ্ঠার আন্তরিক প্রয়াস করেছে নিঃসন্দেহে। সে প্রয়াসেই তাদের সার্থকতা। এই বিপন্ন সময়ে গল্পকারেরা যে তাঁদের সামাজিক ভূমিকাও পালন করেছেন সাহস ও সততার সঙ্গে আপাতত সেকথা অকুন্ঠ চিত্তে স্বীকার করাই পাঠক হিসাবে আমাদের আশু কর্তব্য। বুলু শব্দকর-অর্জুন নমঃশূদ্র- দুলালচন্দ্র পাল-খালু দাস’রা ‘কাগজের স্বদেশ’ ছিন্নভিন্ন করে ‘দিচ্ছে ডাক’ - প্রকৃত স্বদেশ গড়ার। গল্পকারেরা সে ডাকে সাড়া দিয়েছেন প্রবল ভাবে। এবার পাঠকের পালা, সে ডাকে সাড়া  দেবার জন্য দৈনন্দিন-দীনতার-কাছে-হাঁটু-মুড়ে-বসা পাঠক প্রস্তুতির সঙ্কল্প নেবেন কি না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর সে প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের কতটা জবাবদিহি তে হবে না হবে তার হিসেব-নিকেষ  

 

 

 

    

একটি কৈফিয়তঃ লেখাটি সীমিত সময়ের তৎপরতায় শরীরি হয়েছে, ফলে প্রকাশিত অথচ আমার পাঠ পরিধির বাইরে থেকে যাওয়া কিছু গল্প এবং হাতের কাছে না-থাকা আরো কিছু গল্প আলোচিত হয়নি। সে তালিকায় মলয় কান্তি দে, রণবীর পুরকায়স্থ সম গল্পকারও অন্তর্ভুক্ত, এই খামতি পরবর্তীতে পূরণের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা রইল।

  

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১২

‘বিসর্জন’ : বিকল্প পাঠের অবকাশ


শিল্পসাহিত্যের আলোচনায় বহুদিনের প্রকরণবাদী ধ্যানধারণা বিংশ শতাব্দির শেষে এসে এক বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। রচনা কর্মের বিশেষ একটি নির্দিষ্ট পাঠ অথবা ব্যাখ্যা, এমনকি তা যদি রচনাকারের সমর্থনপুষ্টও হয়, গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন, নানান সমস্যা ও সন্দেহ ক্রমশ দানা বাধতে শুরু করে। প্রকরণবাদী সমালোচনার ধারাটি মূলত রচনা কর্মের কোন এক নির্ধারিত কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হত। কেন্দ্রে স্থিত হয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ গ্রহণের সীমিত স্বাধীনতাটুকু মাত্র সমালোচককে দেওয়া হত। কতকগুলো বিশেষ চিহ্ন বা চিহ্নসমষ্টি ও ইমেজ  নির্দিষ্ট কিংবা বিশেষ অর্থে গৃহীত হত। এই পদ্ধতিটির মূলে কুঠারাঘাত করে বসলেন জাঁক দেরিদা নামে এক জাঁদরেল চিন্তাবিদ। ইনি বললেন, না পাঠকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আদপেই চলবে না। পাঠক তার নিজের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে রচনার মর্মোদ্ধার করবে, সেখানে লেখকের খবরদারি মোটেই খাটবে না। দেরিদা আরো অনেক দূর এগিয়েছেন এ বিষয়ে, তবে তাঁর বিনির্মাণ-তত্ত্ব আমাদের আলোচনার বস্তু নয় মোটেই। সাহিত্যের আলোচনায় পাঠ-বিকল্প বা বিকল্প পাঠরীতি-ই আমাদের উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিকল্প বা অন্যতর পাঠ বিষয়ে দেরিদা ছাড়া আরো অনেক জ্ঞানী-গুণীও বিভিন্ন পথ ও পদ্ধতির কথা বলেছেন। বিশেষ কোন মত ও পথের অনুসারী না হয়ে আমরা বরং এই বিকল্প পাঠরীতি প্রয়োগ করে তার ফলাফল কি দাঁড়ায় তা দেখায় বরং উৎসাহীআর তার জন্য রবীন্দ্রনাথেরবিসর্জননাটকটি আমরা নির্বাচন করেছি। খানিকটা দুঃসাহস নিয়েই।  
মূল আলোচনায় যাবার আগে কয়েকটা জরুরি কথা সেরে ফেলা দরকার। বিকল্প পাঠের মূল কথা হচ্ছে রচনা কর্মের স্বীকৃত (বা স্থিরীকৃত) ‘সত্য’-কে উন্মোচিত করে তারপর বিভিন্ন উপায়ে তাকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া। উদ্দেশ্য, নিহিতার্থের অনুসন্ধান। যেহেতু এই পদ্ধতি অনুসারী সমালোচকদের মতানুসারে কোন রচনার নির্দিষ্ট অর্থ (অথবা সত্য) থাকার ধারণাটিই অবাস্তব, আজগুবি। অর্থ-বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় রচনা কর্মের অন্তর্গত স্ববিরোধিতা সমূহ, গুরুত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন দ্বন্দ্বের অবাধ ও মুক্তক্রীড়ার (free play) ওপর। লেখক কিংবা পাঠক যেখানে কোনো এক সাধারণ ধারণা  থেকে রচনা বা পাঠকর্ম আরম্ভ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে বিকল্প পাঠের শুরু হয় ধারণাগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করে অথবা প্রত্যাহ্বান জানিয়ে। পাঠ্যবস্তুর সর্বজনমান্য কোনো বিশেষ’ অর্থের বিপরীতে নির্বিশেষঅর্থের সন্ধানে ব্রতী হয় বিকল্প পাঠ এই পাঠ-পদ্ধতি নির্দিষ্ট কোন কেন্দ্রে স্থিত হওয়ার বিপরীতে গ্রন্থ-সীমা অতিক্রম করে যেতেই আগ্রহী, কেননা তা বিবিধ স্বর ও বহুলার্থের অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দেয়। উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন যুগে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার মূলে থাকে এই নূতন পাঠ প্রচলিত কিংবা নির্দিষ্ট  ব্যাখ্যার (fixed interpretation) পরিবর্তে এই নতুন পাঠের মাধ্যমে মেলে অন্য বহুতর ব্যাখ্যা, উন্মোচিত হয় নানা নতুন দিকরচনার পুনর্জন্ম ঘটে।
বিসর্জননাটকের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে পাঠ-প্রতিক্রিয়া কেমন দাঁড়ায়। বিসর্জন নাটকে পুরুষ-স্ত্রী (male-female) দ্বন্দ্বটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে পুরোহিততন্ত্র ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়। পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণা অনুসারে নারীর উপর পুরুষের সামাজিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতেও তা সমান ভাবে প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে নাটকটি রচনা করেন সে সময় ভারতীয় সমাজে রাজনীতির চেয়ে ধর্মের প্রভাব এবং প্রাধান্য ছিল অবিসম্বাদিত। এই hierarchy বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে রাজা গোবিন্দের বলিপ্রথা রোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে। ধর্মীয় প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে নিষ্পাপ প্রাণের বলি ও অযথা রক্তপাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো রাজা গোবিন্দ এক আধুনিক প্রমূল্যের প্রতিভূ হিসেবেই গৃহীত হন সাধারণ পাঠকের কাছে। কিন্তু গভীরতর পর্যবেক্ষনে আমরা দেখব যে এই ধারণাটি যুক্তি পরম্পরায় যথেষ্ট শক্ত ভূমির উপর স্থিত নয়। নাটকের বিন্যাসে, বিভিন্ন চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তা স্পষ্ট। আর সে কারণেই আমরা দেখি যে মূলত অযথা রক্তপাতনিবারণের উদ্দেশ্য নিয়ে নাটকের শুরু হলেও পরিশেষে ব্যাপক রক্তপাত অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেনাট্যকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই যেন নাটকের মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি ঘটে। দেরিদা-র মতো অনেকেই মনে করেন যে  এই অনিশ্চয়তা যে কোন সাহিত্যকর্মের অন্তর্গত ও অনিবার্য বৈশিষ্ট। আর সে কারণেই রচনার নিশ্চয়ার্থবস্তুত থাকা অসম্ভব, তা আসলে প্রসঙ্গ নির্ভর। প্রসঙ্গের বদল ঘটলে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটেপুনঃপাঠ বা নূতন পাঠের যৌক্তিকতা ঠিক এখানেই।

 
      রাজা গোবিন্দ পোষা ছাগশিশুর মৃত্যুকেন্দ্রিক শিশুমনের মনোকষ্টে বিচলিত হয়ে বলি প্রথা নিবারণের সিদ্ধান্ত নেন। ধর্মীয় প্রথার এই বিরুদ্ধাচরণ রাজাকে কিন্তু করতে হয় উপাস্য দেবতার (কালী) দোহাই দিয়েই। দেবী রাজাকে স্বপ্নাদেশ করেছেন পশুবলি বন্ধের জন্য, এবং যেহেতু দেবীর আদেশ সব আইনের ঊর্ধ্বে তাই রাজার  পক্ষে তা অমান্য করা অসম্ভব, এই যুক্তিতেদেবীর নামেই পশুবলি, আবার দেবীর  নির্দেশেই তা রোধের প্রয়াস -এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে পরস্পরবিরোধিতা, এক কূটাভাস (paradox) এরকম পরস্পরবিরোধিতা এবং দ্ব্যর্থতা (ambiguity) নাটকের সর্বত্র বিদ্যমান। আমরা তারই হদিশ নেবার চেষ্টা করব আমাদের সীমিত ক্ষমতা এবং পরিসরের মধ্যেই
দেবী কালীর যে প্রতিমূর্তি তার মধ্যেও রয়েছে সাংঘাতিক বৈপরিত্য, বিরোধাভাস - দেবীমূর্তি যেন দ্বৈতসত্তার আধার স্বরূপ। তাঁর বাম হস্তদ্বয় তরবারি ও অসুরের ছিন্নমুণ্ড ধারণ করে আছে, আর ডান হস্তদ্বয়ে জ্ঞান ও অভয় মুদ্রা বাস্তব জীবনে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করার প্রয়োজনীয়তা ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে কর্ম করে যাওয়ার কথাই যেন এই মূর্তি রচনার মধ্যে প্রতীকায়িত। নাটকে রাজা গোবিন্দ ও রানি গুণবতীর সংঘাতও বাস্তবিক অর্থে জীবন এবং  মৃত্যুর সংঘর্ষ রূপেই হাজির হয়। দেবী কালী একদিকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের (war & bloodshed) এবং অন্যদিকে উর্বরতার (fertility) প্রতীক। গুণবতী পশুবলি দিতে চান সন্তান লাভের আশায়, আর রাজা গোবিন্দ তা বন্ধ করতে উৎসুক অযথা মৃত্যুর হাত থেকে নিরীহ পশুদের রেহাই দেবার জন্য। দেবী কালীকে ঘিরে এই হেঁয়ালি ও স্ববিরোধিতার আবর্তে সৃষ্টি  হয় যে জটিল দ্বৈরথের তার উৎস ঠিক কোথায় সে হদিশ মেলে না কিছুতেই। অভিজ্ঞতার বাস্তবের সঙ্গে এমন এক পার্থক্য বা ব্যবধান তৈরি হয় যে রচনার বিষয়বস্তুর বাস্তব সীমায় কিংবা বিষয় সম্পর্কিত কোন প্রাক-ধারণা দিয়ে যার মীমাংসা বা সমাধান সম্ভব হয় নাবিকল্প পাঠের প্রবক্তারা তাই মনে করেন যে রচনা মাত্রেরই অভ্যন্তরে অর্থ-বিপর্যয়’ (অনর্থ)-এর এরকম অসংখ্য উপাদান বর্তমান থাকে যার দরুণ কোন স্থায়ী বা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা- (fixed interpretation) চূড়ান্ত বলে গণ্য হতে পারে নাসাহিত্যকৃতি মাত্রেই অনেকার্থক, বহুব্যঞ্জক 
কোন এক পর্যায়ে দেবী কালী নিজেই স্বর্গীয় অনুগ্রহ বা আনুকুল্যের প্রতিদানে পশুবলি চেয়েছেন, অন্যদিকে রাজা গোবিন্দের দাবি হল দেবী স্বয়ং বালিকার ছদ্মবেশে এর বিরুদ্ধে ঈশ্বরীয় ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। যাবতীয় ধর্মীয় রীতি মূলত নির্বাচিত ব্যাক্তি মারফৎ এরকম ঈশ্বরীয় প্রকাশের বিষয়ে আস্থাবান যদিও এর সত্যতা বিষয়ে নিশ্চিত বা নিঃসন্দেহ হওয়ার উপায় নেই। দুই যুযুধান পক্ষের কেন্দ্রে এক প্রতারক এবং অনুপূরক ধারণা হিসেবেই এজাতীয় ঈশ্বরীয় প্রকাশ’ (অলীক সত্যবাদিতা) বিরাজ করে যা আসলে বস্তুও নয়, বস্তুসারও না। অস্তিএবং নাস্তির অবাধ ক্রীড়া মাত্র। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কর্তৃত্ব স্বেচ্ছাচারী হলে নিরীহের রক্ত ঝরবে এ কথা নাটকে সরাসরি বলা হয়নি যদিও তার প্রান্তিক অবস্থান অনস্বীকার্য। একই ভাবে যার রক্ততৃষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় নাটকটি সেই দেবী কালীর উপস্থিতি মূল রচনার প্রান্তসীমায়, অথচ মুখ্য চরিত্রের উপর দেবীর কর্তৃত্ব সর্বময়     
জয়সিংহ চরিত্রের অসঙ্গতি আরো গভীর। আশৈশব মন্দিরের পুরোহিতের সেবক রূপে কালীর উপাসক হিসেবেই বেড়ে উঠেছে সে। অথচ দেবী এবং গুরু পুরোহিতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সে ছাগশিশুটিকে রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয় মেয়েটির কাছে। যে রাজাকে পূর্ণচন্দ্র রূপে কালীর চেয়েও অধিক শ্রদ্ধা-ভক্তি করত সেই রাজাকেই (মন্দিরে বলি প্রথা অটুট রাখার জন্য) হত্যার ষড়যন্ত্রে পুরোহিতের সহযোগী হতেও দ্বিধাহীন সে। এখানেও আরেক বিরোধ, কূটাভাস। মানুষ, না দেবী-কার কর্তৃত্বের বাধ্যবাধকতা অধিক সে তা স্থির করতে অপারগ, অসমর্থবেদীর আড়ালের কন্ঠস্বর পুরোহিতের না দেবীর তা জানা কিংবা না-জানায় তার যায় আসে না কিছু। তার আনুগত্য, ভালোবাসা আদিম এবং জান্তব। সে নিষ্পাপ, আবার বয়সের অনুপাতে বিচক্ষণ। নাটকের সমাপ্তিতে সে নিজেকেই হত্যা করে, উপাস্য দেবীকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে - যে দেবীর উপর তার সন্দেহ জেগেছে, বিশ্বাস টুটে গেছে এও আরেক দ্ব্যর্থতা -দেবী, না কি নিজের ওপর প্রতিশোধ নেয় জয়সিংহ তা অমীমাংসিত থেকে যায়।
নির্বোধ পশুর অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত রোধ কল্পে যে নাটকের আরম্ভ ও বিস্তার, পরিণতিতে তা সামাজিক সংঘাত ও সংঘর্ষের জটিল পরিক্রমা শেষে নিরপরাধ মানব সন্তানের রক্তে স্নাত হয়। অনেকটা ক্লাসিক ট্র্যাজেডির ধাঁচেই। কাজেই এক অমানুষিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে রচিত এই নাটক- এরকমের অতিসরলীকৃত ব্যাখ্যা আজকের পাঠকের কাছে গৃহীত হবার যোগ্য নয়। ধর্মীয় প্রথা, প্রতিষ্ঠিত সত্য অথবা সামাজিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা যে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে তার ইঙ্গিতও হয়ত বা রয়েছে নাটকের পরিধিতে নাট্যকারের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য সাপেক্ষে কিংবা নিরপেক্ষ ভাবেই। উচ্চমানের সাহিত্যকৃতি মাত্রই বিকল্প পাঠের বহুতর সম্ভাবনা অন্তরে ধারণ করে থাকে। পুনঃপাঠের মাধ্যমে খুলে যায় সে সব বন্ধ দুয়ার। রবীন্দ্ররচনার বহু ক্ষেত্রে রয়েছে পাঠকের মুক্তক্রীড়ার প্রচুর অবকাশ। প্রচলিত পাঠের পরিবর্তে বিকল্প পাঠ হয়ত স্পষ্ট করে তুলতে পারে সেই না-বোঝা না-দেখা অনেকান্তক পথরেখা বিষয়াবদ্ধ হয়ে নয়, রচনার কাঠামো কিংবা বিষয়বস্তুর পরিসীমা  অতিক্রম করেই বোধহয় মেলে সাহিত্য পাঠের যথার্থ ব্যঞ্জনা। রবীন্দ্রসাহিত্যের মর্মোদ্ধারেও প্রয়োজন উন্মুক্ত পাঠের অবাধ অবকাশ।
      

আবৃত্তি প্রতিযোগিতা স্মরণিকা / বলাকা, ডিগবয় ২০১১









 

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

রবীন্দ্রনাথ ও একটি খুনের মামলা 


 মৃন্ময় দেব 





‘মরণ’!
 ফাঁসির আগে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে চায় কিনা জানতে চাইলে ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরা ওই রহস্যময় শব্দটি উচ্চারণ করেছিল। বাঙালি পাঠক মাত্রেই জানেন যে ওই একটি মাত্র শব্দের অমোঘ প্রয়োগে রবীন্দ্রনাথ কি সাংঘাতিক অভিঘাত তৈরি করেন। কেবল তাই নয়, ছোটগল্পের সমাপ্তি হিসেবে শব্দশিল্পের কারুকৃতি উৎকর্ষের কোন শিখর স্পর্শ করতে সমর্থ এ গল্প তার বিরল দৃষ্টান্ত বইকি! সাহিত্য বিচারের নান্দনিক তুলাদণ্ডে এ গল্প যে একশ শতাংশ নম্বর পাওয়ার অধিকারী সে বিষয়ে সন্দেহের লেশ মাত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু নান্দনিক তৃপ্তিই তো সব নয়, শেষ কথাও নয়। সাহিত্য রচনার একটা বৈষয়িক অভিপ্রায়ও যে থাকে, প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রত্যক্ষ, অন্তত রবীন্দ্রনাথের গল্পে যে থাকেই সে তো অস্বীকারের জো নেই। ‘শাস্তি’ গল্পের সুঠাম শরীরটিকে খানিকটা কাঁটাছেঁড়া করে দেখা যাক সে অভিপ্রায়টি স্পষ্ট হয় কিনা! ‘শাস্তি’ গল্পের পরিসমাপ্তিতে আদালত চন্দরাকে শাস্তি দিল নাকি চন্দরা স্বামীর অবিচারের শোধ নিল (অথবা স্বামীকে শাস্তি দিল) এই ‘অমীমাংসিত’ প্রশ্নের জন্যই গল্পটি নাকি সার্থক এরকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন বহু অভিজ্ঞ বিশ্লেষক। কেউ কেউ আবার চন্দরার চরিত্রে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও খুঁজে পান। আমরা একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিরীক্ষণ করার প্রয়াস করব, এবং আমাদের প্রয়াসে গল্প থেকেই প্রয়োজনীয় সাক্ষী-সাবুদ পেশ করব। তবে তার আগে ওই ‘মরণ’ শব্দটি সম্পর্কে দু একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। প্রথমত, বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্যের পরিচয় ব্যতিরেকে শব্দটির মর্মোদ্ধার যে অসম্ভব এবং ভাষান্তরে তা যে কিছুতেই প্রকাশযোগ্য নয় তা স্বীকার করে নেওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, ‘মরণ’ শব্দটির উচ্চারণে রাগ, অভিমান ও ক্ষোভের অভিব্যক্তি যেমন রয়েছে, তেমনি তার মধ্যে দাম্পত্যের আকর্ষণ-বিকর্ষণ মিশ্রিত অম্লমধুর সম্পর্কের- ইংরেজিতে erotic বলতে যা বোঝায় তার - আভাসও অবর্তমান নয়। আর সে কারণেই শব্দটির অসাধারণ ব্যঞ্জনা গল্পের শেষে এক অনন্য অভিঘাত তৈরি করতে সক্ষম হয়, নির্মাণের দিক থেকে সার্থকতার নিদর্শন হয়ে ওঠে। তবু, গল্পের সময়, সামাজিক প্রেক্ষিত ইত্যাদির নিরিখে অব্যর্থ ‘মরণ’ শব্দটি উৎসারিত হয় যে চরিত্রটির মুখ থেকে, সেই চন্দরা নাম্নী গৃহবধূর চরিত্রটি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের পটভূমিতে কিভাবে ও কতটা সার্থক বা অসার্থক ভাবে চিত্রিত হয়েছে তা একটু খতিয়ে দেখা যেতেই পারে। ‘মরণ’ শব্দটির অনুষঙ্গে চন্দরার চরিত্রে আদৌ কোনো বিশেষ মাত্রা সংযোজিত হয়েছে কিনা একটু খতিয়ে দেখাই যাক না! গল্পের মধ্যে ঘটনা বলতে যেটুকু তা হচ্ছে, দুখিরামের হাতে ‘আকস্মিক ভাবে’ তার স্ত্রী রাধার খুন হওয়া ও দুখিরামকে বাঁচাতে খুনের দায় চন্দরার ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা। মজার বিষয় হচ্ছে যে, চন্দরার স্বামীই পরিকল্পনাটির উদ্ভাবক এবং সে চন্দরাকে দায়টা মাথা পেতে নিতে অনুরোধ পর্যন্ত করে। এই অস্বাভাবিক অনুরোধের জন্য সামান্য অস্বস্তিও সে বোধ করে বলে চন্দরার শাস্তি মকুব করার আশ্বাসও সে দেয়, যদিও শাস্তি মকুবের ব্যাপারে সে নিজেই নিশ্চিত হতে পারে না। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত চন্দরা প্রাথমিক বিমূঢ়তা কাটিয়ে, বলা যায়, বিক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে ছিদামের কথা মত আত্মরক্ষার চেষ্টামাত্র না করে। এই গল্পের খুনের মামলায় পাত্র-পাত্রীরা কে কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ এবং তার বিচার-বিশ্লেষণ থেকে কি তথ্য সংগৃহীত হয় দেখা যাক। ‘শাস্তি’ গল্পটির বিভিন্ন স্তর ও মাত্রা বর্তমান। কেন্দ্রিয় স্তরে রয়েছে চন্দরা-ছিদাম সম্পর্ক। এই দাম্পত্য সম্পর্কের আপাত স্বতন্ত্রতা বিঘ্নিত হয় খুনের ঘটনার ফলে। কেন্দ্রাতিগ স্তরে রয়েছে একটি যৌথ পরিবারের চিত্র, যা আবার এক বিশেষ সময় ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বিন্যস্ত। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, চরিত্রগুলি এতটাই সুবিন্যস্ত যে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কিংবা বাস্তবতা নিয়ে আদৌ কোন প্রশ্ন ওঠে না। প্রশ্ন ওঠে না ঠিক, তবে এই বিন্যাস যে সরল ও একরৈখিক নয়, বরং বেশ জটিল সেও স্বীকার্য। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। দুখিরাম সন্ধেবেলা কাজ থেকে ফিরে ভাত দিতে বললে বড় বউ উত্তরে বলে - 'ভাত কোথায় যে ভাত দিব। তুই কি চাল দিয়া গিয়াছিলি। আমি কি নিজে রোজগার করিয়া আনিব।' আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে - (লেখকের মতে) শেষ কথাটার ‘কুৎসিত শ্লেষ’ অসহ্য বোধ হওয়ায় - দুখিরাম খুনটা করে ফেলে। লক্ষণীয় যে ঘরের বউয়ের রোজগার করে আনার বিষয়টি এক নিতান্ত ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ পরিবারের পুরুষ কর্তাটির কাছেই কেবল আপত্তিকর ও অমর্যাদাকর নয়, গল্পকার রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত তার মধ্যে ‘কুৎসিত শ্লেষ’ দেখতে পান। এক্ষেত্রে ‘আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদাভেদ নাই’ – রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দুখিরামেরও আশ্চর্য মিল। ঊনবিংশ শতাব্দির বহু বিজ্ঞাপিত আলোক যে পুরুষতান্ত্রিকতার দুয়ার ভাঙতে পারেনি এ নিশ্চয় তারও প্রমাণ! খুনের ঘটনার খানিক বাদে রামলোচন এসে হাজির হলে ছিদাম যখন বউয়ের কাঁধে দোষ চাপিয়ে বাঁচবার উপায় জানতে চায় তখন রামলোচন কিন্তু ‘ভাত দেয় নি বলে দুখি খুন করে ফেলেছে’ কথাটাই থানায় গিয়ে বলার পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ, রামলোচনের অভিজ্ঞতায় উক্ত কারণটির সামাজিক, এবং এমনকি ‘আইনি’ বিশ্বাসযোগ্যতা যে বর্তমান সেটা স্পষ্ট। ওরকম সংসারে খুনের আর্থ-সামাজিক সম্ভাব্য ও বিশ্বাসযোগ্য কারণটি যা হতে পারে সে বিষয়ে রামলোচন অবশ্যই ওয়াকিবহাল। গল্পের প্রারম্ভে গল্পকার ‘জন খাটতে যাওয়া’ দুখি-ছিদামের চিত্তবিক্ষোভের বাস্তব কারণ ব্যাখ্যাও করেছেন নিপুণতার সঙ্গে। দেখা যাচ্ছে খুনের ঘটনার ‘সত্য’ আর প্রাণ বাঁচানোর উপায় হিসেবে রামলোচনের বাতলানো ‘মিথ্যা’ একাকার হয়ে জায়গা বদল করে নিচ্ছে। গল্পের পরিণতিতেও আমরা দেখি কিভাবে ‘বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপিত মিথ্যা’ সমাজ তথা আইনের চোখেও ‘সত্যে’র মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হয়। সে যা হোক, গল্পের উপজীব্য কিন্তু এক মর্মন্তুদ খুনের ট্র্যাজিক বাস্তবতা নয়, বরঞ্চ খুন পরবর্তী একটি মিথ্যার সূত্রে গড়ে ওঠা চন্দরা নাম্নী নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। দাম্পত্য নামক একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে গড়ে ওঠা চন্দরার জীবনের এই সংকট যে আসলে সমাজ নির্দিষ্ট সেটাই দেখানোর প্রয়াস থাকবে নিবন্ধের পরবর্তী অংশে। চন্দরাই এ গল্পের প্রোটাগোনিস্ট চরিত্র। গল্পের বিন্যাস এমন যে মনে হতে পারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক নিয়মতান্ত্রিকতায় পুরুষের আধিপত্য অথবা নারীর অধীনতার বিষয়টি এখানে ‘হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ’ অবস্থায় রয়েছ। চন্দরা বুঝি পুরুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক চপেটাঘাত। বস্তুত এ গল্প সম্পর্কে এরকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন বহু বিদগ্ধ সমালোচক। গল্পের পরিণতিতে এ ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক সচেতন ও সযত্ন নির্মাণ-কৌশল। গল্পপাঠের অভিজ্ঞতায় সাধারণত যেসব তথ্য আপাত গুরুত্বহীন বিবেচিত হয়ে থাকে নিবিড় পাঠে বহুক্ষেত্রে তারাই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আপাত গুরুত্বহীন এইসব তথ্যের সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে ‘শাস্তি’ গল্পে আগাগোড়া পুরুষের নিরঙ্কুশ প্রাধান্যই প্রতিষ্ঠিত। গল্পের আরম্ভেই পাঠক ‘রমণীরা সচরাচর কলহপ্রিয়’ এই প্রচারিত ধারণার অলিন্দে চন্দরাকে আবিষ্কার করেন। সন্দেহের বশে ছিদামের তাকে ঘরে দরজা বন্ধ করে আটকে রাখা, অন্যান্য খুঁটিনাটি বর্ণনা এবং চন্দরার ঘাড়ে খুনের দায় চাপানোর সপক্ষে সে যে যুক্তি দেয় ('ঠাকুর, বউ গেলে বউ পাইব, কিন্তু আমার ভাই ফাঁসি গেলে আর তো ভাই পাইব না1’) তা থেকেও পুরুষ প্রাধান্যের বিষয়টি অবিতর্কিত ভাবেই প্রতিষ্ঠিত। এমনকি রবীন্দ্রনাথও ‘সারাদিনের শ্রান্তি ও লাঞ্ছনার পর অন্নহীন নিরানন্দ অন্ধকার ঘরে প্রজ্বলিত ক্ষুধানলে গৃহিণীর রুক্ষবচন’ শুনলে পুরুষ কর্তাটির মাথা ঠিক রাখা যে দায় তেমন অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। ভাবটা এমন যে দুখিরামের বউ রাধা বুঝি সারাদিন পাটরানী সেজে বসে থাকার সৌভাগ্য নিয়ে ওই পরিবারে এসেছে। ক্ষুধার জ্বালা রাধাদের যেন থাকতে নেই, ‘দেড় বৎসরের ছোটো ছেলেটি কাঁদিতেছিল’ (সম্ভবত পেটের খিদেয়) - সে তথ্য সরবরাহ করা সত্ত্বেও রাধার মত নিরুপায় মায়েদের ক্ষুব্ধ হবার কারণ খুঁজে পান না মরমী রবীন্দ্রনাথ। আরো আশ্চর্যের বিষয় যে, চন্দরার ঘাড়ে দোষ চাপানোর নীচ পরিকল্পনাটিকে পর্যন্ত তিনি নিতান্ত হালকা করে ফেলার চেষ্টা করেন। এমন ভাব করেন যে ছিদাম যেন আগপিছ না ভেবে আচমকা একটা মিথ্যে কথা বলে ফেলে জালে জড়িয়ে গেছে। “... যখন নিজের স্ত্রীর নামে দোষারোপ করিয়াছিল তখন এ সকল কথা ভাবে নাই। তাড়াতাড়িতে একটা কাজ করিয়া ফেলিয়াছে, এখন অলক্ষিতভাবে মন আপনার পক্ষে যুক্তি এবং প্রবোধ সঞ্চয় করিতেছে”। মনোযোগী পাঠকের পক্ষে এমন ওকালতি মেনে নেওয়া কষ্টকর যেহেতু বউ মরলে যে বউ পাওয়া যাবে সে বিষয়ে ছিদামের বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। পুরুষের পক্ষে পুরুষের যুক্তি যেমন হওয়া উচিত এও তেমন। উল্লেখযোগ্য যে, ছিদামের পক্ষ অবলম্বন করে এ যুক্তি আসলে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। কিন্তু তার প্রয়োজন হল কেন? হল এই কারণে যে, ‘কাজটা যে ছিদাম ঠিক করেনি’ সেকথাটা সাধারণ পাঠকের মত লেখক নিজেও জানেন এবং মানেনও। এরকম স্ববিরোধিতার উদাহরণ আরো আছে গল্পটিতে। রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় চন্দরা হল ‘একখানি নূতন-তৈরি নৌকার মতো’, আর ওই নূতন নৌকায় সওয়ার হয়েই দুখি-ছিদাম পাপের পাথার পাড়ি দেয়। নৌ-চালনার দায়িত্বে থাকেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এমন কোন তথ্য গল্পকার আমাদের দেননি যাতে চন্দরার চরিত্রে কোন প্রতিবাদী লক্ষণ স্পষ্ট হয়। গোসা করে মামাবাড়ি চলে গেলেও ফিরে আসতে তার দেরিও হয় না। বড় জোর চন্দরা চটপটে চালাক-চতুর মেয়ে এই পর্যন্ত ধারণায় আসে মাত্র। এই প্রেক্ষাপটে চন্দরার ‘আত্মাহুতি’ যে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রূপে বিবেচ্য হতে পারে না তা সহজেই অনুমেয়। কাজেই ‘আদালত চন্দরাকে শাস্তি দিল না চন্দরা ছিদামকে শাস্তি দিল’ এরকম দ্ব্যর্থতার অনুসন্ধানকে কষ্টকল্পনা বলে চালানোও দুষ্কর। এ আসলে পুরুষালি জবরদস্তি ছাড়া কিছু নয়। পুরুষের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যদি মুখ্য হত তাহলে চন্দরা সরাসরি খুনের দায় গ্রহণে অসম্মতি জানাতো যা সে করেনি। চন্দরা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মৃত জায়ের ওপর মিথ্যে দোষারোপ করা থেকে বিরত থেকেছে মাত্র। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা প্রতিবাদের পরিণামেই দুখির বউকে খুন হতে হয়। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে খুনের দায় স্বীকার করা অব্দি চন্দরা স্বামীর নির্দেশ রাগে-দুঃখে-অভিমানে হলেও পালন করেছে। স্বামীর অনুরোধে প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যে কথা বলেনি শুধু অভিমানের বশে। তাছাড়া রাধার সঙ্গে ‘নিত্য কলহ’ সত্ত্বেও বস্তুত সে তার চক্ষুশূল ছিল না। আদালতে ‘আমি তাকে দেখতে পারতাম না’ উক্তির অন্তর্গত তীক্ষ্ণ শ্লেষ সে সাক্ষ্যই দেয়। মৃতের ওপর মিথ্যে দোষারোপ যে আসলে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ স্বরূপ তা জানে বলেই চন্দরার সে কাজে রুচি হয় না, আত্মরক্ষার প্রয়োজনেও না। এতদিন যে সে সব সহ্য করেও সংসারে মানিয়ে চলেছিল সে তো এজন্যই যে তার ধারণা ছিল ‘স্বামী তাকে ভালবাসে’। কিন্তু ভালবাসার কল্পিত সৌধটি এক লহমায় চৌচির হয়ে যেতে দেখে বেঁচে থাকাটাই চন্দরার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। ছিদামরূপী তার একান্ত পুরুষটির ভালবাসার কপটতা উপলব্ধি করে স্বভাবতই চন্দরা ভেতরে ভেতরে অভিমানে ফেটে পড়ে, আত্মরক্ষার চেষ্টা পর্যন্ত করে না। ফাঁসির আগে ছিদামের সঙ্গে দেখা করতেও অস্বীকার করে সেই অভিমানবশতই। তখন সে ‘স্বামী রাক্ষসের’ হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেও চায় না। পিতৃতান্ত্রিকতার নিগড়ে বাঁধা জীবনে পারিবারিক চৌকাঠ ডিঙানোর সামর্থ্যহীন অনন্যোপায় নারীর পক্ষে ওই পরিস্থিতিতে মৃত্যু ছাড়া পরিত্রাণের অন্য পথ দৃষ্টিগোচর হয় না। খুব সচেতনভাবে না হলেও ওই ‘স্বামী রাক্ষস’ শব্দটির ব্যবহার বলে দেয় যে নারীর ওপর স্বামী-পুরুষের নির্যাতন বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ অনবহিত ছিলেন না। রামায়ণের কাল হলে চন্দরার ‘পাতাল প্রবেশ’ ছাড়া গতি ছিল না। শেষবারের মত মা-কে দেখতে চাওয়াও সে হিসেবে অর্থবহ – ‘ধরণী দ্বিধা হও’ বলার পরিস্থিতি নেই বলেই হয়ত গর্ভধারিণীর কোলে মুখ লুকোনোর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে সে। গল্পকার রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসাধারণ নির্মাণ কুশলতায় চন্দরাকে ‘মহিয়সী’ করে গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন পুরুষ-প্রাধান্যের স্বার্থেই, কারণ গল্পের পরিশেষের নাটকীয় মোচড় সত্ত্বেও বস্তুত চন্দরার মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে পিতৃতন্ত্রের স্বার্থই চরিতার্থতা লাভ করে। গল্পের সমাপ্তির যে আপাত দ্ব্যর্থবোধকতা তার ধরন অবশ্যই রক্ষণাত্মক। সাধারণ পাঠকের এমন মনে হতেই পারে যে চন্দরা বুঝি নিজেই মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। আর তাই যদি হয় তো আদালতের মৃত্যুদণ্ড প্রদান অর্থহীন ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। স্বেচ্ছায় যে মৃত্যুবরণ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া কি আদালতের পক্ষেও সম্ভব? এই অনুচ্চারিত যুক্তি-পরম্পরার অবলম্বন ব্যতিরেকে গল্পের পরিসমাপ্তি পাঠকের কাছে গৃহীত হবার যোগ্যই নয়। বলা বাহুল্য, এই প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে একথাও মেনে নিতে পাঠক বাধ্য হন যে চন্দরার মধ্যে আসলে এক অসাধারণ ‘আত্মশক্তি’, প্রায় ঐশ্বরিকও বলা চলে, রয়েছে যার জোরে সে মৃত্যুকেও স্বেচ্ছায় আলিঙ্গন করতে পিছপা হয় না। অর্থাৎ, চন্দরা সামান্য নারীমাত্র নয়। কিন্তু চন্দরা সে শক্তি পাবে কোথায়? তার সামাজিক প্রেক্ষিত ও অবস্থান তাকে সে সামর্থ্য অর্জনের সুযোগ দেয় না, দিতে পারে না। আর দিতে পারে না বলেই লেখক রবীন্দ্রনাথ চন্দরাকে সে সুযোগ করে দেন। অর্থাৎ, নিজের ইচ্ছায় নয়, চন্দরাকে মরতে হয় তারই স্রষ্টার অভিপ্রায়ে। ঘোমটা ঈষৎ ফাঁক করে বাইরের যা কিছু এক লহমায় দেখে নেবার তৎপরতার মধ্যে যে জীবনাসক্তি ব্যক্ত তা থেকে এও তো স্পষ্ট যে চন্দরা (তার স্রষ্টার মতই) এমন অনায়াসে ‘মরিতে চাহে না’, যদিও তার ভুবনটি তার স্রষ্টার ভুবনের মত নিপাট সুন্দর নয়। কিন্তু তবু তাকে মরতে হয়? এই অন্যায় শাস্তি চন্দরাকে কেনই বা দিতে চান গল্পকার? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাবার আগে একটু অন্য কথা বলে নেওয়া যাক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটিকে রবীন্দ্রনাথ সামাজিক-রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষিতে বিন্যস্ত করেছেন। এবং সেই প্রেক্ষিতেও নির্দোষ চন্দরার জীবনের বাস্তবতা ও সত্যের আবেদন সামাজিক অথবা আইনি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠানের অসাড় অঙ্গে সামান্য সাড়া জাগাতেও সক্ষম হয় না। পক্ষান্তরে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের সাবেক স্বার্থ ও আধিপত্যই রক্ষিত হয় – যাকে দেখা হয় ‘পারিবারিক মর্যাদা’ রূপে। আর এরই জন্য উৎসর্গিত হয় চন্দরা। (আধুনিক গণমাধ্যমের ভাষায় honour killing ছাড়া আর কী-ই বা বলা যাবে একে!) এমন কি দুখিরামের স্বীকারোক্তি পর্যন্ত গ্রাহ্য হয় না, বরং আইনের অন্ধদৃষ্টি তার মধ্যে ঘরের বউকে রক্ষা করার পুরুষ-সুলভ বদান্যতা কিংবা মহানুভবতা খুঁজে পায়! পাবে নাই বা কেন, পুরুষের ‘রক্ষক’ ইমেজটি বজায় রাখার দায়িত্ব যে আইনের হাতে অর্পিত। আর একারণেই দুই উকিলের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চন্দরার পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয়টি সামান্য গুরুত্ব পর্যন্ত পায় না গল্পে, আদালতে! অথচ এর থেকে প্রমাণ হয় যে (গল্পকারের ঘোষণা অনুযায়ী) গাঁ-সুদ্ধ সকলেই একবাক্যে চন্দরাকে ‘খুনি’ সাব্যস্ত করেনি। সমালোচকরা তো ঘটনাটি লক্ষ্য অবধি করেন না। উকিল নিয়োগের সামর্থ্য না থাকা অভিযুক্তের জন্য দুজন উকিল যোগাড় করে দিয়ে গল্পকার হয়ত সামাজিক ও সরকারি ভদ্রতাটুকু বজায় রাখতে চেয়েছেন। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে গল্পের পেছনের পরিকল্পনাটি ছিল ‘ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার মত’ আগাগোড়া নিখুঁত। এদেশে এক কালে সতীদাহ প্রথা ছিল, সহমরণে যাবার জন্য অনুপ্রেরণা যোগানো হত। তারই এক আধুনিক নয়া সংস্করণ ও সম্প্রসারণ যেন দেখতে পাই চন্দরার আত্মবিসর্জনের মূলে। হিন্দুত্বের ধারাটি যদি সযত্নে লক্ষ করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে এদেশে অনিবার্য বিপর্যয়কালে দেশ-জাতি-সমাজ-পরিবারের মর্যাদা রক্ষার দায় চিরকাল নারীর কাঁধে বর্তেছে, চূড়ান্ত আত্মত্যাগের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে নারীর ওপর। সতীপ্রথা কিংবা জহর ব্রত ইত্যাদিকে মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা ও প্রবণতা সেই সত্যের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। উনিশ শতকের নায়করা নানা সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে নারীর ‘স্বাধীনতার গণ্ডি’ কিছু পরিমাণে বৃদ্ধি করার প্রয়াসী হয়েছিলেন যদিও, কিন্তু তাতে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ যাতে অটুট থাকে সে বিষয়েও পূর্ণ সজাগ থেকেছেন। এর ফলে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিষয়ক পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা কিছু পরিমাণে জটিল রূপ ধারণ করে। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক-রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে পুনর্বিন্যাস ঘটে তার ফলে জাতীয়তবাদী ধ্যান-ধারণায় নারীর সামাজিক অবস্থান ও ভূমিকা নির্ধারণের প্রশ্নে দেখা দেয় দ্বিমুখী বৈপরিত্য। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন এবং নারীর স্থান নির্দেশের এলাকা ভিত্তিক যে আদলটি তৈরি হয় তাকে ঘর/বাহির (অথবা বিশ্ব), আধ্যাত্মিক/বস্তুতান্ত্রিক, ব্যক্তিগত/সাধারণ, পূর্ব/পশ্চিম এবং নারী/পুরুষ এই দ্বিধা-বিভক্তি হিসাবে সনাক্ত করেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মত বিদগ্ধ ঐতিহাসিক ও সমাজতত্ত্ববিদরা। নারীর শারীরিক আবদ্ধতা (পর্দা প্রথা ইত্যাদি) মোচনের পক্ষে ওকালতি করে স্ত্রীশিক্ষার দৌলতে নারীকে ‘সক্ষম স্বাধীন’ করে তোলার উনিশ শতকীয় প্রস্তাবনার মধ্যে খাঁচাটাকে বৃহদায়তন ও তত্ত্বগত ভাবে গ্রহণীয় করে তোলাই যে মুখ্য ছিল তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বিভিন্ন আধুনিক গবেষক। এক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতা’ (freedom) শব্দটির এক সংকুচিত ভারতীয় তাৎপর্য নিরূপণ করে পাশ্চাত্যের ধারণা থেকে পৃথকীকরণের প্রয়াসও লক্ষণীয়। পাশ্চাত্যের ‘ফ্রীডম’ এদের বিচারে ‘যথেচ্ছাচার’, আর প্রাচ্যে তার অর্থ ‘অহং’ থেকে মুক্তি – অর্থাৎ, স্বেচ্ছা-অধীনতা। এই অনৈতিহাসিক বিচার-বিবেচনার দরুণ ঘরের বাইরে বহির্বিশ্বে নারীর বিচরণ সে পর্যন্তই অনুমোদিত হয় যে পর্যন্ত নারীর সনাতনী ‘সর্বং সহা’ কল্যানী মূর্তিটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চূর্ণ না হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সমঝোতা ও আপোষের ফলে পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনা যে পরিমাণে সাঙ্গীকৃত হয়েছে উনিশ শতকের বাঙালির পিতৃতান্ত্রিক মননে, প্রতিক্রিয়ায় সে অনুপাতেই দেখা দিয়েছে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণের এক অনৈতিহাসিক, অসুস্থ ও রক্ষণশীল প্রবণতা। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরাধীনতার বিপ্রতীপে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে ‘অন্তর্লোকের স্বাধীনতা’ অটুট রাখার ছদ্মতৃপ্তি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সমাজ সংস্কারকদের। জাতীয় মর্যাদার এই অন্তর্জগতেই (inner domain) হয় নারীর নয়া সংস্থান - স্ত্রী-ধর্ম পালনই যেখানে মুখ্য ও মোক্ষ স্বরূপ। আর এই মর্যাদা রক্ষার কল্পযুদ্ধে বলিপ্রদত্ত চন্দরারা যেন ‘মৃত্যুর নৈবেদ্য গেনু রাখি’ বলে ক্রমাগত অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। স্মর্তব্য যে, ‘মুক্তি’ কবিতার নায়িকাও সংসারের অবজ্ঞা অবহেলার হাত থেকে রেহাই পেতে মৃত্যুর মধ্যেই মুক্তি খুঁজেছে। নির্যাতিত নারীর নিরুপায় মৃত্যুবরণকে মহিমান্বিত করার এক নিরুপদ্রব প্রয়াস এবং প্রবণতা রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যত্রও বর্তমান। কেবল তাই নয়, রমাবাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথ তার জন্য তাত্ত্বিক ভিতও নির্মাণ করেন সচেতন ভাবে, অসাধারণ সতর্কতায়। পাঠক, এই উদ্ধৃতিটি লক্ষ্য করুন- “পূর্বকালে মেয়েরা পুরুষের অধীনতা গ্রহণকে একটা ধর্ম মনে করত তাতে এই হত যে, চরিত্রের ওপর অধীনতা কুফল ফলাতে পারত না, অর্থাৎ হীনতা জন্মাত না, এমনকি অধীনতাতেই চরিত্রের মহত্ত্ব সম্পাদন করত। প্রভুভক্তিকে যদি ধর্ম মনে করে তাহলে ভৃত্যের মনে মনুষ্যত্বের হানি হয় না ।” (রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে পত্র/পরিশিষ্ট,রবীন্দ্ররচনাবলী) চন্দরার চরিত্রে এই মহত্ত্বই রবীন্দ্রনাথ আরোপ করতে চেষ্টা করেছেন। স্বামী প্রভুর প্রতি ভক্তিধর্মে অচল থেকে স্ত্রী-ভৃত্যের মৃত্যুবরণে যে ‘মনুষ্যত্বের হানি হয় না’ বরং উজ্জ্বলতা বাড়ে এই বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠার জন্যই নিপুণতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চন্দরাকে সৃষ্টি করেন। কেননা তাঁর আজন্ম বিশ্বাস - “সাধ্বী স্ত্রীর প্রতি যদি কোনো স্বামী পাশব ব্যবহার করে, তবে সে-ব্যবহারের দ্বারা স্ত্রীর অধোগতি হয় না, বরং মহত্ত্বই বাড়ে। কিন্তু যখন একজন ইংরেজ পাখাটানা কুলিকে লাথি মারে তখন তাতে করে সেই কুলির উজ্জ্বলতা বাড়ে না।” (ঐ) নির্মাণের দিক থেকে অতুলনীয় হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দরুণ গল্পটি শেষ পর্যন্ত নারীর নিয়ন্ত্রিত মুক্তির উনিশ শতকীয় প্রয়াসের আড়ালে পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলটিকে আধুনিক সাংস্কৃতিক সাজ পরানোর পরিকল্পনার বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক নিদর্শন হয়ে থাকে মাত্র। পিতৃতন্ত্রের কাছে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শব্দশিল্পীর এই আত্মসমর্পণ, সে যে কারণেই হোক না কেন, চন্দরার আত্মাহুতির চাইতে কম বেদনাদায়ক নয় - অন্তত বাঙালি পাঠকের কাছে!

ব্লগ সংরক্ষাণাগার