শিল্পসাহিত্যের আলোচনায় বহুদিনের প্রকরণবাদী ধ্যানধারণা
বিংশ শতাব্দির শেষে এসে এক বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। রচনা কর্মের বিশেষ
একটি নির্দিষ্ট পাঠ অথবা ব্যাখ্যা, এমনকি তা
যদি রচনাকারের সমর্থনপুষ্টও হয়, গ্রহণের
ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন, নানান
সমস্যা ও সন্দেহ ক্রমশ দানা বাধতে শুরু করে। প্রকরণবাদী সমালোচনার ধারাটি মূলত রচনা
কর্মের কোন এক নির্ধারিত কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হত। কেন্দ্রে স্থিত হয়ে বিভিন্ন
দৃষ্টিকোণ গ্রহণের সীমিত স্বাধীনতাটুকু মাত্র সমালোচককে দেওয়া হত। কতকগুলো বিশেষ
চিহ্ন বা চিহ্নসমষ্টি ও ইমেজ নির্দিষ্ট
কিংবা বিশেষ অর্থে গৃহীত হত। এই পদ্ধতিটির মূলে কুঠারাঘাত করে বসলেন জাঁক দেরিদা
নামে এক জাঁদরেল চিন্তাবিদ। ইনি বললেন, না পাঠকের
স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আদপেই চলবে না। পাঠক তার নিজের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে রচনার
মর্মোদ্ধার করবে, সেখানে
লেখকের খবরদারি মোটেই খাটবে না। দেরিদা আরো অনেক দূর এগিয়েছেন এ বিষয়ে, তবে তাঁর বিনির্মাণ-তত্ত্ব আমাদের আলোচনার
বস্তু নয় মোটেই। সাহিত্যের আলোচনায় পাঠ-বিকল্প বা বিকল্প পাঠরীতি-ই আমাদের উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিকল্প বা
অন্যতর পাঠ বিষয়ে দেরিদা ছাড়া আরো অনেক
জ্ঞানী-গুণীও বিভিন্ন পথ ও
পদ্ধতির কথা বলেছেন। বিশেষ কোন মত ও পথের অনুসারী না হয়ে আমরা বরং এই বিকল্প
পাঠরীতি প্রয়োগ করে তার ফলাফল কি দাঁড়ায় তা দেখায় বরং উৎসাহী। আর তার জন্য
রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকটি আমরা নির্বাচন
করেছি। খানিকটা দুঃসাহস নিয়েই।
মূল আলোচনায় যাবার আগে কয়েকটা জরুরি কথা সেরে ফেলা দরকার।
বিকল্প পাঠের মূল কথা হচ্ছে রচনা কর্মের স্বীকৃত (বা স্থিরীকৃত) ‘সত্য’-কে উন্মোচিত করে তারপর বিভিন্ন উপায়ে তাকে বিপর্যস্ত করে
দেওয়া। উদ্দেশ্য, নিহিতার্থের অনুসন্ধান। যেহেতু এই পদ্ধতি অনুসারী সমালোচকদের মতানুসারে কোন রচনার
নির্দিষ্ট অর্থ (অথবা সত্য) থাকার ধারণাটিই অবাস্তব, আজগুবি। অর্থ-বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষেত্রে
শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় রচনা কর্মের অন্তর্গত স্ববিরোধিতা সমূহ, গুরুত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন
দ্বন্দ্বের অবাধ ও মুক্তক্রীড়ার (free play) ওপর। লেখক
কিংবা পাঠক যেখানে কোনো এক সাধারণ ধারণা থেকে রচনা বা পাঠকর্ম
আরম্ভ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে
বিকল্প পাঠের শুরু হয় ধারণাগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করে অথবা প্রত্যাহ্বান জানিয়ে। পাঠ্যবস্তুর
সর্বজনমান্য কোনো ‘বিশেষ’ অর্থের বিপরীতে ‘নির্বিশেষ’ অর্থের সন্ধানে ব্রতী হয়
বিকল্প পাঠ। এই পাঠ-পদ্ধতি নির্দিষ্ট কোন কেন্দ্রে স্থিত হওয়ার বিপরীতে গ্রন্থ-সীমা অতিক্রম করে যেতেই
আগ্রহী, কেননা তা
বিবিধ স্বর ও বহুলার্থের অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দেয়। উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন যুগে নতুন করে
প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার মূলে থাকে এই ‘নূতন পাঠ’। প্রচলিত কিংবা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার (fixed interpretation) পরিবর্তে এই নতুন পাঠের মাধ্যমে
মেলে অন্য বহুতর ব্যাখ্যা, উন্মোচিত হয়
নানা নতুন দিক। রচনার পুনর্জন্ম ঘটে।
‘বিসর্জন’ নাটকের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে পাঠ-প্রতিক্রিয়া কেমন
দাঁড়ায়। বিসর্জন নাটকে পুরুষ-স্ত্রী (male-female) দ্বন্দ্বটি বৃহত্তর
প্রেক্ষাপটে পুরোহিততন্ত্র ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়। পাশ্চাত্য
ধ্যান-ধারণা অনুসারে নারীর উপর
পুরুষের সামাজিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত। ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতেও তা সমান ভাবে প্রযোজ্য।
রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে নাটকটি রচনা করেন সে সময় ভারতীয় সমাজে রাজনীতির চেয়ে ধর্মের
প্রভাব এবং প্রাধান্য ছিল অবিসম্বাদিত। এই hierarchy বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে রাজা গোবিন্দের
বলিপ্রথা রোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে। ধর্মীয় প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে নিষ্পাপ
প্রাণের বলি ও অযথা রক্তপাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো রাজা গোবিন্দ এক আধুনিক প্রমূল্যের
প্রতিভূ হিসেবেই গৃহীত হন সাধারণ পাঠকের কাছে। কিন্তু গভীরতর পর্যবেক্ষনে আমরা
দেখব যে এই ধারণাটি যুক্তি পরম্পরায় যথেষ্ট শক্ত ভূমির উপর স্থিত নয়। নাটকের
বিন্যাসে, বিভিন্ন
চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তা স্পষ্ট। আর সে কারণেই আমরা দেখি যে মূলত ‘অযথা রক্তপাত’ নিবারণের উদ্দেশ্য নিয়ে
নাটকের শুরু হলেও পরিশেষে ব্যাপক রক্তপাত অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। নাট্যকারের
ইচ্ছার বিরুদ্ধেই যেন নাটকের মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি ঘটে। দেরিদা-র মতো অনেকেই মনে করেন
যে এই অনিশ্চয়তা যে কোন সাহিত্যকর্মের
অন্তর্গত ও অনিবার্য বৈশিষ্ট। আর সে কারণেই রচনার ‘নিশ্চয়ার্থ’ বস্তুত থাকা অসম্ভব, তা আসলে প্রসঙ্গ নির্ভর। প্রসঙ্গের বদল ঘটলে
অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে। পুনঃপাঠ বা নূতন পাঠের যৌক্তিকতা ঠিক এখানেই।
রাজা গোবিন্দ পোষা ছাগশিশুর মৃত্যুকেন্দ্রিক
শিশুমনের মনোকষ্টে বিচলিত হয়ে বলি প্রথা নিবারণের সিদ্ধান্ত নেন। ধর্মীয় প্রথার এই
বিরুদ্ধাচরণ রাজাকে কিন্তু করতে হয় উপাস্য দেবতার (কালী) দোহাই দিয়েই। দেবী রাজাকে স্বপ্নাদেশ করেছেন পশুবলি বন্ধের
জন্য, এবং যেহেতু
দেবীর আদেশ সব আইনের ঊর্ধ্বে তাই রাজার পক্ষে তা অমান্য করা অসম্ভব, এই যুক্তিতে। দেবীর নামেই পশুবলি, আবার দেবীর নির্দেশেই তা রোধের প্রয়াস -এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে পরস্পরবিরোধিতা, এক কূটাভাস (paradox)। এরকম পরস্পরবিরোধিতা
এবং দ্ব্যর্থতা (ambiguity) নাটকের সর্বত্র বিদ্যমান। আমরা তারই হদিশ নেবার চেষ্টা করব
আমাদের সীমিত ক্ষমতা এবং পরিসরের মধ্যেই।
দেবী কালীর যে প্রতিমূর্তি তার মধ্যেও রয়েছে সাংঘাতিক বৈপরিত্য, বিরোধাভাস - দেবীমূর্তি যেন
দ্বৈতসত্তার আধার স্বরূপ। তাঁর বাম হস্তদ্বয় তরবারি ও অসুরের ছিন্নমুণ্ড ধারণ করে
আছে, আর ডান
হস্তদ্বয়ে জ্ঞান ও অভয় মুদ্রা। বাস্তব জীবনে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করার
প্রয়োজনীয়তা ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে
কর্ম করে যাওয়ার কথাই যেন এই মূর্তি রচনার মধ্যে প্রতীকায়িত। নাটকে রাজা গোবিন্দ ও
রানি গুণবতীর সংঘাতও বাস্তবিক অর্থে জীবন এবং
মৃত্যুর সংঘর্ষ রূপেই হাজির হয়। দেবী কালী
একদিকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের (war
& bloodshed) এবং অন্যদিকে উর্বরতার (fertility) প্রতীক। গুণবতী পশুবলি
দিতে চান সন্তান লাভের আশায়, আর রাজা গোবিন্দ
তা বন্ধ করতে উৎসুক অযথা মৃত্যুর হাত থেকে নিরীহ পশুদের রেহাই দেবার জন্য। দেবী
কালীকে ঘিরে এই হেঁয়ালি ও স্ববিরোধিতার আবর্তে সৃষ্টি
হয় যে জটিল দ্বৈরথের তার
উৎস ঠিক কোথায় সে হদিশ মেলে না কিছুতেই। অভিজ্ঞতার বাস্তবের সঙ্গে এমন এক পার্থক্য
বা ব্যবধান তৈরি হয় যে রচনার বিষয়বস্তুর বাস্তব সীমায় কিংবা বিষয় সম্পর্কিত কোন
প্রাক-ধারণা দিয়েই যার মীমাংসা বা সমাধান সম্ভব হয় না। বিকল্প পাঠের প্রবক্তারা
তাই মনে করেন যে রচনা মাত্রেরই অভ্যন্তরে ‘অর্থ-বিপর্যয়’ (অনর্থ)-এর এরকম অসংখ্য উপাদান বর্তমান
থাকে যার দরুণ কোন স্থায়ী বা নির্দিষ্ট
ব্যাখ্যা-ই (fixed interpretation) চূড়ান্ত বলে গণ্য হতে
পারে না। সাহিত্যকৃতি মাত্রেই অনেকার্থক, বহুব্যঞ্জক।
কোন এক পর্যায়ে দেবী কালী নিজেই স্বর্গীয় অনুগ্রহ বা
আনুকুল্যের প্রতিদানে পশুবলি চেয়েছেন, অন্যদিকে
রাজা গোবিন্দের দাবি হল দেবী স্বয়ং বালিকার ছদ্মবেশে এর বিরুদ্ধে ‘ঈশ্বরীয়’ ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।
যাবতীয় ধর্মীয় রীতি মূলত নির্বাচিত ব্যাক্তি মারফৎ এরকম ‘ঈশ্বরীয় প্রকাশের’ বিষয়ে আস্থাবান যদিও এর সত্যতা বিষয়ে নিশ্চিত
বা নিঃসন্দেহ হওয়ার উপায় নেই। দুই যুযুধান পক্ষের কেন্দ্রে এক প্রতারক এবং অনুপূরক
ধারণা হিসেবেই এজাতীয় ‘ঈশ্বরীয় প্রকাশ’ (অলীক সত্যবাদিতা) বিরাজ করে – যা আসলে বস্তুও নয়, বস্তুসারও না। ‘অস্তি’ এবং ‘নাস্তি’র অবাধ ক্রীড়া মাত্র। রাজনৈতিক
বা ধর্মীয় কর্তৃত্ব স্বেচ্ছাচারী হলে নিরীহের রক্ত ঝরবে এ কথা নাটকে সরাসরি বলা
হয়নি যদিও তার প্রান্তিক অবস্থান অনস্বীকার্য। একই ভাবে যার রক্ততৃষাকে কেন্দ্র
করে আবর্তিত হয় নাটকটি সেই দেবী কালীর উপস্থিতি মূল রচনার প্রান্তসীমায়, অথচ মুখ্য চরিত্রের উপর
দেবীর কর্তৃত্ব সর্বময়।
জয়সিংহ চরিত্রের অসঙ্গতি আরো গভীর। আশৈশব মন্দিরের
পুরোহিতের সেবক রূপে কালীর উপাসক হিসেবেই বেড়ে উঠেছে সে। অথচ দেবী এবং গুরু
পুরোহিতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সে ছাগশিশুটিকে রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ
হয় মেয়েটির কাছে। যে রাজাকে ‘পূর্ণচন্দ্র’ রূপে কালীর চেয়েও অধিক শ্রদ্ধা-ভক্তি করত সেই রাজাকেই (মন্দিরে বলি প্রথা অটুট
রাখার জন্য) হত্যার
ষড়যন্ত্রে পুরোহিতের সহযোগী হতেও দ্বিধাহীন সে। এখানেও আরেক বিরোধ, কূটাভাস। মানুষ, না দেবী-কার কর্তৃত্বের
বাধ্যবাধকতা অধিক সে তা স্থির করতে অপারগ, অসমর্থ। বেদীর আড়ালের কন্ঠস্বর
পুরোহিতের না দেবীর তা জানা কিংবা না-জানায় তার
যায় আসে না কিছু। তার আনুগত্য, ভালোবাসা
আদিম এবং জান্তব। সে নিষ্পাপ, আবার বয়সের
অনুপাতে বিচক্ষণ। নাটকের সমাপ্তিতে সে নিজেকেই হত্যা করে, উপাস্য দেবীকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে - যে দেবীর উপর তার
সন্দেহ জেগেছে, বিশ্বাস
টুটে গেছে। এও আরেক
দ্ব্যর্থতা -দেবী, না কি নিজের ওপর
প্রতিশোধ নেয় জয়সিংহ তা অমীমাংসিত
থেকে যায়।
নির্বোধ পশুর অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত রোধ কল্পে যে নাটকের আরম্ভ ও বিস্তার, পরিণতিতে তা সামাজিক
সংঘাত ও সংঘর্ষের জটিল পরিক্রমা শেষে নিরপরাধ মানব সন্তানের রক্তে স্নাত হয়। অনেকটা
ক্লাসিক ট্র্যাজেডির ধাঁচেই। কাজেই এক অমানুষিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে রচিত এই নাটক- এরকমের অতিসরলীকৃত
ব্যাখ্যা আজকের পাঠকের কাছে গৃহীত হবার যোগ্য নয়। ধর্মীয় প্রথা, প্রতিষ্ঠিত সত্য অথবা
সামাজিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা যে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে তার
ইঙ্গিতও হয়ত বা রয়েছে নাটকের পরিধিতে –নাট্যকারের
ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য সাপেক্ষে কিংবা নিরপেক্ষ ভাবেই। উচ্চমানের সাহিত্যকৃতি মাত্রই
বিকল্প পাঠের বহুতর সম্ভাবনা অন্তরে ধারণ করে থাকে। পুনঃপাঠের মাধ্যমে খুলে যায় সে
সব বন্ধ দুয়ার। রবীন্দ্ররচনার বহু ক্ষেত্রে রয়েছে পাঠকের মুক্তক্রীড়ার প্রচুর
অবকাশ। প্রচলিত পাঠের পরিবর্তে বিকল্প পাঠ হয়ত স্পষ্ট করে তুলতে পারে সেই না-বোঝা না-দেখা অনেকান্তক পথরেখা। বিষয়াবদ্ধ হয়ে নয়, রচনার
কাঠামো কিংবা বিষয়বস্তুর পরিসীমা অতিক্রম
করেই বোধহয় মেলে সাহিত্য পাঠের যথার্থ ব্যঞ্জনা। রবীন্দ্রসাহিত্যের মর্মোদ্ধারেও
প্রয়োজন উন্মুক্ত পাঠের অবাধ অবকাশ।
আবৃত্তি প্রতিযোগিতা স্মরণিকা / বলাকা, ডিগবয় ২০১১
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন