“তোমরা রচিলে যারে
নানা অলংকারে
তারে
তো চিনি নে আমি
চেনেন
না মোর অন্তর্যামী
তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই
মোর নামের প্রতিমা”। [‘নবজাতক’]
… … …
সার্ধ শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা –
এরকম একটা বিষয়ে কিছু বলার চেষ্টা আসলে ‘স্বখাত সলিলে’ ডুবে মরার সামিল। এর মতো
বিড়ম্বনা আর নেই। রবীন্দ্রনাথ যদি একজন হতেন তাহলে নাহয় গা-বাঁচানো বক্তব্যের একটা
খসড়া তৈরি করা যেত। কিন্তু তা তো হবার জো নেই। রবীন্দ্রনাথ মানে তো আসলে ‘নানা
রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’! আর কে না জানেন যে এই নানান রকমের ফুলের মধ্যে কোনও
একটিকে রেখে অন্যটিকে ছুঁড়ে ফেলা বস্তুত
অসম্ভব। কেননা তাহলে মালাটিই হাপিস হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে গিয়ে তাই
অবশ্যই ভাবতে হয় যে ‘কার’ বা ‘কাদের’ কাছে প্রাসঙ্গিক (অথবা অপ্রাসঙ্গিক) এই বিরাট
মাপের মানুষটি? এবং কোন অর্থে?
বিশ্বকবি বলে যাঁকে জানি তাঁকে নিয়ে সত্যিই কি
ভাবিত আজকের বুদ্ধিমান কিংবা বৌদ্ধিক জগত? মনে তো হয় না। অথবা এই ভারতবর্ষ নামক
ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সবার কাছে তিনি কি সম ভাবে সমান মর্যাদায় গৃহীত? এরকমের বহু
অস্বস্তিকর প্রশ্নের মোকাবিলা করে (কিংবা না করেই) ‘বাঙালি জাতির কাছে অতি অবশ্যই
প্রাসঙ্গিক’ এমন মন্তব্য অনায়াসে করা যায়, করা যেতে পারে। করা হয়েও থাকে আকছার।
কিন্তু সমস্যা পিছু নেবে সেখানেও। বাঙালি বলতে কাদের বুঝব? ’৪৭ সালে দ্বিখণ্ডিত হয়ে
গেছে যে বাঙালির শরীর, তার আত্মা কি ভূগোলের বেড়া ডিঙিয়ে একাত্ম হবার সামর্থ্য ধরে
আজো! এপারের এবং ওপারের, উভয় বাঙালির জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথের হাত
ধরেও কি একাত্ম হতে পারি আমরা! না, পারি না। সাময়িক কোলাকুলিতে আমরা যতই আবেগতাড়িত
হই না কেন ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন সাক্ষ্য দেয়, কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়
আমাদের। ধরা যাক সত্তর দশকের কথা, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সাংঘাতিক প্রাসঙ্গিক
হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, এমনকি তাদের কাছেও যাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে
রবীন্দ্রসমালোচনায় (?নিন্দা) মুখর হয়েছেন। অথচ এপার বাংলায় তখন অন্য ছবি। সত্তর
দশককে মুক্তির দশকে বদলে দেবার নিটোল স্বপ্নে বিভোর সংগ্রামী তরুণদের কাছে
রবীন্দ্রনাথ তখন অপ্রাসঙ্গিক নন শুধু, চিহ্নিত হচ্ছেন শ্রেণীশত্রু রূপে! অর্থাৎ দেশ
ভেদে আমূল বদলে গেছে প্রসঙ্গ। এ কিছু আশ্চর্যের নয়, ইতিহাসে এরকম নজির খুঁজলে অনেক
মিলবে।
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের
এভাবে প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া
নিয়ে আমাদের মতো ছাপোষা মানুষেরা বিব্রত বিভ্রান্ত হই বটে, কিন্তু এরকম ঘটা খুবই
স্বাভাবিক। কালের ব্যবধানও এরকম পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, দেয়। সাহিত্যে
রবীন্দ্রোত্তর যুগের উচ্চকিত ঘোষণা শোনা গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ই, কল্লোল
গোষ্ঠীর কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন কবি। আবার সুরেশচন্দ্র সমাজপতি কিংবা
সজনীকান্ত দাসের মত ব্যক্তিরাও রবীন্দ্রনাথের সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন। কিন্তু
এদের রবীন্দ্রবিরোধিতার কারণ ভিন্ন, ধরন আলাদা, মাত্রাও পৃথক। অর্থাৎ, দেশ কালের
সীমায় কিংবা সীমানা পেরিয়ে বিরাট মাপের একজন মানুষ একই সময়ে এক দলের কাছে প্রাসঙ্গিক এবং অন্য আরেক দলের কাছে অপ্রাসঙ্গিক
হতেই পারেন। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধি
হিসেবে প্রোজেক্ট করে থাকে। রাষ্ট্রের
কাছে এই যে প্রাসঙ্গিকতা তার সঙ্গে আমরা যে প্রাসঙ্গিকতার আলোচনায় মেতে আছি তা কি
এক গোত্রের? নিশ্চয়ই না। আর সে কারণেই সীমান্তে বি এস এফ-এর গুলিতে নিহত নিরপরাধ
যুবকের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের মর্মাহত তরুণ বন্ধুটি নিজস্ব ব্লগে যখন লেখেন, ‘সীমান্তে
রবীন্দ্রনাথ ও বি এস এফের সঙ্গে একই সঙ্গে লড়তে হচ্ছে’, তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই
ক্ষুব্ধ হই, অথচ বুঝতে চাইনা যে রাজনৈতিক ঠোকাঠুকির দরুণ এক্ষেত্রে টুকরো হয়ে পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ
স্বয়ং।
তবে একথাও নিশ্চয় ভাবতে হবে যে রবীন্দ্রনাথের
চিন্তা ও কর্মের মধ্যে এই বিভাজনের উৎস বর্তমান কিনা! মুশকিলটা সেখানেই।
রবীন্দ্রকেন্দ্রিক শিবির বিভাজন যে তাঁর স্বকালেই ঘটেছিল সে তো সবারই জানা। আর সে
বিভাজন যে আজকের দিনেও বাস্তব তাই বা অস্বীকার করব কী করে? উনিশ শতকের তথাকথিত
আলোকপ্রাপ্তির সবচেয়ে মূল্যবান ফসল নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি
সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে। তাঁর বিভিন্ন অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বেঁচে থাকতেই
বহু বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সেসব ঘটনার উল্লেখ আপাতত অবান্তর। কিন্তু যে কথাটা সকলের
বোঝা দরকার তা এই যে, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় লাভ করতে হলে
যুক্তিহীন স্তুতি ও সমালোচনার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে তাঁকে অবলোকন
করতে হবে। পুনঃপাঠ ও পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে পুনরাবিষ্কার করে প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি
অনুধাবনে সচেষ্ট হতে হবে। এটাই কালের দাবি। অন্যথায় মধ্যবিত্ত বাঙালির শোভিত ড্রয়িং রুমের
পেরেকবিদ্ধ ছবিতে আর বৈশাখের বাৎসরিক বেসাতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা।
বাস্তবে তাই-ই ঘটছে। পঠনপাঠনের এই দুর্দিনে
রবীন্দ্রনাথ যে সবচেয়ে কম পঠিত সমীক্ষা করলেই ধরা পড়বে। শুধু কি তাই, শিল্পসাহিত্য
চর্চার অঙ্গনে যারা অবাধে ও অবলীলায় বিচরণক্ষম তাদের দশাও যে উৎসাহব্যঞ্জক নয় আদৌ
তার একটা দৃষ্টান্ত হাজির করা যাক নাহয়। ধরা যাক তাঁর গানের কথাই, যে গান সম্পর্কে
তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল যে সে গান বাঙালিকে গাইতেই হবে। দুহাজারের বেশি গান সৃষ্টি
করে গেছেন তিনি, অথচ তাঁর মৃত্যুর অর্ধ শতাব্দী পরেও কেবল দু’আড়াইশ গানই ঘুরিয়ে
ফিরিয়ে আমাদের শোনানো হচ্ছে । নব্বুই শতাংশ গান আজও শ্রোতার নাগালের বাইরে। অথচ
রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক ওজনদার বই প্রকাশের খামতি নেই। এ কী অন্ধের হস্তীদর্শন নয়?
‘সঞ্চয়িতা’র পাতায়ই সীমাবদ্ধ অধিকাংশের কাব্যপরিক্রমা।
রবীন্দ্রকাব্যের একটি উল্লেখযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক সংকলন বাঙালির কপালে আজো
জুটল না! অথচ বাগাড়ম্বরের কোথাও ঘাটতি দেখি না। অন্য ক্ষেত্রের প্রসঙ্গ নাই বা
তুললাম! আরো মজার ব্যাপার হল যে, রবীন্দ্রকবিতা আধুনিক কি না সে তর্কে যারা জান
লড়িয়ে দিতে প্রস্তুত তারাই আবার রবীন্দ্রনাথের গানকে ‘আধুনিক গান’ বললে বেজায়
ক্ষেপে যান। ‘আধুনিক’ শব্দটির এই সুবিধেবাদী প্রয়োগ নিয়েও ভ্যাবাচ্যাকা খেতে হয়
আমাদের। রবীন্দ্রচর্চার হাল যখন এই, তখন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুনলে স্বভাবতই মনে হয় যে, আমাদের
অবচেতনে বোধহয় রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
একটু অন্য ভাবে যদি ভাবি বিষয়টি নিয়ে? ধরুন,
রবীন্দ্রনাথ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে দেড়শ’ বছরের পুঁজি নিয়ে তিনি কি ‘জগতে
আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’ গাইতে পারতেন! যে সময়ে আমাদের বেঁচে থাকা ‘সে বড় সুখের
সময় নয়’, আনন্দের তো নয়ই। অতএব, ‘আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না’। যে পৃথিবীতে আমাদের
বসবাস, সে পৃথিবীর ‘গভীর, গভীরতম অসুখ
এখন’। ভুবনায়নের ভূ-স্বর্গে নিজের জায়গাটি পাকা করে নেবার দুরাশায় আত্মকেন্দ্রিক
আজকের মানুষ আত্মরতিকেই সার বলে জেনেছে। মৃত্যর প্রাক্কালে সভ্যতার যে সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত
হয়ে পড়েছিলেন মানুষটি সেই সংকট সমাসন্ন আজ। অথচ আত্মমগ্ন আমাদের নিশ্চেতনা এতদূর
যে ‘মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো’র ভাবনা তো বহুদূর, শিয়রে নিজের শুশ্রূষার
হাতও আজ আর সহজ লভ্য নয়। এই মানুষের দিকে তাকিয়ে যাবতীয় জবরদস্তি সত্ত্বেও তাঁর
পক্ষে ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ উচ্চারণ করা কি বাস্তবে সম্ভবপর হত?
সুমনের কথা ধার করে বলতে হয় যে ‘প্রশ্নটা সহজ, আর উত্তরও তো জানা’। কবির কাছেই যদি
কথা ধার করি তো বলতে হয়, ‘জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে আজ’, ১৫০তম
জন্মতিথিতে। এটাই বাস্তব, এই বাস্তবতার অলিন্দেই প্রসঙ্গ বিচার।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে রবীন্দ্রনাথ চিরতরে
নিঃশেষিত। শেষের পরেও থাকে শুরুর
সম্ভাবনা। পুনর্জন্মের প্রত্যাশা। তার ছিটেফোঁটাও যদি অবশিষ্ট থেকে থাকে কোথাও,
কোন গোপন গহনে, তবে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন ঊনিশ শতকের জাগরণের সর্বোত্তম
উত্তরপুরুষ রবীন্দ্রনাথ। আমাদের জীবন-যাপনে, চিন্তায়, মননে রবীন্দ্রনাথকে
প্রাসঙ্গিক করে তোলার দায় তো আমাদের! সে
প্রয়াস ব্যতিরেকে প্রাসঙ্গিকতার আলোচনা বিলোচনা অর্থহীন শব্দতরঙ্গ মাত্র। আত্মরতির
সামিল। কিন্তু প্রাসঙ্গিক করে তোলার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হল খোলস ভেঙ্গে শামুকের
জীবন থেকে বেরিয়ে আসা। রবিঠাকুরের ‘নামের প্রতিমা’ ভেঙ্গে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের
‘মানুষী মূর্তি’ গড়ে তোলা। কাজটা কঠিন অবশ্যই, কিন্তু কঠিন ব্রত গ্রহণ ছাড়া ভিন্ন
পথও খোলা নেই আমাদের জন্য। এই ব্রত গ্রহণে যদি রাজি হতে পারি আমরা, আজকের মানুষ,
তাহলে হয়ত আবার দেখা দেবে ‘জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’। তাঁর বাণী ও সুরের মূর্ছনায়
আমাদের কানে বাজবে – ‘আপন হতে বাহির হয়ে
বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’। এই সাড়া পাবার সাড়া দেবার সাধনা
ব্যতীত কিছুতেই প্রাসঙ্গিক হতে পারেন না রবীন্দ্রনাথ, কদাচ নয়।
------------------------------------------
করিমগঞ্জ
কলেজ স্মরণিকা : ২০১১
(সার্ধ শতবর্ষে 'রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা' শীর্ষক করিমগঞ্জ কলেজে প্রদত্ত বক্তৃতার সংক্ষিপ্ত সার)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন