প্যারিসের জেহান রিক্টাস স্কোয়ারের একটি দেয়ালে মানবিক
ঐক্যের প্রতীক স্বরূপ ইউনেস্কোর অন্তর্ভুক্ত ও বহির্ভূত বহু দেশের নিজস্ব ভাষায়
‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ কথাটি লেখা রয়েছে । দেয়াল জুড়ে পরস্পর অপরিচিত ও অচেনা
অক্ষরমালার এমন সহাবস্থান যেন এই কথাই বলতে চায় যে, ‘তুমি আমার ভাষা বলো আমি
আনন্দকে দেখি / আমি তোমার ভাষা বলি তুমি আশ্চর্যকে দেখো’ । কিন্তু বাস্তবে এরকম
‘আনন্দে-আশ্চর্যে সাক্ষাৎকার’ তো দূর অস্ত
, ‘আমি আমার ভাষা বলি তুমি তোমার ভাষা বলো’-গোছের সহনশীলতার পর্যায়েও পৌঁছতে
পারেনি সভ্যতার বড়াই করা এ পৃথিবীর মানুষ । না, একুশ শতকের একটা দশক পাড়ি দিয়েও
‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ পতাকায় পতাকায় ফের মিল আনবে এমন আশা আমাদের পক্ষে আজো দুরাশা
বইকি !
একুশে ফেব্রুয়ারি । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । ১৯৯৯ সালে
ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে এই দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । তারপর থেকে সদস্য
দেশগুলোয় সরকারি-বেসরকারি , প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান উদ্যোগে নানা ভাবে
‘মাতৃভাষা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে । ভারতবর্ষেও
হচ্ছে অবশ্যই । তবে তা মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেমিনার , সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল
, কিছু সরকারি উদ্যোগ , আর পত্র-পত্রিকার এলোমেলো নিবন্ধাদিতে সীমিত থাকছে ।
জনসমাজে তার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে । ভাষা-সচেতনতা বলতে যা বোঝায় তা বস্তুত
আমাদের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তদের মধ্যেও দুর্লভ । ভাসা-ভাসা ভাষা-প্রেম সম্বল করেই
তাই নিয়ম-মাফিক চলে ‘একুশে’র বাৎসরিক উদযাপন । ‘শহিদের রক্তে রাঙানো একুশে
ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ ! না, পারি না ; সারা বছর ভুলে থাকতে পারলেও
‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটিতে তা পারি না । বাঙালি অতটা আত্মবিস্মৃত জাতি নয় অবশ্যই । বরাক
উপত্যকার বাঙালির কাছে ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’ মিলেমিশে একাকার । এই পারে ‘উনিশ’, ওই
পারে ‘একুশ’ – ভাষা নদীর দুই কূল জুড়ে একই ইতিহাস ।
গোটা
বিশ্বে কম বেশি ছ’হাজার ভাষা রয়েছে , যার হাজার তিনেক এ শতাব্দির শেষে নিশ্চিহ্ন
হয়ে যাবে । বিশেষজ্ঞদের এরকমই অভিমত । বিশ্বায়নের জাঁতাকলে অবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে
প্রতিনিয়ত । অঞ্চল বিশেষে এই জটিলতার মাত্রা ও পরিধি কেবল ভিন্ন নয় , প্রায় চরমে
পৌঁছে গেছে । হাতের কাছের উদাহরণ আমাদের
প্রিয় রাজ্য অসম । কিন্তু এরকম এক জটিল
পরিস্থিতিতে , যেখানে প্রতিদিন কোন না কোন
ভাষার সলিল সমাধি ঘটছে কিংবা ঘটার উপক্রম হচ্ছে , মাতৃভাষার সুরক্ষা আদৌ সম্ভব কি
না সেটাই এক কঠিন জিজ্ঞাসা । এই প্রশ্নচিহ্নের ভূমিতে দাঁড়িয়েই ‘আন্তর্জাতিক
মাতৃভাষা দিবসের’ প্রাসঙ্গিকতা বিচার্য । মাতৃভাষার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সম্পর্কই
বা কি এবং কতটুকু সেটাও বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি । Nobel
Laureate Mr. Hallor
Laxness-এর মন্তব্য এ প্রসঙ্গে
স্মর্তব্য – ‘the world becomes a poorer place whenever an
international language swallows
up a smaller one, but the international language becomes no richer for doing
so... ’ ।
মাতৃভাষা হচ্ছে চিন্তা-চেতনার আঁতুর ঘর । মাতৃভাষাকে
কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতির সারস্বত বৃত্তটি । মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা তাই
সমগোত্রীয় । ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ হরিহর আত্মার । সংস্কৃতির বৈচিত্র আসলে
বহুরূপে বিশ্বের অবলোকন , জীবন রহস্যের বহুমাত্রিক প্রতিফলন । সংস্কৃতির সমন্বয়ই
হল বৈশ্বিক উপলব্ধির একমাত্র পথ । এই
সমন্বয় যদি কাঙ্ক্ষিত হয় তাহলে ভাষার মৃত্যু প্রতিরোধ করতেই হবে । মাতৃভাষার
অধিকার তারাই দাবি করতে পারে প্রতিটি ভাষাকে যারা বৃহত্তর মানব পরিবারের সম্পদ
জ্ঞানে সমমর্যাদা দিতে উৎসুক । ভাষাগত বিভেদ কিংবা সংস্কৃতির সংঘাত নিঃসন্দেহে
শান্তি ও মৈত্রীর পরিপন্থী । সে কারণেই ১৯৯৯ সালের উল্লিখিত অধিবেশনে Kofi Annan সময়োচিত মন্তব্য করেছিলেন যে - ‘ the lesson of our age is that languages are not
mutually exclusive, but that human beings
and humanity itself are enriched by communicating
in more than one language .’ ।
বহু ভাষা ও বিবিধ সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠা সমাজ (Multilingual multicultural society) ব্যতীত মানব জাতির মুক্তি অসম্ভব । বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির
বৈচিত্রকে স্বীকার করে নিয়েই সৃষ্টি হতে পারে বিশ্বমানবের নয়া বিশ্বসংস্কৃতি ।
এছাড়া বিশ্বশান্তির অন্যতর সম্ভাবনা আপাতত দৃষ্টিগোচর নয় । ‘সিভিল সোসাইটি’ গুলিকে
এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে । আঞ্চলিক বৈশিষ্ট রক্ষা করার সাথে সাথে বিশ্ব-সংস্কৃতির
সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে তুলতেও হবে । শেকড়ে থাকবে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির সংহতি , আর শাখার
বিস্তারে আন্তর্জাতিকতার বোধ । বিশ্ব-নাগরিক হয়ে ওঠার এই প্রয়াস ব্যতীত
বিশ্বশান্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে । অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক উল্টো । বাচনে ভাষণে
যেখানে বিবিধের মাঝে মিলনের এত অসংখ্য অপরূপ বিজ্ঞাপন সেক্ষেত্রে বাস্তবে বিরোধ কেন ? এক কথায় একেবারে সহজ উত্তর একটা
দেওয়া যায় অবশ্যই , এবং সেটা একেবারে ভুল উত্তরও নয় । উত্তরটা হল – বিশ্বায়নের
বিশ্বজোড়া বিভেদনীতি । যে কোন জাতির ভাষা-সংস্কৃতি যদি কেড়ে নেওয়া যায় তাহলে সেই
জাতিকে পদানত করা নিতান্ত সহজ হয় । সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসাবে এই পদ্ধতি বারে বারে যে অনুসৃত হয়েছে সে
সাক্ষ্য তো ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়ানো । বিশ্বায়নের বাজারকেন্দ্রিক অভিযান তাই
সংস্কৃতিহীনতার এক বাতাবরণ তৈরিতে তৎপর । প্রতিটি ভাষাই আজ , এমনকি ইংরেজিও , কোন
না কোন ভাবে এই বাজার কর্তৃক আক্রান্ত । পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন
ভাষা-সংস্কৃতিকে বেঁচে থাকতে হলে অতি অবশ্যই এই মুনাফা-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে । পরিবর্তে গড়ে তুলতে হবে মানুষ-কেন্দ্রিক এক নয়া
বিশ্বায়নের চেতনা । এটা সম্ভব হতে পারে কেবল জাতিগুলির সামূহিক ঐক্যের ভিত্তিতে ।
আর , বলা বাহুল্য , সেরকমের ঐক্য গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্তই হল পরস্পরের
ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ।
কিন্তু বিশ্বায়নের তুখোড় কৌশুলিরা দুনিয়াটাকে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিতে চায়
বাজার দখলের স্বার্থে । মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ককে হটিয়ে দিয়ে
ওরা চায় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক বহাল করতে । সাম্রাজ্যবাদী
বিশ্বায়নের এটাই মূল নীতি । মুশকিল হচ্ছে , আমাদের সমাজের অনেক জ্ঞানী গুণীও এই বিশ্বায়নের পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন ,
চার দেয়ালের নিরাপদ ঘেরাটোপে বসে বাতানুকুল তত্ত্ব হাজির করছেন । একদিকে বিশ্বজোড়া
ক্রমবর্ধমান দারিদ্র , খাদ্য সংকট , আর আরেক দিকে ভোগ-বিলাস ও অন্যায় অপচয় ।
বিশ্বের বিক্ষুব্ধ মানুষ শোষণ বঞ্চনার দুর্গে ঐক্যবদ্ধ বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে বসে তার
জন্যই ভাষা ও ধর্মের নামে দিশাহীন জাতিগোষ্ঠী গুলিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে
দেওয়ার নিকৃষ্ট রাজনীতিকে হাতিয়ার করা হচ্ছে । আর অন্যদিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
দিবস’ উদযাপনের নাটকীয় আয়োজনের মাধ্যমে মুনাফাখোর মুখগুলিকে খানিকটা মানবীয় আদল
দেবার হাস্যকর প্রয়াস নজরে আসছে ।
তবে
এও ঠিক যে , ভাষা কেন্দ্রিক বিভেদের রাজনীতি চোখে আঙুল দিয়ে এটাও দেখিয়ে দিচ্ছে যে
বহুভাষিক ঐক্য ও বিবিধ সংস্কৃতির সমন্বয় বস্তুত সম্ভব । এই সম্ভাবনার উপলব্ধিটাই
খুব জরুরি এসময় । ভাষার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্কটাও বুঝতে হবে । বুদ্ধদেব বসু বহুদিন আগে এ বিষয়ে সচেতন হতে
বলেছিলেন তাঁর একটি নিবন্ধে । আধুনিক সমাজে ভাষাকে কেবলমাত্র মনের ভাব প্রকাশের
উপায় বা মাধ্যম রূপে বিবেচনা করাটা যথার্থ বুদ্ধিমানের কাজ নয় । কেননা ,
জীবনযাপনের বর্ধিষ্ণু জটিলতা ভাষার ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে । মৌলিক
ভাবগুলির বিনিময় ভাষার ব্যবহার ব্যতিরেকেও হয়তবা সম্ভব , কিন্তু ‘আমাকে ভোট দিন’
কথাটা বোঝাতে ভাষাটা চাই-ই । এই বাড়তি বোঝা কাঁধে চাপার দরুণ শুরু হল এক নয়া
অধ্যায় – অন্যতর প্রয়োজনে ভাষার অ-স্বাভাবিক অ-মানবিক ব্যবহার । প্রকৃত বিচারে ভাষার সংকটের মূল এখানেই । দ্বন্দ্বটা আসলে জনসাধারণের ভাষার জনবিরোধী ব্যবহারের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত । রাজনীতির কূট চাল এই দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের
দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত করে , যার অনিবার্য ফল অর্থহীন হানাহানি , অযথা রক্তপাত । এর
হাত থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদের ব্যাপক
অর্থে ‘ভাষায় এক ভালবাসায় এক মানবতায় এক’ হতেই হবে । বিশ্বের সব ভাষার মানুষই যেন
আজ নিজস্ব শব্দমালায় ‘occupy wall street’ কথাটা দেয়ালে দেয়ালে লিখে দিতে চায় । এই
প্রেক্ষাপট মনে রেখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত ও সঙ্কল্প যদি
গৃহীত হয় তবেই তা আনুষ্ঠানিক আবেগের মঞ্চ-প্রদর্শনী না হয়ে উপযুক্ত মাত্রা লাভ করতে
পারে । নতুবা উনিশের ভূমিতে একুশের চেতনা
একদিন নূতন ঊষার সংবাদ বয়ে আনবে সে
আশা দুরাশা হয়েই থেকে যাবে!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন