বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২০

গল্পের ভুবনে নাগরিকত্ব, এনআরসি এবং…

           (একটি অসম্পূর্ণ পাঠ-প্রতিক্রিয়া)

 

        সমাজ ও সাহিত্যের সম্পর্কটি সুপ্রাচীন নয় কেবল, সুনিবিড়ও। সাহিত্য ছাড়া সমাজের চলতে পারে, কিন্তু সমাজ ছাড়া সাহিত্যের চলে না। প্রাণী জগতে মানুষ শ্রেষ্ঠ, এই কারণে নয় যে সে বুদ্ধিমান ; শ্রেষ্ঠ, কারণ মানুষের সমাজ আছে। সামাজিক সংযোগের জন্য আছে ভাষা। যে ভাষাকে হাতিয়ার করে অগ্রসর সমাজে সৃষ্টি হয় সাহিত্য। মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম যে ভাষা তার মূল উপাদান হচ্ছে শব্দ। শব্দ যদি হয় ব্যক্তিমানুষের অভিব্যক্তি, তবে সাহিত্যকে বলা যেতে পারে সমাজের  অভিব্যক্তি। আর এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্কে অনুঘটক হচ্ছে সময়। কোন বিশেষ সমাজে বিশেষ সময়ে বসবাসকারী মানুষের আচার-আচরণের প্রতিফলন অনিবার্য কারণেই সাহিত্যে ঘটে থাকে। সাহিত্যকে এ কারণে ‘সমাজের দর্পণ’ আখ্যা দেওয়া হলেও বিষয়টা ক্যামেরায় ছবি তোলার মত সরল ব্যাপার নয়। লেখক যেহেতু এক সজীব সংবেদনশীল সত্তার অধিকারী তাই বাস্তবের নেহাত প্রতিবিম্বায়ন বস্তুত অবান্তর, অভীষ্ট তো নয়ই। এই প্রতিবিম্বায়ন তাই বিশ্লেষণাত্মক কিংবা সমালোচনামূলক হওয়াই স্বাভাবিক। একে তাই সামাজিক প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করাই সঙ্গত। বলা অহেতুক, এই জটিল প্রক্রিয়ায় স্থান-কাল-পাত্র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা এক হলেও লেখক ভেদে ভাষ্য ভিন্ন হতে বাধ্য। স্থান-কাল একটি সাহিত্য কর্মকে যেমন স্বাতন্ত্র্য দেয়, তেমনি স্থান ও কালের বৃহত্তর পরিধি ও আবহমানতার সঙ্গেও তা কোন-না-কোন ভাবে সংযুক্ত-সংশ্লিষ্ট থাকে। অঞ্চল ভিত্তিক সাহিত্যের আলোচনায় এই কথাটি মনে রাখা বোধ করি জরুরি।  

অসমের বাংলা লেখালেখি নিয়ে কথা বলার সময়েও আমাদের সেটা মনে রাখতে হবে। অসমের জল-হাওয়ায় জারিত বলে যে স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য, যা-ই বলি না কেন, তা কিন্তু বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের পরিধির বিস্তার মাত্র, বিচ্ছিন্নতার অছিলা নয় কোন অর্থেই। ভিন্ন ভুবনে পায়চারি নয়। অসমের সাহিত্যে  বাঙালির অস্তিত্বের সংকট, ভাষিক সম্প্রসারণবাদী রাজনীতি, বিবিধ প্রতারণা ও দাঙ্গার প্রতিবেদন, এমনকি সাম্প্রতীক এন আর সি প্রসঙ্গ ইত্যাদি উঠে আসাটা নিতান্তই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, একথাও কিছু পরিমাণে সত্য যে, প্রথম পর্বের লেখালেখিতে এমনতর চিহ্ন হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে যা থেকে ধারণা হতে পারে যে লেখকের বাসভূমি ও মনোভূমি বুঝি এক নয়, পৃথক। একটা সময় ছিল যখন ‘ব্রীজ’ শব্দের উচ্চারণে একাংশের মনের পর্দায় শরাইঘাটের বদলে হাওড়া ব্রীজের ছবি ভেসে উঠত। হীনমন্যতার সে অধ্যায় আমরা সযত্নে অতিক্রম করে এসেছি, সজ্ঞানে তো বটেই, স্ব-সামর্থ্যেও। আর এই অতিক্রমণের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ চৌহদ্দিতে আমাদের অহঙ্কার এবং অবদান দুই-ই সাব্যস্ত হয়েছে। এই অর্জন বস্তুত অসমে বাঙালির অস্তিত্বের সংগ্রামেরই অঙ্গ, এবং অনুষঙ্গও।

বর্তমানে গোটা অসম জুড়ে বাঙালির যে সংঘাতময় সঙ্গীন অবস্থা, যার করাল ছায়া বর্তমানে রাজ্যের সীমা অতিক্রমণের অপেক্ষায় দিন গুনছে, সেখানে দাঁড়িয়ে যথার্থ সংবাদ পরিবেশনও যদি করতে হয় তো ‘বধ্যভূমি থেকে বলছি’-এই শিরোনাম ছাড়া অন্য কোনো শিরোনামে তা কদাচ সম্ভব নয়। যাদের ত্রিসীমানায় খবরের কাগজওয়ালাদের পা রাখার ঘটনা ঘটার নয়, সেই বুলু শব্দকর - খালু দাস - দুলালচন্দ্র পাল - অর্জুন নমঃশুদ্র’রা যখন রাষ্ট্রীয় বদান্যতায় ডি-ভোটার, ফরেনার্স  ট্রাইব্যুনাল, ডিটেনশান  ক্যাম্পের ঘাট মাড়িয়ে সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার অনিবার্য শিরোনাম হয়ে ওঠেন,  তাদের কারো কারো ‘লাশ’ নিয়ে যখন রচিত হয় প্রশাসনিক কু-নাট্য, তখন মানবতার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটি যে সারা হয় সাড়ম্বরে, তা কি অস্বীকার করা যাবে কোনো ভাবে! সংবেদনশীল কোন মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি? এরকম চরম ও চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিস্থিতিতে স্বভাবতই কি জিজ্ঞাসা উঠে আসে না - ‘কেন? কার স্বার্থে?’  উত্তরবিহীন এইসব প্রশ্নমালা খুবলে খাচ্ছে শরীর, সময়, সবকিছু – মাটি ও মানুষের। এ থেকে গা বাঁচিয়ে চলার সাধ্য কি আছে সাহিত্যের? সম্ভব কি? আত্মহননের অসহায় ঘটনাগুলো কি আত্মমননের প্রতি প্রত্যাহ্বান ছুঁড়ে দিয়ে যায় নি, যাচ্ছে না!

অসমের সাম্প্রতীক লেখালেখিতে, গল্পচর্চায় মূলত, হালের বাস্তবতার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে এবং তার স্বরূপটি কেমন একটু নাহয় ঝালিয়ে দেখা যাক। তবে সর্বাগ্রে একটা কৈফিয়ত পেশ করা বোধ হয় আবশ্যক। কথাটা এই যে, এই জরিপের প্রকল্পটি বস্তুতই অসম্পূর্ণ, এবং এলোমেলোও বটে। ইংরেজিতে random sampling বলে একটা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, গল্প নির্বাচনের  ক্ষেত্রে আমরা সেই এলোমেলো নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতিই বাধ্যত গ্রহণ করেছি। নির্বাচনের মাপকাঠি কোন ভাবেই গল্পের গুণগত মান কিংবা লেখক ভিত্তিক নয়। গুণাগুণ বিচারের সামর্থ্য নিবন্ধকারের বিন্দুমাত্র নেই। হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে এবং স্মৃতি-নির্ভরতা সম্বল করেই এক রকমের পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেশ করার প্রয়াস করা হয়েছে মাত্র। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

 

আশির দশকের আগে পর্যন্ত আঘাতটা ছিল প্রধানত ভাষা সংস্কৃতির ওপর। জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন-টান্দোলন করে রাজ্য সরকারকে চাপ দিয়ে অগণতান্ত্রিক ভাষানীতি চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আশির দশকে এসে ‘বিদেশি খেদা’ আন্দোলনের বকলমে আক্রমণটা সরাসরি ভাষাভাষী মানুষের ওপর শুরু হলো। নাগরিক পঞ্জি নবায়নের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বিষয়টাকে আইনি বৈধতা দেওয়া হলো। রাষ্ট্র চলে এল মূল ভূমিকায়। পার্শ্ব ভূমিকায় আদালত। উৎস কিন্তু বিদেশি খেদা আন্দোলন ও অসম চুক্তি। তো, আশির দশকেই ঝড়ের পূর্বাভাস যে আঁচ করা গেছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়ে গেছে মলয় কান্তি দে-র ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পে। সে গল্প নিয়ে আলোচনা এখানে অনাবশ্যক, কেননা সেটি ইতোমধ্যে মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পের সূত্রে একটা গৎ বাঁধা হয়ে গেছে।  তারপর থেকে অসমের গল্পকারদের আসরাফ আলী বুঝি নিরন্তর ‘দিচ্ছে ডাক’! সে ডাকে সাড়াও মিলছে যথেষ্ট, জোরদার সাড়া।

ধরা যাক জ্যোতির্ময় সেনগুপ্তের ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ গল্পটির কথাই। গল্পটি পড়তে গিয়ে একেবারে গোড়াতেই জোর ধাক্কা সামলে এগোতে হয়। বিধু সরকারের দাওয়ায় কারো হঠাৎ আগমণের বার্তা দিতে গিয়ে লেখক যখন লেখেন – ‘কাদা মাখানো একজোড়া পায়ের ছাপ পড়েই গেল’ তখন দুপুরের বিষণ্ণতা বস্তুত অপ্রতিরোধ্য হয়ে দেখা দেয়। ‘পড়েই গেল’ বাক্যাংশের সূত্রে উপায়হীনতার যে বিবৃতি, এবং তার অব্যবহিত পরেই ‘লক্ষ্মী না’!!? এই বিস্ময় জিজ্ঞাসার কোল ঘেঁষে পিসিমার ‘অ্যাঁ তুই !? উচ্চারণ এক নিমেষেই বাঙালি গেরস্থের আজন্ম লালিত আহ্লাদ ‘লক্ষ্মী এলো ঘরে’ মুখ থুবড়ে পড়ে। মায়ের দেওয়া দুগাছা  চুড়ি সম্বল করে কানাইয়ের বাপের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া লক্ষ্মী এত বছরে আর এমুখো হয়নি। তার এই অতর্কিত আবির্ভাবে প্রমাদ গুনে বাপ বিপিন। সিঁথির সিঁদুর আর হাতের নোয়া-শাঁখার অনুপস্থিতি পরখ করে অতঃপর বিপিনের খেদোক্তি – ‘জানতাম, আমি ঠিক জানতাম। এইরকমই কিছু একটা হইব’। না, বিপিন ঠিক জানত না। বিপিনের মত আমরাও জানতাম না স্বামী-হারা সন্তান কোলে বিধবা কন্যার অনন্যোপায় বাপের ভিটেয় উঠে আসার চিরাচরিত বিপন্নতার গল্প এ নয়। আরো এক মারাত্মক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ অপেক্ষা করে থাকে আমাদের তরে! দুবেলা দুমোঠো অন্নের ভরসায় নয়, লক্ষ্মী এসেছে অন্যতর গুপ্তধনের খোঁজে, কপাল জোরে যদি মেলে সেই দুরাশায়।            

শ্বশুর বাড়িতে অভাব অনটনের ঘাটতি ছিল না সত্য, তবে লক্ষ্মীমন্ত স্বামীর ঘরে অতৃপ্তির অসুখছিল না। অকস্মাৎ শমন   জারি হল, শ্বশুরের নাম থাকলেও ভোটার লিস্টে নাম কাটা গেল লক্ষ্মী আর কানাইয়ের বাপের। স্বামীকে টেনে-হেঁচড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে গেল সরকারি পেয়াদা। শ্বশুরকে যখন চিতায় ওঠানো হয় পুলিশ প্রহরায় মুখাগ্নি করার সুযোগ দেবার বদান্যতাটুকু অবশ্য দেখিয়েছে প্রশাসন। লক্ষ্মী তাই এসেছে বাপের বাড়িতে জিয়ন-কাঠির খোঁজে, নাগরিকত্ব প্রমাণের এক টুকরো কাগজও যদি মেলে। একটা গ্রুপ  ফটো ছিল বাড়িতে, যেখানে নেতাজীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন তার না-দেখা ঠাকুর্দাও। কিন্তু তার স্বদেশি হওয়ার প্রমাণ কি হবে তা দিয়ে! লক্ষ্মী জানে না। সর্বস্ব দিয়েও কানাইয়ের বাপকে ছাড়িয়ে আনতে অপারগ লক্ষ্মীর কাহিনি শেষ হয় সব অপমানের হাত থেকে মুক্তি খুঁজে নিতে সিলিং থেকে ঝুলে পড়া কানাইয়ের বাপের লাশ সনাক্ত করার ডাক পেয়ে। বাপ-হারা দু’টি কচি সন্তান নিয়ে লক্ষ্মী এনআরসি-র অ্যানার্কিতে ফেঁসে নিজেকেই যেন শনাক্ত করার পথ খুঁজে পায় না। এই মর্মান্তিক পাঁচালি লেখকের মুন্সীয়ানায় অসমের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর বাঙালি পাঠককেও নিশ্চয় ভারাক্রান্ত করে।  

ধীরাজ চক্রবর্তীর ‘সন্দেহজনক’ গল্পে পাই কাগুজে প্রমাণ খোঁজার আরেক ট্র্যাজিক কাহিনি। বছর পঁয়ত্রিশের মনসুর মিঞার মন্ত্রের জাদুতে কাজ হয় এরকম বিশ্বাস জন্মেছে বরপেটা জেলার হাউলি অঞ্চলের মানুষের। বংশানুক্রমেই সে শিখেছে তুকতাক, মন্ত্র-তন্ত্র। গ্রামের শেষ প্রান্তে প্রবীণ বটগাছটির নিচে হাটবারে সে তার মন্ত্রের ঝাঁপি খুলে বসে। মানুষের নানা সমস্যার চটজলদি সস্তা সমাধান আছে তার কাছে। মন্ত্র পড়া তাবিজ দেয় সে, মাঝে সাঝে জড়ি-বুটির ওষুধও। অথচ এন আর সি-র খাতায়  নাম তোলার রক্ষাকবচ এক টুকরো কাগজের জন্য মরীয়া সে। তার জন্ম পঁচাত্তরে, অথচ কাগজ চাই একাত্তরের পঁচিশ মার্চের আগের। বাপ হাসান আলি পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল যদিও সে অনেক আগে। কিন্তু নিজের নামে এক টুকরো কাগজ বানিয়ে রাখার কথা মনেও আসে নি আপনভোলা মানুষটির। পাগলের মত ছুটোছুটি করে মনসুর। বাপের এক সঙ্গীর কাছে খবরটা পেয়ে কিছুটা আশার আলো যেন দেখতে পায়। বাপ হাসান আলির গণনার ভীষণ সুখ্যাতি ছিল দূর-দুরান্ত পর্যন্ত। কোন বছর কতটা বৃষ্টি হবে, ফসল কেমন হবে, মাটির নিচে জল কোথায় পাওয়া যাবে গুনে সব বলে দিতে পারত অবলীলায়। পানিকাটা গ্রামে তাই ডাক পড়েছিল, আর হাসান আলির নির্দেশ মত কুয়ো খুঁড়ে জলের ভাণ্ডারও পাওয়া গেল। গ্রামের মানুষ হাসানকে দিয়েই কুয়ো উদ্বোধন করিয়ে পাথরে খোদাই করে দিয়েছিল - ‘উদ্বোধক হাসান আলি, কুয়া নির্মাণ ১৯৬০’।  

ওখানে দাঁড়িয়ে বাপের গর্বে মনসুরের ছাতি বুঝি ছাপ্পান্নকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। ফটোগ্রাফার ডেকে লেখাটার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি উঠিয়ে সেই ‘অকাট্য প্রমাণ’ তুলে দিয়েছিল উকিল বাবুর হাতে। কিন্তু উকিল বাবুর তাচ্ছিল্যের হাসি ও মস্করায় রাগে ক্ষোভে ফিরে আসতে হয় মনসুরকে। আন্দোলন ছাড়া অন্য পথ নেই আর। গজেন বর্মণদের শলা-পরামর্শে এনআরসি-র হয়রানির বিরুদ্ধে জেলা শাসকের অফিস ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত হয়। ২১শে জুলাই, ২০১০ সাল ডি-ভোটার সমস্যার সমাধান, এনআরসি  বাতিলের জন্য বিরাট সংখ্যক মানুষের মিছিল শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। তার মধ্যে  ‘হাসান আলির স্বীকৃতি চাই’ শ্লোগান শুনে মনসুরও ‘স্বীকৃতি চাই, স্বীকৃতি চাই’ বলে গলা মেলায় সমান তালে। আচমকা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়, বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিকে ওদিকে দৌড়তে থাকে সবাই, পুলিশের গুলিতে মনসুর সহ চার জনের মৃত্যু হয়। নিয়ম মাফিক ন্যায়িক তদন্ত ঘোষিত হয়, কিছুদিন পর জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে – ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’। হাসান আলি জল সরবরাহ প্রকল্প।

বিষয় নির্বাচনে, নির্মাণ কৌশলে অসাধারণ একটি গল্প। সমসাময়িক ঘটনার এমন আশ্চর্য রূপায়ন, সেও খুব স্বল্প পরিসরে, বস্তুতই বিরল। মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠার সামান্য পরিসরে অসমের অভিবাসী বাঙালি মুসলমানের অসামান্য অবদানের আখ্যানের পাশাপাশি তাদের প্রতি অবহেলা ও বঞ্চনার চিত্রও তুলে ধরেছেন অনুভবী ও কুশলী কলমে। যে গ্রামের জল পানের অযোগ্য হাসান আলির দৌলতে সে গ্রাম অমৃতবারি আবিষ্কার করে, ঠিক যেমন এক কালে চাষাবাদের অযোগ্য জমি সুফলা হয়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গ থেকে নিয়ে আসা কুশলী কৃষকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে। ২১শে জুলাই, ২০১০ এ শুরু হয়েছিল এনআরসি’র পাইলট প্রোজেক্ট, বরপেটা জেলায়। আর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বাস্তবিক মৃত্যু বরণ করেছিলেন চার তরুণ তুর্কী। কেন জানি না, পড়তে গিয়ে কেবলই মনে হয়েছে ধীরাজ বুঝি গল্পের সমাপ্তিতে ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’ নামকরণের তীব্র শ্লেষের মধ্য দিয়ে আমাদের উনিশ-একুশ লালিত চৈতন্যের প্রতিই এক শব্দভেদী শর নিক্ষেপ করেছেন।

কুশল ভট্টাচার্যের ‘খাঁচার পাখি ডাকে’ গল্পে ডিটেনশন ক্যাম্পের যে বস্তুনিষ্ঠ উৎপীড়ক বিবরণ প্রত্যক্ষ্ করি তাতে শারীরিক ভাবেই শিউরে উঠতে হয় পাঠক হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত অসাধারণ সিনেমাগুলোতে প্রদর্শিত হিটলার জমানার   কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ছবিই যেন ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। ক্যাম্পের অমানুষিক পরিবেশ ও প্রাত্যহিক নির্যাতনের মধ্যেও গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্পর্ক। ঠিকরে পড়ে মনুষ্যত্বের দ্যুতি। পরিবার-বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো যেন গড়ে নেয় আরেক নতুন পরিবার। ডিটেনশন ক্যাম্পে। লেখারু, লক্ষ্মী, খগেন, পুলিনের মা এবং ওদের মত আরো অনেকে মিলে নয়া সংসার। একে অন্যের সুখ-দুখের – না, সুখ তো এদের নাগালের বাইরে, দুঃখ ভরা জীবন সংগ্রামের খবর নেয়। ছিন্নমূল মানুষের শিকড় সন্ধানের কাহিনি গুলো কোথাও যেন একসূত্রে গাঁথা। এক অনিবার্য আত্মীয়তা তাই গড়ে ওঠে। পারস্পরিক কথোপকথনে, জীবন-সংলগ্ন  আলাপচারিতায় ফুটে ওঠে সে অমলিনতা। পরিচিত গ্রামের ভেতর থেকে আরেক গ্রাম, চেনা মানুষের ভেতর থেকে অন্য আরেক অচেনা মানুষ যেন জেগে ওঠে।

-আমার কী মনে হয় জানস? বাংলাদেশে গিয়া মুসলমান হইয়া যাওয়াই ভাল। তা হইলে অন্তত আমাগো উপর আর কেউ  অইত্যাচার করব না। ধর্ম ক আর ভাষাই ক, সব এক হইয়া যাইব। ঘর বাড়ি তো এইখানেও নাই, নাহয় হেইখানেও থাকব না। কিন্তু কাম কাজ কইরা খাওন তো জুটান যাইব? নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল লেখারু।

-হেই বুইলা বিধর্মী হইবা কাকা? লেখারুর কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠল লক্ষ্মী।

-আমাগো মতো গরিবের লেইগা জাতি-ধর্ম কুনো কামের না রে।

লেখারু আর লক্ষ্মীর এই অন্তরঙ্গ সংলাপ যেন অদৃশ্য চাবুক হয়ে পিঠে পড়ে। আর্থিক দুরবস্থা ও দুর্দশার জন্য সামান্য আক্ষেপ পর্যন্ত নেই, দায়ী করছে না সমাজ ব্যবস্থাকেও। কেবল একটু সম্মান নিয়ে বাঁচার প্রার্থনা। দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে এই আবেদন কি আন্তর্জাতিক স্বর হয়ে ওঠে না! ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ এমন প্রার্থনা-বিলাস তাদের এক্তিয়ারে নেই, তারা বড় জোর ভাবতে পারে - ‘আমার সন্তান যেন থাকে দেশে ভিতে’। কিন্তু সে আশার বুকেও এনআরসির ছুরি। একবার দেশ-ছাড়া মানুষের দেশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে দ্বিতীয়বার। তবে তফাৎ আছে, এই কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র এমনই নিঃশ্ছিদ্র যে অন্য কোথাও অন্য দেশে পালিয়ে যাবার সুযোগটাও নেই। আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার উদ্বাস্তু-জীবন ও বন্দিশিবিরের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য কি আছে? এ গল্প তাই অসমের দরিদ্র মানুষের নিপীড়নের ইতিবৃত্ত হয়ে থাকে না আর, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মেহনতি মানুষের ওপর সংঘটিত ধারাবাহিক নিপীড়নের ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হয়ে ওঠে।

যারা দিন আনে দিন খায় সেই সাধারণ মানুষগুলোর জীবন ধারণের পথটাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এই এনআরসি। অধিকাংশের স্পষ্ট ধারণাও নেই ব্যাপারটা আসলে কী! ‘তাবিজ’ গল্পের নিতাই দাসেরও নেই। পথে ঘাটে আর কোন আলোচনা নেই, কেবল এনআরসির প্রসঙ্গ, আলাপ। হাটবারে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাবিজ বিক্রি করা নিতাইয়ের ব্যবসায় ভীষণ মন্দা চলছে।  অসুখ-বিসুখ, বশীকরণ, বাণ মারা, গর্ভপাত কত রকমের সমস্যা সমাধানের তাবিজ আছে তার ঝুলিতে, কিন্তু খদ্দের কই! এনআরসি দানো যেন গ্রামের মানুষগুলোর সাপ-খোপ জল-আগুন সব কিছুর ভয় গিলে খেয়েছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে গোটা গ্রাম সন্ত্রস্ত, দিশাহারা। মাস্টার মশায়ের বোঝানোর চেষ্টা সত্ত্বেও নিতাই খুব ভালো বুঝে উঠতে পারে না এনআরসি’র আসল গ্যাড়াকল। বুলু শব্দকর না কাকে যেন ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে এবং সেখানেই নাকি সে মারা গেছে। সেই খবরটাই তার কাছে যা গুরুত্ব পায়। নাগরিত্বের সীল-মোহর দেওয়া কাগজ খুঁজছে সবাই হন্যে হয়ে। যেসব কাগজের কথা বলাবলি করে লোকে সেসবের কিছুই তো তার নেই! তবু, নিজের সংকট নিয়ে আদৌ ভাবনা নেই নিতাইয়ের। গ্রামের মানুষগুলো নিশ্চিন্ত  থাকলে সেও নিশ্চিন্ত। সাধন জেঠা জীবনকাকাদের তাই সে সরল ভাবেই সান্ত্বনা দেয় – ‘শোনো জেঠা, অত ভেবো না।  সবাই তো আছি গো আমরা। এ তো তোমার একার সমস্যা নয়’। এভাবেই ভরসা দিয়ে এসেছে নিতাই, এতদিন। ভিটেমাটি ছাড়া করে যে এনআরসি, সেটা তাহলে ভূত-প্রেত-জিন-পরি থেকে আলাদা কিছু নয়। তাহলে তো না পারার কিছু নেই, ভাবতে ভাবতে গ্রামের লোকগুলোর আতঙ্ক-আর্তনাদ সব নিজের মধ্যে পুঞ্জীভূত করে ভরসা গোটায় সে – আলতা দিয়ে লেখা পিচ বোর্ডের সাইন   বোর্ডে জুড়ে দেয় আরেকটা লাইন – ‘এখানে এনার্সি তাবিজ পাওয়া যায়।’ এ গল্পের সমাপ্তির নিষ্পাপ সারল্যে যে মর্মন্তুদ  অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস, যে আর্তি ব্যক্ত ও পরিব্যাপ্ত তার শাব্দিক সম্প্রসার অসাধ্য নয় শুধু, অসমীচিনও। মেঘমালা দে মহন্ত অসামান্য  দক্ষতায় এক নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। নতুন প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে মেঘমালা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং প্রতিশ্রুতিবান।

তাঁর ‘কাগজের স্বদেশ’ গল্পে খুঁজে পাই আরেক ভিন্ন প্রতিভাস। অসাধারণ বিশ্বস্ততায় সেখানে তুলে ধরা হয়েছে শহুরে মধ্যবিত্তের ফাঁপা মনস্তত্ত্ব, মেকী প্রতিবাদের চিরাচরিত চিত্র। ইন্দ্র, ইন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তার প্রতিনিধি। ছোট-বড় সবার ইন্দ্রদা।  অকৃতদার ইন্দ্র, অবিবাহিত বোনকে নিয়ে এই শহরের বাসিন্দা। শুধু বাসিন্দা বললে ঠিক বলা হয় না, শহরের এমন কোন ‘কবিরাজি’ নেই যেখানে ইন্দ্রনাথের নীরব কিংবা সরব উপস্থিতি নেই। মহিলা মজলিশ থেকে মশাল-মিছিল সর্বত্র তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। যুবা প্রজন্মের নজরে ইন্দ্রদা শহরের আইকন,  আই-কার্ড। ‘এই শহরটাই আমার বাড়ি’ এমন আত্মগর্বী উচ্চারণে অভ্যস্ত, প্রতিটি মিছিলের পুরোভাগে হাঁটা ইন্দ্রনাথ হাঁক পাড়ে – ‘দিচ্ছে ডাক’। একুশে ফেব্রুয়ারি’র আমন্ত্রণে সে যায় ওপার বাংলায়, পিতৃপুরুষের ভিটেয়। তার জন্মও সেখানে, বাবা-জেঠা’র মুখে শোনা ‘দেশের বাড়ি’র গল্প বলে বোন উজিকে।  মনোভূমি আর বাসভূমি’র মাঝখানে বুঝি  লুকিয়ে থাকে বিভাজনের সূক্ষ্ম রেখা। ইন্দ্রের নামেও আসে নোটিশ, ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে সে। তার ‘অবসরের গান’ ভেঙে চুরমার করে দেয় এক টুকরো কাগজ, ছিনিয়ে নিতে চায় আত্ম-পরিচয়। গণহারে ডি-নোটিশ জারি নিয়ে দেশভাগের মতই দু ভাগে ভাগ হয়ে যায় নাগরিক-প্রতিক্রিয়া। এলিট মধ্যবিত্ত, যারা ‘চরিত্রহীন’ প্রতিবাদী মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটে, তারা ব্যস্ত নথি-পত্র গুছিয়ে নিতে। আর আচ্ছে দিনের স্বপ্নে মশগুল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর হেলদোল নেই তেমন। এনআরসি তাড়িত মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে না পারার আত্মগ্লানি থেকে ইন্দ্রকে যেন মুক্ত করে বুক পকেটে রাখা কাগুজে নোটিশ। মনে মনে ইন্দ্র এখন নিজেকে তাদের দলভুক্ত দেখতে পায়। সবার প্রত্যাশা মত আজ আর মিছিলের সামনের সারিতে  আগের মত দাঁড়াতে পারে না ইন্দ্র, সঙ্কোচ হয়। অবস্থান পাল্টে পাল্টে এগিয়ে চলা মধ্যবিত্তের আত্মিক সংকট মূর্ত হয়ে ওঠে ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। এক নতুন লড়াইয়ের জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নেয় ইন্দ্র।   

    

 

এনআরসি’র মার কি শুধু গ্রাম শহরের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনকেই এলোমেলো করে দিয়েছে, সচ্ছল আপাত সুখী মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রায় আঁচড় কি লাগেনি একেবারে! দৌড়ঝাঁপ একটুও কি নেই? আতঙ্ক ততটা  গাঢ় নয় হয়তবা, তবে নিশ্চিন্ত বসে থাকার অবস্থাও নয়। ছেলে-বুড়ো যুবক-যুবতী সবার মুখেই কেবল এনআরসি। ফটো-তোলা, কাগজ জমা-দেওয়া এই নিয়েই ব্যস্ত সবাই। শহরের জানা-বোঝা মানুষের বেশির ভাগের হাতেই গোছানো কাগজ-টাগজ রয়েছে। তবু ঝামেলা একেবারে মিটে না যাওয়া অব্দি যেন স্বস্তি নেই। মধ্যবিত্ত ভাবালুতাও বুঝি থিতিয়ে গেছে। জীবনের উত্তাপ বলতেও কিছু নেই। রক্ত বুঝি জমে ঠাণ্ডা হবার জোগাড়, প্রেম-টেমও জমছে না তেমন। ‘ঠাণ্ডা রক্ত বা NRC–র দিনে প্রেম’ গল্পে মিথিলেশ ভট্টাচার্য তাঁর সুপরিচিত অথচ অননুকরণীয় গদ্য শৈলীতে সে আখ্যানই শোনান। যতীন-সিক্তার অতি সম্ভাবনাময় প্রেমের মাঝখানেও ঢুকে পড়ে এনআরসি। জমে ওঠা খেলায় হতে হতেও গোলটা না হওয়ার মত ‘ধেত্তেরি’ অবস্থা। সুযোগ ছিল হাতের মুঠোয়, তবু দুজনের একটা যুগল ফটো-সেশনের সম্ভাবনা মাঠে মারা গেল, সিক্তার অসম্মতিতে-‘আজ না, আরেক দিন’। যতীন টের পেয়েছে তার রক্ত ঠাণ্ডা, সিক্তার  ল্যাবরেটরিতে তাই টেস্ট করিয়ে কারণটা জেনে নিতে উৎসুক সে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের প্রতি এক তীব্র ও তির্যক শ্লেষ রয়েছে এ গল্পে।

   ‘উঁইপোকা’দের জীবন নিয়ে ইদানীং কালে গল্প কিন্তু খুব কম লেখা হয়নি এ অঞ্চলে। উল্লেখিত গল্পগুলো ছাড়াও ‘মানবরতন’ (স্বপ্না ভট্টাচার্য), ‘স্থায়ী ঠিকানা’ (রণবীর পুরকায়স্থ), হামারি অজিব কাহানি (দোঁলনচাঁপা দাস পাল), একটি গলিত স্থবির ব্যাং অথবা এলি তেলি মহম্মদ আলির জীবন বৃত্তান্ত (কান্তারভূষণ নন্দী) ইত্যাদি নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। এর বাইরে, ব্যক্তিগত পাঠ-পরিধির বাইরেও রয়ে গেছে আরো কত! নাগরিকত্ব-ডি-ভোটার-ডিটেনশন ক্যাম্প-ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কত  বিচিত্র গল্পই না লেখা হয়েছে এই অসময়ে, কত ভয়ানক তথ্য কত নির্মম সত্য খোদাই করা আছে পত্র-পত্রিকা বইপত্রের পাতায়  পাতায় তার সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা ও আলোচনার গুরু দায়িত্ব হয়ত নেবেন আগামীর কোনো সাহিত্য গবেষক। এটুকু আশা করা যেতেই পারে। আমাদের সাধ সীমাহীন, কিন্তু সাধ্য সীমিত। কাজেই দাঁড়ি টানার কথা ভাবতেহচ্ছে। স্থান সংকুলানের দায়ও  আছে। তবে শেষ করার আগে আরেকটি গল্পের কথা বলতেই হবে। না বললে গোটা উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে।

কান্তারভূষুণ নন্দীর ‘মাটিপোকাদের নিয়ে একটি না-গল্পের খসড়া’র কথা না বললে নিজেকেই কাঠগড়াতে দাঁড় করাতে হ। গল্পকার কান্তারভূষণ সম্পর্কে বলার কিছু নেই। এমনিতেই তাঁর গল্প না পড়াটা যে কোন গল্পরসিকের জন্য প্রায় অপরাধের  পর্যায়ে পড়ে। আর এনআরসির প্রসঙ্গে তো কথাই নেই। কেউ যদি একটি মাত্র গল্প পড়ে এনআরসি নিপীড়ণের সম্যক ধারণা পেতে আগ্রহী থাকেন তবে ‘মাটিপোকাদের ……’ তাকে পড়তেই হবে। কারণ এই গল্পে এনআরসি কেন্দ্রিক উথাল-পাথালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থনীতিক -রাজনীতিক-শাসনিক সব কটা দিকই উন্মোচিত হয়েছে। হয়েছে সুনিপুণ বিশ্বস্ততায়। এ গল্প এ সময়ের অসামান্য দলিল, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

রশিদ-মালতী আর তারক-ময়না দুই সংসারের ভোমরা-জুটি। কেবল পাশাপাশি বসবাস নয় এদের, বেঁচে থাকার  দৈনন্দিন কসরতে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনায় একে অন্যের অবিচ্ছিন্ন দোসর। এক পরিবারের কান্নার রোল তাই আরেক পরিবারের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কান্নার রোল আর ঘুম কেড়ে নেওয়ার মূলে সেই এনআরসি।  রশিদ বলে –

“জলপোকা দেখছস না, জলপোকা? আমরা হইলাম গিয়া মাটিপোকা। মাটির গভ্যে আমরার বাস, আমরার মরণ-বাঁচন। মাটি না হইলে আমরা থাকুম ক্যামনে?” তাইতো, কি করেই বা বাঁচবে! এই মাটিই কেড়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক-মানুষিক দুর্যোগ আসে ক্ষণে ক্ষণে। কোকড়াঝাড়ের দাঙ্গায় নিঃস্ব হয়ে রশিদ-মালতী এসে ওঠে গরজুলির পারে। সেখানেও বন্যার প্রকোপ, ঝড়ের দাপট। প্রাণ বাঁচানো দায়, তো কাগজ পত্তর! অথচ কাগজ না হলে ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে, এই আতঙ্কে অস্থির আদ্ধেক গ্রাম। কিন্তু শমন আসে তারকের নামেই, তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পায়ের তলায় এক চিলতে মাটির জন্য তাই মালতীরও হা-পিত্যেশ।

-“সাহাদা, একটা কথা কন তো। কুনোদিন যদি গরজুলির ভিতর থিইক্যা মাটি ভাইস্যা উঠে, চর পড়ে, অউ মাটি কি গরমেন্টের হইব? আমরা হউ চরো থাকতে পারবাম না?” ন্যায্য অধিকার নিয়েও সংশয় মালতীর কন্ঠে।

– “সব গরমেন্টের। কারও বাপের মাল না, বুঝছ ?” মহাদেব সাহা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানিয়ে দেয়, সাহার দলই গরমেন্ট কিনা! আগের গরমেন্ট ছিল বিরোধী দলের পাণ্ডা মোহিনী বরুয়াদের, তারককে তুলে নিয়ে যাবার সময় যে মোহিনী দাঁত কেলিয়ে বলেছিল – “তাঁহতৰ মহাদেব সাহাই কেনেকুৱা বঁচায় চাম নহয় কেলা।” নিখুঁত আঁচড়ে কান্তার খুলে দেন এনআরসি-রাজনীতির মুখোস। গণতন্ত্র-ন্যায়-মানবিকতা- সমানাধিকার শব্দগুলো ঠাট্টার মত শোনায়। এনআরসি’র দাবার ঘুঁটি রশিদ-তারক-ময়না-মালতী-সুমতিরা উপলব্ধি করে গরমেন্ট আসলে আরেক ভগবান, আর ভগবানের মর্জি না হলে কারও পক্ষেই কিছু করা  সম্ভব নয়।

মহাদেব সাহা মিটিং করে বুঝিয়ে দেয় দোষ তারকেরই, সস্তা দরে এক টুকরো মাটি তো সে দিয়েই দিচ্ছিল, কিন্তু নেমকহারাম তারক শুনল না। গ্রামের লোকের ভাল-মন্দের কিছুটা দায় তারও কি না! মহাদেবের টোপ গিলে মালতী ও রশিদ সাত হাজার আগাম দিয়ে মাটির স্বপ্নে বিভোর হয়। মহাদেব মাটিও দেয় না, টাকাও না। ফেরত দিতে বলায় তার চেলারা বাড়িতে হামলা চালায়, হাটবারে ওষুধ বিক্রির ‘অবৈধ’ ব্যবসা বন্ধ করার ফরমান জারি করে, ক্যাম্পে চালান করার হুমকিও দেয়। ভিটে-মাটির সাথে পেটের ভাতও কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কি? মহাদেবের মত ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’রা আবার ধর্মের মোড়কে রাজনীতি পুরে দেবার কায়দাটা রপ্ত করেছে ভালো। শ্যালক ভগীরথ দাসের বাড়িতে দুর্গা পুজো হবে, মিটিং করে চাঁদার হার সাব্যস্ত হয়, ‘মুখ্যমন্ত্রী আসবেন’ ঘোষণাও দেওয়া হয়। রোজকার দেখা পরিচিত রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ তৈরি হচ্ছে যেন। কিন্তু পুরুত ভবতোষ চক্রবর্তীর শাস্ত্র-বিধানে সংকট ঘনীভূত হয় - বেশ্যাদ্বারের মাটি চাই। ‘ক্যান লাগে’ তাও বুঝিয়ে দেন চক্কত্তি মশাই, জুতো খুলে অর্থাৎ তাবৎ পুণ্য ও পবিত্রতা দোরগোড়ায় রেখে বেশ্যার ঘরে প্রবেশ করতে হয় বলে যাবতীয় পুণ্য বেশ্যাদ্বারেই জমা হয়। তাছাড়া যেহেতু পুরুষই গণিকা তৈরি করে, আবার অস্পৃশ্যও করে রাখে বলে গণিকারা যাতে পুজোর বাইরে না থেকে যায় তাই-ই শাস্ত্রের এই মহান বিধান। আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! সব কা সাথ, সব কা বিকাশ! এমন বামুন ঠাকুর না হলে মহাদেব সাহার দোসর হওয়া সাজে! এক সুরে তাই ধ্বনিত হয় – আলবৎ চাই, ‘যিকান থিক্যা পার আন, কিন্তু মাটি লাগবই’।  

মালতী-ময়নাদের মাসকাবারি কাজ আর নেই, রশিদও জ্বরে জর্জর। কী করে হাঁড়ি চড়বে ভেবে কুল-কিনারা পায় না মালতী। বোবা বোনটির সঙ্গে শলা করে, সুমতিকে সাথে করে অন্ধকারে রওয়ানা হয় ভগীরথের বাড়িমুখো। এত রাতেও বাড়ির উঠোনে চলছে মিটিং। ভগীরথকে এক প্রান্তে ডেকে নিয়ে বলে,

–পাইসেন মাটি?

-না, পাই নাই।

-‘আমারে কন, আমি দিতে পারি’- বলে মাটি-ভর্তি কাচের বোতল এগিয়ে দেয় মালতী। ‘আমরার ঘরর মাটি। আমি  আর আমার বইন মিল্যা অনেকদিন থিক্যা গোপনে আপনাগো বড়ো বড়ো নেতারা জানে।’

মহাদেব সাহা-মোহিনী বরুয়াদের সমাজ সভ্যতার রঙ করা মুখের উপর একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় মালতী।

সার্টিফিকেট বানিয়ে দেবার শর্তে আর মাটির দাম নগদ পাঁচশো টাকা হতভম্ব মহাদেবের হাত থেকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে মালতী। অন্ধকার সাপ্টে ধরে। স্বামী-সন্তানের পাশে শুয়ে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বহুদূর থেকে আরও একটা চাপা কান্না যেন এসে মিশে যায় তার কান্নার সাথে। মালতী ঠিক শুনতে পায়। জীবনে প্রথম বার।  

 

কান্তারভূষণকে কুর্ণিশ, সার্বিক সামাজিক ধাপ্পাবাজির গালে এমন বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্ত থাপ্পড় কষানোর জন্য। ‘যুক্তি তক্কো   গপ্পো’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে ক্যামেরার লেন্সে নীলকন্ঠ বাগচি’র মদ ছুঁড়ে মারার দৃশ্য মনে পড়ে যায়। সাম্প্রতীক গল্পচর্চায় এমন  নিদর্শন বড় একটা মেলে না। কী অসাধারণ পর্যবেক্ষণ, কী অভাবনীয় প্রতিরূপ নির্মাণ! এ তো শুধু ভাষাশৈলীর দৌলতে সম্ভব নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু চাই। সেই অতিরিক্ত ধনে কান্তার ধনী।   

শেষ করার আগে একটা কথাই বলার। নাগরিকত্ব, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, এফ টি পীড়িত সাধারণ নাগরিকের জীবনের ভাষ্য কতটা সফল বা সার্থক ভাবে রূপায়িত হল তার নিরীক্ষা এ নিবন্ধের উদ্দিষ্ট নয় কোন ভাবেই। আলোচিত গল্প সমূহের সাহিত্যিক মূল্য কী ও কতটা তার বিচারের ভার আগামী কালের কাঁধেই নাহয় অর্পিত হোক। আলাদা করে প্রতিটি গল্পের  মূল্য নির্ধারণ অবান্তর, অর্থহীন। যেহেতু এই গল্পগুলো একে অপরের পরিপূরক, এক সমগ্রের অপরিহার্য অংশ। কোনোটিই তুচ্ছ নয়। সংযোজ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে বসবাস করেও আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। বিভাজনের ঘৃণ্য রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গল্পগুলো মানবিক প্রমূল্য প্রতিষ্ঠার আন্তরিক প্রয়াস করেছে নিঃসন্দেহে। সে প্রয়াসেই তাদের সার্থকতা। এই বিপন্ন সময়ে গল্পকারেরা যে তাঁদের সামাজিক ভূমিকাও পালন করেছেন সাহস ও সততার সঙ্গে আপাতত সেকথা অকুন্ঠ চিত্তে স্বীকার করাই পাঠক হিসাবে আমাদের আশু কর্তব্য। বুলু শব্দকর-অর্জুন নমঃশূদ্র- দুলালচন্দ্র পাল-খালু দাস’রা ‘কাগজের স্বদেশ’ ছিন্নভিন্ন করে ‘দিচ্ছে ডাক’ - প্রকৃত স্বদেশ গড়ার। গল্পকারেরা সে ডাকে সাড়া দিয়েছেন প্রবল ভাবে। এবার পাঠকের পালা, সে ডাকে সাড়া  দেবার জন্য দৈনন্দিন-দীনতার-কাছে-হাঁটু-মুড়ে-বসা পাঠক প্রস্তুতির সঙ্কল্প নেবেন কি না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর সে প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের কতটা জবাবদিহি তে হবে না হবে তার হিসেব-নিকেষ  

 

 

 

    

একটি কৈফিয়তঃ লেখাটি সীমিত সময়ের তৎপরতায় শরীরি হয়েছে, ফলে প্রকাশিত অথচ আমার পাঠ পরিধির বাইরে থেকে যাওয়া কিছু গল্প এবং হাতের কাছে না-থাকা আরো কিছু গল্প আলোচিত হয়নি। সে তালিকায় মলয় কান্তি দে, রণবীর পুরকায়স্থ সম গল্পকারও অন্তর্ভুক্ত, এই খামতি পরবর্তীতে পূরণের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা রইল।

  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ব্লগ সংরক্ষাণাগার