বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ন্যায় : প্রাতিষ্ঠানিক বনাম সামাজিক


 

Injustice anywhere is a threat to justice everywhere.  Martin Luther King, Jr.

 

কাজটা ঠিক ন্যায়সঙ্গত হল না’-এরকম বাক্য আমরা হামেশাই শুনে থাকি। এখানে বক্তার এক ঔচিত্যবোধ প্রত্যক্ষ করা যায়। অর্থাৎ যা হওয়া উচিত নয় তাই অন্যায়, অসঙ্গত। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে এই উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায় বোধ কিভাবে জন্মায়! ন্যায় (justice) শব্দটা আপাতভাবে খুব সহজ ও সাধারণ এবং বোধগম্য মনে হলেও ন্যায় বিধান কিন্তু তত সহজ নয়। মানুষের সমাজ যেদিন সৃষ্টি হয়েছে সেদিন থেকেই বিষয় হিসেবে ন্যায় বিশেষভাবে চর্চিত হয়ে আসছে। কেননা এর সঙ্গে  অধিকারের প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে। ন্যায়ের ধারণাটি মূলত এক সামাজিক প্রয়োজনে সৃষ্ট। যে কোন সমাজে ব্যক্তি এবং সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বর্তমান থাকে। এই বিরোধ মীমাংসা করা সম্ভব না হলে সমাজের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। সামাজিক রীতি-নীতি গুলো হচ্ছে এই বিরোধ মেটানোর এক প্রয়োজনীয় এবং সর্বসম্মত উপায়। এক কথায় বলা যায় যে, ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে এ এক অলিখিত চুক্তি। যার শর্ত সমূহের পালন ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। এই শর্ত লঙ্ঘন করা অন্যায়, অসঙ্গত। একই সঙ্গে এটাও এই অলিখিত চুক্তির অন্তর্গত বিষয় যে ব্যক্তির যা প্রাপ্য (ন্যায্য পাওনা) সমাজ তা অস্বীকার করতে পারে না বা তা থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করতে পারে না। বলা বাহুল্য যে, সমাজ ভেদে এই অলিখিত শর্ত সমূহ পৃথক ও ভিন্ন, ফলে ন্যায়ের ধারণা ও অধিকারের সীমানাও আলাদা। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ন্যায়-বোধ ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ন্যায়ের ভাবনা কোনো অর্থেই এক বা সমতুল্য নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের ন্যায়-সম্পর্কিত ধারণাও বদলেছে (সে বদল হিতকর কি অ-হিতকর হয়েছে তার বিচার এখানে অপ্রাসঙ্গিক) এবং সে বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি চলমান     

এই ন্যায়ের ধারণার মূলে কিন্তু এক (সামাজিক) সাম্যের ভাবনা ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ, সমাজের দিক থেকে সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখার চিন্তাEquals should be treated equally and unequals unequally’- প্রায় দু’হাজার বছর আগে অ্যারিস্টটল ন্যায়ের মৌলিক নীতি সূত্রবদ্ধ করেছিলেন এভাবেই। এটা হচ্ছে এক অ-ঘোষিত নীতি, -লিখিত চুক্তির মত। বাস্তবে সেটা  কিভাবে কতটা পালন করা হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কি না সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। একটা দৃষ্টান্ত দেখা যাক, ধরা যাক এবং দুজন মোটামুটি সমগোত্রীয় ও সমগুণসম্পন্ন ব্যক্তি। মনে করা যাক উভয়ে কোন একটি কাজের জন্য শ্রমদান করেছেন এবং পারিশ্রমিক পেয়েছেন পারিশ্রমিক সমান হওয়া উচিত অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিৎ। কিন্তু যদি দেখা যায় যে, ব্যক্তি দুজনের একজন মহিলা  বলে কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন তো সেটা অ-ন্যায় সাব্যস্ত হবে নিশ্চয়। (চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঠিক এরকম অন্যায়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে।) এই উদাহরণ কেবল এটা বোঝানোর জন্য যে সাম্যের ধারণাটি সর্বত্র সব সমাজে এক নয়, এমনকি একই সমাজেও ভিন্ন হতে পারে। ফলে অধিকারের স্তর ও পরিসীমাও পৃথক হয়ে পড়ে। আমাদের বর্ণ-বিভাজিত ভারতীয় সমাজেও সেটা চোখে পড়ে। প্রাচীন কালে একজন ব্রাহ্মণ ও একজন শূদ্রের অধিকার সমান ছিল না। উভয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গীও অনিবার্য কারণে আলাদা ছিল। আদিম সাম্যবাদী সমাজে সাম্যের যে ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল আর এ যুগের আধুনিক মানুষের যে  সাম্যের বোধ তার মধ্যে যে জমিন-আসমান ফারাক রয়েছে সেকথা আলাদা করে উল্লেখের নিশ্চয় প্রয়োজন নেই। তাহলেই দেখুন, ন্যায় ব্যাপারটা মোটেই সহজ-সরল নয়, বরং বেশ গোলমেলে। আর গোলমেলে  বলেই তা নিয়ে চিন্তা-চর্চা, তর্ক-বিতর্ক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেই আদ্যিকাল থেকেই চলছে। বলা যায়, সভ্যতার শুরু থেকেই ন্যায় সম্পর্কিত ভাবনা দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। (প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী) এটা যে পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনায় কেবল অগ্রাধিকার লাভ করেছে  এমন নয়, প্রাচ্যের চিন্তা-চর্চায়ও যে ন্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মর্যাদা লাভ করেছিল তার দৃষ্টান্তের অভাব নেই। আমাদের দেশে তো ন্যায় দর্শনসশরীরে বিদ্যমান। প্লেটোর রিপাব্লিকথেকে শুরু করে রাউলস-এর ‘অ্যা থিয়োরি অব জাস্টিস’ অব্দি চিন্তাবিদদের চিন্তা ও কাজে ন্যায় সংক্রান্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি জটিল থেকে  জটিলতর হয়েছে ন্যায় বিধানের ও ন্যায় প্রদানের প্রক্রিয়া। 

গোষ্ঠীতন্ত্রে গোষ্ঠী সমূহের বিশ্বাস অনুসারে কিছু রীতি-নীতি প্রচলিত ছিল যার ভিত্তিতে সাধারণত ন্যায়িক সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হত। পরবর্তীতে সে স্থান দখল করে ধর্মাচরণ। ধর্ম যা অনুমোদন করত সেটাই ন্যায়সঙ্গতবিবেচিত হত। রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী পর্যায়ে সমাজে আইন সে স্থান অধিকার করে নিয়েছে। কিন্তু সামাজিক সাম্যের প্রেক্ষিতে দেখলে আইনি ন্যায়সব সময় সামাজিক ন্যায়নিশ্চিত করে না। Earl Warren তাই মন্তব্য করেছেন, ‘It is the spirit and not the form of law that keeps justice alive.’ এই আইনও আবার রাষ্ট্রভেদে আলাদা। যেমন, সমকামিতা বহু দেশে আইনসম্মত, আবার অনেক দেশে দণ্ডনীয়।  যে  স্পিরিট’-এর কথা ওয়ারেন উল্লেখ করেছেন, দেখা যাচ্ছে যে তার অবিসংবাদী কোনো ধারণা মানব সমাজে অবর্তমান। সমাজ ভেদে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে অ-সাম্যের উপস্থিতি অস্বীকারের উপায় নেই। বস্তুত, উৎপাদন-পদ্ধতি, উৎপাদনের উপকরণের ওপর আধিপত্য ও শ্রম-সম্পর্ক, ইত্যাদি বহু জটিল বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়ের ধারণা। অতএব, সামাজিক সাম্য ব্যতিরেকে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে সাম্যের আশা দুরাশা মাত্র। আপাতত, আমাদের আইন-নির্ভরতা ছাড়া ন্যায় বিতরণের ভিন্ন পথ নেই।   

এবারে দেখা যাক, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় ন্যায়ের যথার্থ স্বরূপটি কেমন। কোন ব্যক্তির (individual) ক্ষেত্রে প্রাপ্য কিংবা উপযুক্ত ন্যায়যেভাবে সাব্যস্ত হয় তার ভিত্তিতে ন্যায় (justice) হতে পারে তিন ধরনের। Distributive  justice : যার লক্ষ্য হল যতদূর সম্ভব নাগরিকের হিতাধিকার (benefits) ও দায়ভার (burden) যথাক্রমে বিস্তৃত ও নির্দিষ্ট করা দাস ব্যবস্থা সে হিসেবে ন্যায়সম্মত ছিল না নিশ্চয়। Retributive or corrective justice – এর লক্ষ্য হল কোন অপরাধের শাস্তি কতটা হওয়া উচিত তা স্থির করা - চোখের বদলে চোখকিংবা চুরির অপরাধে  অপরাধীর হাত কেটে ফেলাটা যেহেতু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।  Compensatory justice  হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ন্যায্যতা ও পরিমাণ স্থির করে (ক্ষতি যাদের দ্বারা হয়েছে তাদের কাছ থেকে) তা আদায় দেওয়া। ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা সেরকম একটি দৃষ্টান্ত।  রাউলস অবশ্য ন্যায়কে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘প্রায়োগিক’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন। ন্যায়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক স্থিরতা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম মর্যাদা। সামাজিক স্থিরতা নির্ভর করে সমাজের সদস্যরা ন্যায্য ব্যবহার কতটা পাচ্ছে বা পাচ্ছে না তার নিরিখে। সমাজের কোনও অংশ যখন অনুভব করে যে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে তখন সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়, বিক্ষোভ মাথা চাড়া দেয়। রাউলসের ভাবনায় সমাজের সদস্যরা পরস্পরের  উপর নির্ভরশীল, এবং সামাজিক ঐক্য ততক্ষণ বজায় থাকে যতক্ষণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দেখিয়েছেন যে, সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী ও দাবিদার। বিমূর্ত ও অসম্পর্কিত কারণে বৈষম্য মূলক আচরণ অতএব মৌলিক মানবিক অধিকার লঙ্ঘন বৈ  কিছু নয়।

ন্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিকতা ও বিবেকের প্রশ্ন। ন্যায়ের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে নীতিশাস্ত্র। যে কোন নৈতিক সিদ্ধান্ত  গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা আবশ্যক যে আমরা প্রত্যেককে সমান নজরে দেখছি কি না! যদি তা না হয়, তাহলে যেসব শর্তের  ভিত্তিতে ভিন্ন, অর্থাৎ বিষম আচরণ করা হচ্ছে তা যুক্তিপূর্ণ ও যথার্থ কি না সেও দেখা কর্তব্য! কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিষম ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত বলে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, যেমন দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারীদের বেলায় যে ছাড় দেওয়া হয় তা। কিংবা কোনো প্রকল্পে কারো অবদান অন্যদের তুলনায় বেশি হওয়ার দরুণ অধিক প্রাপ্তি ঘটলে আমরা তা মেনে নেই। এ কথা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে  না যে, ন্যায় হচ্ছে পারস্পরিক মর্যাদার স্বীকৃতি এবং পরস্পর নির্ভরশীল সমাজে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপনের প্রাথমিক  শর্ত হচ্ছে আচরণগত সমতা। ব্যাপক অর্থে ন্যায়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামাজিক সাম্যের স্থাপনা। অমর্ত্য সেনও সামাজিক ন্যায় (social justice)-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সভ্য সমাজ সেই সামাজিক ন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়াবে নিশ্চয়। আপাতত, সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক (ন্যায্য)অধিকার সুনিশ্চিত করাই ন্যায়ের লক্ষ্য হোক।  

  

 

 

 

    

  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ব্লগ সংরক্ষাণাগার