(স্মরণ)
সুজিৎ চৌধুরী !
এই
একটি মাত্র নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যতখানি মান ও মান্যতা বরাক উপত্যকার আর কোনও
সামাজিক ব্যক্তিত্বকে তার ধারে কাছেও পৌঁছতে দেখিনি, বিগত দুই দশকে। এ অর্জন কেবল বৈদগ্ধের
নয়, অন্তর্বৈভবেরও। প্রায় দেড় দশকের অনুপম সান্নিধ্যে যেটুকু দেখেছি, জেনেছি,
বুঝেছি তাতে মানুষটিকে জানার আগ্রহ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে ক্রমে। ব্যক্তিত্বের
এমন সহজ অথচ সাবলীল আত্মপ্রকাশ সচরাচর চোখে পড়ে না। কখনো সমাজ ব্যক্তিকে তুলে ধরে,
আবার কখনো ব্যক্তি সমাজ মনস্কতার মাধ্যমে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলেন সমাজে। সুজিৎ চৌধুরীর
ক্ষেত্রে এ দুয়ের এক বিরল সংযোগ ঘটেছিল। ব্যাষ্টি এবং সমষ্টির মধ্যে দেয়া-নেয়া,
আদান-প্রদান যখন সঙ্গতি ও সংহতির ভেতর
দিয়ে পথ খুঁজে পায়, তখন অবশ্যই ব্যতিক্রমী
উদ্ভাস দৃষ্টিগোচর হয়। বরাক উপত্যকার বঙ্গ সমাজ ও সংস্কৃতি আত্মপ্রকাশের এক বিশেষ
পথ খুঁজে পেয়েছে ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীর সংস্পর্শে, তাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক
ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রে, দৌলতে। একথা অবশ্যই অতিশয়োক্তি নয়। আবার একথাও মিথ্যে নয় যে,
এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজ-কর্ম ব্যক্তি সুজিৎ
চৌধুরীর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ও অনিবার্য ছিল। ঐতিহাসিক কারণেই। এটা
আপতিক কোনও ঘটনা নয় মোটেই যে, তিনি
শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ইতিহাস লিখতে শুরু করবেন। অধ্যয়নের বিষয় ইতিহাস হলেই স্ব-ভূমির
ইতিহাস রচনায় সচরাচর আগ্রহী হয় না কেউ, তার মূলে থাকে ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন
অনুষঙ্গ।
সুজিৎ
চৌধুরীর ক্ষেত্রে অনুষঙ্গটি অবশ্যই দেশভাগ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যে বেদনা বয়ে
বেড়িয়েছেন মানুষটি। মর্মান্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট মর্মবেদনা
ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে আমৃত্যু। এমন নয় যে, দেশভাগের দরুণ তাঁর
পরিবার সাঙ্ঘাতিক বিপর্যয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। দেশের বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হওয়ার জন্য
যন্ত্রণা তো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু (তাঁর ক্ষেত্রে) এই যন্ত্রণাবোধের
মাত্রা ও পরিধি ছিল বহু গভীর এবং ব্যাপক। ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ যাঁরা পড়েছেন
তাঁরা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন সে বেদনার স্বরূপ। এর মূলে রয়েছে এক সামূহিক বোধ,
সামাজিক বিপর্যয়কে নিজের ভেতর ধারণ করার দায়। এক্ষেত্রে পারিবারিক এক উত্তরাধিকার
তাঁর অবশ্য ছিল। পারিবারিক পরিমণ্ডলে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ও বহনের
আবহ বর্তমান ছিল। পিতা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয়
ভূমিকা পালন করেছেন গোড়া থেকেই। সেই সূত্রে পারিবারিক পত্রিকা ‘যুগশক্তি’-র জন্ম।
সে পত্রিকার সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়া বাহুল্য মাত্র। স্বাধীনোত্তর
সময়ে, আরো সঠিক ভাবে দেশভাগের পর, অতঃপর যে-মানসিকতা অনিবার্য হয়ে দেখা দিল সেটা মূলত
আত্মপরিচয় খোঁজার, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথের অন্বেষণ। ছিন্নমূল মানুষের থিতু
হওয়ার জন্য যে সংগ্রাম, চিন্তা ও মননের দিক থেকে অন্তত, তার শরিক হওয়ার ঐকান্তিক
আগ্রহ। তাঁর সারা জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছোট্ট কথায় বোধহয় বর্ণনা করা
যায় ‘ছিন্নমূলের শিকড় সন্ধান’ শব্দবন্ধের
মাধ্যমে। এবং সেটা ভুলও নয়। ‘ভাষা আন্দোলন’ থেকে ‘বিদেশী বিতাড়ন’,
সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ সে
সাক্ষ্য বহন করছে।
না,
সুজিৎ চৌধুরীর সৃষ্টি ও কর্মের মূল্যায়ন করতে বসিনি আমি, সে সাধ কিংবা সাধ্য
কোনটাই নেই আমার। তাঁর সাহচর্যে যেভাবে যতটুকু (তাঁকে) জানার এবং বোঝার সুযোগ
পেয়েছি তার শরিক করতে চাইছি পাঠকদের। কথায় বলে, ফলের ভার বেশি হলে বৃক্ষ নুয়ে পড়ে।
বৈদগ্ধের এমন প্রাচুর্য সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য রকমের নিরহঙ্কার ছিলেন মানুষটি।
রাগ-দ্বেষ-হিংসা-ঘৃণা তাঁর ব্যক্তিত্বের ত্রিসীমায় ঘেঁষতে পারেনি, অন্তত আমার নজরে
আসেনি। মন-প্রাণ খুলে কথা বলা যেত যে-কোনও বিষয়ে, আলোচনা করা যেত অনায়াসে। গুরুত্ব সহকারে শুনতেন সবার কথাই। বয়সের বাধা
ছিল না কোনও, ছেলের বয়সীদের সঙ্গেও চুটিয়ে আড্ডা দিতে পারতেন। সুজিৎ-দা হয়ে পড়েছিলেন
অল্পদিনে, সে সুবাদেই। ছিল অসাধারণ রসবোধ। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রসিকতায় তাঁর জুড়ি
মেলা ভার ছিল। শিল্প-সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত তরুণ ব্রিগেডকে অযাচিত অকুন্ঠ
প্রশংসায় ভাসাতে এমন আর কাউকে দেখিনি। উৎসাহিত করতেন ভীষন রকম। উপদেশ নয়, পরামর্শ
দিতেন বন্ধুর মতন। ব্যক্তিগত ভাবেও তেমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছি। নিজের ক্ষেত্রেও
প্রশস্তি শুনে বিব্রত বোধ করেছি যেমন, উৎসাহিতও হয়েছি। গর্বিতও যে হইনি কিছু
পরিমাণে তা বললে মিথ্যে ভাষণ হবে। এখানে একটা কথা বলা জরুরি যে, ভাষা-সাহিত্য
চর্চাকে তিনি আত্মানুসন্ধানের, আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর সে
কারণেই সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত পশ্চিমবঙ্গীয় অতিথির বক্তব্যে পত্র-পত্রিকা
কবি-লেখকদের নিয়ে কটাক্ষের জবাবে সুজিৎ চৌধুরী অনায়াসে বলতে পারেন, ‘এরা প্রত্যেকে
এক একজন ভাষা-সৈনিক, আমাদের বাস্তবতায় সেনার সংখ্যা যত বেশি হয় তত লাভ। গুনগত
মানের বিচার আপাতত গৌণ’। লড়াইয়ের ময়দানে থাকলে কুশলী হতে দেরি হবে না এই ছিল তাঁর যুক্তি। সুজিৎ চৌধুরী ছাড়া আর কে-ই বা বলতে
পারতেন এমন কথা !
সভা-সমিতিতে, নির্ধারিত বক্তা হিসেবে যেখানেই
সুজিৎ চৌধুরীর নাম থাকত সেখানেই, আমরা, ‘ঋত্বিজ’-এর কয়েকজন বিশেষত, হুমড়ি খেয়ে
পড়তাম। নতুন কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষায়। সভাশেষে মতামত জানতেও চাইতেন অনেক সময়, ‘ঠিক
আছে তো!’ সংশয় নিরসন করতে চাইতেন বা সমর্থন চাইতেন তা নয়, এ তাঁর বদান্যতা,
স্বভাবের অঙ্গ। এই দরাজ স্বভাবের জন্যই যে
কোনও সভাস্থলে তাঁকে ঘিরে আরেকটা অণু-সভা শুরু হওয়া ছিল প্রায় অবধারিত। সভাপতি হিসেবে যখন মঞ্চালোকিত করতেন তখনও, সভাপতির ভাষণে তাঁর অসামান্য সার সঙ্কলন শোনার অধীর
অপেক্ষায় বসে থাকতাম। প্রতিটি যুক্তি যেন
ছুরির ফলার মত ধারালো। সাধারণত বিশিষ্ট জনদের
কাছে ঘেঁষা প্রায় দুষ্কর, সেখানে সুজিৎ চৌধুরী কাছে ডেকে নিতেন অবলীলায়। মেয়েদের মর্যাদা সম্পর্কে এতটা সচেতন
ছিলেন যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আমল দিতেন না মোটেই, সেরকম ক্ষেত্রে সচরাচর
মেয়েদের পক্ষ নিতেন। ঘরে-বাইরে, সর্বত্র। কাছাকাছি থেকেছি যখন, এসব চারিত্রিক
গুণাবলী নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি কিছু, গুরুত্ব দিইনি সে অর্থে। আজ যখন মানুষটি
চিরতরে দূরে, তখন উপলব্ধি করতে পারি যে, এ হেন গুণাবলী অর্জনের নেপথ্যে ছিল এক নির্দিষ্ট
জীবনচর্চা। শ্রম ও মেধার বিনিময়ে অর্জিত। ‘প্রাচীন ভারতে মাতৃতান্ত্রিকতাঃ
কিংবদন্তীর পুনর্বিচার’ গ্রন্থ লেখা তাই সম্ভব ছিল তাঁর পক্ষেই। অনিবার্যও ছিল
হয়তবা!
ইতিহাসের
অধ্যাপক ও গবেষক ছিলেন। ইতিহাস তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল, নিঃসন্দেহে। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তা বলে এক বিন্দু কম ছিল না। সাহিত্যের
এমন নিবিষ্ট পাঠক সহজে মেলে না। কেবল ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে আপত্তি
করতেন না, তবে সাহিত্যের লোক নন ভাবলে ক্ষুণ্ণ হতেন। অন্তরঙ্গ মুহূর্তে প্রকাশও করেছেন সে ক্ষোভ। ইতিহাস ছাড়া
বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা তাঁর প্রধান এবং অন্যতম বিচরণ ক্ষেত্র হলেও
সৃষ্টিশীল রচনায়ও রেখে গেছেন পরাক্রমী স্বাক্ষর। তাঁর গদ্য যেমন ঝরঝরে, তেমনি
প্রাঞ্জল। প্রতিটি শব্দ ব্যবহারে অসাধারণ মনোযোগী। বক্তৃতার ভাষাও ছিল একই রকম সরল,
অথচ অর্থবহ। শ্রোতাবান্ধব। বৈদগ্ধের প্রকাশ থাকত, কিন্তু পাণ্ডিত্যের প্রবলতা নয়।
রসবোধ ছিল সূক্ষ্ম। ‘ধূমপায়ীর জবানবন্দী’ যারা পড়েছেন তারা অবশ্যই তার পরিচয়
পেয়ে থাকবেন। যেমন ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, তেমনি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ইতিহাস,
নৃতত্ত্ব, ভাষা, সাহিত্য, লোক-সংস্কৃতি, রাজনীতি কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন অসাধারণ
সব রচনা। ইতিহাস হোক কিংবা ভাষা-সাহিত্য, যে-কোন বিষয়ে সংশয় উপস্থিত হলে আমরা তো বটেই, আরো অনেকেই কড়া নাড়তেন সুজিৎ-দার
দরজায়।
খাপছাড়া ভাবে এই যে কথাগুলো বললাম, তা থেকে
সুজিৎ চৌধুরী সম্পর্কে একটা আভাস মাত্র হয়ত পাওয়া যাবে। সেটা আমি জানি, তবু লিখতে
বসে যেহেতু বহু কথাই মনে আসছে, তার থেকেই তুলে আনছি কিছু কিছু। আঁজলাভরা জলে
সমুদ্রের আস্বাদ মেলে না জেনেও। অন্য উপায় যে নেই আর! তাঁর লেখালেখি, গবেষণা,
কাজ-কর্ম, চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আগামীতে যোগ্য ব্যক্তিরা নিশ্চয় মূল্যবান আলোচনা
করবেন। কিন্তু যে সময়সীমা জুড়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন সে সময়ের বরাক উপত্যকার সমাজ ও
রাজনীতি বুঝতে হলে সুজিৎ চৌধুরীকেও জানতেই হবে। এতে সংশয়ের অবকাশ নেই কোনও। তাঁর
ভাবনা-চিন্তা, মতামতের সঙ্গে একমত নাও যদি
হই, তবু গুরুত্ব দিতে হবে বৈকি! দিতে হবে দুটো কারণে। এক, তথ্যের খাতিরে এবং দুই,
মৌলিকতার জন্য। তথ্য থেকে সত্যে বা সিদ্ধান্তে পৌঁছবার চেষ্টা করতেন সব সময়, এবং
সে পদ্ধতিটিও ছিল মৌলিক। একটা কথা তিনি সব সময় বলতেন যে, প্রান্তবাসীদের সুযোগের
অভাব থাকলেও একটা মস্ত বড় সুবিধাও আছে, বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কাজ করতে হয়
বলে চিন্তাচর্চায় মৌলিকতা আসে। কথাটা তাঁর ক্ষেত্রে শুধু সত্য নয়, আখরে আখরে সত্য।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছত্রছায়ায় লালিত হন নি তিনি। লেখালেখির প্রায় পুরোটাই মাতৃভাষা
বাংলায়, ইংরেজি লেখা সে তুলনায় খুব কম যদিও বিষয় এবং বিশ্লেষণের নিরিখে কম
গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেই। নামী প্রকাশকের দৃষ্টিগোচর হয়নি বলেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে
অপরিচিত রয়ে গেছেন এই মেধাবী মানুষটি। উত্তর প্রজন্মের দায় রয়েছে সেসব সংকলিত করে
বৃহত্তর পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেবার।
তাঁর
মতামত মেনে নিতেই হবে এ জাতীয় গোঁড়ামি ছিল না একটুও। বক্তব্যের বিরোধিতা কেউ করলে
বিচলিত হতেন নিশ্চয়, ক্ষোভও প্রকাশ করতেন কখনো-সখনো। আবার বুঝতেও চাইতেন বিরুদ্ধ
মতের যুক্তি-পরম্পরা, ভাবনা প্রবাহকে। সে
ঔদার্য পুরোপুরি বজায় রেখেছিলেন শেষ দিন অবধি। কোনও বিষয়ে মতানৈক্য হলে ফোন করে ডাক
দিতেন, ‘তোমার লগে দরবার আছে’। বহু ক্ষেত্রে ও বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে বহুবার, ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাইতেন, একমত
না হতে পারলেও অবজ্ঞা করতেন না মোটেই। পত্র- পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হলে পড়েছি কিনা
যেমন জানতে চাইতেন, তেমনি অনেক সময় নতুন লেখা ডাকে দেবার আগে ডেকে পড়াতেনও। আলোচনা
করতেন। সেসব স্মৃতি ভোলার নয়। ভোলার নয়, কারণ সেসব আলোচনার সূত্রে নিজের অপরিণত
চিন্তা-ভাবনা পরিণত হওয়ার সুযোগ পেত। যুক্তি বুদ্ধিতে মাঝে মাঝে শান দেওয়া দরকার ,
তাঁর সান্নিধ্যে শান দেওয়ার কাজটা খুব সহজে ও সুচারু ভাবে সম্পূর্ণ হত। তাঁর কাছে
যাবার, আড্ডা দেবার, বিতর্ক উসকে দেবার একটা তাগিদ তাই থাকত। কত ভাবে যে উপকৃত ও
লাভবান হয়েছি সে বলে বোঝানোর নয়। দেশভাগ নিয়ে তাঁর তীব্র যন্ত্রণা ও তথ্যনিষ্ঠতার
একটা দৃষ্টান্ত দেবার লোভ হচ্ছে খুব। সকলেই জানেন যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর সবচেয়ে
প্রিয় ঔপন্যাসিক, তাঁকে বিভূতিভূষণ-বিশেষজ্ঞ বললেও ভুল হবে না, কিন্তু ‘দেশভাগের অলিখিত উপন্যাস’
প্রবন্ধে (ঋত্বিজ সাময়িকী, ২০০৫ জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘দেশভাগ ও বাংলা উপন্যাস’ গ্রন্থে সংকলিত) দেশভাগ নিয়ে বিভূতিভূষণের চিঠি থেকে উদ্ধৃতি
হাজির করে (‘ নতুন বঙ্গ ভাগ হয়ে গেল ভালই হ’ল। বাঙালী হিন্দুরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে।
আমাদের ভয় নেই, হিন্দুস্তান, পাকিস্তান দুজায়গাতেই বাড়ী আছে’) লেখকের হিন্দুত্ববাদী অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। এ
ব্যাপারে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না, রেয়াত
করেননি বিভূতিভূষণকেও, তথ্যই ছিল শেষ কথা।
ছিন্নমূলের
শিকড় সন্ধানের যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম, টের পেতাম, আশিরনখর জুড়ে ছিল সেই এক ভাবনা, চিন্তা। শিল্প-সাহিত্যের প্রাঙ্গনে
ঋত্বিক ঘটক কিংবা জীবনানন্দকে যেমন নদী-মাঠ শোভিত গ্রাম বাংলার প্রকৃতির মায়ায়
জড়িয়ে থাকতে দেখি, সেই একই মায়ায় ডুবে থাকা জলজ্যান্ত যে মানুষকে আমি দেখেছি তিনি
সুজিৎ চৌধুরী। তাঁর মতন এমন আর কাউকে আমি অন্তত দেখিনি। বাংলা ভাষা, বাঙালি ও
বাংলাদেশ ছিল তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। লিখেওছিলেন, ‘... রেখেছ
মানুষ করে, বাঙালি করোনি’। ‘হারানো স্বদেশ’ ঘিরে এই আবেগ নিয়ে একবার অনুযোগ করে
বলেছিলাম যে, আমরা যারা স্বাধীনতার পর জন্মেছি তাদের তো কোনও ‘হারানো স্বদেশ’-এর
স্মৃতি নেই, তাহলে এই শোকগাঁথা শুনে আমরা কী করব? উত্তরে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, ‘কত
বড় ক্ষতিটা হয়েছে তোমরা বুঝবে না। তোমরা তো জানো না, হেমাঙ্গ বিশ্বাস যখন ভগ্ন
স্বাস্থ্য নিয়ে প্রায় অচল, তখন একটা ‘দেশের বাড়ি’ ছিল বলেই মাস কয়েকের বিশ্রামে
স্বাস্থ্যোদ্ধার করে পূর্ণোদ্যমে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পেরেছিলেন’। চুপ করে
গেছি, কিছু বলতে পারিনি, বলার ছিল না। বুঝতে পেরেছি যে, এ বেদনা তো ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির
গর্ভজাত নয়, তার শিকড় অন্যত্র, ও বহুদূর বিস্তৃত।
রাজনীতির
পাশা খেলায় পাল্টে যাওয়া বঙ্গভূমির মানচিত্রে নতুন করে থিতু হওয়ার, শিকড় প্রোথিত
করার ঐকান্তিক প্রয়াসেই তাই নিয়োজিত হয়েছে তাঁর শ্রম এবং মেধা। কথায় কথায় একদিন
বলেছিলেন, ‘আমি তো লেখালেখি শুরু করেছি সে অর্থে অনেক দেরিতে, চল্লিশের কোঠায়
পৌঁছে, প্রয়োজনের তাগিদে।’ সত্যিই তাই, লেখক হিসেবে যশোপ্রার্থী তিনি ছিলেন না। ‘শ্রীহট্ট-কাছাড়ের
ইতিহাস’ থেকে শুরু করে ‘ধর্ম, রাজনীতি ও
সাম্প্রদায়িকতাঃ উৎস ও পটভূমি’ পর্যন্ত তাঁর তাবৎ মসী-চালনা এক অর্থে অসি-চালনার সামিল। বরাক উপত্যকার বাঙালির ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের
জন্য লড়াইয়ে তথ্যের তরবারি হাতে ’৬১র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৮০র বিদেশি-খেদা
আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়সীমা জুড়ে তাত্ত্বিক লড়াই প্রায়
একাই লড়েছেন মানুষটি। আসলে ইতিহাস চর্চা তাঁর কাছে ‘অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ’ মাত্র
ছিল না, ছিল নিজের সময়কে বোঝার যাচাই করার কষ্টিপাথর। দেশভাগের যন্ত্রণা এবং
সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অবস্থান তাই তাঁকে
দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে অসামান্য সব রচনা। সুজিৎ চৌধুরী ও সুজিৎ চৌধুরীর সময় এভাবেই একাকার হয়ে আছে। তাঁর যাবতীয়
লেখালেখি আসলেই ‘সময়ের পদাবলী’ রচনা। নাগরিক পঞ্জি নবায়ন নিয়ে হালে যে অনিশ্চয়তা
দেখা দিয়েছে, উদ্ভুত হয়েছে যে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির, তার পরিপ্রেক্ষিতে সুজিৎ
চৌধুরীর অনুপস্থিতি তীব্র ভাবে অনুভূত হচ্ছে। বরাকের, বিশেষ করে করিমগঞ্জের
বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে বরাক তথা গোটা ভারতবর্ষ
জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতি বিরাজ করছে সে
প্রসঙ্গে বিশেষ করে মনে পড়ছে তাঁর ‘গোরু ও আমরা’ রসরচনাটির কথা। অবশ্য সে রচনার
রসাস্বাদনে এ মুহূর্তে কতজন উৎসাহী সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। পরিস্থিতি
এমনই।
বরাক
উপত্যকার সমাজ-গঠন প্রক্রিয়া অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে এই ছিল তাঁর সুচিন্তিত অভিমত।
এ নিয়ে লিখেছেনও বিস্তর। ইতালির প্রসঙ্গ টেনে গ্রামশ্চির উল্লেখ করে বরাক উপত্যকায়
যে ‘অরগ্যানিক ইন্টেলেকচ্যুয়াল’ (organic intellectual)শ্রেণীর উদ্ভব হয়নি
তেমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কথাটা সর্বাংশে মিথ্যেও নয়। বরাক উপত্যকার প্রথম পর্বের সাহিত্য
ও শিল্পচর্চায় কলকাতা-মুখিনতা, সামান্য দু’একটি ব্যতিক্রম
বাদ দিলে যে প্রায় সর্বব্যাপ্ত ছিল সে সম্ভবত সে কারণেই। কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের
দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার প্রবণতা ও মানসিকতার সমালোচনা করেছেন, এর ক্ষতিকারক
ভূমিকা বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলতেন প্রায়শ। মৌলিক চিন্তাচর্চাকে সর্বাধিক
প্রাধান্য দিতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ধারণার কথা সভয়ে সসঙ্কোচে বলে ফেলি। এ
অঞ্চলের সাহিত্যচর্চা এবং অন্যান্য লেখালেখি বিষয়ে সুজিৎ চৌধুরী খুঁটিনাটি খবর
পর্যন্ত রাখতেন। পাঠক হিসেবে অভাবনীয় মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য করেছি যে,
কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, এক কথায় গদ্যরচনার প্রতি তাঁর উৎসাহ
বেশি ছিল। নতুন প্রজন্মের দু’একজন কবি সম্পর্কে অবশ্য দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এর
একটা কারণ সম্ভবত এই যে, কলকাতা-মুখিনতা কবিতার ক্ষেত্রেই অধিকতর প্রকট ছিল। এ
অবশ্যই আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত। হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া বরাকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ
লেখার লোক সংখ্যায় কম তার জন্য তাঁকে আক্ষেপ করতেও দেখেছি। এই অভাব মোচনের গুরুদায়িত্ব
ও গুরুভার তিনি একার সামর্থ্যে বহন করেছেন বহুলাংশে। এ কথা বললে বোধহয় একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না যে ‘অরগ্যানিক
বুদ্ধিজীবী’র উদ্ভবের প্রক্রিয়াটি এ উপত্যকায় শুরু হয়েছে সুজিৎ চোধুরীর হাত ধরেই। প্রদত্ত
কোনও দৈব গাণ্ডীব অথবা অক্ষয় তূণ তাঁর হাতে ছিল না সত্য, শরসন্ধানে শরযোজনায় তিনি
অর্জুনের সমকক্ষ ছিলেন না, ছিলেন একলব্যের সমগোত্রীয়। স্বভূমি-সন্ধানের
মনোস্তাত্ত্বিক ভিত তৈরি করে দিয়ে গেছেন একার সামর্থ্যে। উপত্যকার ছিন্নমূল
বাঙালির শিকড় সন্ধানের, বিবিধ বিড়ম্বনার হাত
থেকে নিষ্কৃতির দিগদর্শন রেখে গেছেন উত্তর প্রজন্মের জন্য। তাঁর জীবনের চূড়ান্ত
সার্থকতা এখানেই। ...
‘ঋত্বিজ’-এর
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আজীবন সদস্য হিসেবে আমরা আর সবার চেয়ে খানিকটা বেশি অধিকার
খাটাতাম তাঁর ওপর, তিনিও প্রশ্রয় দিতেন। মনে আছে, আমাদের ছোট্ট অফিস ঘরে তাঁকে ‘আজীবন
সদস্য’ ঘোষণা করে নিজেদের ছাব্বিশ ইঞ্চি ছাতিকে যখন ছাপ্পান্ন ভাবতে প্ররোচিত
হচ্ছি সুজিৎ-দা তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আজীবন সদস্য তাকেই করা হয়
যার জীবনের আয়ু আর বেশি নেই।’ এটাই ছিল সুজিৎ-দার স্টাইল। সিনেমা হয়ত সেভাবে বেশি
দেখতেন না, কিন্তু আমাদের বাৎসরিক চলচ্চিত্র উৎসবে আসতেন আড্ডা দিতে, রাধা সিনেমা
হলের সেই সব জমাটি আড্ডার মুহূর্তগুলো ঝিনুকের মাঝে মুক্তোর মত সঞ্চিত থাকবে স্মৃতিকোঠায়। আজীবন। ঋত্বিজের ডাকে
অসুস্থ শরীর নিয়েও উপস্থিত হয়েছেন। আসলে কেউ নতুন কিছু করতে চাইছে দেখলে সর্বাগ্রে
উৎসাহ যোগাতেন সুজিৎ-দা। চলচ্চিত্র সে অর্থে তাঁর বিচরণভূমি ছিল না, তা সত্ত্বেও আমাদের দাবি মিটিয়েছেন অসামান্য
সব রচনা দিয়ে। সেদিক থেকে আমরা অবশ্যই এক বাড়তি
অহঙ্কারের দাবিদার, এই কারণে যে, সুজিৎ-দার বহুমুখী মেধার পরিচয় পেয়েছেন উপত্যকার বহু মানুষ, ঘনিষ্ঠ জনেরা তো বটেই, কিন্তু ‘ঋত্বিজের
সুজিৎ-দা’ আর কারো ন’ন, কোন ভাবেই সে ‘কপিরাইট’ কেউ কোনোদিন ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
ঋত্বিজের রজত জয়ন্তী বর্ষে এই অহঙ্কারী উচ্চারণের মধ্য দিয়েই হোক আমাদের ‘সুজিৎ চৌধুরী স্মরণ’।
আক্ষেপ
কেবল এই যে, দেশ হারানোর হাহাকার বুকে করে যিনি লিখে গেলেন সারা জীবনের যাপনকথা, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁকে
দ্বিতীয়বার ‘দেশ’ (করিমগঞ্জ) ছাড়তে হয়েছে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই। করিমগঞ্জ ছেড়ে
যেতে মন সায় দেয়নি, ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তিন-চার দিন আগে দূরভাষে
জানিয়েওছিলেন ফিরে আসার দিনক্ষণ। কিন্তু ফেরা হল না আর, মৃত্যুর নিঠুর হানায়। ‘হারানো
দিন হারানো মানুষ’-এর লেখক নিজেই আজ ‘হারানো মানুষের’ সারিতে বটে। কিন্তু সে তো শারীরিক ভাবে হারিয়ে যাওয়া, স্বাভাবিক জৈবিক নিয়মে। উপত্যকার
অধিবাসীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে ও প্রসঙ্গে তাঁর আত্মিক উপস্থিতি কি
এত সত্বর হারিয়ে যাবার! আলবৎ নয়। এ অঞ্চলের বাঙালির আত্মপরিচয় খুঁজে নেবার এবং অধিকার অর্জনের আগামী
লড়াইয়ের শরিক হয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আরো বহুকাল। প্রেরণা ও সাহস যুগিয়ে যাবেন
অবিরত। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক যে ইচ্ছা করলেও তাঁকে
উপেক্ষা করার জো নেই। অস্তিত্বের সঙ্কট মোচনের খাতিরেই বারবার ফিরে যেতে হবে সুজিৎ চৌধুরীর কাছে, সুজিৎ চৌধুরীর কালে। এ
আমাদের ভবিতব্য। ‘ব্যর্থ-চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণ’ নিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন, শিয়রে শুশ্রূষার হাত রেখে আত্মজন যেমন থাকেন
সঙ্কট কালে। একালের একলব্যকে এভাবেই স্মরণ করবেন উপত্যকার আপামর মানুষ। আরো
বহুকাল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন