আমাদের অক্ষর পরিচয় তথা বই পড়ার শুরুয়াত মূলত ওই ‘‘অ’-য় অজগর আসছে তেড়ে’’ দিয়েই। একটা বয়স অবধি তাই বই-ভীতি প্রায় অনিবার্য ছিল। সে বয়সে বই মানে আসলে পুস্তক, পাঠ্য পুস্তক অথবা পড়ার বই। এই অদ্ভুত বিভাজন কেন যে করা হত, (এখনো হয়) তা আজও বোধগম্য হল না। সিলেবাসের বাইরের বইগুলো তবে কি অপাঠ্য বা না-পড়ার ? কে জানে ! গো-শালার মত পাঠশালা শব্দটা নিয়েও তেমন স্বস্তি বোধ করতাম না সেই ছোট বেলাতেও। বই পড়া অর্থাৎ পঠন-পাঠন প্রসঙ্গে কথাগুলো আজও মনে আসে, ভাবায়। আমাদের শৈশবে গল্প-উপন্যাসের বই পড়া তো রীতিমত শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেই গণ্য হত। অনেক অভিভাবক এখনো তাই মনে করেন। এমন কি যারা নিজেরা গল্প-বই পড়েন তাদেরও অনেকে! ওগুলো ছিল ‘আউট’ বই, ওগুলোকে আউট করার জন্য সব রকমের প্রচেষ্টায় নিরলস ছিলেন অভিভাবকেরা। আমাদের মত বেয়াড়া ছাত্র যারা পাঠ্যপুস্তকের নিচে লুকিয়ে (অপাঠ্য) বই পড়ার দুঃসাহস দেখাত তাদের সাবুদ করার লোভে বাবা-মা’রা রীতিমত সি আই ডি-র ধাঁচে গোয়েন্দাগিরি করতেন । বাড়িতে-স্কুলে কতবার যে এর ফলে নাকাল-নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
অথচ তার মধ্যে একটা দারুণ মজাও ছিল। কারণ ধরা পড়ার ঘটনা ঘটত কালে ভদ্রে। মাস্টারমশাইকে পরীক্ষায় ঠকাতে না পারলেও লুকিয়ে গল্প-বই পড়ার প্রকল্পে বিজয়ীর হাসি আমরাই হাসতাম অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ছোটদের বড়রা যতটা বোকা ভাবেন ছোটরা যে আসলে তত বোকা নয় সেকথা একুশ শতকের পিতৃ-মাতৃকুলও সহজে স্বীকার করতে চাইবেন না। একালের ছেলেমেয়েরা হয়ত লুকিয়ে বই পড়ে না, কম্পিউটারে কারসাজিটা করে। ব্যাপারটা মূলত একই। সে যা হোক, ক্লাস সেভেনে ‘পথের পাঁচালী’ পড়ার অনুভূতি আজও অক্ষয়, অম্লান হয়ে আছে মনের মণিকোঠায়। কত রাতের ঘুম যে নষ্ট হয়েছে, স্বপ্নের ঘোরে কত না সফর করেছি অপু-র হাত ধরে। তার কাছে যে-কোন ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও নেহাৎ খোলামকুচি ছাড়া কিচ্ছু নয়। পুনর্জন্ম যদি থাকত তাহলে প্রথম উপন্যাস পাঠের সেই স্মৃতি নিয়ে জাতিস্মর হয়ে জন্মাতাম। নির্ঘাৎ। তার আগেও বিস্তর অন্য বই পড়া হয়েছে বইকি, শুকতারা, কিশোর ভারতী, স্বপনকুমারের বিভিন্ন সিরিজ ইত্যাদি। পরবর্তী পর্বে প্রেমেন মিত্তির শিবরাম চক্কোত্তি আরো কত কি ! কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’র ব্যাপারই আলাদা।
সে যাক, বইয়ের শ্রেণি-বিভাগ নিয়ে কথা হচ্ছিল, তারও নানান শ্রেণি বর্তমান। পৌরাণিক, আধুনিক, শাস্ত্রীয় ইত্যাদি কত না শ্রেণি-বিভাগ। তবে ক্লাসিক বইয়ের মান-মর্যাদাই আলাদা। যদিও ক্লাসিক বইয়ের সংজ্ঞা নিয়ে রসিকতা করা হয় এই বলে যে, যেসব বহু প্রশংসিত বই শিক্ষিত শ্রেণির ড্রয়িং-রুমের শো-কেসে জ্বলজ্বল করে শোভা পায় অথচ বইয়ের মালিক ভুলেও কোনোদিন খুলে দেখেন না ‘তাহাই ক্লাসিক’ বই। “Classic' - a book which people praise and don't read.” ― Mark Twain. এরকমের কখনো খুলে-না-দেখা ঢাউস বই ছাত্রাবস্থায় বালিশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতেও দেখেছি। বইয়ের এরকম অভিনব ব্যবহারের ফলেই সম্ভবত ‘থান ইঁট সাইজের বই’ গোছের উপমা সৃষ্টি হয়ে থাকবে। বই নিয়ে রসিকতা যেমন আছে, নীতিকথাও কিছু আছে। যেমন,‘বই-চুরি চুরি নয়’। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত ব্যক্তিও ন্যাশন্যাল লাইব্রেরীতে ঢুকলে নাকি নজরদারি চলত। কথায় আছে বই আর বউ হাতছাড়া হলে ফিরে পাওয়া যায় না। বই-পাড়া বউ-বাজার ঢুঁড়েও না। সর্বাংশে মিথ্যে নয় কথাটা। বই নিয়ে যারা রসে বশে দিন কাটান তাদের ভাঁড়ারে এজাতীয় রসের পরিমাণ অফুরান। যাক, বই নিয়ে রসিকতা আপাতত আর না।
এবার অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। মানুষের বই-রুচিও বিবিধ রকমের। ভিন্ন রুচির্হি লোকাঃ । ইংরেজিতে একটা কথা চালু আছে -Man is known by his companions. – কার কেমন বই পছন্দ, অথবা কে কীরকম বই পড়তে ভালবাসেন তা থেকেও মানুষ চেনা যায়। গ্রন্থগারিকদের এই তত্ত্বে অগাধ আস্থা এবং এই পদ্ধতির প্রয়োগে এরা ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কে ‘এক্সপার্ট ওপিনিয়ন’ও দিয়ে থাকেন আকছার। বই নাকি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ! বিশেষজ্ঞদের মতে কুকুরের পর বই-ই নাকি মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সুহৃদ। “There is no friend as loyal as a book.” ― Ernest Hemingway. বইয়ের শ্রেণিভেদের মত পাঠকেরও শ্রেণিভেদ আছে। কেউ বই পড়েন মনে রাখার জন্য, কেউ পড়েন ভুলে যাবেন বলেই। কেউ কেনেন, অথচ পড়েন না; আবার এমনও মানুষ আছেন যিনি প্রচুর পড়েন, কিন্তু (সামর্থ্য সত্ত্বেও) কদাপি বই ক্রয় করেন না। বই-পাগল বা বই-বাতুল যেমন আছেন, বই-পোকা (গ্রন্থকীট)ও আছেন – উভয়েই গ্রন্থাসক্ত যদিও এই দুই শ্রেণির মধ্যে গুণগত ভিন্নতা রয়েছে । বিজ্ঞজনের পরামর্শ এই যে, যদি কোনো আসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের প্রতি কখনো আকৃষ্ট হন তাহলে তিনি কী ধরনের বই পড়েন তা জানার চেষ্টা করুন। বই নিয়ে আছে বহু বাহারি কথা, কথার বাহার। বই-মেলায় আছে বইয়ের বাহার, বই-মেলা মানেই ‘মেলা বই’ (তবে মেলে রাখা নয়), থরে থরে সাজানো। তার আবার গন্ধও আছে, নতুন এবং পুরোনো বইয়ের গন্ধ আবার আলাদা।
বই নিয়ে বহু বিস্ময়কর তথ্য ও মজাদার কাহিনি আছে, উদ্ধারযোগ্য এবং স্মরণীয় অসংখ্য উক্তিরও ইয়ত্তা নেই । বই যে মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে সেগুলো আসলে সেটাই ঘোষনা করে। বই ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব বইকি। “A room without books is like a body without a soul.” ― Cicero. শেষ করার আগে একটা মজার গল্প শোনা যাক। শুনেছিলাম প্রয়াত সুজিৎ চৌধুরীর বয়ানে। অক্ষম অনুবাদে হাজির করছি। শহরের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি, বর্তমানে প্রয়াত, একদিন আড্ডায় এসে বললেন –‘কাল একটা দারুণ বই পড়লাম, অসাধারণ উপন্যাস’। সুজিৎ-দা বইটির নাম জানতে চাইলে ইতস্তত করে তিনি বল্লেন, ‘ইস্, নামটা কিছুতেই মনে আসছে না যে!’ ‘ঠিক আছে, গল্পটা কী সেটাই বলো’। ‘গল্পটা’-ভদ্রলোক আমতা-আমতা করতে লাগলেন । ‘আচ্ছা একটা কোনো চরিত্রের নাম-ই নাহয় বলো’। ভদ্রলোক সেও বলতে পারলেন না, ‘মনে পড়ছে না তো, ভুলে গেছি...। সুজিৎ চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বল্লেন, ‘তুমি সব ভুলতে পারলে আর বইটা যে পড়েছ সে তথ্যটা ভুলতে পারলে না, আচ্ছা লোক বটে!’
উক্ত স্বনামধন্য ব্যক্তিটি ভুলতে না পারলেও এযুগের মানুষ কিন্তু বাস্তবিক অর্থেই বই পড়া ভুলতে বসেছে। সে বছর বছর যতই বইমেলা, বই নিয়ে আলোচনা-লেখালেখি হোক না কেন। এই ‘ইলেক্ট্রনিক এজে’ বই নিয়ে কেউ আর সবিশেষ মাথা ঘামায় না। ‘বই এখন কেনে না কেউ’-বইমেলায় কান পাতলেই এমন কথা শোনা যায়। দু’একজন কেনেন যদিও পড়েন না। যারা এখনো পড়ার বাতিক ছাড়তে পারেন নি তাদেরও বড় অংশের সাহারা এখন ই-বই (e-book)। গাঁটের পয়সা খরচ হয় না, বাড়িতে ইন্টারনেটের সুবিধে থাকলে যখন যেমন খুশি বই খুঁজে নিয়ে পড়ে ফেলা যায় অনায়াসে। এতোদিন অভিজাত পাঠকেরাই কেবল নিজস্ব বুক-শেলফে বই ‘আপ-লোড’ করে গেছেন, এখন, বই-পড়া বই-কেনার ডাউন ট্রেণ্ডের এ-যুগে, চিত্রটা পাল্টে গেছে। এখন ‘ডাউন-লোড’-এর মরসুম। আম-পাঠকও অজস্র অসংখ্য বই সহজেই নামিয়ে নিতে পারেন নিজস্ব ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ-লাইব্রেরীতে। এতে ‘গেল গেল’ রব তুলছেন একদল। যদিও এর পেছনে কোনো যৌক্তিকতা নেই। মুদ্রণ যন্ত্রের আবির্ভাবে ছাপা বই যেভাবে হাতে-লেখা পুঁথির যুগ থেকে এক লাফে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছিল, ই-বইও বস্তুত সেরকম এক বিপ্লবের সূচনা করেছে পঠন- পাঠনের ক্ষেত্রে। বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চার বিশ্বে এই বিকেন্দ্রিকরণের এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব অবশ্যম্ভাবী তো বটেই। বই পড়ার পাট উঠে গেল বলে তাই অযথা হাহুতাশ না করে বরং স্মরণ করুন - “There are worse crimes than burning books. One of them is not reading them.” ― Joseph Brodsky। এবং স্বীকার করুন, ই-বই আর যাই হোক পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব নয় কিছুতেই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন