বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

মানুষ বনাম প্রকৃতি


ভণিতা

প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে ভাবতে বসলে বৃক্ষরোপণ আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কথাই মনে আসে এটা প্রায় বাঁধা গতে পরিণত হয়ে গেছে বলা যায় আর এই ওয়ার্মিং-এর জন্য দায়ী করা হয় মানুষকেই এতে ভুল নেই হয়ত, কিন্তু এর মধ্যে পুরো সত্যও নেইযদি পৃথিবীর গড় তাপ আজকের চেয়ে ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যায়,যার প্রবল   সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে,তাহলেও বহু লক্ষ বা বহু কোটি বছর পর এই গ্রহে নতুন প্রাণের উদ্ভব সম্ভব,  বায়োডাইভারসিটিও ফিরতে পারে। কিন্তু তা হবে মানুষের ধরা ছোঁয়া এমন কি কল্পনারও বাইরে পার্মিয়-ট্রায়াসিক (Permian-Triassic) যুগে,অর্থাৎ ২৫ কোটি বছরেরও বেশি আগে,প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রাণ - উদ্ভিদ,পশু সবই - ধ্বংস হয়ে যায়। পৃথিবীর বায়োডাইভারসিটি তার পুরোনো স্তরে ফিরতে পেরেছিল ৫ কোটি বছর পরে। বিশ্ব উষ্ণায়ণ হলে সভ্যতা ভেঙে পড়বে। এবং তার ফলে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হবে। শুধু তাই নয়,দ্রুত পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রজাতির মৃত্যু হবে।

এই যে বিনাশের,সভ্যতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কথা বলা হল, সে সভ্যতার জয়যাত্রা কিন্তু সম্ভব  হয়েছে প্রতিবেশের সঙ্গে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক ও সংযোগের ফলেইএকথাও অবশ্য সত্য যে, এই যাত্রা পথে সৃষ্টি হয়েছে  অনিবার্য সংঘাতেরও। মানুষ যেদিন থেকে আগুনের ব্যবহার আয়ত্ত করেছে সেদিন থেকেই দহন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে দম বদ্ধ করা ধোঁয়ারও। পরিবেশ দূষণের সেই শুরু। তারপর একে একে এসেছে কল-কারখানা, মায় পারমাণবিক চুল্লী অবধি দূষণের উৎস অঢেল। আজকের নগর-সভ্যতায় ‘অর্জন’ ও ‘বর্জন’ সমানুপাতিক নয়। বর্জ্য বস্তুর স্তূপে পরিণত হয়ে পড়ছে গোটা পৃথিবী। এক কথায় ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে, হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পরিণাম যে দুর্বিষহ সে তো দেখতেই পাচ্ছি সবাই।  সংকটের ভয়াবহতা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই তেমন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সঙ্কট থেকে মুক্তির উপায় কী?  কী ভাবে পাওয়া যাবে পরিত্রাণ? পরিত্রাণ পেতে হলে বুঝতে হবে সমস্যার ব্যাপ্তি ও চরিত্র, জানতে হবে মানুষ এবং পরিবেশের মধ্যে দেয়া-নেয়ার প্রক্রিয়াটিওসে চেষ্টাই আমরা করব এখানে, সীমিত সামর্থ্যে। 

 

মানুষ ও পরিবেশ   

মানুষ ও প্রকৃতির পাস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে একথা অনায়াসে বলা যায় যে, প্রকৃতি যেখানে মানব দেহ নয়,সেখানে প্রকৃতি মানুষের অজৈব দেহ। মানুষ প্রকৃতির দ্বারাই জীবনধারণ করে,এবং প্রকৃতির সঙ্গে ধারাবাহিক কথোপকথন তাকে চালাতেই হয়অর্থাৎ, সোজা কথায় মানুষের শারীরিক ও মানসিক জীবন প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্তএ কথা বলার অর্থ কেবল,প্রকৃতি নিজের সঙ্গে যুক্ত,কারণ মানুষ প্রকৃতির একটি অঙ্গ। মানবদেহ পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পরিবেশও মানবদেহের উপর প্রভাব ফেলে। এই  পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে উভয়েরই পরিবর্তন ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী,পরিবেশ নিস্ক্রিয় নয়প্রাণী অথবা জীব মাত্রেই,যাদের মধ্যে মানুষও পড়ে,মানুষের সামাজিক ক্রিয়াও পড়ে,তারা সকলে সকলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত তারা ধারাবাহিকভাবে একে অপরের সঙ্গে আদান-প্রদান ঘটায় এবং একে অপরকে রূপান্তরিত করে। আমরা যখন বলি, ‘অমুক প্রজাতি অমুক পরিবেশগত স্থান দখল করেছে’ (has occupied an environmental niche) তখন এমন একটা ধারণা তৈরি হয়,যেন ঐ স্থান বা niche-টি এমনিতেই তৈরি ছিল,আর ঐ প্রাণীটি পথ চলতে চলতে হঠাৎ সেটি দেখতে পেয়ে আনন্দের সঙ্গে নিজেকে সেখানে প্রবিষ্ট করে ফেলছেবস্তুত,প্রাণীদের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রথম থেকে মাথায় না রাখলে ‘পরিবেশ’ কথাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে

পরিবেশবাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য এক সহযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা। লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও গোল বাঁধছে লক্ষ্যপূরণের পদ্ধতিগত প্রশ্নে। মানুষের স্বার্থ আর প্রকৃতির স্বার্থে দেখা দিচ্ছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। একপক্ষের কাছে মানুষের স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে, অপর পক্ষের কাছে প্রধান হয়ে উঠছে প্রকৃতি। মানুষ ও প্রকৃতি যেন দুই যুযুধান পক্ষ। আবার ‘পরিবেশ বাঁচাও’-বাদীদের কারো কারো হাবভাব এমন যে প্রকৃতিকে ‘যেভাবে যেমন আছে সেভাবেই’ (in virgin state) টিকিয়ে রাখতে হবে, মানে ‘দাও ফিরে সেই অরণ্য’ আর কি ! তাতে চাই কি মানুষকে উৎসর্গ যদি করতে হয় তবে তাও সই। অর্থাৎ, মানুষ এবং প্রকৃতি যেন দুটো আলাদা বা পৃথক সত্তা। আর এই দুই সত্তার সম্পর্ক বুঝি সর্বাংশে বৈরিমূলকগোলমাল বাঁধছে তাই, প্রকৃতি-প্রেমিকের দৃষ্টিতে মানুষ হয়ে  পড়েছে খলনায়কমানুষের জন্য নয়, মানুষের কাছ থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করাই বুঝি এদের লক্ষ্য ও অভীষ্টঅর্থাৎ, মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে, বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটা প্রবণতা রয়েছে এক্ষেত্রে। সমস্যার মূলও সেখানেই নিহিত, এই ভুল বিভাজনের মধ্যে। মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ, এবং  এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থে যে মানুষ অন্যান্য প্রাণীকুলের মত ‘প্রকৃতির হাতের পুতুল’ মাত্র নয়। প্রকৃতির নিয়ম গুলোকে বোঝার সদিচ্ছা ও সামর্থ্য তার আছে। আর আছে বলেই প্রতিকূল পরিবেশ পরিবর্তিত হতে পারে অনুকূল পরিবেশে-মানুষেরই সামর্থ্যে, শুভবোধ, দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার দৌলতে।   

 

স্বল্প মেয়াদি লাভ, দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা  

আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, এমন এক যুগে বসবাস করছি যে-যুগে একদিকে প্রাচুর্য ও অপচয় অগাধ, অন্যদিকে শুধুই অভাব – খাদ্যের অভাব, পানীয় জলের অভাব, শুদ্ধ ও মুক্ত বায়ুর অভাব, শক্তি(energy)-র অভাব। এইসব অভাব-মোচনের মাধ্যমে জীবনযাপনে সুখ আমদানির নানাবিধ প্রচেষ্টা চলছে নিরন্তর। ফলাফল যে সব সময় সুখদায়ক হচ্ছে তা নয়, বরং বহুক্ষেত্রে যে অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা বলা বাহুল্য মাত্র। (অহেতুক তথ্য  ভারাক্রান্তির পথ পরিহারের সদিচ্ছা সত্ত্বেও) সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা বুঝতে খানিকটা সুবিধে হবে ভেবেই কয়েকটা বিষয় বাধ্যত উল্লেখ করছি। যেমন ধরুন, প্রতিদিন বিশ্বে যে পরিমাণ জল ব্যবহৃত হয় তা প্রকৃতির প্রদান ক্ষমতা থেকে ১০% বেশি।  অর্থাৎ, ওই অতিরিক্ত ১০% জল জোর জবরদস্তি করে প্রকৃতিকে শোষণের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যদিও তা অপরিহার্য নয় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ এখান থেকেই শুরু হচ্ছে।  

আবার ধরুন, বিভিন্ন রাসায়নিক সার, কীটনাশক  ইত্যাদির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিমাণগত ভাবে ফসলের বৃদ্ধি ঘটানো হল, কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল যে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে বহুলাংশে। অর্থাৎ, সাময়িক লাভ সামগ্রিক লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। প্রযুক্তি-নির্ভর তথাকথিত উন্নয়নের জন্য ‘শক্তি’(energy)-র চাহিদা বিরাট। প্রচুর মজুত সত্ত্বেও কয়লার ব্যবহার কিঞ্চিৎ, কারণ এ হচ্ছে ‘নোংরা জ্বালানি’-পেট্রোল-ডিজেল-এর বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় আদৌ। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৬০% ব্যয় হয় কেবল পরিবহনের জন্য। খাদ্যশস্য থেকে জ্বালানি নির্মাণ প্রকল্পের ( ‘fuel for food’ policies’) ফলে উদ্ভুত সমস্যার একটি দৃষ্টান্ত দিই – যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টা (corn)-র মূল্যবৃদ্ধি ঘটার অন্যতম কারণ হল কৃষিপণ্যজাত ইথানল তৈরির জন্য ভর্তুকি  প্রদান। এদেশেও জেট্রোফা থেকে ডিজেল তৈরির প্রয়াস একই সমস্যা সৃষ্টি করবে হয়ত অদূর ভবিষ্যতেঅথচ বিকল্প শক্তির উৎস গুলোকে ব্যবহারের সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। স্বল্প মেয়াদি লাভ এভাবেই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি করে। খাদ্য, জল ও শক্তি ক্ষেত্রে যা ঘটে তা অনিবার্য কারণেই পরিবেশকে প্রভাবিত করে, পক্ষান্তরে পরিবেশে যে বদল ঘটে তা আবার পূর্বোক্ত তিনটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করে।  

আজকের পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যার মূলে রয়েছে এক শ্রেণির মানুষের অত্যধিক লোভ-লালসা এবং আশু ফল লাভের অপরিণামদর্শী মানসিকতা। এক শতাব্দীর বেশি আগে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস শ্রেণিবিভক্ত সমাজে স্বল্পমেয়াদি   স্বার্থসিদ্ধি ও  তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা উদ্রেকের নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমরা মানুষরা প্রকৃতির উপর যে বিজয় অর্জন করেছি তা নিয়ে নিজেদের বেশি পিঠ চাপড়ানি দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি  আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। একথা ঠিক যে প্রতিটি বিজয় প্রথমত,আমরা যে ফল চেয়েছিলাম,তা এনে দিয়েছে ;কিন্তু দ্বিতীয়ত এবং তৃতীয়ত,ভিন্ন,অপ্রত্যাশিত ফল দেখা দিয়েছে,যা অনেক ক্ষেত্রে প্রথমটির নেতি ঘটিয়েছে।” এই তো কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডে যা ঘটে গেল তাকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ (natural calamity) মানতে নারাজ অনেকেই, পরিবেশবাদীরা তো বটেই। পরিবর্তে এই দুর্ঘটনাকে ‘মানুষের তৈরি দুর্যোগ’ (man made disaster)হিসাবেই বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ। কথাটা মিথ্যে নয় অবশ্যই ।

দৃষ্টান্ত ইচ্ছে করলেই বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োজন বোধহয় নেই। কেননা, মূল কথাটা এর থেকেই পাঠকের কাছে নিশ্চয় পরিষ্কার হয়ে যাবেসে যা-ই হোক, আপাতত সে প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে আমরা পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাটিকে একটু নেড়ে চেড়ে দেখতে চেষ্টা করব। একথা নিশ্চয় অনস্বীকার্য যে পরিবেশগত পরিবর্তন মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এক ভয়ানক সঙ্কটের সূচনা করেছে এবং এর থকে বেরুনোর পথ খুঁজতে ব্যস্ত সব পক্ষই। যদিও খোঁজার ধরনে পার্থক্য বর্তমান। পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতার মূলে যে ব্যাপার বা উদ্দেশ্যটি রয়েছে তা তো আসলে মানুষের বেঁচে থাকা, জীবনযাপনের পথটাকে সহজ সুগম করার উপায় বের করার নিরন্তর প্রয়াস ছাড়া অন্য কিছু নয়। অথচ অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন  যে মানুষ যেন ‘যে ডালে বসে আছে সে ডালটিকেই কাটতে চাইছে’ বোকার মতন।

 

সমস্যার মূল কোথায় ?

কিন্তু এই অপরিণামদর্শিতার হেতু কী ? মানুষ তো বোকা নয়, বুদ্ধিমান জীব ! তাহলে ? এই আত্মঘাতী প্রবণতার মূল কোথায় ? মানুষ মাত্রেই কী এই আত্মঘাতের জন্য সমভাবে দায়ী ? এইসব সাধারণ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাধানের সূত্রটিও। উত্তর খোঁজা যাক তবে ! মানুষের কাজের দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে মানুষ কেন তাকে যথাযথভাবে দেখে নি ? এর কারণ হল,শ্রেণীবিভক্ত সমাজে,একদিকে রয়েছে শাসক-শোষক শ্রেণী,যাদের কাছে (অন্তত সাধারণভাবে) গচ্ছিত আছে জ্ঞান,অথচ তারা সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করতে চায় নিছক নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে;আর অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষ,যারা বিকল্প চায়,কিন্তু বিকল্প সম্পর্কে তাদের ধারণা সব সময় স্বচ্ছ নয়। একারণেই,গণচেতনা-গণবিদ্রোহকে নতুন উদীয়মান উচ্চবর্গীয়রা অনেক ক্ষেত্রেই কুক্ষিগত করে ফেলতে সমর্থ হয় ইউরোপে সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ে শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-ছোটো চাষী সকলেই সামিল হলেও নেতৃত্ব দিতে এই জন্যই   সক্ষম হয়েছিল বুর্জোয়া শ্রেণী। আর বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের ফলেই দীর্ঘমেয়াদী ফল বিশ্লেষণ করার চেষ্টা শিকেয়   উঠে গেল। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের এক প্রসিদ্ধ উক্তি হল,‘in the long run we will all be dead’ - অর্থাৎ,আমরা তো সবাই একদিন মরব, অতএব, বেশি দীর্ঘমেয়াদী ফলের কথা ভেবে কী হবে ?

 

‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’

এই বহুশ্রুত বচনটিতে ‘বীরের দল’ আসলে কারা ? সেটা জানা ও বোঝা দরকার। সামাজিক বিবর্তনের ফলে একটা পর্যায়ে আদিম সাম্যের  মানবিক নীতি পরাস্ত হবার ফলে সম্পদের গোষ্ঠী (সামাজিক) মালিকানার বদলে উদ্ভব  হল ব্যক্তি-মালিকানার। বিভাজিত হল মানুষ, মানুষের সমাজ। বিভিন্ন শ্রেণির জন্ম হল। দেখা দিল শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, শ্রেণিসংঘাত। শোষক-শোষিত শাসক-শাসিতে  বিভাজিত হল দুনিয়া। পৃথিবীকে ভোগ করার সামাজিক ছাড়পত্র নিয়ে শাসক-শোষকের দলটিই হয়ে উঠল বীরের দল। দলের মধ্যেও এল দলাদলি, কাড়াকাড়ি – ভোগ্য বস্তুর দখলদারি নিয়ে। এরই চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে  পেলাম, দেখতে পাচ্ছি বাজার দখলের জন্য সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মধ্যে। ওই যে কথায় আছে না, ‘যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়, উলু খাগড়ার প্রাণ যায়’-এখানে উলু খাগড়া হচ্ছে শোষিত-শাসিত আমজনতা, আর অতি অবশ্যই আমাদের ধাত্রী ধরিত্রী, প্রকৃতি।

এই বীরের দল প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করার জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে না শুধু, একেবারে তছনছ করে ছাড়ে। সৃজনশীল শ্রমকে শোষণ করার মাধ্যমে যেমন ছিবড়ে করে ফেলে তাবৎ শ্রমজীবী মানুষকে। অর্থাৎ, এই শ্রেণির মানুষের লোভ-লালসার বলি হয় সাধারণ মানুষ, যারা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে না জ্ঞানত, বরং বেঁচে থাকার স্বার্থে জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করে। করেছে আজন্ম, আজও করে চলেছে। এই সত্য উপলব্ধি করা যায় এখনো, বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রার প্রণালী লক্ষ্য করলে। নদীকে যারা চেনে, পাহাড়কে যারা জানে, জঙ্গল যাদের আবাসভূমি তারা জানে প্রকৃতির সঙ্গে সহবাসের রীতিনীতি। সাম্প্রতীক সময়ে এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত তো  আমাদের সবারই জানা, যে, আন্দামানের আদিবাসীদের একজনও প্রাণ হারান নি প্রলয়ংকর সুনামির ফলে। সমস্যা হল, এই না-যুদ্ধবাজ মানুষেরা পেরে ওঠে না ‘আধুনিক লুঠেরা বীরপুঙ্গবদের’ সঙ্গে লড়াইয়ে, প্রতিরোধ করতে পারে না প্রতিহত করতে পারেনা তাদের বিবিধ ও বিধ্বংসী আক্রমণ। 

 

প্রতিবাদ প্রতিরোধের কড়চা

কিন্তু একেবারেই কি পারে না ! একে বারেই পারে না তা নয়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রচেষ্টা চলছে, চলছেই। চলতেও থাকবে নিশ্চয়, কেননা এ আসলে জীবন সংগ্রামেরই অঙ্গ। বাঁচার লড়াই থেকে আলাদা নয়। ‘চিপকো’ আন্দোলনের (১৯৭৩) কথাই স্মরণ করুন, সুন্দরলাল বহুগুণা-র নেতৃত্বে এই গণ-আন্দোলন যখন চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল সে সময় এদেশে পরিবেশবাদীদের অস্তিত্বও ছিল না। কিংবা ‘জঙ্গল বাঁচাও আন্দোলন’(১৯৮০), বিহারের সিংভূম জেলায় শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বৃহৎ নদী-বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে মেধা পাটেকরের নেতৃত্বাধীন ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’(১৯৮২) তো গোটা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও  কোকাকোলা-র বিরুদ্ধে যে স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছে এদেশের একেবারে সাধারণ মানুষ, অথবা এই সেদিন তামিলনাডুর মানুষ কুডানাকুলাম পারমাণবিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে যে গণ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তার মধ্যে নেই এই জীবনদায়িনী ধাত্রী ধরিত্রীকে লুঠেরাদের হাত থেকে রক্ষা করার অদম্য সংকল্প ?

দৃষ্টান্তের অভাব নেই। আসলে, আমরা, যারা বছরের কোনও এক বিশেষ দিনে নির্ধারিত ভাষণ শেষে বৃক্ষরোপণের কর্মসূচী পালন করে আলোকচিত্রিত হই সহাস্যে, পরিবেশ চেতনার দারুণ নিদর্শন হাজির করি সদম্ভে, সেই আমরা বহুযোজন দূরের ওই লড়াইগুলো সম্পর্কে জানতেও চেষ্টা করি না। যদি বা জানিও, সে লড়াইয়ের মর্মে পৌঁছতে পারি না কিছুতেই, কোনও ভাবে। সংযুক্ত হওয়া তো দূর অস্ত। আর এখানেই মস্ত সুযোগ পেয়ে যায়  ক্ষমতান্ধ  লুঠেরার দল। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের টুঁটি টিঁপে ধরার অঢেল অবকাশ পেয়ে যায় তারা। আমাদেরই উদাসীনতায়, অসচেতনতায়, কিংবা সচেতন নিষ্ক্রিয়তার দরুণ। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যে লড়াই আমাদের লড়ার কথা জীবন দিয়ে সে লড়াই চালিয়ে যায়  সামাজিক বিচারে শিক্ষায়-দীক্ষায় অনেক পেছনের সারির মানুষেরা। যারা এনভায়রনমেন্ট, বায়োডাইভারসিটি, ইকো-ফ্রেণ্ডলি ইত্যাদি শব্দের মানে জানে না, ধারও ধারে না। সে প্রয়োজনও পড়ে না তাদের। কারণ, শিক্ষিত সমাজ যে তত্ত্বের  বড়াই করে, তার ধারাবাহিক অনুশীলন করে চলে এরা জীবন জুড়ে, প্রজন্মের পর  প্রজন্ম জুড়ে।  এই হচ্ছে বাস্তব চিত্র, দেশে দেশে, সারা বিশ্বে।

 

বিশ্বায়নের বিষবাস্প       

ধনতন্ত্র যেহেতু ক্রমাগত বাড়তে চায়, তাই তার ক্রমাগত বেশি শক্তির প্রয়োজন, দরকার অজস্র কাঁচামালের। পুঁজিবাদীরা যদিও দাবি করে,তারা অধিক দক্ষ ভাবে কাঁচামাল ব্যবহার করছে,তবু বর্জ্য পদার্থ বেড়েই চলেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলির অর্থনীতি সম্পর্কে ২০০০ সালে পাঁচটি বড় গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, সম্পদ ব্যবহার বাড়ছে বই কমছে না, এবং অর্থনীতিতে বার্ষিক যত সম্পদ প্রবেশ করছে তার অর্ধেক থেকে তিন চতুর্থাংশ এক বছরের মধ্যে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে পরিবেশে ফিরে আসছেএই কারণেই মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল তাঁবেদার  রাষ্ট্রকে ‘বর্জ্যের বদলে ডলার’ দিয়ে থাকে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি মানুষ ও পৃথিবীর মধ্যে বিপাকীয় (metabolic) আদান-প্রদানে ব্যাঘাত ঘটায়;অর্থাৎ,মানুষ খাদ্যবস্তুরূপে জমির যে সব উপাদান গ্রহণ করে,সেগুলোকে জমিতে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা দেয়। তার ফলে ধনতন্ত্র জমির ধারাবাহিক উর্বরতা রক্ষার শর্তাবলীকে লঙ্ঘন করে। শ্রম প্রক্রিয়াসমূহের সামাজিক সংযোগ ও সংগঠন পর্যবসিত হয় শ্রমিকের ব্যক্তিগত প্রাণশক্তি, মুক্তি ও স্বাধীনতাকে চুরমার করে দেওয়ার এক সংগঠিত পদ্ধতিতে উপরন্তু ধনতান্ত্রিক কৃষিতে সব প্রগতিই হল একাধারে শ্রমিক এবং জমি, উভয়কেই লুন্ঠন করে এমন এক প্রযুক্তিগত  প্রগতি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমির উর্বরতাবৃদ্ধিতে যে প্রগতি,তা হল দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ঐ উর্বরতা বিনষ্ট করার উৎসের দিকে যাত্রার প্রগতি। জমি ও শ্রম, উভয়কেই শোষণ করা এই প্রগতির অনিবার্য পূর্বশর্ত।

 

পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন যে ভোগবাদের জন্ম দিয়েছে তার কুফল ব্যক্তি থেকে ব্যষ্টি-জীবনে, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সর্বত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মানুষকে মানবিকতা-বিযুক্ত করার পাশাপাশি এই বিশ্বায়ন প্রকৃতিকেও করে তুলছে অ-প্রকৃতিস্থ।  প্রকৃতির প্রতিশোধ অনিবার্য হয়ে দেখা দিচ্ছে। যেমন অনিবার্য হয়ে উঠছে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। প্রলয়ের, মহাপ্রলয়ের আয়োজন সুসম্পন্ন প্রায়। ‘ধরণী, দ্বিধা হও, তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে আত্মরক্ষা করি’ বলার উপায় পর্যন্ত নেই আমাদের। প্রতিদিনের হীন-বাণিজ্য আমাদের এনে দাঁড় করিয়েছে এক মহা সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। সিদ্ধান্ত নিতে হবে মানুষকেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত; বেছে নিতে হবে চূড়ান্ত পথ, অন্তর্বর্তী পথ বলে কিছু নেই আরবলা বাহুল্য, সে পথ এক নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের পথ। সে যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সাম্যের লক্ষ্যে, সে যুদ্ধ মানুষকে প্রকৃতি থেকে মানবিক প্রবৃত্তি থেকে বিযুক্ত করার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, শেষ বিচারে পরিবেশ বাঁচানোর সংগ্রামটাও আসলে আলাদা লড়াই নয়, মানুষের অন্য সব রকমের মানবিক সংগ্রামের অংশ মাত্র। সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের লড়াইয়ের অন্তর্গত এক সার্বিক লড়াই, এক বিশ্বজনীন যুদ্ধ। মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেমন নিজস্ব শোষণ-প্রক্রিয়া বজায় রাখে ও লুঠতরাজ চালিয়ে যায়, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে সাম্য ও মুক্তির অন্যতর প্রয়াস সমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার মতাদর্শ ও তত্ত্ব প্রচার করেও তেমনি স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পাকা বন্দোবস্ত করতে উদগ্রীব ধূর্ত শাসকের দল। এই বিষয়টা স্পষ্ট না হলে ‘প্রকৃতি বাঁচাও’ ‘পরিবেশ বাঁচাও’ জাতীয় স্লোগানগুলো শেষ পর্যন্ত শত্রু শিবিরের মুখগুলোকে মুখোসে ঢেকে দেবার ভূমিকা পালনের অতিরিক্ত কোনও দায় পালনে সক্ষম হবে না। এই কারণে,আমাদের গ্রহকে যদি তার বর্তমান অবস্থায়,বর্তমান প্রাণীজগতকে নিয়ে বাঁচতে হয়,তাহলে পুঁজিবাদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য, অবশ্যম্ভাবী


সমাধানের সম্ভাব্য সূত্র :বিকল্প বিশ্বায়ন

 

       ধনতন্ত্র ও তার পৃষ্ঠপোষক বুর্জোয়া সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রে এক আপাত স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি বা বড়াই করলেও আসলে প্রত্যেকটি খণ্ডের বিচ্ছিন্নতাই একমাত্র সত্য ও বাস্তব। কডওয়েল এই বিচ্ছিন্নতাকেই বুর্জোয়া সমাজের সবরকম চিন্তার মধ্যে এক সাধারণ সমস্যা বা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। শ্রম থেকে শ্রমিককে, যন্ত্র থেকে যন্ত্রীকে, প্রকৃতি থেকে মানুষকে, চিন্তা থেকে কর্মকে বিচ্ছিন্ন করেই ব্যবস্থাটি টিকে থাকে। এ তার চারিত্রিক গঠনের অঙ্গ। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সমাজ  তাই একপেশে যুক্তিসর্বস্বতার আশ্রয় নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অবাস্তব দাবির মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু  সমাজ ও সংস্কৃতিকে বাঁচাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। ধনতান্ত্রিক বিশ্বায়ন এই প্রয়াসের অনিবার্য অনুষঙ্গ বই আর কিছু নয়।  

এমন নয় যে সমাধানের উপায় আমাদের হাতে নেই, পরিবেশ কেন্দ্রিক সমস্যার যথার্থ সমাধানের জ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের হাতেই আছে, কিন্তু যাদের হাতে রয়েছে তারা তার উপযোগে উৎসাহী নয় মোটেই। সমস্যা এখানেই। বিশ্বায়ন আমরাও চাই, তবে তেমন বিশ্বায়ন চাই না যেখানে কেউ একজন অথবা একদল কিংবা কোন একটি দেশ মোড়লি করবে শুধুপুঁজিবাদী বিশ্বায়ন নয়, আমরা চাই মানবিক বিশ্বায়ন। মানুষের বিশ্বকে বিশ্বের মানুষের জন্য পেতে চাই, যে বিশ্বে খাদ্য-খাদকের সম্পর্কের বদলে ‘বাঁচো, এবং বাঁচতে দাও’ (Live and let live) নীতি-ই হবে মূল   সামাজিক চালিকাশক্তি, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে সংযম ও মিতব্যয়িতা হবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক রীতি, যুদ্ধের বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠাই যেখানে মুখ্য হবে। মানুষে মানুষে তো বটেই,  সেখানে  মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যেও থাকবে না কোনো যুযুধান ব্যবধান, বিরোধএ পৃথিবী সত্যি অর্থে বাসযোগ্য হয়ে উঠবে তখনই।

কাজটা দুরূহ ও দুঃসাধ্য নিশ্চয়, কিন্তু সাধ্যাতীত নয়। আদিম মানুষ থেকে আজকের আধুনিক মানুষে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে মানুষেরই অদম্য উৎসাহে, অপরিসীম নিষ্ঠায়যে বিবর্তনের ফলে এই অভাবনীয় পথ-পরিক্রমা সম্ভব হয়েছে তা তো থেমে যায়নি। সে প্রক্রিয়া তো চলছে এখনো, আমাদের স্থূল দৃষ্টির অন্তরালে। চলমান প্রক্রিয়াটিকে বোধের গভীরে  অনুধাবন করে অন্তরে আত্মস্থ করে নিতে যদি পারি, তাহলেই চিনে নিতে পারব পথের নিশানা। তবে তার জন্য প্রয়োজন আছে আরেক আত্মযুদ্ধের, ‘আপন হতে বাহির হয়ে’ বাইরে দাঁড়াবার শক্তি এবং সাহসের। মানুষ হয়ে মানুষের সারিতে দাঁড়াবার দরকার এখন। ভেতর থেকে বদলাতে হবে প্রথমে, আত্মকেন্দ্রিকতার গহ্বর থেকে বেরুতে হবে সর্বাগ্রে, তবেই ‘বাহিরে’ বদল ঘটানো সম্ভব হবে, সহজ হবে। অন্তর্গত পরিবেশ না পাল্টালে বাইরের পরিবেশ পাল্টাবে না কিছুতেই, এই উপলব্ধি সবচেয়ে জরুরি এসময়। অর্থাৎ, এক সামাজিক রূপান্তর ছাড়া আমাদের গ্রহের রূপান্তর বস্তুত অসম্ভব।

 


 

 

  

একালের একলব্য স্মরণে

 

(স্মরণ)


সুজিৎ চৌধুরী !

এই একটি মাত্র নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যতখানি মান ও মান্যতা বরাক উপত্যকার আর কোনও সামাজিক ব্যক্তিত্বকে তার ধারে কাছেও পৌঁছতে দেখিনি, বিগত দুই দশকে। এ অর্জন কেবল বৈদগ্ধের নয়, অন্তর্বৈভবেরও। প্রায় দেড় দশকের অনুপম সান্নিধ্যে যেটুকু দেখেছি, জেনেছি, বুঝেছি তাতে মানুষটিকে জানার আগ্রহ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে ক্রমে। ব্যক্তিত্বের এমন সহজ অথচ সাবলীল আত্মপ্রকাশ সচরাচর চোখে পড়ে না। কখনো সমাজ ব্যক্তিকে তুলে ধরে, আবার কখনো ব্যক্তি সমাজ মনস্কতার মাধ্যমে নিজেকে   অপরিহার্য করে তোলেন সমাজে। সুজিৎ চৌধুরীর ক্ষেত্রে এ দুয়ের এক বিরল সংযোগ ঘটেছিল। ব্যাষ্টি এবং সমষ্টির মধ্যে দেয়া-নেয়া, আদান-প্রদান যখন  সঙ্গতি ও সংহতির ভেতর দিয়ে পথ খুঁজে পায়, তখন অবশ্যই  ব্যতিক্রমী উদ্ভাস দৃষ্টিগোচর হয়। বরাক উপত্যকার বঙ্গ সমাজ ও সংস্কৃতি আত্মপ্রকাশের এক বিশেষ পথ খুঁজে পেয়েছে ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীর সংস্পর্শে, তাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রে, দৌলতে। একথা    অবশ্যই অতিশয়োক্তি নয়। আবার একথাও মিথ্যে নয় যে, এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজ-কর্ম ব্যক্তি সুজিৎ  চৌধুরীর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ও অনিবার্য ছিল। ঐতিহাসিক কারণেই। এটা আপতিক কোনও ঘটনা নয়  মোটেই যে, তিনি শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ইতিহাস লিখতে শুরু করবেন। অধ্যয়নের বিষয় ইতিহাস হলেই স্ব-ভূমির ইতিহাস রচনায় সচরাচর আগ্রহী হয় না কেউ, তার মূলে থাকে ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন অনুষঙ্গ।   

সুজিৎ চৌধুরীর ক্ষেত্রে অনুষঙ্গটি অবশ্যই দেশভাগ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যে বেদনা বয়ে বেড়িয়েছেন মানুষটি। মর্মান্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট মর্মবেদনা ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরীকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে আমৃত্যু। এমন নয় যে, দেশভাগের দরুণ তাঁর পরিবার সাঙ্ঘাতিক বিপর্যয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।  দেশের বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হওয়ার জন্য যন্ত্রণা তো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু (তাঁর ক্ষেত্রে) এই   যন্ত্রণাবোধের মাত্রা ও পরিধি ছিল বহু গভীর এবং ব্যাপক। ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন সে বেদনার স্বরূপ। এর মূলে রয়েছে এক সামূহিক বোধ, সামাজিক বিপর্যয়কে নিজের ভেতর ধারণ করার দায়। এক্ষেত্রে পারিবারিক এক উত্তরাধিকার তাঁর অবশ্য ছিল।   পারিবারিক পরিমণ্ডলে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ও বহনের আবহ বর্তমান ছিল। পিতা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন গোড়া থেকেই। সেই সূত্রে পারিবারিক পত্রিকা ‘যুগশক্তি’-র জন্ম। সে পত্রিকার সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়া বাহুল্য মাত্র। স্বাধীনোত্তর সময়ে, আরো সঠিক ভাবে দেশভাগের পর, অতঃপর যে-মানসিকতা অনিবার্য হয়ে দেখা দিল সেটা মূলত আত্মপরিচয় খোঁজার, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথের অন্বেষণ। ছিন্নমূল মানুষের থিতু হওয়ার জন্য যে সংগ্রাম, চিন্তা ও মননের দিক থেকে অন্তত, তার শরিক হওয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ। তাঁর সারা জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছোট্ট কথায় বোধহয় বর্ণনা করা যায় ‘ছিন্নমূলের শিকড়  সন্ধান’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে। এবং সেটা ভুলও নয়। ‘ভাষা আন্দোলন’ থেকে ‘বিদেশী বিতাড়ন’, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ সে সাক্ষ্য বহন করছে।  

না, সুজিৎ চৌধুরীর সৃষ্টি ও কর্মের মূল্যায়ন করতে বসিনি আমি, সে সাধ কিংবা সাধ্য কোনটাই নেই আমার। তাঁর সাহচর্যে যেভাবে যতটুকু (তাঁকে) জানার এবং বোঝার সুযোগ পেয়েছি তার শরিক করতে চাইছি পাঠকদের। কথায় বলে, ফলের ভার বেশি হলে বৃক্ষ নুয়ে পড়ে। বৈদগ্ধের এমন প্রাচুর্য সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য রকমের নিরহঙ্কার ছিলেন মানুষটি। রাগ-দ্বেষ-হিংসা-ঘৃণা তাঁর ব্যক্তিত্বের ত্রিসীমায় ঘেঁষতে পারেনি, অন্তত আমার নজরে আসেনি। মন-প্রাণ খুলে কথা বলা যেত যে-কোনও বিষয়ে, আলোচনা করা যেত অনায়াসে।  গুরুত্ব সহকারে শুনতেন সবার কথাই। বয়সের বাধা ছিল না কোনও, ছেলের বয়সীদের সঙ্গেও চুটিয়ে আড্ডা দিতে পারতেন। সুজিৎ-দা হয়ে পড়েছিলেন অল্পদিনে, সে সুবাদেই। ছিল অসাধারণ রসবোধ। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রসিকতায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। শিল্প-সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত তরুণ ব্রিগেডকে অযাচিত অকুন্ঠ প্রশংসায় ভাসাতে এমন আর কাউকে দেখিনি। উৎসাহিত করতেন ভীষন রকম। উপদেশ নয়, পরামর্শ দিতেন বন্ধুর মতন। ব্যক্তিগত ভাবেও তেমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছি। নিজের ক্ষেত্রেও প্রশস্তি শুনে বিব্রত বোধ করেছি যেমন, উৎসাহিতও হয়েছি। গর্বিতও যে হইনি কিছু পরিমাণে তা বললে মিথ্যে ভাষণ হবে। এখানে একটা কথা বলা জরুরি যে, ভাষা-সাহিত্য চর্চাকে তিনি আত্মানুসন্ধানের, আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর সে কারণেই সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত পশ্চিমবঙ্গীয় অতিথির বক্তব্যে পত্র-পত্রিকা কবি-লেখকদের নিয়ে কটাক্ষের জবাবে সুজিৎ চৌধুরী অনায়াসে বলতে পারেন, ‘এরা প্রত্যেকে এক একজন ভাষা-সৈনিক, আমাদের বাস্তবতায় সেনার সংখ্যা যত বেশি হয় তত লাভ। গুনগত মানের বিচার আপাতত গৌণ’। লড়াইয়ের ময়দানে থাকলে কুশলী হতে দেরি হবে না এই ছিল তাঁর  যুক্তি। সুজিৎ চৌধুরী ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারতেন এমন কথা !

 সভা-সমিতিতে, নির্ধারিত বক্তা হিসেবে যেখানেই সুজিৎ চৌধুরীর নাম থাকত সেখানেই, আমরা, ‘ঋত্বিজ’-এর কয়েকজন বিশেষত, হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। নতুন কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষায়। সভাশেষে মতামত জানতেও চাইতেন অনেক সময়, ‘ঠিক আছে তো!’ সংশয় নিরসন করতে চাইতেন বা সমর্থন চাইতেন তা নয়, এ তাঁর বদান্যতা, স্বভাবের অঙ্গ।  এই দরাজ স্বভাবের জন্যই যে কোনও সভাস্থলে তাঁকে ঘিরে আরেকটা অণু-সভা শুরু হওয়া ছিল প্রায় অবধারিত। সভাপতি  হিসেবে যখন মঞ্চালোকিত করতেন তখনও, সভাপতির  ভাষণে তাঁর অসামান্য সার সঙ্কলন শোনার অধীর অপেক্ষায়  বসে থাকতাম। প্রতিটি যুক্তি যেন ছুরির ফলার  মত ধারালো। সাধারণত বিশিষ্ট জনদের কাছে ঘেঁষা প্রায় দুষ্কর, সেখানে সুজিৎ চৌধুরী কাছে ডেকে নিতেন  অবলীলায়। মেয়েদের মর্যাদা সম্পর্কে এতটা সচেতন ছিলেন যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আমল দিতেন না মোটেই, সেরকম ক্ষেত্রে সচরাচর মেয়েদের পক্ষ নিতেন। ঘরে-বাইরে, সর্বত্র। কাছাকাছি থেকেছি যখন, এসব চারিত্রিক গুণাবলী নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি কিছু, গুরুত্ব দিইনি সে অর্থে। আজ যখন মানুষটি চিরতরে দূরে, তখন উপলব্ধি করতে পারি যে, এ হেন গুণাবলী অর্জনের নেপথ্যে ছিল এক নির্দিষ্ট জীবনচর্চা। শ্রম ও মেধার বিনিময়ে অর্জিত। ‘প্রাচীন ভারতে মাতৃতান্ত্রিকতাঃ কিংবদন্তীর পুনর্বিচার’ গ্রন্থ লেখা তাই সম্ভব ছিল তাঁর পক্ষেই। অনিবার্যও ছিল হয়তবা!

ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক ছিলেন। ইতিহাস তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল, নিঃসন্দেহে। সাহিত্যের প্রতি  অনুরাগ তা বলে এক বিন্দু কম ছিল না। সাহিত্যের এমন নিবিষ্ট পাঠক সহজে মেলে না। কেবল ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে আপত্তি করতেন না, তবে সাহিত্যের লোক নন ভাবলে ক্ষুণ্ণ হতেন। অন্তরঙ্গ  মুহূর্তে প্রকাশও করেছেন সে ক্ষোভ। ইতিহাস ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা তাঁর প্রধান এবং অন্যতম বিচরণ ক্ষেত্র হলেও সৃষ্টিশীল রচনায়ও রেখে গেছেন পরাক্রমী স্বাক্ষর। তাঁর গদ্য যেমন ঝরঝরে, তেমনি প্রাঞ্জল। প্রতিটি শব্দ ব্যবহারে অসাধারণ মনোযোগী। বক্তৃতার ভাষাও ছিল একই রকম সরল, অথচ অর্থবহ। শ্রোতাবান্ধব। বৈদগ্ধের প্রকাশ থাকত, কিন্তু পাণ্ডিত্যের প্রবলতা নয়। রসবোধ ছিল সূক্ষ্ম। ‘ধূমপায়ীর   জবানবন্দী’ যারা পড়েছেন তারা অবশ্যই তার পরিচয় পেয়ে থাকবেন। যেমন ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, তেমনি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ভাষা, সাহিত্য, লোক-সংস্কৃতি, রাজনীতি কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন অসাধারণ সব রচনা। ইতিহাস হোক কিংবা ভাষা-সাহিত্য, যে-কোন বিষয়ে সংশয় উপস্থিত হলে  আমরা তো বটেই, আরো অনেকেই কড়া নাড়তেন সুজিৎ-দার দরজায়।    

 

 খাপছাড়া ভাবে এই যে কথাগুলো বললাম, তা থেকে সুজিৎ চৌধুরী সম্পর্কে একটা আভাস মাত্র হয়ত পাওয়া যাবে। সেটা আমি জানি, তবু লিখতে বসে যেহেতু বহু কথাই মনে আসছে, তার থেকেই তুলে আনছি কিছু কিছু। আঁজলাভরা জলে সমুদ্রের আস্বাদ মেলে না জেনেও। অন্য উপায় যে নেই আর! তাঁর লেখালেখি,   গবেষণা, কাজ-কর্ম, চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আগামীতে যোগ্য ব্যক্তিরা নিশ্চয় মূল্যবান আলোচনা করবেন। কিন্তু যে সময়সীমা জুড়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন সে সময়ের বরাক উপত্যকার সমাজ ও রাজনীতি বুঝতে হলে সুজিৎ চৌধুরীকেও জানতেই হবে। এতে সংশয়ের অবকাশ নেই কোনও। তাঁর ভাবনা-চিন্তা, মতামতের সঙ্গে একমত  নাও যদি হই, তবু গুরুত্ব দিতে হবে বৈকি! দিতে হবে দুটো কারণে। এক, তথ্যের খাতিরে এবং দুই, মৌলিকতার জন্য। তথ্য থেকে সত্যে বা সিদ্ধান্তে পৌঁছবার চেষ্টা করতেন সব সময়, এবং সে পদ্ধতিটিও ছিল মৌলিক। একটা কথা তিনি সব সময় বলতেন যে, প্রান্তবাসীদের সুযোগের অভাব থাকলেও একটা মস্ত বড় সুবিধাও আছে, বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কাজ করতে হয় বলে চিন্তাচর্চায় মৌলিকতা আসে। কথাটা তাঁর ক্ষেত্রে শুধু সত্য নয়, আখরে আখরে সত্য। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছত্রছায়ায় লালিত হন নি তিনি। লেখালেখির প্রায় পুরোটাই মাতৃভাষা বাংলায়, ইংরেজি লেখা সে তুলনায় খুব কম যদিও বিষয় এবং বিশ্লেষণের নিরিখে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেই। নামী প্রকাশকের দৃষ্টিগোচর হয়নি বলেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে অপরিচিত রয়ে গেছেন এই মেধাবী মানুষটি। উত্তর প্রজন্মের দায় রয়েছে সেসব সংকলিত করে বৃহত্তর পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেবার।   

তাঁর মতামত মেনে নিতেই হবে এ জাতীয় গোঁড়ামি ছিল না একটুও। বক্তব্যের বিরোধিতা কেউ করলে বিচলিত হতেন নিশ্চয়, ক্ষোভও প্রকাশ করতেন কখনো-সখনো। আবার বুঝতেও চাইতেন বিরুদ্ধ মতের  যুক্তি-পরম্পরা, ভাবনা প্রবাহকে। সে ঔদার্য পুরোপুরি বজায় রেখেছিলেন শেষ দিন অবধি। কোনও বিষয়ে মতানৈক্য হলে ফোন করে ডাক দিতেন, ‘তোমার লগে দরবার আছে’। বহু ক্ষেত্রে ও বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে  বহুবার, ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাইতেন, একমত না হতে পারলেও অবজ্ঞা করতেন না মোটেই। পত্র-  পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হলে পড়েছি কিনা যেমন জানতে চাইতেন, তেমনি অনেক সময় নতুন লেখা ডাকে দেবার আগে ডেকে পড়াতেনও। আলোচনা করতেন। সেসব স্মৃতি ভোলার নয়। ভোলার নয়, কারণ সেসব আলোচনার সূত্রে নিজের অপরিণত চিন্তা-ভাবনা পরিণত হওয়ার সুযোগ পেত। যুক্তি বুদ্ধিতে মাঝে মাঝে শান দেওয়া দরকার , তাঁর সান্নিধ্যে শান দেওয়ার কাজটা খুব সহজে ও সুচারু ভাবে সম্পূর্ণ হত। তাঁর কাছে যাবার, আড্ডা দেবার, বিতর্ক উসকে দেবার একটা তাগিদ তাই থাকত। কত ভাবে যে উপকৃত ও লাভবান হয়েছি সে বলে বোঝানোর নয়। দেশভাগ নিয়ে তাঁর তীব্র যন্ত্রণা ও তথ্যনিষ্ঠতার একটা দৃষ্টান্ত দেবার লোভ হচ্ছে খুব। সকলেই জানেন যে  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ঔপন্যাসিক, তাঁকে বিভূতিভূষণ-বিশেষজ্ঞ বললেও ভুল  হবে না, কিন্তু ‘দেশভাগের অলিখিত উপন্যাস’ প্রবন্ধে (ঋত্বিজ সাময়িকী, ২০০৫ জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘দেশভাগ ও বাংলা উপন্যাস’ গ্রন্থে সংকলিত)  দেশভাগ নিয়ে বিভূতিভূষণের চিঠি থেকে উদ্ধৃতি হাজির করে (‘ নতুন বঙ্গ ভাগ হয়ে গেল ভালই হ’ল। বাঙালী হিন্দুরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। আমাদের ভয় নেই, হিন্দুস্তান, পাকিস্তান দুজায়গাতেই বাড়ী আছে’) লেখকের  হিন্দুত্ববাদী অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না,  রেয়াত করেননি বিভূতিভূষণকেও, তথ্যই ছিল শেষ কথা।    

ছিন্নমূলের শিকড় সন্ধানের যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম, টের পেতাম, আশিরনখর জুড়ে ছিল সেই  এক ভাবনা, চিন্তা। শিল্প-সাহিত্যের প্রাঙ্গনে ঋত্বিক ঘটক কিংবা জীবনানন্দকে যেমন নদী-মাঠ শোভিত গ্রাম বাংলার প্রকৃতির মায়ায় জড়িয়ে থাকতে দেখি, সেই একই মায়ায় ডুবে থাকা জলজ্যান্ত যে মানুষকে আমি দেখেছি তিনি সুজিৎ চৌধুরী। তাঁর মতন এমন আর কাউকে আমি অন্তত দেখিনি। বাংলা ভাষা, বাঙালি ও বাংলাদেশ ছিল তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। লিখেওছিলেন, ‘... রেখেছ মানুষ করে, বাঙালি করোনি’। ‘হারানো স্বদেশ’ ঘিরে এই আবেগ নিয়ে একবার অনুযোগ করে বলেছিলাম যে, আমরা যারা স্বাধীনতার পর জন্মেছি তাদের তো কোনও ‘হারানো স্বদেশ’-এর স্মৃতি নেই, তাহলে এই শোকগাঁথা শুনে আমরা কী করব? উত্তরে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, ‘কত বড় ক্ষতিটা হয়েছে তোমরা বুঝবে না। তোমরা তো জানো না, হেমাঙ্গ বিশ্বাস যখন ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রায় অচল, তখন একটা ‘দেশের বাড়ি’ ছিল বলেই মাস কয়েকের বিশ্রামে স্বাস্থ্যোদ্ধার করে পূর্ণোদ্যমে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পেরেছিলেন’। চুপ করে গেছি, কিছু বলতে পারিনি, বলার ছিল না। বুঝতে  পেরেছি যে, এ বেদনা তো ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির গর্ভজাত নয়, তার শিকড় অন্যত্র, ও বহুদূর বিস্তৃত।  

রাজনীতির পাশা খেলায় পাল্টে যাওয়া বঙ্গভূমির মানচিত্রে নতুন করে থিতু হওয়ার, শিকড় প্রোথিত করার ঐকান্তিক প্রয়াসেই তাই নিয়োজিত হয়েছে তাঁর শ্রম এবং মেধা। কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, ‘আমি তো লেখালেখি শুরু করেছি সে অর্থে অনেক দেরিতে, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে, প্রয়োজনের তাগিদে।’ সত্যিই তাই, লেখক হিসেবে যশোপ্রার্থী তিনি ছিলেন না। ‘শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ইতিহাস’ থেকে শুরু করে ‘ধর্ম,  রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতাঃ উৎস ও পটভূমি’ পর্যন্ত তাঁর তাবৎ মসী-চালনা  এক অর্থে অসি-চালনার সামিল।  বরাক উপত্যকার বাঙালির ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্য লড়াইয়ে তথ্যের তরবারি হাতে ’৬১র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৮০র বিদেশি-খেদা আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়সীমা জুড়ে তাত্ত্বিক  লড়াই  প্রায় একাই লড়েছেন মানুষটি। আসলে ইতিহাস চর্চা তাঁর কাছে ‘অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ’ মাত্র ছিল না, ছিল নিজের সময়কে বোঝার যাচাই করার কষ্টিপাথর। দেশভাগের যন্ত্রণা এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী   অবস্থান তাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে অসামান্য সব রচনা। সুজিৎ চৌধুরী ও সুজিৎ চৌধুরীর  সময় এভাবেই একাকার হয়ে আছে। তাঁর যাবতীয় লেখালেখি আসলেই ‘সময়ের পদাবলী’ রচনা। নাগরিক পঞ্জি নবায়ন নিয়ে হালে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, উদ্ভুত হয়েছে যে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির, তার পরিপ্রেক্ষিতে সুজিৎ চৌধুরীর অনুপস্থিতি তীব্র ভাবে অনুভূত হচ্ছে। বরাকের, বিশেষ করে করিমগঞ্জের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে বরাক তথা গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে অসহনীয় পরিস্থিতি বিরাজ  করছে সে প্রসঙ্গে বিশেষ করে মনে পড়ছে তাঁর ‘গোরু ও আমরা’ রসরচনাটির কথা। অবশ্য সে রচনার রসাস্বাদনে এ মুহূর্তে কতজন উৎসাহী সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। পরিস্থিতি এমনই।

বরাক উপত্যকার সমাজ-গঠন প্রক্রিয়া অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে এই ছিল তাঁর সুচিন্তিত অভিমত। এ নিয়ে লিখেছেনও বিস্তর। ইতালির প্রসঙ্গ টেনে গ্রামশ্চির উল্লেখ করে বরাক উপত্যকায় যে ‘অরগ্যানিক    ইন্টেলেকচ্যুয়াল’ (organic intellectual)শ্রেণীর উদ্ভব হয়নি তেমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কথাটা সর্বাংশে  মিথ্যেও নয়। বরাক উপত্যকার প্রথম পর্বের সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় কলকাতা-মুখিনতা, সামান্য দু’একটি     ব্যতিক্রম বাদ দিলে যে প্রায় সর্বব্যাপ্ত ছিল সে সম্ভবত সে কারণেই। কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার প্রবণতা ও মানসিকতার সমালোচনা করেছেন, এর ক্ষতিকারক ভূমিকা বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলতেন প্রায়শ। মৌলিক চিন্তাচর্চাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ধারণার কথা সভয়ে সসঙ্কোচে বলে ফেলি। এ অঞ্চলের সাহিত্যচর্চা এবং অন্যান্য লেখালেখি বিষয়ে সুজিৎ চৌধুরী খুঁটিনাটি খবর পর্যন্ত রাখতেন। পাঠক হিসেবে অভাবনীয় মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য করেছি যে, কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, এক কথায় গদ্যরচনার প্রতি তাঁর উৎসাহ বেশি ছিল। নতুন প্রজন্মের দু’একজন কবি সম্পর্কে অবশ্য দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, কলকাতা-মুখিনতা কবিতার ক্ষেত্রেই অধিকতর প্রকট ছিল। এ অবশ্যই আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত। হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া বরাকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার লোক সংখ্যায় কম তার জন্য তাঁকে আক্ষেপ করতেও দেখেছি। এই অভাব মোচনের গুরুদায়িত্ব ও গুরুভার তিনি একার সামর্থ্যে বহন করেছেন বহুলাংশে। এ কথা বললে বোধহয়  একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না যে ‘অরগ্যানিক বুদ্ধিজীবী’র উদ্ভবের প্রক্রিয়াটি এ উপত্যকায় শুরু হয়েছে সুজিৎ চোধুরীর হাত ধরেই। প্রদত্ত কোনও দৈব গাণ্ডীব অথবা অক্ষয় তূণ তাঁর হাতে ছিল না সত্য, শরসন্ধানে শরযোজনায় তিনি অর্জুনের সমকক্ষ ছিলেন না, ছিলেন একলব্যের সমগোত্রীয়। স্বভূমি-সন্ধানের মনোস্তাত্ত্বিক ভিত তৈরি করে দিয়ে গেছেন একার সামর্থ্যে। উপত্যকার ছিন্নমূল বাঙালির শিকড় সন্ধানের, বিবিধ বিড়ম্বনার  হাত থেকে নিষ্কৃতির দিগদর্শন রেখে গেছেন উত্তর প্রজন্মের জন্য। তাঁর জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা এখানেই। ...  

‘ঋত্বিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আজীবন সদস্য হিসেবে আমরা আর সবার চেয়ে খানিকটা বেশি অধিকার খাটাতাম তাঁর ওপর, তিনিও প্রশ্রয় দিতেন। মনে আছে, আমাদের ছোট্ট অফিস ঘরে তাঁকে ‘আজীবন সদস্য’ ঘোষণা করে নিজেদের ছাব্বিশ ইঞ্চি ছাতিকে যখন ছাপ্পান্ন ভাবতে প্ররোচিত হচ্ছি সুজিৎ-দা তাঁর   বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আজীবন সদস্য তাকেই করা হয় যার জীবনের আয়ু আর বেশি নেই।’ এটাই ছিল সুজিৎ-দার স্টাইল। সিনেমা হয়ত সেভাবে বেশি দেখতেন না, কিন্তু আমাদের বাৎসরিক চলচ্চিত্র উৎসবে আসতেন আড্ডা দিতে, রাধা সিনেমা হলের সেই সব জমাটি আড্ডার মুহূর্তগুলো ঝিনুকের মাঝে মুক্তোর মত  সঞ্চিত থাকবে স্মৃতিকোঠায়। আজীবন। ঋত্বিজের ডাকে অসুস্থ শরীর নিয়েও উপস্থিত হয়েছেন। আসলে কেউ নতুন কিছু করতে চাইছে দেখলে সর্বাগ্রে উৎসাহ যোগাতেন সুজিৎ-দা। চলচ্চিত্র সে অর্থে তাঁর বিচরণভূমি ছিল  না, তা সত্ত্বেও আমাদের দাবি মিটিয়েছেন অসামান্য সব রচনা দিয়ে। সেদিক থেকে আমরা অবশ্যই এক  বাড়তি অহঙ্কারের দাবিদার, এই কারণে যে, সুজিৎ-দার বহুমুখী মেধার পরিচয় পেয়েছেন  উপত্যকার বহু  মানুষ, ঘনিষ্ঠ জনেরা তো বটেই, কিন্তু ‘ঋত্বিজের সুজিৎ-দা’ আর কারো ন’ন, কোন ভাবেই সে ‘কপিরাইট’ কেউ কোনোদিন ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ঋত্বিজের রজত জয়ন্তী বর্ষে এই অহঙ্কারী উচ্চারণের মধ্য দিয়েই  হোক আমাদের ‘সুজিৎ চৌধুরী স্মরণ’।

আক্ষেপ কেবল এই যে, দেশ হারানোর হাহাকার বুকে করে যিনি লিখে গেলেন সারা জীবনের  যাপনকথা, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁকে দ্বিতীয়বার ‘দেশ’ (করিমগঞ্জ) ছাড়তে হয়েছে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই। করিমগঞ্জ ছেড়ে যেতে মন সায় দেয়নি, ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তিন-চার দিন আগে দূরভাষে জানিয়েওছিলেন ফিরে আসার দিনক্ষণ। কিন্তু ফেরা হল না আর, মৃত্যুর নিঠুর হানায়। ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’-এর লেখক নিজেই আজ ‘হারানো মানুষের’ সারিতে বটে। কিন্তু সে তো  শারীরিক ভাবে  হারিয়ে যাওয়া, স্বাভাবিক জৈবিক নিয়মে। উপত্যকার অধিবাসীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে ও প্রসঙ্গে তাঁর আত্মিক উপস্থিতি কি এত সত্বর হারিয়ে যাবার! আলবৎ নয়। এ অঞ্চলের বাঙালির  আত্মপরিচয় খুঁজে নেবার এবং অধিকার অর্জনের আগামী লড়াইয়ের শরিক হয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আরো বহুকাল। প্রেরণা ও সাহস যুগিয়ে যাবেন অবিরত। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক যে ইচ্ছা করলেও তাঁকে উপেক্ষা করার জো নেই। অস্তিত্বের সঙ্কট মোচনের খাতিরেই বারবার ফিরে যেতে হবে  সুজিৎ চৌধুরীর কাছে, সুজিৎ চৌধুরীর কালে। এ আমাদের ভবিতব্য। ‘ব্যর্থ-চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণ’ নিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন,  শিয়রে শুশ্রূষার হাত রেখে আত্মজন যেমন থাকেন সঙ্কট কালে। একালের একলব্যকে এভাবেই স্মরণ করবেন উপত্যকার আপামর মানুষ। আরো বহুকাল।

       

ন্যায় : প্রাতিষ্ঠানিক বনাম সামাজিক


 

Injustice anywhere is a threat to justice everywhere.  Martin Luther King, Jr.

 

কাজটা ঠিক ন্যায়সঙ্গত হল না’-এরকম বাক্য আমরা হামেশাই শুনে থাকি। এখানে বক্তার এক ঔচিত্যবোধ প্রত্যক্ষ করা যায়। অর্থাৎ যা হওয়া উচিত নয় তাই অন্যায়, অসঙ্গত। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে এই উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায় বোধ কিভাবে জন্মায়! ন্যায় (justice) শব্দটা আপাতভাবে খুব সহজ ও সাধারণ এবং বোধগম্য মনে হলেও ন্যায় বিধান কিন্তু তত সহজ নয়। মানুষের সমাজ যেদিন সৃষ্টি হয়েছে সেদিন থেকেই বিষয় হিসেবে ন্যায় বিশেষভাবে চর্চিত হয়ে আসছে। কেননা এর সঙ্গে  অধিকারের প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে। ন্যায়ের ধারণাটি মূলত এক সামাজিক প্রয়োজনে সৃষ্ট। যে কোন সমাজে ব্যক্তি এবং সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বর্তমান থাকে। এই বিরোধ মীমাংসা করা সম্ভব না হলে সমাজের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। সামাজিক রীতি-নীতি গুলো হচ্ছে এই বিরোধ মেটানোর এক প্রয়োজনীয় এবং সর্বসম্মত উপায়। এক কথায় বলা যায় যে, ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে এ এক অলিখিত চুক্তি। যার শর্ত সমূহের পালন ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। এই শর্ত লঙ্ঘন করা অন্যায়, অসঙ্গত। একই সঙ্গে এটাও এই অলিখিত চুক্তির অন্তর্গত বিষয় যে ব্যক্তির যা প্রাপ্য (ন্যায্য পাওনা) সমাজ তা অস্বীকার করতে পারে না বা তা থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করতে পারে না। বলা বাহুল্য যে, সমাজ ভেদে এই অলিখিত শর্ত সমূহ পৃথক ও ভিন্ন, ফলে ন্যায়ের ধারণা ও অধিকারের সীমানাও আলাদা। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ন্যায়-বোধ ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ন্যায়ের ভাবনা কোনো অর্থেই এক বা সমতুল্য নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের ন্যায়-সম্পর্কিত ধারণাও বদলেছে (সে বদল হিতকর কি অ-হিতকর হয়েছে তার বিচার এখানে অপ্রাসঙ্গিক) এবং সে বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি চলমান     

এই ন্যায়ের ধারণার মূলে কিন্তু এক (সামাজিক) সাম্যের ভাবনা ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ, সমাজের দিক থেকে সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখার চিন্তাEquals should be treated equally and unequals unequally’- প্রায় দু’হাজার বছর আগে অ্যারিস্টটল ন্যায়ের মৌলিক নীতি সূত্রবদ্ধ করেছিলেন এভাবেই। এটা হচ্ছে এক অ-ঘোষিত নীতি, -লিখিত চুক্তির মত। বাস্তবে সেটা  কিভাবে কতটা পালন করা হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কি না সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। একটা দৃষ্টান্ত দেখা যাক, ধরা যাক এবং দুজন মোটামুটি সমগোত্রীয় ও সমগুণসম্পন্ন ব্যক্তি। মনে করা যাক উভয়ে কোন একটি কাজের জন্য শ্রমদান করেছেন এবং পারিশ্রমিক পেয়েছেন পারিশ্রমিক সমান হওয়া উচিত অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিৎ। কিন্তু যদি দেখা যায় যে, ব্যক্তি দুজনের একজন মহিলা  বলে কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন তো সেটা অ-ন্যায় সাব্যস্ত হবে নিশ্চয়। (চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঠিক এরকম অন্যায়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে।) এই উদাহরণ কেবল এটা বোঝানোর জন্য যে সাম্যের ধারণাটি সর্বত্র সব সমাজে এক নয়, এমনকি একই সমাজেও ভিন্ন হতে পারে। ফলে অধিকারের স্তর ও পরিসীমাও পৃথক হয়ে পড়ে। আমাদের বর্ণ-বিভাজিত ভারতীয় সমাজেও সেটা চোখে পড়ে। প্রাচীন কালে একজন ব্রাহ্মণ ও একজন শূদ্রের অধিকার সমান ছিল না। উভয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গীও অনিবার্য কারণে আলাদা ছিল। আদিম সাম্যবাদী সমাজে সাম্যের যে ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল আর এ যুগের আধুনিক মানুষের যে  সাম্যের বোধ তার মধ্যে যে জমিন-আসমান ফারাক রয়েছে সেকথা আলাদা করে উল্লেখের নিশ্চয় প্রয়োজন নেই। তাহলেই দেখুন, ন্যায় ব্যাপারটা মোটেই সহজ-সরল নয়, বরং বেশ গোলমেলে। আর গোলমেলে  বলেই তা নিয়ে চিন্তা-চর্চা, তর্ক-বিতর্ক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেই আদ্যিকাল থেকেই চলছে। বলা যায়, সভ্যতার শুরু থেকেই ন্যায় সম্পর্কিত ভাবনা দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। (প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী) এটা যে পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনায় কেবল অগ্রাধিকার লাভ করেছে  এমন নয়, প্রাচ্যের চিন্তা-চর্চায়ও যে ন্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মর্যাদা লাভ করেছিল তার দৃষ্টান্তের অভাব নেই। আমাদের দেশে তো ন্যায় দর্শনসশরীরে বিদ্যমান। প্লেটোর রিপাব্লিকথেকে শুরু করে রাউলস-এর ‘অ্যা থিয়োরি অব জাস্টিস’ অব্দি চিন্তাবিদদের চিন্তা ও কাজে ন্যায় সংক্রান্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি জটিল থেকে  জটিলতর হয়েছে ন্যায় বিধানের ও ন্যায় প্রদানের প্রক্রিয়া। 

গোষ্ঠীতন্ত্রে গোষ্ঠী সমূহের বিশ্বাস অনুসারে কিছু রীতি-নীতি প্রচলিত ছিল যার ভিত্তিতে সাধারণত ন্যায়িক সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হত। পরবর্তীতে সে স্থান দখল করে ধর্মাচরণ। ধর্ম যা অনুমোদন করত সেটাই ন্যায়সঙ্গতবিবেচিত হত। রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী পর্যায়ে সমাজে আইন সে স্থান অধিকার করে নিয়েছে। কিন্তু সামাজিক সাম্যের প্রেক্ষিতে দেখলে আইনি ন্যায়সব সময় সামাজিক ন্যায়নিশ্চিত করে না। Earl Warren তাই মন্তব্য করেছেন, ‘It is the spirit and not the form of law that keeps justice alive.’ এই আইনও আবার রাষ্ট্রভেদে আলাদা। যেমন, সমকামিতা বহু দেশে আইনসম্মত, আবার অনেক দেশে দণ্ডনীয়।  যে  স্পিরিট’-এর কথা ওয়ারেন উল্লেখ করেছেন, দেখা যাচ্ছে যে তার অবিসংবাদী কোনো ধারণা মানব সমাজে অবর্তমান। সমাজ ভেদে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে অ-সাম্যের উপস্থিতি অস্বীকারের উপায় নেই। বস্তুত, উৎপাদন-পদ্ধতি, উৎপাদনের উপকরণের ওপর আধিপত্য ও শ্রম-সম্পর্ক, ইত্যাদি বহু জটিল বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়ের ধারণা। অতএব, সামাজিক সাম্য ব্যতিরেকে ন্যায় প্রদানের প্রশ্নে সাম্যের আশা দুরাশা মাত্র। আপাতত, আমাদের আইন-নির্ভরতা ছাড়া ন্যায় বিতরণের ভিন্ন পথ নেই।   

এবারে দেখা যাক, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় ন্যায়ের যথার্থ স্বরূপটি কেমন। কোন ব্যক্তির (individual) ক্ষেত্রে প্রাপ্য কিংবা উপযুক্ত ন্যায়যেভাবে সাব্যস্ত হয় তার ভিত্তিতে ন্যায় (justice) হতে পারে তিন ধরনের। Distributive  justice : যার লক্ষ্য হল যতদূর সম্ভব নাগরিকের হিতাধিকার (benefits) ও দায়ভার (burden) যথাক্রমে বিস্তৃত ও নির্দিষ্ট করা দাস ব্যবস্থা সে হিসেবে ন্যায়সম্মত ছিল না নিশ্চয়। Retributive or corrective justice – এর লক্ষ্য হল কোন অপরাধের শাস্তি কতটা হওয়া উচিত তা স্থির করা - চোখের বদলে চোখকিংবা চুরির অপরাধে  অপরাধীর হাত কেটে ফেলাটা যেহেতু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।  Compensatory justice  হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ন্যায্যতা ও পরিমাণ স্থির করে (ক্ষতি যাদের দ্বারা হয়েছে তাদের কাছ থেকে) তা আদায় দেওয়া। ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা সেরকম একটি দৃষ্টান্ত।  রাউলস অবশ্য ন্যায়কে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘প্রায়োগিক’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন। ন্যায়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক স্থিরতা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম মর্যাদা। সামাজিক স্থিরতা নির্ভর করে সমাজের সদস্যরা ন্যায্য ব্যবহার কতটা পাচ্ছে বা পাচ্ছে না তার নিরিখে। সমাজের কোনও অংশ যখন অনুভব করে যে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে তখন সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়, বিক্ষোভ মাথা চাড়া দেয়। রাউলসের ভাবনায় সমাজের সদস্যরা পরস্পরের  উপর নির্ভরশীল, এবং সামাজিক ঐক্য ততক্ষণ বজায় থাকে যতক্ষণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দেখিয়েছেন যে, সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী ও দাবিদার। বিমূর্ত ও অসম্পর্কিত কারণে বৈষম্য মূলক আচরণ অতএব মৌলিক মানবিক অধিকার লঙ্ঘন বৈ  কিছু নয়।

ন্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিকতা ও বিবেকের প্রশ্ন। ন্যায়ের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে নীতিশাস্ত্র। যে কোন নৈতিক সিদ্ধান্ত  গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা আবশ্যক যে আমরা প্রত্যেককে সমান নজরে দেখছি কি না! যদি তা না হয়, তাহলে যেসব শর্তের  ভিত্তিতে ভিন্ন, অর্থাৎ বিষম আচরণ করা হচ্ছে তা যুক্তিপূর্ণ ও যথার্থ কি না সেও দেখা কর্তব্য! কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিষম ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত বলে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, যেমন দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারীদের বেলায় যে ছাড় দেওয়া হয় তা। কিংবা কোনো প্রকল্পে কারো অবদান অন্যদের তুলনায় বেশি হওয়ার দরুণ অধিক প্রাপ্তি ঘটলে আমরা তা মেনে নেই। এ কথা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে  না যে, ন্যায় হচ্ছে পারস্পরিক মর্যাদার স্বীকৃতি এবং পরস্পর নির্ভরশীল সমাজে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপনের প্রাথমিক  শর্ত হচ্ছে আচরণগত সমতা। ব্যাপক অর্থে ন্যায়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামাজিক সাম্যের স্থাপনা। অমর্ত্য সেনও সামাজিক ন্যায় (social justice)-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সভ্য সমাজ সেই সামাজিক ন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়াবে নিশ্চয়। আপাতত, সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক (ন্যায্য)অধিকার সুনিশ্চিত করাই ন্যায়ের লক্ষ্য হোক।  

  

 

 

 

    

  

ব্লগ সংরক্ষাণাগার