বই পড়ার চল উঠে যাচ্ছে এমন আক্ষেপ শোনা যায় প্রায়শ। ‘পাঠাগার নয় যেন শবাধার’-কোনও এক গ্রন্থাগারের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন সমরেশ মজুমদার। (সম্ভবত) আনন্দবাজার পত্রিকায়। শিরোনাম ছিল ‘সব বই শব হয়ে গেছে’। নিবন্ধের সবটা ঠিক মনে নেই, তবু, কথাটা এ মুহূর্তে মনে পড়ে গেল হঠাৎ। না, একেবারে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নয়, মনে পড়ল বই প্রসঙ্গেই। বইমেলা উপলক্ষে কিছু লেখার অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়েই। কেন, তা বলি। কিছুদিন আগে একটা মুভি দেখছিলাম, Book Thief, হলিউডের ছবি। ১৯১৩ সালে রিলিজ হয়। পুরস্কার-টুরস্কারও পেয়েছে বেশ। ...না না, ঘাবড়াবেন না মশাই, সিনেমার আলোচনা শুরু করছি না তাই বলে। আসলে সিনেমাটির প্রোটাগোনিস্ট চরিত্র হিসেবে ‘লিজেল’ (Liesel) নাম্নী যে বাচ্চা মেয়েটি ছিল, তার গোটা জীবন এবং অস্তিত্বের সঙ্গে সংপৃক্ত ছিল বই বস্তুটি। অথচ পড়তে জানত না সে, যে কারণে স্কুলের প্রথমদিনেইসহপাঠীদের অসহনীয় টিটকিরি সইতেহয়েছেতাকে। লিজেল তার প্রথম বইটা পায় একটা কবরস্থান থেকে। তার ভাইকে যখন গোরখোদকেরা কবরে নামাচ্ছে, তখন একজনের কোটের পকেট থেকে বরফাবৃত মাটিতে পড়ে যায় বইটা। সকলের অলক্ষ্যে বইটা হাতে তুলে নেয় লিজেল। বইয়ের নাম গোরখোদকদের সহায়কপুস্তিকা। শুরু হয় পালক পিতা আর কন্যা লিজেলের বই-সফর। বইয়ের পাতায় পাতায় পিতা-কন্যার সে এক অলৌকিক ভ্রমণ। বাবা হ্যানস পড়ে শোনাচ্ছেন গোরখোদকদের সহায়িকা পুস্তক। লিজেল মুগ্ধ শ্রোতা।
সেই শুরু। তারপর চুরি করে লুকিয়ে লুকিয়ে তার পড়তে শেখা, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেওয়ার এক মানবিক বিবরণ রয়েছে ছবিতে। মৃত্যুর মুখ দিয়ে বর্ণিত এক নিদারুণ কথকতা যেন। এক ভয়ানক ঘটনা রয়েছে এর কাহিনির কেন্দ্রে। স্থান-জার্মানী, কাল- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল, আর পাত্র -বিশ্বত্রাস হিটলার। হ্যাঁ, ১৯৩৮ সালে বার্লিনের সেই কুখ্যাত বই পোড়ানোর ঘটনা নিয়েই তৈরি এ সিনেমা, যেখানে লক্ষ লক্ষ বই পুড়েছিল, পোড়ানো হয়েছিল। এক আদিম হিংস্রতা আঘাত করেছিল সভ্যতার শরীরে। আর সেই ছাই হয়ে যাওয়া দগ্ধ বইয়ের স্তূপ থেকে মেয়েটি দ্বিতীয়বার কুড়িয়ে নিয়েছিল অলক্ষ্যে রক্ষা পেয়ে যাওয়া আরেকটি বই। এই ছিল কাহিনি, তার বৃত্তীয় পরিক্রমা। আর তাই মনে পড়ে গেল বইয়ের শব কথাটা।
কেউ কেউ হয়ত ভাবছেন বই-পড়া ছেড়ে হঠাৎ বই-পোড়ানোর প্রসঙ্গ কেন। প্রসঙ্গটা এল সিনেমাটির সূত্রেই। একটু খোঁজ-খবর করতে গিয়ে নজরে এল বই পোড়ানোর ব্যাপারটা অনেক প্রাচীন। মানব-সভ্যতা আজো যুদ্ধকে পরিহার করতে শেখেনি, সক্ষম হয়নি। আর যুদ্ধের এমন কোনও খতিয়ান নেই যেখানে কম-বেশি বই-পুঁথি পোড়ানো হয়নি। কেবল তাই নয়, বইয়ের সাথে সাথে বিদ্বান-বুদ্ধিজীবীদেরও পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। যে চিনদেশ ক্ষমতার যুদ্ধে বার বার বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানেও Confucianism এবং Taoism এর ন্যায় আকর্ষক দার্শনিকতার জন্ম হতে পেরেছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ২১৩ তে সম্রাট Qin-এর শাসনকালে অসংখ্য বই পুড়িয়ে ফেলা হয়। তিন বছর ধরে চলে এই দক্ষযজ্ঞ। ইতিহাসের সমস্ত বই জ্বালিয়ে দেওয়া হয় নতুন করে ইতিহাস রচনার জন্য। এদেশেও, কান পাতলে মাঝে মাঝে নতুন করে ইতিহাস লেখার কানাঘুষো শোনা যায়। আশঙ্কা জাগে তখন। জাগে, কেননা, এদেশেই ৬০০ বছর ধরে পৃথিবীর পণ্ডিতদের আকর্ষণের স্থল হয়ে ছিল যে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সুদূর গ্রীস দেশ থেকেও শিক্ষার্থীরা এসেছেন, সেও তো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শোনা যায়, গ্রন্থের এমন প্রাচুর্য ছিল যে তিন মাস লেগেছিল সে বহ্ন্যুৎসবের আগুন নিভতে। আর তার সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে গেছে বৌদ্ধ দর্শন ও চিন্তার যাবতীয় অমূল্য নিদর্শন।
স্পেনেও ঘটেছে একই ঘটনা। Tomas Torquemada-র আমলে সেদেশে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে ফেলা হয়েছে প্রচলিত ক্যাথলিক ধর্মমত বিরোধী যাবতীয় লিখন। বই পোড়ানোর ‘উৎসব’-এর আয়োজন করা হত রীতিমত। উন্নত মায়া-সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব ১০০তেই লিখন রীতি শিখে নিয়েছিল, এবং পরবর্তী ১৪০০ বছর ধরে নথিবদ্ধ করেছিল ইতিহাস, জ্যোতিষ ও দিন-পঞ্জিকা সংক্রান্ত অমূল্য সব জ্ঞান। ১৫৬২তে তিন মাস ধরে সেসব ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে (খ্রিস্টান ধর্মে) ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে। গোটা বিশ্বে আজ মায়া সভ্যতার তিনটি মাত্র নিদর্শন বর্তমান। একই ভাবে ব্রিটিশ আগ্রাসনের সময় জ্বালিয়ে দেওয়া হয় আমেরিকার ৩০০০ বইয়ের সংগ্রহস্থল THE LIBRARY OF CONGREss। সব যুদ্ধেই বই পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। তবে, জাপানিরা ছিল এক্ষেত্রে অদ্বিতীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সৈন্যরা চিনদেশের কম পক্ষেও আটটি গ্রন্থাগার ধূলিসাৎ করে দেয়। কয়েক নিযুত বইয়ের সমাধি দেওয়া হয়। নাজী বাহিনী হচ্ছে সেই স্বল্প সৈন্যদলের অন্যতম যারা জাপানি সৈন্যদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গোটা ওয়ারশ’ সিটিকে তারা কার্যত ‘বই-হীন’ করে ফেলেছিল। ১৪টি গ্রন্থাগারে সংগৃহীত আনুমানিক ১৬০ লক্ষের অধিক বই, পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র পোলাণ্ডের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ফেলার লক্ষ্যেই তারা একাজ করেছিল। এই অপকর্মে জার্মানরা বিশেষ পারদর্শী ছিল, কারণ তাদের বিশেষ বাহিনী ছিল-Verbrennungskommandos (Burning detachments)-যাদের কাজই ছিল যাবতীয় সামগ্রী সহ প্রাসাদ ও সৌধগুলি ধ্বংস করা।
তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে অধিক বই ধ্বংস হয়েছিল জার্মানীতেই। মিত্র বাহিনী যখন জার্মানীর শহরগুলির ওপর বাছবিচারহীন ভাবে লাগাতার বোমাবর্ষণ চালায় তখন কম করেও পঁয়ত্রিশটি বিশাল গ্রন্থাগার ও অসংখ্য ছোটো ছোটো গ্রন্থাগার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কত বই যে ধ্বংস হয়েছে তার হিসেব কষা সহজ নয়। আন্দাজ করা হয় যে গোটা জার্মান দেশের মোট বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ বই-ই ভস্ম হয়ে গেছে যুদ্ধের আগুনে। ভাবুন তো, কত অজানা তথ্য, কত জ্ঞানের ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেল! কী সম্পদ থেকে বঞ্চিত হলো মানবজাতি! যতটুকু বলা হলো তাই কিন্তু সব নয়। এ হয়ত হিমশৈলের চূড়া মাত্র। পৃথিবী জুড়ে আরো কত ঘটনা রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মনে হতে পারে এসব তো পুরনো দিনের কথা। আজকাল কি আর তা ঘটে! এমন ভাবনার মূলে কশাঘাত করার জন্য উপযুক্ত একটি তথ্য দিই। এই সেদিন, ২০১৩ সালে ফ্রেঞ্চ ও মালি-র সৈন্যদল Timbuktu শহরে পৌঁছে আত্মগোপন করে থাকা বিদ্রোহীদের নিঃশেষ করার জন্য অগণন অট্টালিকা ও সৌধ গুঁড়িয়ে দেয়। আর তার দরুণ অমূল্য সব পাণ্ডুলিপির সংগ্রহের আকর দুটি বিশাল আর্কাইভ ধ্বংস হয়ে যায়। সেসব পাণ্ডুলিপি অন্য কোনো ভাষায় অনুদিত হয়নি, যার মধ্যে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের পাণ্ডুলিপিও ছিল। সে জ্ঞানের হদিশ পৃথিবী পাবে না তো কোনোদিন! অথচ সেসব তো সে দেশের সম্পদ মাত্র ছিল না, তা তো ছিল গোটা বিশ্বের, গোটা মানবজাতির সম্পদ। বই তো বৈদগ্ধের সম্ভার। বিদগ্ধ মানুষের শ্রমের ফসল, সভ্যতার পুষ্টি।
বই নিয়ে আলাপে এই নেতিবাচক বর্ণনায় যে ভরিয়ে ফেললাম পৃষ্ঠা, সে কি কেবল তথ্য প্রদানের স্বার্থেই! নাকি নিজেরই মনের আনাচে কানাচে বাসা বেঁধেছে কোনও শঙ্কা, ভয়, অথবা সংশয়! হয়ত তাই, হয়ত নয়। সহনশীলতার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে এমন বোধ হয়। বইয়ের বিরুদ্ধে, ভিন্ন চিন্তা ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যে ফুরিয়ে যায়নি সেও ঠিক। শুরুতে যে বাচ্চা মেয়েটির কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, কবরের পাশে কুড়িয়ে পাওয়া বই যাকে মানুষ করেছিল, আর ছবির শেষে জ্বলন্ত চিতার আগুন থেকে আরেকটি বইকে সে যে রক্ষা করেছিল সে তো নিজের স্বার্থেই! বই মানে তো শুধু সাদা পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরের সমাহার নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু। অনেক বেশি কিছু। বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে ধরা থাকে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস। ‘বইকে রক্ষা করুন, বই আপনাকে রক্ষা করবে’ –এই হয়ত বলতে চেয়েছেন সিনেমার পরিচালক, ওই ছোট্ট মেয়েটির বেড়ে ওঠার গল্পের মাধ্যমে! বই পোড়ানো যায়, কিন্তু মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে কি পুড়িয়ে ছাই করা যায়! না, যায় না-ইতিহাস সাক্ষী তার। তাই বার্লিনের ঘটনার পর জার্মানীর ছাত্র সংসদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর বিখ্যাত চিঠিতে হেলেন কেলার লিখেছিলেন, “You can burn my books… but the ideas in them have seeped through a million channels and will continue to quicken other minds.” - বইয়ের জন্ম আছে, কিন্তু মৃত্যু নেই। তবে, বই পোড়ানোর চেয়েও বড় অপরাধ কিন্তু বই না-পড়া। সে আরো মারাত্মক ব্যাধি। আর এই ব্যাধির বিরুদ্ধে, বই-কে বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধের অপরিহার্য অঙ্গ হচ্ছে বইয়ের উৎসব -বইমেলা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন