আমরা হাঁটতে থাকি, হেঁটে যেতে থাকি
এক দেশ থেকে অন্য দেশে
এক ধর্ষণের থেকে আরো এক ধর্ষণের দিকে।
(দেশান্তর, শঙ্খ ঘোষ)
ক্ষত শুকিয়ে যায়, কিন্তু দাগ রেখে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে
এই দাগ এতো গভীরে প্রবিষ্ট হয় যে তা কেবল অতীতের বিষাদবিন্দু হয়ে থাকে না, ক্ষতিগ্রস্তের বর্তমান ও ভবিষ্যতকেও প্রাভাবিত করে। নিরন্তর রক্তপাত
ঘটায়। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের আনন্দঘন মুহূর্তটি তেমনি এক দুর্বিষহ ক্ষত সৃষ্টি
করেছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সাত সাতটি দশক
পার করেও কী সাংঘাতিক প্রক্রিয়ায় দেশান্তরিত মানুষের জীবনযাপনে দুঃসহ দুর্যোগ ঘনিয়ে এনেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্রে ইদানীং তা যে নতুন মাত্রা
যোগ করেছে সেও অনস্বীকার্য। মূলত বাংলা এবং পাঞ্জাব, এ দু’টি প্রদেশের মানুষকেই সবচেয়ে বেশি দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পাঞ্জাবের মানুষের সমস্যার অনেকটাই হয়ত সমাধান করা গেছে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গের বদান্যতায়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ও কারণে বাংলা ও বাঙালির
ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। কেন ঘটেনি তার
সামাজিক রাজনৈতিক কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণার
সুযোগ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে । কাজও করছেন অনেকেই। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তার
সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আমরা কেবল দেখবার চেষ্টা করব বিংশ শতাব্দীর এই অঙ্গচ্ছেদের
ঘটনা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে কীভাবে ও কতটা প্রভাবিত করেছে। বলা বাহুল্য, নিবন্ধের সীমিত
পরিসরে বিস্তৃত ও বিশ্লেষণ মূলক আলোচনার পরিবর্তে বস্তুত আমরা বিভিন্ন প্রয়াস
সমূহের প্রকার ও প্রকৃতি, এবং ক্ষেত্র বিশেষে অবশ্যই পরিধি ও পরিসরের এক সামগ্রিক
আভাস দেবার চেষ্টা করব। বলা অহেতুক, এ ধরনের রচনায় (পাঠকের তরফে) পূর্ণতার দাবি অতিরিক্ত দাবি হিসেবেই গণ্য হতে বাধ্য, ফাঁক-ফোকর, তথ্যের খামতি
ইত্যাদি বিষয়ে সঙ্গত প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেবে সে অনুমান সহকারেই আমরা এগোব। অত্যুৎসাহী
পাঠকের পাঠ-বিড়ম্বনা সম্পর্কে বিধিসম্মত সতর্কীকরণের খাতিরেই এই অগ্রিম কৈফিয়ত। তবে হতাশ পাঠকের জন্য আশাব্যঞ্জক এই সংবাদটি পরিবেশন করা যেতে পারে যে সম্প্রতি সুশীল সাহা সম্পাদিত ‘দেশভাগের সিনেমা’ (সোপান) গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।
দেশ কালের ইতিহাসে খুব বড় কোনও ঘটনা
যখন ঘটে তা স্বভাবত জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে, ক্ষেত্র বিশেষে ঢেলে সাজায়, অর্থাৎ
পুনর্বিন্যস্ত করে। সঙ্গত কারণেই সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চিত্রের এরকম পালাবদলের
প্রভাব সৃষ্টিশীল কাজকর্মেও নানা ভাবে ছাপ রেখে যায় । সামাজিক স্মৃতিতে ঘটনার ছাপ যত
গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী হয় শিল্প-সাহিত্যের
বিষয় (content) হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও সে অনুপাতে স্বল্প কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।
কিন্তু সম্ভাবনা সত্ত্বেও বহুক্ষেত্রে তার সদ্ব্যবহার যে হয় না সেও মিথ্যে নয়। সমসাময়িক
ঘটনা নিয়ে সৃষ্টির তাৎক্ষণিক আকুতি অনেক সময় বিষয়বস্তুকেই লঘু করে দিয়েছে এমনটা দেখা
গেছে, আবার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সময়ের স্বরটি হারিয়ে গেছে তেমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়।
দেশভাগ নিয়ে সিনেমা নির্মাণের বেলায়ও এই সমস্যা ছিল এবং আছে। ইদানিং এই সমস্যাটির ক্ষেত্রে
একটি ভিন্ন মাত্রা সংযুক্ত হয়েছে যার উল্লেখ এখানে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আশির দশকে
অসমের বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলনের হাত ধরে ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প এবং তারপর
নাগরিক পঞ্জি নবায়ন ও নাগরিক সংশোধনী আইন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে ভারতীয়
উপমাহাদেশের রাজনীতি যেভাবে বাঁক নিতে শুরু করেছে তার ফলে দেশভাগ সংক্রান্ত ঘটনাটি
আবার গুরুত্বপূর্ণ
ও আলোচ্য হয়ে উঠেছে। শিল্প-সাহিত্যেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, এমনকি
খুব সামান্য হলেও সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রেও। কারণটা আর কিছু নয়, রাজনীতির অঙ্গনে
বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা।
স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনোত্তর , এই কাল বিভাজন অনুসরণ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে
আলোচনার ক্ষেত্রে, বিশেষত যারা উদ্বাস্তু হয়ে নিজ ভূমি
ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তাদের দুর্দশা ও দুর্গতির প্রশ্নে, দেশভাগ অনিবার্য কারণেই প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। বাংলা ও পাঞ্জাব, এই দুই প্রদেশের মানুষই সবচেয়ে বেশি
অনিশ্চয়তার শিকার হয়েছেন সেকথা আগেই উল্লেখ করেছি। ভারতীয় সিনেমায় দেশভাগ কিন্তু ’৪৭
পরবর্তী সময়েই ঠাঁই করে নেয়। কোলকাতা এবং মুম্বাই, সিনেমা নির্মাণের দুই কেন্দ্রেই
বিষয়টি গুরুত্ব পায় নির্মাতা ও পরিচালকদের কাছে। বাণিজ্যিক ‘সেন্টিমেন্টাল’ সিনেমা নির্মাতাদের কাছে প্লটে একটা
‘নতুনত্ব আমদানি’র সাথে সাথে ‘সামাজিক’ হয়ে ওঠার স্বার্থেও। ‘সিরিয়াস’ সিনেমা নির্মাতাদের কাছেও দেশভাগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে।
অনিকেত এক
জীবনযাত্রা ও অসেতুসম্ভব এক বিচ্ছিন্নতার বলয়ে আবদ্ধ মানুষের দুর্দশা ও দুর্গতির
ভাষ্য তৈরিতে সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণেই নিয়োজিত হন বহু সংবেদনশীল সিনেমা পরিচালক । এই
দ্বিতীয় শ্রেণির উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যেই আমরা আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়াস
করব, যদিও কালানুক্রমিক চিত্র তুলে ধরার খাতিরে ‘অপ্রধান’ কিছু ছবির উল্লেখও বাধ্যতই করব। সীমিত পরিসরে যেহেতু বিভিন্ন
প্রাদেশিক ভাষায় নির্মিত ছবির বিস্তৃত উল্লেখ সম্ভবপর নয় অতএব মূলত বাংলা ও হিন্দি
সিনেমার আঙিনায় আমাদের ঘোরাফেরা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
স্বাধীনতার দু’বছর পর, ১৯৪৯ সালে পরিচালক
এম এল আনন্দ নির্মাণ করেন ‘লাহোর’ ছবিটি। দেশভাগের পটভূমিকায় নির্মিত হলেও এটি বাণিজ্যিক
‘ফর্মূলা পিকচার্স’ গোত্রীয়। যদিও নার্গিসের মত অভিনেত্রী ও করণ দেওয়ানের মত অভিনেতা অভিনয় করেছেন মুখ্য ভূমিকায়। দেশভাগ নিয়ে প্রকৃতার্থে প্রথম উল্লেখযোগ্য সিনেমা
নির্মাণ করেন নিমাই ঘোষ, স্বাধীনতার চার বছর পর, ১৯৫১ সালে। ভারতীয় সিনেমায় নিমাই ঘোষের
‘ছিন্নমূল’ই দেশভাগের সিনেমা সংক্রান্ত প্রথম
এবং প্রধান মাইল ফলক বলা যায়। ওই সময়কার আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কাজটি কেবল
দুরূহ ছিল না, ছিল দুঃসাহসিক। প্রামাণ্য চিত্রের আদলে দেশভাগের যন্ত্রণা, শেয়ালদা স্টেশনের উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা
ইত্যাদি শৈল্পিক সততায় প্রথম উঠে এল ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে। কাছাকাছি সময়ে সইফুদ্দিন সইফের পরিচালনায়
পাঞ্জাবি ভাষায় পাকিস্তানেও নির্মিত হয় ‘কর্তার সিং’ নামে একটি ফিল্ম, ১৯৫৯ সালে। এখানে একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, মুম্বাইয়ের বলিউডে এবং অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষায় নির্মিত সিনেমায় মূলত পাঞ্জাব তথা পশ্চিম-পাকিস্তানের
কথাই প্রাধান্য পেয়েছে স্বাভাবিক কারণেই। পূর্ব-পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের দুর্দশার
চিত্র মেলে প্রধানত বাংলা সিনেমায়।
দেশভাগ-দেশত্যাগ একেবারে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ রূপে
যাদের সিনেমায় উঠে এসেছে তাদের মধ্যে অন্যতম ঋত্বিক ঘটক। বস্তুত ঋত্বিকের সিনেমায়
দেশভাগ ও দেশত্যাগের মর্মবেদনা এমন ভাবে চিত্রিত হয়েছে যা দেশ কালের সীমা অতিক্রম
করে এক ক্লাসিক সৃষ্টির নিদর্শন হয়ে আছে। হিন্দি সিনেমার জগতে সমগোত্রীয়
পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন এম এস সথ্যু, সৈয়দ আখতার মির্জা, শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনি প্রমুখ। স্ব স্ব
ক্ষেত্রে এদের প্রত্যেকের উল্লেখযোগ্য অবদান স্বীকার করেও একথা বলতে দ্বিধা নেই যে
ঋত্বিক ঘটক এক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম, এক অনন্য স্বকীয়তায় ভাস্বর। হিন্দি সিনেমায় দেশভাগ নিয়ে উল্লেখযোগ্য
নির্মাণের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে সত্তরের দশক অব্দি, যদিও ১৯৬১ সালে যশ
চোপরার পরিচালনায় ‘ধরমপুত্র’ ছবিটি নির্মিত হয় বলরাজ
সাহানি’দের মত অভিনেতাদের নিয়ে। ছবিটির একটি
গান ‘না তু হিন্দু বনেগা, না মুসলমান’ ভীষণ জনপ্রিয় হয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে
মানবিক আবেদন সম্পন্ন একটি সুস্থ সামাজিক ছবি হিসেবে এটি অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে।
কোলকাতায়, বাংলা সিনেমায়, দেশভাগকে
কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র আমরা কিন্তু পেয়ে যাই ষাটের দশকেই। হ্যাঁ, এই নির্মাণ যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত নিশ্চিত ভাবেই ঋত্বিক ঘটক, এবং কেবল ঋত্বিক ঘটক। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণ রেখা’ পর পর নির্মিত
হয় যথাক্রমে ১৯৬০, ১৯৬১ ও ১৯৬৫ সালে। এই সিনেমা ত্রয়ী (trilogy) দেশভাগের বলি প্রতিটি বাঙালি পরিবারের নিদারুণ ভাষ্য হয়ে আজও বিরাজ করে ।
বাঙালি দর্শক মাত্রেই এই ছবিগুলির সাথে একাত্মবোধ করেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই।
দেশভাগের হৃদয়বিদারক যন্ত্রণা এমন তীব্রতায় আর কোনো পরিচালক উপলব্ধি করেন নি। করা
সম্ভবও ছিল না। ঋত্বিক ছিলেন দেশভাগের জলজ্যান্ত সাক্ষী। ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের
পাশার চালে বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত দেশ ও জাতির করুণ দুর্দশা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে
পারেন নি। বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, বিদ্রোহ করেছেন, গোটা জীবনের সিনেমা নির্মাণে সেই
চিহ্নই রেখে গেছেন। কেবল এই তিনটি নয়, তাঁর অন্যান্য সিনেমাগুলোতেও দেশভাগ পরোক্ষ
ও সূক্ষ্মভাবে বর্তমান। দেশভাগ গোটা বাঙালি জাতির সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনে মূল্যবোধের যে
ধ্বস নামিয়ে আনে, ঋত্বিকের সংবেদনশীল সচেতন মন আদ্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া
ব্যক্ত করেছে, তাঁর ক্যামেরা ‘অযান্ত্রিক’ পদ্ধতি ও ভঙ্গিমায় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে
সময় ও সমাজকে।
এখানে আরেকটি কথা বলে নেওয়া মনে হয়
আবশ্যক। (১৯৪৭ সালের) দেশভাগের ফলেই যে কেবল মানুষ দেশান্তরী
হয়েছেন তা কিন্তু নয়। দেশত্যাগের কারণ কেবল দেশভাগ
নয়। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক নানা কারণেই মানুষকে ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশান্তরী হতে হয়, হচ্ছে।
এ সমস্যা কিন্তু গোটা বিশ্ব জুড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে
মোটামুটি ১৯৪০ থেকে ১৯৭১, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্ব থেকে বাংলাদেশের জন্ম অবধি
উদ্বাস্তু মানুষের ঢল নেমেছে। কিন্তু যে কারণেই হোক তেমন দেশত্যাগের ঘটনাগুলো নিয়ে সিনেমা সেভাবে নির্মিত হয়নি, যদিও উদ্বাস্তু অথবা
রিফিউজি সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অসাধারণ সব মর্মস্পর্শী সিনেমা
নির্মিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে সেসবের উল্লেখের অবকাশ নেই, প্রয়োজনও নেই। প্রসঙ্গ
তবু উঠল এই কারণে যাতে উৎসাহী পাঠক/দর্শক সে বিষয়ে অনুসন্ধানে ব্রতী হতে পারেন। দেশভাগ
কেন্দ্রিক ঋত্বিকের সিনেমাগুলির অ্যাপ্রোচ ও ট্রিটমেন্ট এমন অসামান্য যে সেগুলো
কেবল এই উপমহাদেশের সিনেমা হয়েই থাকে না, ভূগোলের আঞ্চলিক বেড়া ডিঙিয়ে এক অন্তর্লীন আবেদন সহ বিশ্বের দর্শকের কাছে অবলীলায় পৌঁছে যায়। এখানেই তার স্বকীয়তা। এখানেই তিনি
অনন্য, অতুলনীয়। তাঁর নির্মিত সিনেমাগুলি দেশভাগের মর্মবেদনাকে এমন ভাবে প্রতিফলিত
করে যে দর্শক প্রায় শারীরিক ভাবে যন্ত্রণাবিদ্ধ হন। এ এক বিরল অভিজ্ঞতা, ভাষায়
প্রকাশের নয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে দেশভাগ সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য ও
প্রতিনিধিত্ব মূলক সিনেমার একটা কালানুক্রমিক সূচী যদি তৈরি করা যায় এবং বিশ্বে
সবচেয়ে বেশি ছবি নির্মিত হয় যেখানে সেই বলিউডকে দিয়েই যদি শুরু করি তাহলে তালিকাটি
কম বেশি নিম্নরূপ নেবে।
দেশভাগের
সিনেমা নিয়ে কিছু বলতে হলে সর্বাগ্রে ‘গরম হাওয়া’র নাম করতে হয়। ১৯৭৩ সালে ছবিটি নির্মাণ করেন
এম এস সথ্যু। অসাধারণ একটি সিনেমা। পার্টিশনের প্রেক্ষিতে একটি মুসলিম পরিবারের
ভারতে থাকা কিংবা পাকিস্তানে চলে যাওয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে
টানাপোড়েন নিয়ে এক সাংঘাতিক আখ্যান। কাইফি আজমির
চিত্রনাট্য ও বলরাজ সাহানির অসাধারণ অভিনয় এ ছবির সম্পদ। সত্তর-আশির দশকে ভারতীয়
সিনেমায় যে নয়া ঢেউ (new wave) আসে গরম হাওয়া তারও পথিকৃৎ বললে
ভুল হবে না। ‘গরম হাওয়া’ সথ্যুর প্রথম ছবি, যথেষ্ট বিতর্কিতও।
‘গান্ধী’ (১৯৮৮)ঃ ভারত এবং ব্রিটিশ সংস্থার উদ্যোগে
নির্মিত এই সিনেমাটি নিয়ে বিতর্ক অশেষ। জন ব্রেইলির চিত্রনাট্য অনুসরণ করে
চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন রিচার্ড অ্যাটেনব্রো। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন বেন কিংসলে। ১৯৯৮ সালে সেরকম পাকিস্তান-ব্রিটিশ যৌথ উদ্যোগেই
নির্মিত হয় ‘জিন্নাহ’। স্বাধীনতা আন্দোলন
ও দেশভাগ প্রসঙ্গে এই দুই ঐতিহাসিক ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের অন্ত
নেই। সিনেমা দুটি নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই।
গোবিন্দ নিহালনি পরিচালিত ‘তমস’ (১৯৮৮) সিনেমাটি একটু
আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। এই বিষয়ে এত
বিশদ ও বিস্তৃত কাজ তেমন হয়নি। এটি একটি ‘অবশ্যই দেখা উচিত’ ছাপ মেরে দেওয়ার মতন
ছবি। ’৪৭ এর পরে যাদের জন্ম তাদের তো অতি অবশ্যই দেখা দরকার। ভীষ্ম সাহানির
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত হিন্দি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমার
পটভূমি দেশভাগের ফলে দাঙ্গা বিধ্বস্ত
পাকিস্তান। উদ্বাস্তু শিখ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবনযন্ত্রণার এক মর্মস্পর্শী
আখ্যান। বহু প্রশংসিত ও পুরস্কৃত ছবিটি মূলত দূরদর্শনে প্রদর্শনের জন্য নির্মিত
হলেও পরবর্তীতে বড় পর্দায়ও প্রদর্শিত হয়। অভিনয়ে রয়েছেন বলিউডের একঝাঁক বিখ্যাত
অভিনেতা-অভিনেত্রী ।
‘সর্দার’ (১৯৯৪)ঃ কেতন মেহতা নির্মিত সর্দার
প্যাটেলের জীবন ভিত্তিক ছবি। উল্লেখযোগ্য তো বটেই, বিশেষ
করে পরিচালক যেখানে কেতন মেহতা। তবে এ ধরনের জীবনী- নির্ভর সিনেমার অন্য মূল্য
যা-ই হোক আম দর্শকের পারস্পেক্টিভ থেকে ততটা সংবেদনা আশা করা যায় না অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই।
‘মাম্মো’, ১৯৯৪ সালে শ্যাম বেনেগাল নির্মিত
একটি বহু প্রশংসিত এবং ১৯৯৫ সালে জাতীয় পুরস্কার
প্রাপ্ত ছবি। রিয়াজ নামের ১৩ বছরের একটি ছেলে ঠাকুমা ও তার বোন
মেহমুদা বেগম, ওরফে মাম্মোর সঙ্গে অতি সাধারণ জীবনযাপন করে মুম্বাই শহরে। দেশভাগের
ফলে মাম্মোকে চলে যেতে হয় পাকিস্তানে, যদিও তার জন্ম পানিপথে। নিঃসন্তান মাম্মোকে স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের
লোকেরা তাড়িয়ে দিলে সে স্বল্পমেয়াদি ভিসা
নিয়ে মুম্বাই শহরে বিধবা বোনের বাড়িতে চলে আসে। প্রতি মাসে থানায় গিয়ে ঘুষ দিয়ে ভিসার
মেয়াদ বাড়ায় এবং স্থায়ী ভিসা যোগাড়ের চেষ্টা করে। কিন্তু থানার অফিসার বদলি হয়ে
গেলে মাম্মোকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে ধরে পাকিস্তানের ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়।
রিয়াজ ও তার ঠাকুমা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও হদিশ পায় না। কুড়ি বছর পর রিয়াজ তার
মাম্মোকে নিয়ে বই লেখে এই আশায় যে একদিন তাদের পুনর্মিলন হবে। নিঃসন্তান মাম্মোর
সঙ্গে রিয়াজের সম্পর্ক এ ছবির সম্পদ। ছবির সমাপ্তি মধুর। মাম্মো আবার ফিরে আসে, আর যাতে ফিরে যেতে না হয়
তার জন্য মৃত্যুর জাল নথির মোক্ষম হাতিয়ার নিয়ে। সমাপ্তির মধুরতা আসলে অন্তর্লীন ট্র্যাজেডির
নামান্তর মাত্র।
১৯৯৫ সালে তৈরি সৈয়দ আখতার মির্জা’র ‘নাসিম’
সিনেমাটির বিষয় সরাসরি দেশভাগ না হলেও ছবিটিকে আমরা তালিকাভুক্ত করার পক্ষে। কারণ
দেশভাগ হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গভীর ফাটল সৃষ্টি করেছে তার এমন
শৈল্পিক উপস্থাপনা খুব বেশি নেই। কাহিনির সময়কাল ১৯৯২ এর শেষার্ধ। বাবরি মসজিদ ভাঙার ঠিক আগে দ্রুত বদলে
যেতে থাকা পরিস্থিতির পটভূমিতে মুম্বাইয়ের একটি মুসলমান পরিবারের গল্প। ১৫ বছরের এক কিশোরী নাসিম
(ময়ূরী কঙ্গো) ও তার অসুস্থ পিতামহের (কাইফি আজমি) পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলে। একদিকে দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও টিভিতে ত্রাস সৃষ্টিকারী সংবাদ, আর অন্যদিকে
পিতামহের স্মৃতিচারণে দেশভাগ-পূর্ব আগ্রা শহরের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির গল্প।
নাতনি লক্ষ্য করে তার স্কুল ও আশপাশের দ্রুত
বদলে যাওয়া পরিবেশ, আর অসহায় পিতামহ নিষ্পলক চেয়ে দেখেন সাম্প্রদায়িকতার বিষে
জর্জরিত প্রিয় শহরের দ্বিধা-বিভক্ত স্বরূপ । সিনেমা শেষ হয় পিতামহের মৃত্যুতে,
তাৎপর্যপূর্ণভাবে তারিখটি ৬ ডিসেম্বর। সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে এমন জোরালো সিনেমাটিতে কিন্তু
দাঙ্গা বা হিংসার একটিও দৃশ্য নেই।
‘১৯৪৭ আর্থ ’ঃ ১৯৯৮ সালে দীপা মেহতার পরিচালনায়
নির্মিত একটি বহু প্রশংসিত ছবি। ছবির পটভূমি লাহোর, সময়কাল ১৯৪৭ । এক পোলিও
আক্রান্ত কিশোরীর বয়ানে বিবৃত কাহিনি। দীপা মেহতা পরিচালক হিসেবে খ্যাতিমান। তাঁর
সিনেমায় ভিন্ন ধাঁচের ট্রিটমেন্ট বিষয়কে অনেক গভীরতা দেয়। শাবানা আজমি, আমির খান ও নন্দিতা দাশের মত
শিল্পীরা অভিনয় করেছেন এ ছবিতে। এলাকার হিন্দু, শিখ এবং
মুসলমানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা
করা একটি পার্সি পরিবারের পোলিও
আক্রান্ত তরুণী লেনি (মাইয়া সেথনা) তার
প্রাপ্তবয়স্ক সত্তার (শাবানা আজমি) বয়ানে গল্পটি বলে যান।
১৯৯৮ সালেই খুশবন্ত সিং-এর কাহিনি অবলম্বনে পামেলা রুকস তৈরি করেন ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’। এই ছবিটি
পাঞ্জাবের একটি কাল্পনিক গ্রামের পটভূমিতে নির্মিত। গ্রামের অধিবাসীরা, শিখ এবং
মুসলিম, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। দেশভাগ ও ধর্মীয় বিভাজনের পরিণতি যে কী ভয়ানক ও
মর্মান্তিক হতে পারে লাশ বোঝাই ট্রেনের দৃশ্যে দর্শক সেই ভয়ঙ্করকে প্রত্যক্ষ করেন।
ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের আপত্তির ফলে দু’ দুবার
ছবিটির নির্ধারিত মুক্তি আটকে যায়।
‘শহিদ-য়ে-মহব্বত বুটা সিং’ (১৯৯৯) ঃ পাকিস্তানি এক
নারীকে দেশভাগের হিংসাত্মক সময়ে ভারতীয় যুবকের উদ্ধার করার ঘটনা ও পরবর্তীতে
ভালোবাসা ও বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটিকে জোর করে পাকিস্তানে ফেরৎ পাঠানোর অমানবিক
কাহিনি এর উপজীব্য। পরিচালক মনোজ পুঞ্জ। সিনেমাটি বুটা সিং ও জয়নাব বিবির প্রেমের বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি।
‘হে রাম’ (২০০০) ঃ কমল হাসান নির্মিত একটি বহু আলোচিত
ও বিতর্কিত সিনেমা। দেশভাগ, গান্ধীজীর হত্যা ও নাথুরাম গডসে প্রসঙ্গ এ ছবির
উপজীব্য। ছবিটি অস্কার মনোনয়নের জন্যও প্রেরিত হয়েছিল যদিও শেষ পর্যন্ত মনোনীত
হয়নি ।
‘গদারঃ এক প্রেমকথা’ (২০০১) বহু প্রশংসিত ও জনপ্রিয়
ছবি। বহু পুরস্কৃতও। এক শিখ যুবক পার্টিশনে পরিবার বিচ্ছিন্ন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম
মেয়ে সাকিনাকে উদ্ধার করে এবং পরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাকিনার বাবা-মা বেঁচে আছেন জেনে তারা দেখা
করতে যায় এবং সাকিনার বাবা তখন স্বামীর সঙ্গে ফিরে আসতে সাকিনাকে বাধা দেন। ধর্মীয় বিভাজন ও
প্রেম-ভালোবাসার দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে টানটান সিনেমা। অনেকটা শহিদ-য়ে-মহব্বত বুটা
সিং কাহিনির পুনর্নির্মাণ। পরিচালক অনিল শর্মা।
‘খামোশ পানি’ (২০০৩)ঃ মূলত এটি পাকিস্তানি
সিনেমা। পরিচালক সাবিহা সুমর। ১৯৭৯ সালের পাকিস্তানে
উদ্ভুত এক সামাজিক সঙ্কটের প্রেক্ষিতে আয়েষা নাম্নী এক নারীর যন্ত্রণার কথা, যার
শুরু ১৯৪৭ এর দেশভাগের মধ্যে দিয়ে। পরিচালক
পাকিস্তানে জন্ম গ্রহণ করলেও বর্তমানে দিল্লি নিবাসী। দেশভাগ কিংবা
মৌলবাদী হিংসা উভয় ক্ষেত্রেই পিতৃতান্ত্রিকতার যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত নারীদের
ভোগান্তি দেশভাগের ফলে যে কোন চরমে পৌঁছেছিল সে কাহিনিই সৃষ্টিশীল ভাবে চিত্রিত
হয়েছে এ ছবিতে। আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত এ সিনেমাটি পাকিস্তানি হলেও
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অধিকাংশই ভারতীয়।
‘পিঞ্জর’(২০০৩)ঃ উর্মিলা মাতণ্ডকর পরিচালিত দেশভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি
অন্য ধরনের সিনেমা। অপহৃত এক হিন্দু নারী কোনক্রমে
অপহরণকারীদের খপ্পর থেকে পালিয়ে আসতে সমর্থ হলেও তার পিতা-মাতা তাকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার
করে, যার দরুন মেয়েটিকে অপহরণকারীর কাছেই ফিরে যেতে হয় বাধ্য হয়ে। ধর্মান্ধতার
খাঁচায় বন্দী সমাজের অমানবিকতার স্বরূপ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি পিতৃতান্ত্রিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ
করেছেন পরিচালক।
‘ভাইসরয়’স হাউস’ (২০১৭)ঃFreedom at Midnight ( Larry Collins and Dominique Lapierre) ও The Shadow of the Great Game: The Untold
Story of Partition ( Narendra Singh Sarila) - এ দুটি গ্রন্থের ভিত্তিতে ভারতীয়-ব্রিটিশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ছবি। রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর উপলক্ষে
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত আগমণ, নেহরু ও জিন্নাহ প্রসঙ্গ, দেশ বিভাজনের সিদ্ধান্ত ও সীমানা নির্ধারণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
ইত্যাদি এ ছবির কেন্দ্রীয় বিষয়। গুরিন্দর চাড্ডা পরিচালিত ছবিটি ৬৭তম বার্লিন
চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়। সিনেমাটি প্রথম মুক্তি পায়
ইংল্যাণ্ডে, ২০১৭ সালের ৩রা মার্চ। ছবিটির হিন্দি ভার্সন ‘পার্টিশন ঃ ১৯৪৭’ ২০১৭
সালের ১৮ আগস্ট, ৭০ তম স্বাধীনতা দিবসের তিন দিন পর ভারতবর্ষে মুক্তি লাভ করে।
‘টোবা
টেক সিং’ (২০১৮)ঃ সাদাত হাসান মান্টো’র কাহিনি অবলম্বনে কেতন মেহতা পরিচালিত একটি ভিন্ন গোত্রের সিনেমা। দেশভাগের
সাহিত্যে সাদাত হাসান মান্টোর অবদান আলাদা
করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ঋত্বিক এবং মান্টো দুজনেই দেশভাগের সাক্ষী, এবং
দেশভাগের মর্মবেদনা এই দুজনের
সৃষ্টিকর্মে, যথাক্রমে সিনেমা ও সাহিত্যে যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা দৃষ্টান্তরহিত।
টোবা টেক সিং সিনেমার কাহিনি লাহোরের এক মেন্টাল অ্যাসাইলাম থেকে শুরু হয়, যেখানে
হিন্দু-মুসলিম-শিখ সব ধর্মের পরিবার পরিজন পরিত্যক্ত মানুষের একত্র বসবাস। এদের
প্রত্যেকের নিজস্ব আকর্ষক জীবনকাহিনী বর্তমান, যদিও বিষান সিং-এর গল্প অন্যদের
থেকে একেবারেই আলাদা। তার সুস্থতা থেকে
(মানসিক) অসুস্থতার যাত্রা শুরু হয় নিজের গ্রাম থেকে। বিগত দশ বছর যাবৎ সে রাতদিন জেগে থাকে। সুস্থ এবং অসুস্থ উভয়
অবস্থায় যাকে নিজের ঠিকানা জেনেছে সে স্থান ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা কীরকম হতে পারে,
বিশেষত যাদের পৃথিবীর ‘সুস্থ’ মানুষদের মত চিন্তা ভাবনা করার মতন মানসিক ভারসাম্য
নেই তাদের পক্ষে ? ব্যক্তি যে-ই হোক এবং তার মানসিক
অবস্থা যাই হোক না কেন দেশভাগ যে কেবল যন্ত্রণার
সে যারা তা ভোগ করেছে তারাই জানে এবং এ ছবির সার কথা এটাই।
‘মান্টো’ (২০১৮)ঃ পরিচালক নন্দিতা দাশ স্বনামধন্য । ‘মান্টো’
দেশভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সাদাত হাসান মান্টোর জীবন-নির্ভর একটি উল্লেখযোগ্য
সিনেমা । মুম্বাই ভিত্তিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সংঠনের সাথে
যুক্ত প্রথাগত ধর্মাচারণ না-করা বিখ্যাত লেখক মান্টো কেন, কোন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে
সিদ্ধান্ত পাল্টে মুম্বাই ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যেতে
বাধ্য হন সেই হৃদয়বিদারক আখ্যান নন্দিতা দাশের সুদক্ষ পরিচালনায় পরিস্ফূট। এক
বিভ্রান্ত সময়ের অনন্য মানবিক দলিল হিসেবেই ছবিটি পরিগণিত হবে ভবিষ্যতে। প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাদ দিলে শিল্পী-সাহিত্যিকের জীবন- নির্ভর পার্টিশন কেন্দ্রিক সিনেমা কিন্তু সেভাবে নির্মিত হয়নি।
এছাড়াও বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় কিছু
উল্লেখযোগ্য সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তার কয়েকটির উল্লেখ না করলে সত্যিই অন্যায় হবে। ১৯৯১
সালে জি অরবিন্দন তৈরি করেন বহু আলোচিত মালয়ালম ছবি ‘বাস্তুহারা’। এই ছবিতে
রিফিউজি ক্যাম্পের সরকারি আধিকারিক ভেনুর দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালি উদ্বাস্তু ও
শরণার্থীদের দুর্গতির কথা বর্ণিত হয়েছে। এটি দেশভাগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ
সিনেমা।
২০০৩ সালে অনুপ সিং নির্মিত ‘একটি নদীর নাম’ বেশ
প্রশংসিত ও বিদগ্ধ মহলে আলোচিত একটি ছবি। তথ্যচিত্রের
আদলে নির্মিত এই ছবি নদী-বিভাজিত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নারী-পুরুষের প্রেম-প্রণয়ের
আখ্যান। ছবিটি অন্য কারণেও বিশেষ
উল্লেখযোগ্য, ছবিটি ঋত্বিক ঘটকের প্রতি পরিচালকের শ্রদ্ধার্ঘ।
পাঞ্জাবি ভাষায় নির্মিত ’৪৭-৮৪’ (২০১৫) একটি
উল্লেখযোগ্য ছবি। এই ছবির কাহিনি সাতচল্লিশের
দেশভাগ ও দাঙ্গার সময় থেকে ’৮৪ সালের শিখ দাঙ্গা অব্দি
বিস্তৃত। দেশভাগের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার
ভেতর দিয়ে একটি শিশুর বেড়ে ওঠা এবং জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে ওঠার মুহূর্তে ’৮৪র
শিখ নিধন যজ্ঞের অভিঘাত এ ছবির উপজীব্য। ছবির প্রোটাগোনিস্ট চরিত্রের এই যাত্রা
যেন প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
যদিও ভারতীয় উপমহাদেশে নির্মিত নয় তাহলেও আরো দুটি
ছবির উল্লেখ এখানে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দুটি ছবির নাম একই, ‘পার্টিশন’ –
প্রথমটি নির্মিত হয় ১৯৮৭ সালে, নির্মাতা কেন ম্যাকমুলেন। দ্বিতীয়টি নির্মাণ করেন
ভিচ সারিন, কানাডায়, ২০০৭ সালে। দেশভাগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যে অন্যান্য দেশের
ফিল্ম নির্মাতাদের কাছেও নেহাৎ কম নয় এ দুটো ফিল্ম তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
এবারে আসা যাক টলিউডে, মানে বাংলা সিনেমার
জগতে। স্বাধীনতার পর পর ১৯৫১ সালে নির্মিত ‘ছিন্নমূল’ ছবির পরে পঞ্চাশের দশকেই তৈরি
হয় পরিচালক সলিল সেনের ‘নতুন ইহুদি’ (১৯৫৩) এবং শান্তিপ্রিয়
চট্টোপাধ্যায়ের ‘রিফিউজি’ (১৯৫৪) – সিনেমা হিসেবে তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও এ দুটি
চলচ্চিত্রে যে যন্ত্রণা ও হতাশার চিহ্ন ছড়ানো রয়েছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপেক্ষার
নয় মোটেই। পাঞ্জাবের
ক্ষেত্রে বিভাজনের শিকার হয়েছেন দু’পারের অধিবাসীরাই। বাংলার ক্ষেত্রে কিন্তু চিত্রটা
একটু ভিন্ন। মূলত পূর্ববঙ্গের অধিবাসী বাঙালির জীবনেই সব থেকে বড় আঘাত হানে
দেশভাগ। প্রাথমিক ধাক্কাটা ছিল বাস্তুচ্যুত হওয়ার। নিজের দেশ, জন্মভূমি ছেড়ে শুধুমাত্র প্রাণের দায়ে অনির্দেশ্যের উদ্দেশে
পাড়ি জমানো। এপারে এসে প্রাণের নিরাপত্তা যদিবা খানিকটা মিলল জীবিকার অন্বেষণে সঙ্গীন
হলো জীবনযাপন। মানসিক ভাবে উদ্বাস্তু
হওয়ার পালা শুরু হলো। এই দ্বিতীয় ধাক্কা সামলে ওঠা সম্ভব হয়ে উঠল না আজ পর্যন্ত।
অনিকেত জীবনের এই যন্ত্রণা ও হতাশা, ছিন্নমূলের শিকড়
সন্ধানের অনন্য আকুতি ও সংগ্রাম দুর্ভাগ্যক্রমে
সে অর্থে রূপ পেল না আমাদের সম্পন্ন সাহিত্যে। সেই ঘাটতি পূরণের জন্যই বুঝি বাংলা
চলচ্চিত্রের আঙিনায় আবির্ভূত হলেন ঋত্বিক ঘটকের মত পরিচালক। বাংলা সিনেমায় দেশভাগ
এক ভিন্ন মাত্রা পেল, স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকদের অমানবিক সিদ্ধান্তের ফলে নেমে
আসা দুর্যোগের অসামান্য মানবিক দলিল হয়ে রইল তাঁর চলচ্চিত্র। লক্ষ্য করলে দেখা
যাবে যে, দেশভাগ নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোতে মূলত প্রধান হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিভাজনের
প্রসঙ্গ ও দাঙ্গার বিষয়টি। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা এদিক থেকে একেবারেই ভিন্ন গোত্রের,
ব্যতিক্রমী। তাঁর ছবিগুলো তাই নিছক ‘দাঙ্গার প্রতিবেদন’ হয়ে ওঠার পরিবর্তে
‘উদ্বাস্তু জীবনের মানবিক দলিল’ হয়ে ওঠে। এইখানেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অন্যদের
পার্থক্য, তাঁর অনন্যতা। দেশভাগের বেদনা তাঁর সৃষ্টিকর্মে এক সমগ্রতা নিয়ে হাজির
হয়, যা আর কারো সিনেমায় সেভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না।
‘মেঘে ঢাকা তারা’(১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’(১৯৬১) ও
‘সুবর্ণরেখা’(১৯৬৫)- এই তিনটি ছবিতে দেশভাগ বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনকে কীভাবে ও
কতটা নিঃস্ব ও নিরালম্ব করেছে সেই চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন জীবন ঘনিষ্ঠতায়।
ভিটে-মাটি চ্যুত মানুষের জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয় , সুস্থির জীবনের জন্য আকুতি ও
অন্তহীন লড়াইয়ের এমন চলচ্চিত্রায়ন এদেশের আর কোনও চলচ্চিত্রকারের কাজে খুঁজে পাওয়া
ভার। সিনেমার জগতে, এক্ষেত্রে, তিনি স্বরাট - একমেবমদ্বিতীয়ম ! অন্যত্র সরাসরি
কথাগুলো বলেছেন তাঁর স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিতে - “দু’বাংলা ভেঙে চুরমার করে দিল। এটা বদমাইশি। সমস্ত অর্থনীতি আর রাজনীতিতে যে
ভাঙন শুরু হয়েছে তার উৎস ওই বাংলাদেশ ভাগ।
…আমি চাই দু’বাংলার সংস্কৃতিকে এক ফ্রেমে আঁটতে”। দেশ
ভাঙ্গার রাজনৈতিক খেলা একটা গোটা জাতির জীবনে যে ভাঙন নিয়ে এলো ঋত্বিকের সিনেমা
তার এক সামগ্রিক এবং সমালোচনামূলক চিত্র তুলে ধরল প্রথম বারের মত। এও বলেছেন, ‘প্রতিবাদটা
করা দরকার – কিন্তু শালা বুঝল না কেউ।’ প্রতিবাদটা তাই তাঁকেই করতে হলো, তাঁর মত
করেই। ভারতীয় তথা আন্তর্জাতিক সিনেমায় ইতিহাস রচিত হলো। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র শেষ
দৃশ্যে মুমূর্ষু নীতা’র আকুল আর্তি দেশ কালের সীমা ছাড়িয়ে স্পর্শ করে আপামর
দর্শককে। হয়ে ওঠে দেশ হারানো ছিন্নমূল মানুষের জীবনের চিরন্তন মানবিক দলিল।
এরপর এক দীর্ঘ বিরতি, নিঃস্তব্ধতা। দেশভাগের স্মৃতি ক্রমে বুঝি ঝাপসা
হয়ে আসে। সেলুলয়েডের
জগত থেকে দেশভাগের সিনেমা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে শুরু
করে, মিলিয়ে যায়। এই বিরতি পর্বে
একমাত্র উল্লেখযোগ্য সিনেমা উৎপল দত্ত অভিনীত রাজেন
তরফদারের ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৫)। পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যামেরার দৃষ্টি নিবদ্ধ বা কেন্দ্রীভূত
হয় ভিন্নতর বিষয়ে। খোলা বাজারের ‘উদার’ অর্থনীতি চলচ্চিত্রের
দুনিয়ায়ও ‘নতুন হাওয়া’ ভরে দেয়। কিন্তু তার
মধ্যেই উপমহাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় কিছু অবাঞ্ছিত
ঘটনা, ধর্ম ভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটতে শুরু করে। আর তার প্রেক্ষিতে দেশভাগও একটু একটু করে আবার আলোচ্য হয়ে উঠতে আরম্ভ করে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই, দু’ তরফেই, তথ্যানুসন্ধানে ব্রতী
হলেন। যার দরুণ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে দেশভাগ, বাস্তুহারা ও শরণার্থীদের সমস্যা আবার সিনেমার বিষয় হয়ে উঠতে আরম্ভ
করে। বলা নিষ্প্রয়োজন, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান, তথ্যের নতুন আলোক এবং নবীন প্রজন্মের নয়া পর্যবেক্ষণ
ইত্যাদির হাত ধরে বিষয়টি চলচ্চিত্রে উঠে আসতে শুরু করেছে ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন
ভঙ্গিমায়।
সৃজিত মুখার্জীর ‘রাজকাহিনি’ (২০১৫) তেমনি একটি
সাম্প্রতীক সিনেমা। উপমহাদেশকে
দ্বিখণ্ডিত করেছিল একটি কলঙ্করেখা, র্যাডক্লিফ লাইন। এই অভিশপ্ত রেখাটি একটি ভূখণ্ডকেই কেবল বিভক্ত করেনি, ভাগ করেছে উপমহাদেশের মানুষ ও তার
সংস্কৃতিকেও। ‘রাজকাহিনি’ সে বিভাজনের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদের আখ্যান। ছবির কাহিনি গড়ে ওঠে একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে, যার মাঝখান দিয়ে
চলে গেছে র্যাডক্লিফ লাইন। বাড়িটি পতিতাদের, এবং তাদের নেত্রী বেগমজানের নেতৃত্বে
বিভাজনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার গল্প ‘রাজকাহিনি’। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের একঝাঁক
নামি-দামী অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন আবীর চট্টোপাধ্যায়,
কৌশিক সেন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, জয়া আহসান প্রমুখ।
ছবিটির একটি হিন্দি ভার্সানও নির্মিত হয় বলিউডে,
মহেশ ভাটের পরিচালনায় ২০১৭ সালে ‘বেগমজান’ নামেই। কেন্দ্রিয় নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান।
‘শঙ্খচিল’ (২০১৬) প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী সিনেমা। মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন পশ্চিমবঙ্গের
অভিনেতা প্রসেনজিৎ
চট্টোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের কুসুম শিকদার। ১৯৪৭
সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে সিনেমাটির গল্প।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এক জনপদের গল্প ‘শঙ্খচিল’। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী
সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প নিয়েই মূলত কাহিনী তৈরি
হয়েছে এই চলচ্চিত্রের। ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ছবিটি সম্পর্কে দর্শকের
প্রতিক্রিয়া মিশ্র।
‘বিসর্জন’(২০১৭) কৌশিক গাঙ্গুলি নির্মিত একটি ভিন্ন
ধরনের ফিল্ম। ভারত ও বর্তমান বাংলাদেশর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গল্প, দু’দেশের মাঝের
জলবিভাজন রেখাটি হচ্ছে ইছামতী । দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের দিন দু’দিকের প্রতিমা দু’পারে সার
বেঁধে বিসর্জন হয়। এক ভাষা, এক রীতি , অথচ মানচিত্রের বাধার ফলে একাত্ম হবার
উপায় নেই। ছবিতেও দেখি, ছেলের আব্দার মেনে
বিসর্জন দেখতে যেতে গররাজি মা, কেননা এই বিসর্জনের দিনটি তাকে নিয়ে যায় অতীতের
অন্য এক বিসর্জনের ঘটনায়। ছবিটি বহু প্রশংসিত।
লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল ব্যানার্জী নির্মিত ‘মাটি’
(২০১৮) একটি উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসিত সিনেমা।
মেঘলা, কোলকাতার কলেজে দেশভাগ নিয়ে গবেষণায় রত। মেঘলাদের
আদি বাড়ি বাংলাদেশে। পরিবারের সকলে ১৯৭১এর
আগে চলে এলেও ঠাকুমা কুমুদিনি নড়েননি পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে। পরে তিনিও মারা যান। মেঘলার ঠাকুর্দার বন্ধুর
মেয়ে জিম্মি বিশ্বভারতীতে পড়ে, সেই সূত্রে বন্ধুত্ব এবং ঠাকুমার ডায়রি হাতে পাওয়া।
পিতৃপুরুষের ভিটে দেখার তাগিদে জিম্মির বিয়ে উপলক্ষে মেঘলা একাই চলে যায়
বাংলাদেশে। সেই অভিজ্ঞতা ও দেশভাগ নিয়ে গবেষণা, কাহিনির বিবিধ ক্লাইম্যাক্স পেরিয়ে
মেঘলা বুঝতে পারে যে এক অপ্রিয় বাস্তব দু’পারের মানুষকেই কুরে কুরে খাচ্ছে। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের নিজের গল্প অবলম্বনে
নির্মিত সিনেমাটির
অধিকাংশ শুটিং বাংলাদেশে। অভিনয়ে অসমের আদিল
হোসেন ও পাওলি দাম।
দেশভাগ প্রসঙ্গে অন্য একটি জরুরি কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন।
‘দেশভাগ’ কথাটা উচ্চারিত হওয়া মাত্র যে ছবিটা ভেসে ওঠে তা হচ্ছে – ওপার বাংলা
থেকে কাতারে কাতারে মানুষের ঢল নামছে এপার বাংলায়। আমরা যারা দেশভাগ দেখিনি,
স্বাধীনোত্তর কালে এদেশে জন্মেছি তারা এই দেশান্তরী পূর্বজদের মুখে ‘দেশের বাড়ির
গল্প’ শুনে বড় হয়েছি। এই গল্পগুলো বেশি অংশে একমাত্রিক, একদেশদর্শী তো বটেই ;
অনেকাংশে অতিরঞ্জিতও। যার দরুণ এমন এক ‘মিথ’ তৈরি হয়ে গেছে যা পরবর্তীতে
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সবচেয়ে ‘সফল’ হাতিয়ার হিসেবে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে ও হয়ে
চলেছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তথ্যচিত্রের,
সত্যিকারের দেশভাগের সিনেমার, গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। দেশভাগ নিয়ে তৈরি সিনেমাগুলোকে মোটা দাগে
কয়েকটা ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ১) তথ্য বা
দলিল চিত্র ২) ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ব্যক্তির জীবন-নির্ভর চলচ্চিত্র ৩) কাহিনি
চিত্র এবং ৪) ডকু-ফিচার। উপরে আলোচিত সিনেমাগুলিও অবশ্যই কোনো-না-কোন
একটি বিভাগের অন্তর্গত। ।
অতিকথন ও অনৃতভাষনের বিপরীতে তথ্য ভিত্তিক
ইতিহাসের চর্চা ও সত্য কথনের চিত্র কিন্তু উপমহাদেশের চলচ্চিত্র প্রয়াসে প্রায় অনুপস্থিত।
দেশভাগ নিয়ে তথ্যচিত্র সত্যিই দুর্লভ।
সুপ্রিয় সেনের ‘Way Back Home’
(২০০৩) এক্ষেত্রে অবশ্যই এক জরুরি সংযোজন। একদিকে
ছবিটি পরিচালকের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে বিচ্ছিন্ন অতীতে ফিরে যাবার যাত্রাকে
চিহ্নিত করে ; অন্যদিকে, এটি বিভাজনের বেদনাদায়ক ঘটনার বর্ণনা দেয় যা শুধু একটি
দেশকেই বিচ্ছিন্ন করে নি, বরং এর জনগণকেও বিচ্ছিন্ন
করেছে, যাদেরকে অন্য কোথাও নতুন শিকড় খুঁজতে হয়েছে। এছাড়াও এটি মুসলমানদের ভারত ত্যাগের সময় যে
বেদনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তারও এক
ঝলক তুলে ধরে। দেশভাগ কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের মানচিত্র জুড়ে প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত
এই সিনেমাটি গুজরাট দাঙ্গার সময় মুক্তি পায় এবং তাই, পার্টিশনের অডিওভিজুয়াল
আর্কাইভে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হয়। চলচ্চিত্রটি কোথাও যেন এক
কাল্পনিক মাতৃভূমির দিকে আমাদেরও যাত্রা হয়ে ওঠে, যে-ভূমির গল্প আমরা শুনেছি
কিন্তু কখনো চোখে দেখিনি। সুপ্রিয় সেন
তার আগের চলচ্চিত্রের সাথে ‘ওয়ে ব্যাক
হোম’ প্রামাণ্যচিত্রে বিন্যাসের এক নতুন ধারা নির্ধারণের মাধ্যমে অনুসন্ধানমূলক ফর্মকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন।
রয়েছে ‘Thin Wall’ (২০১৫) ছবিটিও। এই তথ্যচিত্রটি এক যৌথ প্রচেষ্টার
ফসল। সিনেমাটির পাকিস্তানি-আমেরিকান পরিচালক মারা আহমেদ ও ভারতীয়-আমেরিকান
সহ-প্রযোজক সুরভি দেওয়ান – এই দুই পরিবারের পারিবারিক স্মৃতিতে রয়ে গেছে ‘হারানো
স্বদেশের’ জন্য হাহাকার। জিতেন্দর শেঠী, দেওয়ান-এর ‘খালা’, পাকিস্তান ছেড়ে চলে আসেন এপারে ; পরিচালক মারা’র মা নিলোফার সালিম পাঁচ
বছর বয়সে পাকিস্তানে চলে যান। মারা ও দেওয়ান, উভয়ের সাক্ষাৎ নিউ ইয়র্ক শহরে, উভয়েই
আবিষ্কার করেন যে তাঁরা দুজনেই এক অবাঞ্ছিত ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছেন, দুজনেই পার্টিশন
দ্বারা বিচ্ছিন্ন পরিবার থেকে এসেছেন। একভাবে, শেঠি এবং
সেলিম উভয়েই এমন এক সময়ে ধরা পড়েছেন যেখানে স্মৃতিতে একটি আদিম বাড়ি, বাড়ি
ফিরে যেতে না পারার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী বেদনা রয়েছে, যা আসলে সময়ের জাঁতাকলে
চাপা পড়েছে। চলচ্চিত্রটি চিরাচরিত ‘আমরা’ ও ‘ওরা’ আখ্যানের বিপরীতে পরিচয়, ধর্ম এবং সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কিভাবে অতি-জাতীয়তাবাদী
আখ্যানে এগুলোকে সমসাময়িক জটিল রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিভেদমূলক
হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার চিত্রও তুলে ধরে। মতপার্থক্য সত্ত্বেও
মানুষকে কিভাবে ঐক্যবদ্ধ করা যায় সে বিষয়েও চিন্তা ব্যক্ত করেছেন পরিচালক।
এই বিভাগে সাম্প্রতীক সময়ে নির্মিত একটি
উল্লেখযোগ্য ছবি হচ্ছে ‘সীমান্ত আখ্যান’(২০১৮)। পরিচালক বিশিষ্ট এবং বিখ্যাত
তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র ঘোষ দস্তিদার। গুজরাট ২০০২ কিংবা বোড়ল্যাণ্ড ২০১২ র ঘটনা নিয়েও ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছেন
তিনি। উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে আগ্রহী সৌমিত্র দস্তিদার বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্রও
নির্মাণ করেছেন এ অঞ্চলের মানুষজন ও রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে। দেশভাগ নিয়েও ভবিষ্যতে
বৃহত্তর পরিসরে চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। নিজেই বলেছেন, ‘আমি ছবির দ্বিতীয়
পর্ব করব আসাম নিয়ে। সিলেট ভাগ অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশভাগের ডিসকোর্সে
বাংলা যেটুকু আসে, অসম একেবারেই আসে না। অথচ এপার থেকে, বা অসমের বিপুল এলাকা থেকেও যে মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার লোককে
উদ্বাস্তু হয়ে কষ্টের জীবন যাপন করতে হয়েছে, ইতিহাসের এই
দিকটা আমাদের চেনা পাঠে আসে না।’
এপার থেকেও বহু মানুষকে কিন্তু চলে যেতে হয়েছে ওপারে।
তবে পাঞ্জাব প্রদেশের মত বাংলার ক্ষেত্রে সংখ্যাটা অত বিশাল নয়। ‘ট্রেন টু
পাকিস্তান’-এর মত গ্রন্থ কিংবা ফিল্ম সৃষ্টি তাই বাংলায় হয়নি। তাহলেও বাঙালির এক
বড় অংশকে, অনেক কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীও র্য়েছেন তার মধ্যে, বিক্ষুব্ধ
মন নিয়েই কিন্তু চলে যেতে হয়েছিল পূর্ব-পাকিস্তানে। এ বিষয়টি হিন্দি সিনেমায় গুরুত্ব
পেলেও বাংলা সিনেমায় প্রসঙ্গটি কিন্তু সেভাবে উঠে আসেনি। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ
বিভাজনের কারণে ওপারে চলে যাওয়া মানুষদের হয়ত সেভাবে দুর্দশাগ্রস্ত হতে হয়নি। ঠিক
একই কারণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দেশভাগের,
দেশান্তরী মানুষের জীবনের উপাখ্যান আমরা তেমন খুঁজে পাই না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের আগে সে
চিন্তা-ভাবনাও তেমন আমল পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর ভাবনা শুরু হয়, এবং চলচ্চিত্রে
বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। পরবর্তী অংশ সেই নির্মাণ কথা দিয়েই শুরু করব।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দেশভাগের প্রসঙ্গ গুরুত্ব
সহকারে স্থান পায় যে ছবিতে এবং বাঙালি দর্শকের চিত্তকে আলোড়িত করে ভীষণ ভাবে সেটি
‘চিত্রা নদীর পারে’। ১৯৯৯ সালে ছবিটি
নির্মাণ করেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, বিকল্প সিনেমার পথিকৃৎ,
আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল। তানভীরের সিনেমায় দেশভাগ-দেশত্যাগের বিষয়টি
নানাভাবে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে ‘স্বপ্নভূমি’ (২০০৭), ‘১৯৭১’ (২০১১), ‘জীবন ঢুলি’(২০১৪)
ইত্যাদি ছবিতে। বাংলা চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটকের পরে দেশভাগ নিয়ে তানভীর ছাড়া আর কেউ তেমন বড় পরিসরে
কাজ করার চেষ্টা করেন নি। কাহিনি চিত্র বাদ দিলেও দেশভাগ নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র
নির্মাণেও তিনি সম্প্রতি এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ‘সীমান্তরেখা’ সিনেমাটি তৈরি করে। ২০১৭
সালে, দেশভাগের ৭০তম বছরে ছবিটি রিলিজ করা হয় এবং বহু প্রশংসিত হয়। সিনেমাটি নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, দেশভাগ নিয়ে তথ্য বা দলিল চিত্র বেশ
কিছু নির্মিত হলেও এরকম বড় মাপের এমন
বিস্তৃত কাজ এই প্রথম। দ্বিতীয়ত, সিনেমাটির পরিচালক ওপার বাংলার, অর্থাৎ সে অর্থে দেশভাগের শিকার নন,
যদিও তাঁর মায়ের বাড়ি ছিল এপার বাংলায়।
ঋত্বিক ঘটক ছিলেন দেশভাগের সাক্ষী, তাঁর বেদনাবোধের
উৎস চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা। তানভীরের জন্ম দেশভাগের পরে, এক অখণ্ড বাঙালি সত্তা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি ধরতে চেষ্টা করেছেন সে ইতিহাস। যারা সাক্ষী ছিলেন তাদের
সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন তাদের কাছে গিয়ে। দুই বাংলার এমন কিছু বিশিষ্ট জনের সাক্ষ্য তিনি সংগ্রহ
করেছেন যাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই, কাজেই এর তথ্যগত মূল্যও অপরিসীম। সিনেমাটি
নির্মাণের ও তথ্য সংগ্রহের জন্য পরিচালক আক্ষরিক অর্থেই ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতীয়
উপমহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মরিচঝাঁপি থেকে দণ্ডকারণ্য কিংবা আখাউড়া
থেকে করিমগঞ্জ কোথায় না গিয়েছেন ! আলাপ
করেছেন অসংখ্য মানুষের
সাথে, বক্তব্য শুনেছেন ও
গ্রহণ করেছেন দেশ বিভাজনের সাক্ষী ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের। দেশভাগ
সংক্রান্ত বিবিধ অতিকথন ও প্রচলিত ‘মিথ’ অতিক্রম করে ঐতিহাসিক সত্যের অনুসন্ধানের
এক নতুন ধারা এবং প্রবণতা তানভীরের কাজের
মধ্যে দিয়ে শুরু হলো বলা যায়। এ এক সুলক্ষণ বটে। ‘সীমান্তরেখা’ চিত্রটি আরেকটি ভিন্ন
কারণেও মূল্যবান। এতে রয়েছে মণিন্দ্র গুপ্ত, নীরেন চক্রবর্তী, দেবেশ রায়, অতীন
বন্দ্যোপাধ্যায়, ঢাকায় থেকে যাওয়া ঋত্বিক ঘটকের বোন প্রতীতি দেবী, শান্তা সেন ও বদরুদ্দিন উমরের মত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার , যাদের
মধ্যে প্রথম তিন জন ইতোমধ্যেই প্রয়াত। তথ্যচিত্রটিতে
দেশভাগের শিকার দুই বাংলার মানুষের ভাষ্যের পাশাপাশি উত্তর প্রজন্মের প্রতিক্রিয়া
ও বুদ্ধিজীবীদের বিশ্লেষণও সন্নিবিষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের ফিল্ম নির্মাতাদের
মধ্যেও দেশভাগের বিষয়টি ইদানীং গুরুত্ব পাচ্ছে।
আকরাম খান ২০১৭ সালে নির্মাণ করেছেন ‘খাঁচা’ ছবিটি। বিখ্যাত সাহিত্যিক হাসান
আজিজুল হকের ছোটগল্প অবলম্বনে ফিল্মটি নির্মিত। হাসান আজিজুল হক জন্মেছিলেন এপার
বাংলায়, দেশভাগের ফলে তাঁদের পরিবারও
পূর্বপাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হয়। গল্পের কাহিনিও পূর্ব-বঙ্গের এক ব্রাহ্মণ
পরিবারের পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলমান পরিবারের সঙ্গে বাড়ি-জমিজমা বিনিময় করে চলে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। অভিনয়ে জয়া আহসান
ও অন্যান্যরা।
ভারতীয় উপমহাদেশে নির্মিত দেশভাগ কেন্দ্রিক
সিনেমা সম্পর্কে এক অসম্পূর্ণ আভাস হয়ত দেওয়া
গেল এতক্ষণের আলোচনায়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ
– এই তিনটি দেশের সিনেমা প্রয়াসের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সাধ্যানুসারে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দুটুকরো হয় ’৪৭ এর দেশভাগের
ফলে , জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের। বাংলা ও পাঞ্জাব, এই দুটি প্রদেশও বিভক্ত হয়। তার
চব্বিশ বছর পর ধর্ম-নিরপেক্ষ ভাবে পূর্বপাকিস্তানের বাঙালির ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণ। বাঙালির ভাষিক ঐক্য
প্রথমবারের মত ইতিহাস সৃষ্টি করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। সে ইতিহাস সবার
জানা। তবু এর উল্লেখ এখানে করার অন্য এক কারণ ও তাৎপর্য রয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ফলে উদ্বাস্তু হওয়া
মানুষের প্রসঙ্গ আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু পাকিস্তান-বাংলাদেশ বিভাজনের ফলেও
বিপন্ন হয়েছেন বহু মানুষ, যেমন বিহারি মুসলমান সম্প্রদায়ের বহু মানুষ যারা ’৪৭এ (পূর্ব)
পাকিস্তানে চলে গিয়ে বসবাস করছিলেন, ’৭১এ বাংলাদেশ জন্মের পর তারাই ধর্মীয় সংখ্যাগুরু
থেকে ভাষিক সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে গেলেন, অর্থাৎ
মানসিক ভাবে উদ্বাস্তু হলেন। তেমনি চাকমা, রোহিঙ্গিয়া, গারো ও অন্যান্য বহু জনজাতি
গোষ্ঠীর মানুষ নানা কারণে ভীষণ ভাবে বিপন্ন হয়েছেন, কেউ কেউ বাস্তুহারাও হয়েছেন। এদের
নিয়ে কিন্তু সেভাবে কোনও চলচ্চিত্র
নির্মাণ আজও সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সচেতন অনেক পরিচালক আক্ষেপ ব্যক্তও করেছেন
বিভিন্ন সময়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে
দেশভাগের চলচ্চিত্রায়ন পর্বটি, সে যে ফর্ম্যাটেই হোক না কেন, অসম্পূর্ণ বলা যায়।
তবে বিষয়টি যেভাবে গুরুত্ব লাভ করেছে আলোচিত ফিল্ম নির্মাতাদের ঐকান্তিক
প্রচেষ্টায় তাতে নতুন প্রজন্মের সিনেমা পরিচালকদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ ধারাটিকে
সম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন সে আশা হয়ত দুরাশা নয়। আর সেদিন দেশভাগের ও
উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণার ঐতিহাসিক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ত্রিধা বিভক্ত উপমহাদেশের
ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তবা ঐক্যের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে প্রয়াসী হবে। কেননা, ‘সীমান্ত
আখ্যান’ চলচ্চিত্রের পরিচালক সৌমিত্র দস্তিদারের কথায় – ‘সীমান্ত আসলে আমাদের মনে, মনের মধ্যেকার
বিদ্বেষে। তার থেকে বের হতে না পারলে, সামনের দিকে তাকাতে না
পারলে আধুনিক ভারতের মুক্তি নেই।’
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন