অস্তিত্বের সঙ্কট ও উত্তরপূর্বের বাঙালিবাঙালি ও সমস্যা যেন হরিহর আত্মা। একে অন্যকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। না, স্বজাতির নিন্দা-মন্দ করার লক্ষ্যে এ মন্তব্য নয়। এটা এক বাস্তবতা। এই প্রাথমিক স্বীকৃতি ব্যতীত সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সুলুক সন্ধানে উৎসাহী হওয়া বস্তুত হাস্যকর প্রচেষ্টা মাত্র। উত্তর-পূর্বের বাঙালির অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গিন। বাঙালির নিজের দোষে এ অবস্থা তা নয়। আবার দোষ যে নেই একদম তাও নয়, বলাই বাহুল্য। এর মূলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক সব কটি কারণ বর্তমান রয়েছে। স্বভাবত, এর দরুণ অবস্থা ক্রমে জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে, হয়ে চলেছে। বিপন্নতার ক্ষেত্র ও পরিধি প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে, উত্তর-পূর্বেই যে সীমিত থাকছে না সেও বাস্তব সত্য। সমস্যা এখন সঙ্কটের চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। সঙ্কটের স্বরূপ, তার পেছনের কারণ সমূহ বহুমাত্রিক। তার বিশদ বিশ্লেষণ সময় সাপেক্ষ নয় কেবল, মেধা ও মননের দাবিও রাখে। বর্তমান নিবন্ধকার তদ্রূপ মেধার অধিকারী নন কোনও ভাবেই। তথাপিও বিষয়টি নিয়ে মত প্রকাশে এগিয়ে আসার কারণ কেবল এই যে, উত্তরপূর্বের বাঙালি হিসেবে এ তারও অস্তিত্বের সঙ্কট। ফলে নিস্পৃহ থাকা অসম্ভবপ্রায়। অতএব, বাঙালি হিসেবে নিজস্ব ভয়-ভীতি, আশা-আশঙ্কা ব্যক্ত করার অধিকার এবং দায় দুটোই রয়েছে। আশা করি এই প্রারম্ভিক কৈফিয়ত বাহুল্য বিবেচনায় অগ্রাহ্য হবে না।
বাঙালি জাতিসত্তার প্রকৃত
স্বরূপ কী সেটাই সর্বাগ্রে স্থিরীকৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাঙালি কি একটি জাতি? যদি হয় তো কীসের ভিত্তিতে? যে কোন জাতির
এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে যার ভিত্তিতে ঐক্য ও সমভাবাপন্ন মানসিকতা তৈরি হয়।
ভৌগোলিক ভাবে বাঙালির যে আজ আর কোন অখণ্ড সত্তা বিরাজমান নয় সেকথা সকলেই নিশ্চয় স্বীকার করবেন। এক কালে
হয়ত বা ছিল, আজ আর নেই। জাতির গরিমা নিয়ে বাঙালি যতই বড়াই করুক না কেন ছাতির মাপ
ছাব্বিশ পেরোবে না কিছুতেই, ছাপ্পান্ন তো বহুদূর। দেশভাগ সংক্রান্ত কাঁদুনি সত্ত্বেও
একথা হলফ করেই বলা যায় যে ভারতবর্ষের বাঙালি আর বাংলাদেশের বাঙালি ভাবে-ভাবনায়
চিন্তা-চেতনায় মনে-মননে কোনও অর্থেই ‘এক জাতি’ নয় আর, মুখের এবং শিল্প- সাহিত্যচর্চার ভাষা একই ‘বাংলা’ হওয়া সত্ত্বেও!
এই বাস্তবতা আজ আর অস্বীকারের উপায় নেই। এ শুধু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার ফল নয়,
মানসিক বিচ্ছেদেরও পরিণাম। ‘দেশভাগ’ কেন্দ্রিক আবেগের তাড়নায় ইংরেজ সাহেবদের খলনায়ক
বানিয়ে যতই নিষ্কলুষ সাজার চেষ্টা করি না কেন ভৌগোলিক বিভাজনের মূলে মানসিক বিচ্ছিন্নতার ভূমিকা ছিল কি না কিংবা
কতটা ছিল তা নিয়ে ভাবার স্থল এবং প্রয়োজন দুটোই রয়েছে। রয়েছে নয় শুধু, জরুরিও হয়ে
পড়েছে। বাইরের দৃশ্যমান কাঁটাতারের খোঁচা সইতে পারিনা, রক্ত ঝরাই অঝোরে। অথচ অন্দরে অদৃশ্য
অজস্র কাঁটাতার, আমাদের নজরে আসে না! কিংবা আসে হয়তবা, চোখ ঠেরে উপেক্ষা করি অভ্যাসবশেই।
ধরা যাক ভারতবর্ষের কথাই। ভাষা ভিত্তিক রাজ্য
গঠনের নিরিখে বাঙালি মানে বাংলার (পশ্চিমবঙ্গের) অধিবাসী। এর বাইরে
আসামে-ত্রিপুরায়-বিহারে-ঝাড়খণ্ডে তথা অন্যত্র যে বাঙালির অধিষ্ঠান, ভাষার মিলটুকু বাদ
দিলে তাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির আক্ষরিক অর্থেই কি সংযোগ রয়েছে কোন? না,
নেই। অত্যুৎসাহী দু’একজন শিল্প-সাহিত্যচর্চার টুকরো সংবাদ হয়ত বা রাখেন, একটু আধটু
সংযোগও কখনোবা, তবে সেখানেও ধরন ও হাবভাবে সম্পর্কটা মূলত কেন্দ্র ও প্রান্তের।
একাত্ববোধের বদলে অপরতা অধিক দ্রষ্টব্য, এবং দর্শনীয়ও। সারা বিশ্বে বাঙালির গৃহ
ছড়িয়ে আছে, আর স্ব-গৃহে বাঙালি পরবাসী - এরকম বাক্য বিন্যাসের পেছনে নিজেকে জাহির করার
আবেগসর্বস্ব উৎসাহ যতখানি, এর কারণ অনুসন্ধানে যুক্তির নিরিখে বিচার-বিশ্লেষণের
সচেতন ভাবনা ও প্রয়াস ঠিক ততখানি অনুপস্থিত। বাঙালির এজাতীয় ঘোষণা আছে, কিন্তু
জাতীয় ভূমিকা নেই। ‘বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি’ নয় কেবল, আত্মবিভাজিত জাতিও! বলা
বাহুল্য, সে বিভাজন বড়ই মর্মান্তিক, প্রাণঘাতী। যে কোন জাতির অভ্যন্তরে সামাজিক
বিভাজন বিভিন্ন স্তরে ও মাত্রায় স্বভাবত বর্তমান ও অন্তর্লীন থাকে। তা সত্ত্বেও সব
রকমের ভেদ ছাপিয়ে একটি সাধারণ লক্ষ্যের নিরিখে জাতীয় সত্তা বিকশিত হয়ে থেকে।
অন্তর্লীন বিভাজন সমূহ যাতে সাধারণ লক্ষ্যের অন্তরায় হিসেবে দেখা না দেয় সেদিকে জাতির তীক্ষ্ণ নজরদারি থাকে।
তদুপরি বিভাজিত কোনও অংশের সামাজিক অবস্থান যদি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে ওঠে
তাহলে উক্ত অংশ তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়। তেমন ভূমিকা শুধু নিন্দনীয় নয়,
জাতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষমার অযোগ্য বিবেচিত হয়।
যে মৌলিক বস্তুটির উপর
বাঙালির ‘বাঙালিত্ব’ নির্ভরশীল সেটি হচ্ছে ভাষা। বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতেই জাতিসত্তা গড়ে ওঠা ছিল স্বাভাবিক।
ভাষিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবেই
ভাষিক ঐক্য সাব্যস্ত হতে পারে, হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ভাষার উপর
ভিত্তি করে বাঙালির নিরঙ্কুশ বাঙালিত্ব তথা ভাষিক ঐক্য বস্তুত গড়ে ওঠে নি।
অভ্যন্তরীণ বিবিধ বিভাজন যে এর জন্য বহুলাংশে দায়ী সেকথা অস্বীকারের উপায় আজ আর
নেই। বৃহত্তর ক্ষেত্রে বাঙালি তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার সুরাহা করতে পারেনি বলেই অন্তর্লীন বিভাজন হালে
এমন এক চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিপন্নতা ভাষা-সংস্কৃতির বেড়া
ডিঙিয়ে প্রায় শারীরিক হয়ে পড়েছে। একই ভাষিক গোষ্ঠী যখন ভাষিক ঐক্য গড়ে তোলার
ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় তখন বুঝতে হবে যে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বস্তুগত ভিত্তি বর্তমান। শুধু তাই নয় অনুকুল
পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে বিভাজক চিন্তা-চর্চা মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের জায়গায় পৌঁছে
যেতেও পারে। আবার উল্টো ভাবে বিভাজনের মনস্তত্ত্ব বস্তুগত বিভাজন সম্ভবপর করে
তুলতেও সক্ষম। বিভাজনের উভয় প্রক্রিয়াই বাংলাভাষী গোষ্ঠী ও সমাজে ক্রিয়াশীল। বঙ্গভঙ্গ
থেকে শুরু করে দেশভাগ পর্যন্ত বিদেশি শাসকদের মদতে এই বিভাজন প্রক্রিয়া বারংবার
সম্ভাব্য ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথটিকে দুর্গম
করে তুলেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের
মাধ্যমে যে ঐক্য স্থাপিত ও স্থায়ী হতে পারত দেশ বিভাজনের কূটনৈতিক চাল সে সম্ভাবনার কফিনে শেষ
পেরেক ঠুকে দিয়ে গেছে। এসব বহুবার বহুভাবে বহু আলোচিত, অতএব এ নিয়ে অযথা
বাগবিস্তারের প্রয়োজন দেখি না। ’৪৭ পরবর্তী অধ্যায়ে ইতর বিশেষ তেমন কিছু ঘটল না,
বরং অবস্থা ক্রমে জটিল থেকে জটিলতর হল।
এবারে আসা যাক উত্তর
পূর্বাঞ্চলের বাঙালির প্রসঙ্গে। ‘বরাক উপত্যকা’ অভিধাটির মত ‘উত্তরপূর্বের বাঙালি’ অভিধাটিও হালের আমদানি। লক্ষণীয় যে, এই
পরিচয়জ্ঞাপক অভিধাটি স্থানিক পৃথকীকরণের দ্যোতক।
অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের অথবা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের বাঙালি থেকে এরা আলাদা।
আলাদা কেন? আলাদা, কারণ ‘ভাষায় এক’ হলেও ‘ভালবাসায় এক’ নয়। তাছাড়া ভাষাটাও এখানে
সাদামাটা ‘বাংলা’ নয়, বরং ‘বিপন্ন’ বাংলা। জাতিসত্তার পরিচয় যে-ভাষা নির্ভর সেই
ভাষা যদি বিপন্ন হয় তো জাতিও বিপন্ন হয়। অবশ্য ভাষিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে
রাখার সচেতন বোধ যদি থাকে তবেই ভাষা ও জাতির বিপন্নতা সমার্থক, নতুবা নয়। একথা
অনস্বীকার্য যে উত্তরপূর্বের বাঙালি অভিধাটির মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে অন্তত দুটি জরুরি স্বীকৃতি রয়েছে। এক, এর
মাধ্যমে ‘আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য’, অস্তিত্বের সঙ্কটও যার অন্তর্ভুক্ত, সন্দেহাতীত
রূপে স্বীকৃত। আর, দুই-খুব আবছা ভাবে হলেও (সঙ্কট মোচনের জন্য) বাঙালির ‘আঞ্চলিক’
ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অন্তত পরোক্ষ স্বীকৃতি লাভ করেছে। যেহেতু অভিধাটি স্থানিক
কিংবা আঞ্চলিক কাজেই এতদঞ্চলের বাঙালি সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার।
উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি
রাজ্যে - অসম, মেঘালয়, অরুণাচল, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যাণ্ড ও ত্রিপুরা – বিপুল
সংখ্যক বাঙালি বা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ছড়িয়ে আছেন। এদের ওপর অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক
নিপীড়ণ প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অনন্যোপায় এই
বাংলাভাষীরা সদা সতর্ক ও সন্ত্রস্ত থাকেন যে কোন ছলছুতোয় আক্রমণের আশঙ্কায়। বলা
নিষ্প্রয়োজন, যাবতীয় নিপীড়ণের উৎসমূলে
রয়েছে ভাষিক পরিচয়। অসম ও ত্রিপুরাকে বাদ দিলে বাকি পাঁচটি প্রদেশের অভিবাসী
বাঙালির কিন্তু ভাষা-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক কোন সঙ্কট নেই। বস্তুত ভাষা-সংস্কৃতি
রক্ষা কিংবা চর্চার সচেতন অবকাশ কিংবা পরিসর দুই-ই সেখানে অনুপস্থিত। এদের সঙ্কট
মূলত অস্তিত্বের - জীবন এবং জীবিকার। এক
কথায় এদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার বিবিধ লাঞ্ছনায় খণ্ডিত ও খর্বিত। আর সে
সঙ্কটের একমাত্র কারণ ভাষা। অর্থাৎ, ভাষার সঙ্কট নয়, ভাষিক সঙ্কট বর্তমান। এসব অঞ্চলে শ্রমজীবী
শ্রেণীর মানুষজনের প্রব্রজন ঘটেছে বিভিন্ন
সময়ে, স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনোত্তর কালে। দেশভাগ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের
অব্যবহিত পরে হয়ত অধিক মাত্রায় ঘটেছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃহদংশের আগমন প্রধানত
ইংরেজ প্রশাসনের ‘ছোট শরিক’ হিসেবে। মূলত এদের আগমন ঘটেছিল অবিভক্ত অসমে, এবং
সেখান থেকেই পরবর্তী কালে পার্শ্ববর্তী
অঞ্চল সমূহে। আরেক শ্রেণীর মানুষ আছেন যাদের প্রায় ধরে-বেঁধে ‘আমন্ত্রণ’ করে নিয়ে আসা হয়েছে অনাবাদী-জমি আবাদ করার কুশল
কারিগর হিসেবে। নিম্ন অসম সহ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চর অঞ্চলেই এদের বসবাস এবং এদের
গরিষ্ঠাংশ ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। চূড়ান্ত নিপীড়ণের এরাই সবথেকে বড় শিকার। ‘বিশুদ্ধ
বাংলায়’ সফট্ টার্গেট!
নিপীড়ণের মাত্রা অসমেই
সর্বাধিক, এবং সর্বাত্মক। ধারাবাহিক তো বটেই। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে কেটে অসমের সঙ্গে সিলেটের সংযুক্তি, দেশভাগ,
সিলেট-বিভাজন কিংবা গোয়ালপাড়ার অসমীয়াকরণ ইত্যাদি প্রসঙ্গের অবতারণা আপাতত
অনাবশ্যক। যেহেতু সে ইতিহাস বহু আলোচিত ও সচেতন বাঙালি মাত্রেরই সুবিদিত। বলার কথা
শুধু এটাই যে মানচিত্রের এই আমূল পরিবর্তন বাঙালির ইচ্ছা নিরপেক্ষ নয় কেবল,
দেশি-বিদেশি উভয় শাসক সম্প্রদায়ের লাভালাভ সংক্রান্ত অঙ্কের খাতিরে বাঙালির
স্বার্থের প্রতিকূলে সম্পন্ন হয়েছে। লক্ষণীয় যে, জুড়ে দেওয়াটা যেমন স্বার্থ
প্রণোদিত ছিল, অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদের ‘বিদেশী
(বঙাল) খেদা’ও অনুরূপ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ‘কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরোলেই পাঁজি’! রাজনৈতিক দ্বিচারিতা আর কাকে বলে! অসমে
উগ্রজাতীয়তাবাদীরা ’৪৭ পরবর্তী সময়ে যে বাঙালি-বিদ্বেষের চাষাবাদ আরম্ভ করেছিল,
যার চরম পর্যায় আশির দশকের তথাকথিত ‘বিদেশি বিতাড়ন’ আন্দোলন, তার ফসল
উত্তরপূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যেও রপ্তানি করতে তারা সক্ষম হয়েছে। আর একুশ শতকের
দ্বিতীয় দশকে এসে এই বিদ্বেষের এক ‘রাষ্ট্রীয় চেহারা’ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ‘নাগরিক
পঞ্জি নবীকরণ’ থেকে শুরু করে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধেয়ক’ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে যে
পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে বাঙালি তথা বাংলাভাষীর সঙ্কট কেবল গভীর হয়নি, ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর
হয়েছে, হয়ে চলেছে। প্রদেশের গণ্ডী টপকে গোটা দেশ জুড়েই আজ বাঙালির অস্তিত্ব প্রশ্নের
সম্মুখীন। ধাপে ধাপে, পর্যায়ক্রমে ‘ডি-ভোটার’, ‘ফরেনার্স ট্রাইবুন্যাল’, ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’
স্তরের রিহার্সাল শেষে পাকাপোক্ত ভাবে ‘নাগরিকত্ব হরণের’ মাধ্যমে যবনিকাপাতের
দ্রুত প্রয়াস চলছে।
উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্য
গুলির মধ্যে ত্রিপুরার বাঙালিদের অবস্থাই তুলনামূলক ভাবে ভালো বলা যায়। ভৌগোলিক অবস্থান ও বাংলাভাষীর সংখ্যাধিক্য এক
উল্লেখযোগ্য কারণ নিশ্চয়। কিন্তু সেটাই সব নয়। সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অর্থনীতির
ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও অবদান, যার দরুণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় জনজাতি
সমূহের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত একসময় চরম রূপ পেলেও ‘বামপন্থী’ শাসনের দীর্ঘ সময়সীমায়
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার হার বৃদ্ধির মত
সামাজিক অগ্রগতির প্রশংসনীয় দিক গুলোকেও অস্বীকারের উপায় নেই। ফলে, উত্তরপূর্বে
একমাত্র ত্রিপুরাতেই সঠিক এবং সীমিত অর্থে বাঙালি জাতিসত্তা একটি অবয়ব অর্জন
করেছে। ভাষা-সংস্কৃতিগত কোন সঙ্কট সেখানে আপাতত নেই। অর্থনীতির অংশীদারিত্ব ত্রিপুরায়
নিজস্ব বৌদ্ধিক সমাজ গঠনে সহায়ক হয়েছে যার ফলে ভাষিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার
সচেতন প্রচেষ্টা জারি আছে। কিন্তু এই বৌদ্ধিক সমাজের চেতনাও ভৌগোলিক সীমায়
সীমাবদ্ধ। ‘নিজস্ব নিরাপদ ভুবনে’ ত্রিপুরার বাঙালি আত্মতৃপ্ত, নতুবা গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলের বাঙালির সমস্যা নিরসনে
ইতিবাচক বৌদ্ধিক ভূমিকা নিতে পারত। অবশ্য এই নিরাপত্তার বোধ যে নিরঙ্কুশ নয় তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। লক্ষণীয়
যে, অসমীয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীরা ‘বাংলাদেশির
প্রকোপে অসমীয়া জাতির সঙ্কট’ সংক্রান্ত মিথ তৈরির ‘জাতীয়’ প্রকল্পে সর্বদা ত্রিপুরার
‘দৃষ্টান্ত’ হাজির করে ও যাবতীয় অ-গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া ও কার্যকলাপকে বৈধতা
দেবার অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। অসমীয়াভাষীর
আধিপত্যবাদের ফলে অসমের বিভাজনের ইতিহাস শিকেয় তোলা থাকে!
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে
প্রায় সমগোত্রীয় বাংলাভাষী অঞ্চল হচ্ছে বরাক উপত্যকা। তফাৎ কেবল এই যে এখানে
বাঙালির হাতের মুঠোয় রাজনৈতিক ক্ষমতা সেভাবে নেই। গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ বাংলাভাষী
বলে এ উপত্যকায় ভাষা-সংস্কৃতিগত সঙ্কট দেখা দেবার সঙ্গত কারণও নেই। কিন্তু সঙ্কট
যে বর্তমান সে তো সবার জানা। একষট্টির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সে সাক্ষ্যই বহন করে
চলেছে। কাছাড় যে ‘অসমের ক্যান্সার’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে তার মূলে রয়েছে
বাংলাভাষীর নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা। আর সে কারণেই অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেবার
রাজনৈতিক হাতিয়ার বারংবার ব্যবহৃত হয়েছে। উত্তরপূর্বের বাঙালির সঙ্কট মোচনে বরাক
উপত্যকার বাঙালিও সদর্থক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি, মূলত বৌদ্ধিক
বিভ্রান্তির দরুণ। গোটা বিষয়টিকে আগাগোড়া অর্থনীতি বহির্ভূত ‘ভাষা-সংস্কৃতির
সমস্যা’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা যে কেবল উপরিসৌধের নয়, বরং তার শেকড় যে
বহু গভীরে বিস্তৃত ‘নাগরিকপঞ্জী নবীকরণ’ কেন্দ্রিক আত্মহত্যার ঘটনাগুলো চোখে আঙুল
দিয়ে তা চাক্ষুষ করিয়েছে। এই বিভ্রান্তির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে বরাক উপত্যকার
বিশিষ্ট সমাজতত্ত্ববিদদের অনেকেই ইতিহাস ও ভূগোলের বিপর্যয় এবং ‘উপত্যকা বহির্ভূত
রাজনীতি’কে মূলত দায়ী করেছেন। তা সর্বাংশে অসত্য নয় হয়তবা, তবে সম্পূর্ণ সত্যও নিশ্চয় নয়। উপত্যকার
ও উপত্যকা-কেন্দ্রিক রাজনীতিও যে সম পরিমাণে দায়ী সেকথাও স্বীকার করার সময় হয়েছে।
বিদেশী শাসকরা শাসন ও
শোষণের স্বার্থে ভাষা-সংস্কৃতি নিরপেক্ষ ভাবে মানচিত্রের বদল ঘটিয়েছে সেটা নাহয়
বোধগম্য, কিন্তু দেশীয় শাসকবর্গ যে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারত তা না করার
কারণ বোঝা দায়। স্বাধীনোত্তর সময়ে উপত্যকার অর্থনৈতিক গতিবেগ ত্বরান্বিত হতে পারে
তেমন কোন পরিকল্পনা গৃহীত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিক্ষোভ তো দূরের বিষয় সামান্য
প্রশ্নচিহ্নও দেখা দেয়নি। যদিও রাজ্য এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের শাসক গোষ্ঠীতে
উপত্যকার প্রতিনিধিত্ব নেহাত দুর্বল ছিল বলা যায় না। রাজনীতির অঙ্গনে দিসপুর-দিল্লির
লেজুড় বৃত্তিই ছিল মুখ্য ও মোক্ষম। ব্রিটিশ আমলের চা-শিল্পকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক গতি এল না, স্থানীয় পুঁজিও গড়ে উঠল না। ফলে অর্থনীতি
নির্ভর নয়া সমাজও গড়ে উঠল না। পুঁজির হাত ধরে নগর পত্তন ও আধুনিক নাগরিক তৈরি হতে
পারল না। নাগরিক মননের পরিবর্তে প্রাক-পুঁজিবাদী আধা-সামন্ততান্ত্রিক এক সমাজ বহাল
রইল। দেশভাগ, মূলত সিলেট বিভাজনের ফলে পুর্ব-পাকিস্তান থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের
যে অংশ উপত্যকায় এসে খুঁটি পুঁতলেন তার ফলে সামাজিক সম্পর্ক প্রভাবিত হল ও এক ধরনের ‘উদ্বাস্তু মানসিকতা’র জন্ম হল। যারা
এলেন, শিক্ষা-দীক্ষায় তুলনামূলক ভাবে অগ্রবর্তী হওয়ার সুবাদে সামাজিক-সাংস্কৃতিক
ক্ষেত্রে ক্রমশ প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারেও সক্ষম হলেন। এই নবাগত শ্রেণীটি ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ কোলে লালিত পালিত। এরা ‘দেশের
বাড়ির নকল’ তৈরিতেই অধিক আগ্রহী ছিলেন, ‘হারানো স্বদেশের স্মৃতি’ ছাড়া অন্যতর
সম্বল তাদের ছিল না। স্মৃতির জাবর কাটতে কাটতে তাই বিবিধ মিথ সৃষ্টি করলেন। ডিমাছা রাজ্যের অন্তর্গত কাছাড়
জেলার সমতল অংশ (পরবর্তীতে দ্বিখণ্ডিত কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলা) ও সিলেটের অংশ বিশেষের - করিমগঞ্জ মহকুমার
- সংযুক্তি এ অঞ্চলে স্থানীয়-অস্থানীয়, সিলেটি-কাছাড়ি বিভাজনও আমদানি করল। যদিও
তার সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা প্রায় অবান্তর হয়ে
পড়েছিল, কিন্তু হালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধেয়ক’ কেন্দ্রিক বিভাজনে সেও
আবার উঁকি-ঝুঁকি দিতে শুরু করেছে।
বরাক উপত্যকায় স্বাধীনতার
আগে-পরে যারাই এসেছেন তাদের প্রায় সকলেই এসেছেন অবিভক্ত ও বিভাজিত সিলেট জেলা থেকে। এবং অগ্রবর্তী অংশটি
হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। অবিভক্ত কাছাড় জেলা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ আওতায় ছিল না।
ফলে জমি-জমার অধিকার সংক্রান্ত যে খোলামেলা ব্যবস্থা ছিল, এই শ্রেণীর আগমনে নিম্ন
বর্গীয় বাঙালি – হিন্দু-মুসলমান উভয় পক্ষই শঙ্কিত হলেন। নবাগত বাঙালি বর্ণহিন্দু
শ্রেণীর সঙ্গে অনিবার্য স্বার্থের সংঘাত দেখা
দিল। এই নবাগতরা জমি-জমা কিনে, ব্যবসা-বাণিজ্য সহ বিভিন্ন অর্থকরী পেশায় নিযুক্ত
হয়ে ক্রমে ‘থিতু’ হয়ে ধীরে-ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হলেন। শহর ও শহর-সংলগ্ন
অঞ্চল হল এদের মূল ঠিকানা। প্রয়াত সুজিৎ
চৌধুরী ‘বরাক উপত্যকার বাঙালিঃ অস্তিত্ব ও অবয়বের সঙ্কট’ নিবন্ধে একটি প্রণিধানযোগ্য
তথ্য দিয়েছেন যার উদ্ধৃতি বর্তমান নিবন্ধের প্রতিপাদ্য অনুধাবনে সহায়ক হবে বলে
উল্লেখ করছি -‘দেশভাগ করিমগঞ্জের সামাজিক ক্ষেত্রে নতুন কিছু মাত্রা যোগ করে, শহর
থেকে মুসলমান নাগরিকরা প্রায় সকলে চলে যান, ফলে শহর হয়ে পড়ে পুরোটাই হিন্দু’। বরাক
উপত্যকায় অতঃপর শহর-গ্রাম বিভাজনে এক অতিরিক্ত মাত্রা সংযোজিত হল। শহর এবং গ্রাম
হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত হয়ে পড়ল। করিমগঞ্জ সিলেটের অংশ ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের
আওতাধীন ছিল বলে সামন্ততান্ত্রিক আনুগত্য প্রায় নিরঙ্কুশ ছিল। সেখানেই যখন এমন
ঘটতে পেরেছে তাহলে বাকি অংশের, অর্থাৎ সমতল কাছাড় এবং বর্তমান হাইলাকান্দির দশা কী
হতে পারে সহজেই অনুমেয়! ত্রিশের দশকের রাজনীতির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এক্ষেত্রে
অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছে। চল্লিশের দশকের কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ফলে সাম্প্রদায়িক
রাজনীতি সাময়িক ভাবে প্রশমিত হলেও ছেচল্লিশে তার প্রবল পুনরাবির্ভাব ঘটে।
এই বিভাজনের কারণেই
একষট্টির ভাষা-আন্দোলন বাস্তবে কোন নতুন চেতনার জন্ম দিল না। বাস্তবে ভাষিক ঐক্যও
গড়ে উঠল না। ধর্ম বাগড়া দিল, জল ও পানির মধ্যে জলচল থমকে গেল। ‘দেশভাগের শিকার’
মার্কা ‘উদ্বাস্তু মনস্তত্ত্ব’ পর্যাপ্ত ইন্ধন জুগাল। বাহাত্তর ও ছিয়াশির আন্দোলন-পরবর্তী
নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে বিষয়টা
স্পষ্ট হবে। আধা-সামন্ততান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা অন্য এক বিভাজনকে স্পষ্ট করল।
গ্রামাঞ্চলে নিম্নবর্গের বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েই বর্ণহিন্দুর বিপরীত মেরুর অবস্থানে
সরে গেল। এই সমীকরণ এখনো নির্বাচনের
প্রাক্কালে প্রায়শ দ্রষ্টব্য হয়ে পড়ে। বর্ণহিন্দুর সাংস্কৃতিক আধিপত্য সে কারণেই
‘হেজিমনি’ প্রতিষ্ঠায় অপারগ হল। ভাষা ভিত্তিক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠার প্রধান ও অন্যতম
শর্তই হচ্ছে বুদ্ধিজীবীর হেজিমনি সাব্যস্ত হওয়া, বরাক উপত্যকায় যা হয়ে ওঠেনি।
ভাষিক ঐক্যের পটভূমি তৈরি হতে পারেনি, বরং সামন্ততান্ত্রিক ধর্মীয় বিভাজন ক্রমে পর্যাপ্ত
সার-পানি পেয়ে জাঁকিয়ে বসেছে যার চূড়ান্ত স্বরূপ
বর্তমানে প্রত্যক্ষ গোচর হচ্ছে। বলা অহেতুক, অসম তথা গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
বাঙালি মনস্তত্ত্ব বরাক উপত্যকার সমাজ মানসের বর্ধিত কিংবা সম্প্রসারিত রূপ বৈ
ভিন্ন কিছু নয়। জাতিসত্তার বিকাশে ধর্ম যে উপযুক্ত ও কার্যকরী নয় আদৌ, বাংলাদেশের জন্মের
ইতিহাস তার উজ্জ্বল এবং সাম্প্রতীক উদাহরণ। তা সত্ত্বেও উপমহাদেশের রাজনীতি আজ
ধর্মের ধ্বজাবাহী, আর দুর্ভাগ্যের ঘটনা এটাই যে বাঙালির এক বড় অংশ সে রাজনীতির
অনুসারী এবং অনুগামী।
এই সঙ্কটময় পরিস্থিতির জন্য
বাঙালির কোন বিশেষ বর্গ অথবা শ্রেণীকে একতরফা ভাবে দায়ী করা হয়ত সমীচীন হবে না। বস্তুত
বরাক উপত্যকায় শ্রেণী বিভাজন অসম্পূর্ণ, যার দরুণ সে অর্থে শ্রেণী চেতনাও গড়ে
ওঠেনি। বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম বাদ দিলে বামপন্থার প্রসার ও প্রভাব কার্যত শহরের সীমা
অতিক্রম করে গ্রামকে ছুঁতে পারেনি। কিন্তু অবস্থার গুণগত পরিবর্তন সাধনের কিংবা সমস্যা
নিরসনের প্রশ্নে বৃহত্তর বাঙালির অগ্রবর্তী অংশের ভূমিকা যে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়
সেকথা বলা নিষ্প্রয়োজন। জাতিসত্তার বিকাশে আর্থ-সামাজিক নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তো
ছিলই, কিন্তু জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার প্রশ্নে বৌদ্ধিক ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে
মর্মান্তিক। চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে কোন উদার ও
সমন্বয়বাদী সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে এরা সর্বোতভাবে বিফল হয়। কম-বেশি তারই
মাশুল আজ গুনতে হচ্ছে বিভাজিত বাঙালির উভয় পক্ষকেই। বলা বাহুল্য, দুর্বল পক্ষের উপরই
আঘাতটা হয় চরম এবং চূড়ান্ত। উত্তরপূর্বাঞ্চলের বাঙালির ক্ষেত্রেও তা প্রকট হচ্ছে।
এর বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। আর ভাষার
ভিত্তিতেই কেবল সে ঐক্য স্থাপিত হতে পারে। বিভাজিত বাঙালির পক্ষে কোনও সঙ্কট
মুকাবিলাই যে সম্ভব নয় সে বোধোহয় যত সত্বর ঘটে ততই মঙ্গল। অন্যথায় গৃহের প্রবেশপথ
তস্করকে দেখানোর মত আত্মঘাতী পদক্ষেপে নির্মূল হবে ভবিষ্যত অস্তিত্ব।... গ্রহণ-অগ্রহণের
আশা ও আশঙ্কা বাদ দিয়ে, খুব এলোমেলো ভাবে, সঙ্কটাপন্ন এক জাতির হাফজান্তা সদস্য হিসেবে কিছু বিক্ষিপ্ত
মতামত দেওয়া গেল, যদি পাঠকের চিত্তে সামান্য চিন্তারও উদ্রেক হয় কেবল সেই আশায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন