বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২০

একুশ শতকে একুশের প্রাসঙ্গিকতা

 

 

প্যারিসের জেহান রিক্টাস স্কোয়ারের একটি দেয়ালে মানবিক ঐক্যের প্রতীক স্বরূপ ইউনেস্কোর অন্তর্ভুক্ত ও বহির্ভূত বহু দেশের নিজস্ব ভাষায় ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ কথাটি লেখা রয়েছে । দেয়াল জুড়ে পরস্পর অপরিচিত ও অচেনা অক্ষরমালার এমন সহাবস্থান যেন এই কথাই বলতে চায় যে, ‘তুমি আমার ভাষা বলো আমি আনন্দকে দেখি / আমি তোমার ভাষা বলি তুমি আশ্চর্যকে দেখো’ কিন্তু বাস্তবে  এরকম  ‘আনন্দে-আশ্চর্যে সাক্ষাৎকার’ তো দূর অস্ত , ‘আমি আমার ভাষা বলি তুমি তোমার ভাষা বলো’-গোছের সহনশীলতার পর্যায়েও পৌঁছতে পারেনি সভ্যতার বড়াই করা এ পৃথিবীর মানুষ । না, একুশ শতকের একটা দশক পাড়ি দিয়েও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ পতাকায় পতাকায় ফের মিল আনবে এমন আশা আমাদের পক্ষে আজো দুরাশা বইকি !  

একুশে ফেব্রুয়ারি । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে এই দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । তারপর থেকে সদস্য দেশগুলোয় সরকারি-বেসরকারি , প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান উদ্যোগে নানা ভাবে ‘মাতৃভাষা দিবস’  পালিত হয়ে আসছে । ভারতবর্ষেও হচ্ছে অবশ্যই । তবে তা মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেমিনার , সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল , কিছু সরকারি উদ্যোগ , আর পত্র-পত্রিকার এলোমেলো নিবন্ধাদিতে সীমিত থাকছে । জনসমাজে তার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে । ভাষা-সচেতনতা বলতে যা বোঝায় তা বস্তুত আমাদের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তদের মধ্যেও দুর্লভ । ভাসা-ভাসা ভাষা-প্রেম সম্বল করেই তাই নিয়ম-মাফিক চলে ‘একুশে’র বাৎসরিক উদযাপন । ‘শহিদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ ! না, পারি না ; সারা বছর ভুলে থাকতে পারলেও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটিতে তা পারি না । বাঙালি অতটা আত্মবিস্মৃত জাতি নয় অবশ্যই বরাক উপত্যকার বাঙালির কাছে ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’ মিলেমিশে একাকার । এই পারে ‘উনিশ’, ওই পারে ‘একুশ’ – ভাষা নদীর দুই কূল জুড়ে একই ইতিহাস ।  

            গোটা বিশ্বে কম বেশি ছ’হাজার ভাষা রয়েছে , যার হাজার তিনেক এ শতাব্দির শেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে । বিশেষজ্ঞদের এরকমই অভিমতবিশ্বায়নের জাঁতাকলে অবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে প্রতিনিয়ত । অঞ্চল বিশেষে এই জটিলতার মাত্রা ও পরিধি কেবল ভিন্ন নয় , প্রায় চরমে পৌঁছে গেছে । হাতের কাছের উদাহরণ  আমাদের প্রিয় রাজ্য অসম ।  কিন্তু এরকম এক জটিল পরিস্থিতিতে , যেখানে প্রতিদিন  কোন না কোন ভাষার সলিল সমাধি ঘটছে কিংবা ঘটার উপক্রম হচ্ছে , মাতৃভাষার সুরক্ষা আদৌ সম্ভব কি না সেটাই এক কঠিন জিজ্ঞাসা । এই প্রশ্নচিহ্নের ভূমিতে দাঁড়িয়েই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ প্রাসঙ্গিকতা বিচার্য । মাতৃভাষার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সম্পর্কই বা কি এবং কতটুকু সেটাও বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি । Nobel Laureate Mr. Hallor Laxness-এর মন্তব্য এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য – ‘the world becomes a poorer place whenever an international language swallows up a smaller one, but the international language becomes no richer for doing so...

মাতৃভাষা হচ্ছে চিন্তা-চেতনার আঁতুর ঘর । মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতির সারস্বত বৃত্তটি । মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা তাই সমগোত্রীয় । ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ হরিহর আত্মার । সংস্কৃতির বৈচিত্র আসলে বহুরূপে বিশ্বের অবলোকন , জীবন রহস্যের বহুমাত্রিক প্রতিফলন । সংস্কৃতির সমন্বয়ই হল  বৈশ্বিক উপলব্ধির একমাত্র পথ । এই সমন্বয় যদি কাঙ্ক্ষিত হয় তাহলে ভাষার মৃত্যু প্রতিরোধ করতেই হবে । মাতৃভাষার অধিকার তারাই দাবি করতে পারে প্রতিটি ভাষাকে যারা বৃহত্তর মানব পরিবারের সম্পদ জ্ঞানে সমমর্যাদা দিতে উৎসুক । ভাষাগত বিভেদ কিংবা সংস্কৃতির সংঘাত নিঃসন্দেহে শান্তি ও মৈত্রীর পরিপন্থী । সে কারণেই ১৯৯৯ সালের উল্লিখিত অধিবেশনে Kofi  Annan সময়োচিত মন্তব্য করেছিলেন যে - ‘ the lesson of our age is that languages are not mutually exclusive, but that human beings and humanity itself are enriched by communicating in more than one language .

বহু ভাষা ও বিবিধ সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠা সমাজ (Multilingual multicultural society) ব্যতীত মানব জাতির মুক্তি অসম্ভব । বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির বৈচিত্রকে স্বীকার করে নিয়েই সৃষ্টি হতে পারে বিশ্বমানবের নয়া বিশ্বসংস্কৃতি । এছাড়া বিশ্বশান্তির অন্যতর সম্ভাবনা আপাতত দৃষ্টিগোচর নয় । ‘সিভিল সোসাইটি’ গুলিকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে  আঞ্চলিক বৈশিষ্ট রক্ষা করার সাথে সাথে বিশ্ব-সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে তুলতেও হবে ।  শেকড়ে থাকবে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির সংহতি , আর শাখার বিস্তারে আন্তর্জাতিকতার বোধ ।  বিশ্ব-নাগরিক হয়ে ওঠার এই প্রয়াস ব্যতীত বিশ্বশান্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে । অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক উল্টো । বাচনে ভাষণে যেখানে বিবিধের মাঝে মিলনের এত অসংখ্য অপরূপ বিজ্ঞাপন সেক্ষেত্রে বাস্তবে  বিরোধ কেন ? এক কথায় একেবারে সহজ উত্তর একটা দেওয়া যায় অবশ্যই , এবং সেটা একেবারে ভুল উত্তরও নয় । উত্তরটা হল – বিশ্বায়নের বিশ্বজোড়া বিভেদনীতি । যে কোন জাতির ভাষা-সংস্কৃতি যদি কেড়ে নেওয়া যায় তাহলে সেই জাতিকে পদানত করা নিতান্ত সহজ হয় । সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসাবে  এই পদ্ধতি বারে বারে যে অনুসৃত হয়েছে সে সাক্ষ্য তো ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়ানো । বিশ্বায়নের বাজারকেন্দ্রিক অভিযান তাই সংস্কৃতিহীনতার এক বাতাবরণ তৈরিতে তৎপর । প্রতিটি ভাষাই আজ , এমনকি ইংরেজিও , কোন না কোন ভাবে এই বাজার কর্তৃক আক্রান্ত । পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন ভাষা-সংস্কৃতিকে বেঁচে থাকতে হলে অতি অবশ্যই এই মুনাফা-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে । পরিবর্তে গড়ে তুলতে হবে মানুষ-কেন্দ্রিক এক নয়া বিশ্বায়নের চেতনা । এটা সম্ভব হতে পারে কেবল জাতিগুলির সামূহিক ঐক্যের ভিত্তিতে । আর , বলা বাহুল্য , সেরকমের ঐক্য গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্তই হল পরস্পরের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ।  

কিন্তু বিশ্বায়নের তুখোড় কৌশুলিরা দুনিয়াটাকে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিতে চায় বাজার দখলের স্বার্থে । মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ককে হটিয়ে দিয়ে ওরা চায় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক বহাল করতে  সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের এটাই মূল নীতি । মুশকিল হচ্ছে , আমাদের সমাজের অনেক জ্ঞানী গুণীও এই বিশ্বায়নের পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন , চার দেয়ালের নিরাপদ ঘেরাটোপে বসে বাতানুকুল তত্ত্ব হাজির করছেন । একদিকে বিশ্বজোড়া ক্রমবর্ধমান দারিদ্র , খাদ্য সংকট , আর আরেক দিকে ভোগ-বিলাস ও অন্যায় অপচয় । বিশ্বের বিক্ষুব্ধ মানুষ শোষণ বঞ্চনার দুর্গে ঐক্যবদ্ধ বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে বসে তার জন্যই ভাষা ও ধর্মের নামে দিশাহীন জাতিগোষ্ঠী গুলিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়ার নিকৃষ্ট রাজনীতিকে হাতিয়ার করা হচ্ছে । আর অন্যদিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের নাটকীয় আয়োজনের মাধ্যমে মুনাফাখোর মুখগুলিকে খানিকটা মানবীয় আদল দেবার হাস্যকর প্রয়াস নজরে আসছে ।   

 

            তবে এও ঠিক যে , ভাষা কেন্দ্রিক বিভেদের রাজনীতি চোখে আঙুল দিয়ে এটাও দেখিয়ে দিচ্ছে যে বহুভাষিক ঐক্য ও বিবিধ সংস্কৃতির সমন্বয় বস্তুত সম্ভব । এই সম্ভাবনার উপলব্ধিটাই খুব জরুরি এসময় । ভাষার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্কটাও বুঝতে হবে ।  বুদ্ধদেব বসু বহুদিন আগে এ বিষয়ে সচেতন হতে বলেছিলেন তাঁর একটি নিবন্ধে । আধুনিক সমাজে ভাষাকে কেবলমাত্র মনের ভাব প্রকাশের উপায় বা মাধ্যম রূপে বিবেচনা করাটা যথার্থ বুদ্ধিমানের কাজ নয় । কেননা , জীবনযাপনের বর্ধিষ্ণু জটিলতা ভাষার ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে । মৌলিক ভাবগুলির বিনিময় ভাষার ব্যবহার ব্যতিরেকেও হয়তবা সম্ভব , কিন্তু ‘আমাকে ভোট দিন’ কথাটা বোঝাতে ভাষাটা চাই-ই । এই বাড়তি বোঝা কাঁধে চাপার দরুণ শুরু হল এক নয়া অধ্যায় – অন্যতর প্রয়োজনে ভাষার অ-স্বাভাবিক অ-মানবিক  ব্যবহার । প্রকৃত বিচারে ভাষার সংকটের মূল এখানেইদ্বন্দ্বটা আসলে জনসাধারণের ভাষার জনবিরোধী ব্যবহারের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত রাজনীতির কূট চাল এই দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত করে , যার অনিবার্য ফল অর্থহীন হানাহানি , অযথা রক্তপাত । এর হাত থেকে রেহাই  পেতে হলে আমাদের ব্যাপক অর্থে ‘ভাষায় এক ভালবাসায় এক মানবতায় এক’ হতেই হবে । বিশ্বের সব ভাষার মানুষই যেন আজ নিজস্ব শব্দমালায় ‘occupy wall street’ কথাটা দেয়ালে দেয়ালে লিখে দিতে চায় ।  এই প্রেক্ষাপট মনে রেখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত ও সঙ্কল্প যদি গৃহীত হয় তবেই তা আনুষ্ঠানিক আবেগের মঞ্চ-প্রদর্শনী না হয়ে উপযুক্ত মাত্রা লাভ করতে পারে । নতুবা উনিশের ভূমিতে একুশের চেতনা  একদিন  নূতন ঊষার সংবাদ বয়ে আনবে সে আশা  দুরাশা হয়েই থেকে যাবে!

 

 

        

 

 

 

 

 

 

গল্পের ভুবনে নাগরিকত্ব, এনআরসি এবং…

           (একটি অসম্পূর্ণ পাঠ-প্রতিক্রিয়া)

 

        সমাজ ও সাহিত্যের সম্পর্কটি সুপ্রাচীন নয় কেবল, সুনিবিড়ও। সাহিত্য ছাড়া সমাজের চলতে পারে, কিন্তু সমাজ ছাড়া সাহিত্যের চলে না। প্রাণী জগতে মানুষ শ্রেষ্ঠ, এই কারণে নয় যে সে বুদ্ধিমান ; শ্রেষ্ঠ, কারণ মানুষের সমাজ আছে। সামাজিক সংযোগের জন্য আছে ভাষা। যে ভাষাকে হাতিয়ার করে অগ্রসর সমাজে সৃষ্টি হয় সাহিত্য। মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম যে ভাষা তার মূল উপাদান হচ্ছে শব্দ। শব্দ যদি হয় ব্যক্তিমানুষের অভিব্যক্তি, তবে সাহিত্যকে বলা যেতে পারে সমাজের  অভিব্যক্তি। আর এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্কে অনুঘটক হচ্ছে সময়। কোন বিশেষ সমাজে বিশেষ সময়ে বসবাসকারী মানুষের আচার-আচরণের প্রতিফলন অনিবার্য কারণেই সাহিত্যে ঘটে থাকে। সাহিত্যকে এ কারণে ‘সমাজের দর্পণ’ আখ্যা দেওয়া হলেও বিষয়টা ক্যামেরায় ছবি তোলার মত সরল ব্যাপার নয়। লেখক যেহেতু এক সজীব সংবেদনশীল সত্তার অধিকারী তাই বাস্তবের নেহাত প্রতিবিম্বায়ন বস্তুত অবান্তর, অভীষ্ট তো নয়ই। এই প্রতিবিম্বায়ন তাই বিশ্লেষণাত্মক কিংবা সমালোচনামূলক হওয়াই স্বাভাবিক। একে তাই সামাজিক প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করাই সঙ্গত। বলা অহেতুক, এই জটিল প্রক্রিয়ায় স্থান-কাল-পাত্র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা এক হলেও লেখক ভেদে ভাষ্য ভিন্ন হতে বাধ্য। স্থান-কাল একটি সাহিত্য কর্মকে যেমন স্বাতন্ত্র্য দেয়, তেমনি স্থান ও কালের বৃহত্তর পরিধি ও আবহমানতার সঙ্গেও তা কোন-না-কোন ভাবে সংযুক্ত-সংশ্লিষ্ট থাকে। অঞ্চল ভিত্তিক সাহিত্যের আলোচনায় এই কথাটি মনে রাখা বোধ করি জরুরি।  

অসমের বাংলা লেখালেখি নিয়ে কথা বলার সময়েও আমাদের সেটা মনে রাখতে হবে। অসমের জল-হাওয়ায় জারিত বলে যে স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য, যা-ই বলি না কেন, তা কিন্তু বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের পরিধির বিস্তার মাত্র, বিচ্ছিন্নতার অছিলা নয় কোন অর্থেই। ভিন্ন ভুবনে পায়চারি নয়। অসমের সাহিত্যে  বাঙালির অস্তিত্বের সংকট, ভাষিক সম্প্রসারণবাদী রাজনীতি, বিবিধ প্রতারণা ও দাঙ্গার প্রতিবেদন, এমনকি সাম্প্রতীক এন আর সি প্রসঙ্গ ইত্যাদি উঠে আসাটা নিতান্তই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, একথাও কিছু পরিমাণে সত্য যে, প্রথম পর্বের লেখালেখিতে এমনতর চিহ্ন হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে যা থেকে ধারণা হতে পারে যে লেখকের বাসভূমি ও মনোভূমি বুঝি এক নয়, পৃথক। একটা সময় ছিল যখন ‘ব্রীজ’ শব্দের উচ্চারণে একাংশের মনের পর্দায় শরাইঘাটের বদলে হাওড়া ব্রীজের ছবি ভেসে উঠত। হীনমন্যতার সে অধ্যায় আমরা সযত্নে অতিক্রম করে এসেছি, সজ্ঞানে তো বটেই, স্ব-সামর্থ্যেও। আর এই অতিক্রমণের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ চৌহদ্দিতে আমাদের অহঙ্কার এবং অবদান দুই-ই সাব্যস্ত হয়েছে। এই অর্জন বস্তুত অসমে বাঙালির অস্তিত্বের সংগ্রামেরই অঙ্গ, এবং অনুষঙ্গও।

বর্তমানে গোটা অসম জুড়ে বাঙালির যে সংঘাতময় সঙ্গীন অবস্থা, যার করাল ছায়া বর্তমানে রাজ্যের সীমা অতিক্রমণের অপেক্ষায় দিন গুনছে, সেখানে দাঁড়িয়ে যথার্থ সংবাদ পরিবেশনও যদি করতে হয় তো ‘বধ্যভূমি থেকে বলছি’-এই শিরোনাম ছাড়া অন্য কোনো শিরোনামে তা কদাচ সম্ভব নয়। যাদের ত্রিসীমানায় খবরের কাগজওয়ালাদের পা রাখার ঘটনা ঘটার নয়, সেই বুলু শব্দকর - খালু দাস - দুলালচন্দ্র পাল - অর্জুন নমঃশুদ্র’রা যখন রাষ্ট্রীয় বদান্যতায় ডি-ভোটার, ফরেনার্স  ট্রাইব্যুনাল, ডিটেনশান  ক্যাম্পের ঘাট মাড়িয়ে সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার অনিবার্য শিরোনাম হয়ে ওঠেন,  তাদের কারো কারো ‘লাশ’ নিয়ে যখন রচিত হয় প্রশাসনিক কু-নাট্য, তখন মানবতার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটি যে সারা হয় সাড়ম্বরে, তা কি অস্বীকার করা যাবে কোনো ভাবে! সংবেদনশীল কোন মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি? এরকম চরম ও চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিস্থিতিতে স্বভাবতই কি জিজ্ঞাসা উঠে আসে না - ‘কেন? কার স্বার্থে?’  উত্তরবিহীন এইসব প্রশ্নমালা খুবলে খাচ্ছে শরীর, সময়, সবকিছু – মাটি ও মানুষের। এ থেকে গা বাঁচিয়ে চলার সাধ্য কি আছে সাহিত্যের? সম্ভব কি? আত্মহননের অসহায় ঘটনাগুলো কি আত্মমননের প্রতি প্রত্যাহ্বান ছুঁড়ে দিয়ে যায় নি, যাচ্ছে না!

অসমের সাম্প্রতীক লেখালেখিতে, গল্পচর্চায় মূলত, হালের বাস্তবতার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে এবং তার স্বরূপটি কেমন একটু নাহয় ঝালিয়ে দেখা যাক। তবে সর্বাগ্রে একটা কৈফিয়ত পেশ করা বোধ হয় আবশ্যক। কথাটা এই যে, এই জরিপের প্রকল্পটি বস্তুতই অসম্পূর্ণ, এবং এলোমেলোও বটে। ইংরেজিতে random sampling বলে একটা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, গল্প নির্বাচনের  ক্ষেত্রে আমরা সেই এলোমেলো নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতিই বাধ্যত গ্রহণ করেছি। নির্বাচনের মাপকাঠি কোন ভাবেই গল্পের গুণগত মান কিংবা লেখক ভিত্তিক নয়। গুণাগুণ বিচারের সামর্থ্য নিবন্ধকারের বিন্দুমাত্র নেই। হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে এবং স্মৃতি-নির্ভরতা সম্বল করেই এক রকমের পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেশ করার প্রয়াস করা হয়েছে মাত্র। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

 

আশির দশকের আগে পর্যন্ত আঘাতটা ছিল প্রধানত ভাষা সংস্কৃতির ওপর। জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন-টান্দোলন করে রাজ্য সরকারকে চাপ দিয়ে অগণতান্ত্রিক ভাষানীতি চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আশির দশকে এসে ‘বিদেশি খেদা’ আন্দোলনের বকলমে আক্রমণটা সরাসরি ভাষাভাষী মানুষের ওপর শুরু হলো। নাগরিক পঞ্জি নবায়নের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বিষয়টাকে আইনি বৈধতা দেওয়া হলো। রাষ্ট্র চলে এল মূল ভূমিকায়। পার্শ্ব ভূমিকায় আদালত। উৎস কিন্তু বিদেশি খেদা আন্দোলন ও অসম চুক্তি। তো, আশির দশকেই ঝড়ের পূর্বাভাস যে আঁচ করা গেছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়ে গেছে মলয় কান্তি দে-র ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পে। সে গল্প নিয়ে আলোচনা এখানে অনাবশ্যক, কেননা সেটি ইতোমধ্যে মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী ‘আসরাফ আলীর স্বদেশ’ গল্পের সূত্রে একটা গৎ বাঁধা হয়ে গেছে।  তারপর থেকে অসমের গল্পকারদের আসরাফ আলী বুঝি নিরন্তর ‘দিচ্ছে ডাক’! সে ডাকে সাড়াও মিলছে যথেষ্ট, জোরদার সাড়া।

ধরা যাক জ্যোতির্ময় সেনগুপ্তের ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ গল্পটির কথাই। গল্পটি পড়তে গিয়ে একেবারে গোড়াতেই জোর ধাক্কা সামলে এগোতে হয়। বিধু সরকারের দাওয়ায় কারো হঠাৎ আগমণের বার্তা দিতে গিয়ে লেখক যখন লেখেন – ‘কাদা মাখানো একজোড়া পায়ের ছাপ পড়েই গেল’ তখন দুপুরের বিষণ্ণতা বস্তুত অপ্রতিরোধ্য হয়ে দেখা দেয়। ‘পড়েই গেল’ বাক্যাংশের সূত্রে উপায়হীনতার যে বিবৃতি, এবং তার অব্যবহিত পরেই ‘লক্ষ্মী না’!!? এই বিস্ময় জিজ্ঞাসার কোল ঘেঁষে পিসিমার ‘অ্যাঁ তুই !? উচ্চারণ এক নিমেষেই বাঙালি গেরস্থের আজন্ম লালিত আহ্লাদ ‘লক্ষ্মী এলো ঘরে’ মুখ থুবড়ে পড়ে। মায়ের দেওয়া দুগাছা  চুড়ি সম্বল করে কানাইয়ের বাপের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া লক্ষ্মী এত বছরে আর এমুখো হয়নি। তার এই অতর্কিত আবির্ভাবে প্রমাদ গুনে বাপ বিপিন। সিঁথির সিঁদুর আর হাতের নোয়া-শাঁখার অনুপস্থিতি পরখ করে অতঃপর বিপিনের খেদোক্তি – ‘জানতাম, আমি ঠিক জানতাম। এইরকমই কিছু একটা হইব’। না, বিপিন ঠিক জানত না। বিপিনের মত আমরাও জানতাম না স্বামী-হারা সন্তান কোলে বিধবা কন্যার অনন্যোপায় বাপের ভিটেয় উঠে আসার চিরাচরিত বিপন্নতার গল্প এ নয়। আরো এক মারাত্মক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ অপেক্ষা করে থাকে আমাদের তরে! দুবেলা দুমোঠো অন্নের ভরসায় নয়, লক্ষ্মী এসেছে অন্যতর গুপ্তধনের খোঁজে, কপাল জোরে যদি মেলে সেই দুরাশায়।            

শ্বশুর বাড়িতে অভাব অনটনের ঘাটতি ছিল না সত্য, তবে লক্ষ্মীমন্ত স্বামীর ঘরে অতৃপ্তির অসুখছিল না। অকস্মাৎ শমন   জারি হল, শ্বশুরের নাম থাকলেও ভোটার লিস্টে নাম কাটা গেল লক্ষ্মী আর কানাইয়ের বাপের। স্বামীকে টেনে-হেঁচড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে গেল সরকারি পেয়াদা। শ্বশুরকে যখন চিতায় ওঠানো হয় পুলিশ প্রহরায় মুখাগ্নি করার সুযোগ দেবার বদান্যতাটুকু অবশ্য দেখিয়েছে প্রশাসন। লক্ষ্মী তাই এসেছে বাপের বাড়িতে জিয়ন-কাঠির খোঁজে, নাগরিকত্ব প্রমাণের এক টুকরো কাগজও যদি মেলে। একটা গ্রুপ  ফটো ছিল বাড়িতে, যেখানে নেতাজীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন তার না-দেখা ঠাকুর্দাও। কিন্তু তার স্বদেশি হওয়ার প্রমাণ কি হবে তা দিয়ে! লক্ষ্মী জানে না। সর্বস্ব দিয়েও কানাইয়ের বাপকে ছাড়িয়ে আনতে অপারগ লক্ষ্মীর কাহিনি শেষ হয় সব অপমানের হাত থেকে মুক্তি খুঁজে নিতে সিলিং থেকে ঝুলে পড়া কানাইয়ের বাপের লাশ সনাক্ত করার ডাক পেয়ে। বাপ-হারা দু’টি কচি সন্তান নিয়ে লক্ষ্মী এনআরসি-র অ্যানার্কিতে ফেঁসে নিজেকেই যেন শনাক্ত করার পথ খুঁজে পায় না। এই মর্মান্তিক পাঁচালি লেখকের মুন্সীয়ানায় অসমের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর বাঙালি পাঠককেও নিশ্চয় ভারাক্রান্ত করে।  

ধীরাজ চক্রবর্তীর ‘সন্দেহজনক’ গল্পে পাই কাগুজে প্রমাণ খোঁজার আরেক ট্র্যাজিক কাহিনি। বছর পঁয়ত্রিশের মনসুর মিঞার মন্ত্রের জাদুতে কাজ হয় এরকম বিশ্বাস জন্মেছে বরপেটা জেলার হাউলি অঞ্চলের মানুষের। বংশানুক্রমেই সে শিখেছে তুকতাক, মন্ত্র-তন্ত্র। গ্রামের শেষ প্রান্তে প্রবীণ বটগাছটির নিচে হাটবারে সে তার মন্ত্রের ঝাঁপি খুলে বসে। মানুষের নানা সমস্যার চটজলদি সস্তা সমাধান আছে তার কাছে। মন্ত্র পড়া তাবিজ দেয় সে, মাঝে সাঝে জড়ি-বুটির ওষুধও। অথচ এন আর সি-র খাতায়  নাম তোলার রক্ষাকবচ এক টুকরো কাগজের জন্য মরীয়া সে। তার জন্ম পঁচাত্তরে, অথচ কাগজ চাই একাত্তরের পঁচিশ মার্চের আগের। বাপ হাসান আলি পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল যদিও সে অনেক আগে। কিন্তু নিজের নামে এক টুকরো কাগজ বানিয়ে রাখার কথা মনেও আসে নি আপনভোলা মানুষটির। পাগলের মত ছুটোছুটি করে মনসুর। বাপের এক সঙ্গীর কাছে খবরটা পেয়ে কিছুটা আশার আলো যেন দেখতে পায়। বাপ হাসান আলির গণনার ভীষণ সুখ্যাতি ছিল দূর-দুরান্ত পর্যন্ত। কোন বছর কতটা বৃষ্টি হবে, ফসল কেমন হবে, মাটির নিচে জল কোথায় পাওয়া যাবে গুনে সব বলে দিতে পারত অবলীলায়। পানিকাটা গ্রামে তাই ডাক পড়েছিল, আর হাসান আলির নির্দেশ মত কুয়ো খুঁড়ে জলের ভাণ্ডারও পাওয়া গেল। গ্রামের মানুষ হাসানকে দিয়েই কুয়ো উদ্বোধন করিয়ে পাথরে খোদাই করে দিয়েছিল - ‘উদ্বোধক হাসান আলি, কুয়া নির্মাণ ১৯৬০’।  

ওখানে দাঁড়িয়ে বাপের গর্বে মনসুরের ছাতি বুঝি ছাপ্পান্নকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। ফটোগ্রাফার ডেকে লেখাটার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি উঠিয়ে সেই ‘অকাট্য প্রমাণ’ তুলে দিয়েছিল উকিল বাবুর হাতে। কিন্তু উকিল বাবুর তাচ্ছিল্যের হাসি ও মস্করায় রাগে ক্ষোভে ফিরে আসতে হয় মনসুরকে। আন্দোলন ছাড়া অন্য পথ নেই আর। গজেন বর্মণদের শলা-পরামর্শে এনআরসি-র হয়রানির বিরুদ্ধে জেলা শাসকের অফিস ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত হয়। ২১শে জুলাই, ২০১০ সাল ডি-ভোটার সমস্যার সমাধান, এনআরসি  বাতিলের জন্য বিরাট সংখ্যক মানুষের মিছিল শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। তার মধ্যে  ‘হাসান আলির স্বীকৃতি চাই’ শ্লোগান শুনে মনসুরও ‘স্বীকৃতি চাই, স্বীকৃতি চাই’ বলে গলা মেলায় সমান তালে। আচমকা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়, বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিকে ওদিকে দৌড়তে থাকে সবাই, পুলিশের গুলিতে মনসুর সহ চার জনের মৃত্যু হয়। নিয়ম মাফিক ন্যায়িক তদন্ত ঘোষিত হয়, কিছুদিন পর জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে – ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’। হাসান আলি জল সরবরাহ প্রকল্প।

বিষয় নির্বাচনে, নির্মাণ কৌশলে অসাধারণ একটি গল্প। সমসাময়িক ঘটনার এমন আশ্চর্য রূপায়ন, সেও খুব স্বল্প পরিসরে, বস্তুতই বিরল। মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠার সামান্য পরিসরে অসমের অভিবাসী বাঙালি মুসলমানের অসামান্য অবদানের আখ্যানের পাশাপাশি তাদের প্রতি অবহেলা ও বঞ্চনার চিত্রও তুলে ধরেছেন অনুভবী ও কুশলী কলমে। যে গ্রামের জল পানের অযোগ্য হাসান আলির দৌলতে সে গ্রাম অমৃতবারি আবিষ্কার করে, ঠিক যেমন এক কালে চাষাবাদের অযোগ্য জমি সুফলা হয়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গ থেকে নিয়ে আসা কুশলী কৃষকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে। ২১শে জুলাই, ২০১০ এ শুরু হয়েছিল এনআরসি’র পাইলট প্রোজেক্ট, বরপেটা জেলায়। আর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বাস্তবিক মৃত্যু বরণ করেছিলেন চার তরুণ তুর্কী। কেন জানি না, পড়তে গিয়ে কেবলই মনে হয়েছে ধীরাজ বুঝি গল্পের সমাপ্তিতে ‘হাসান আলি পানি যোগান আচনি’ নামকরণের তীব্র শ্লেষের মধ্য দিয়ে আমাদের উনিশ-একুশ লালিত চৈতন্যের প্রতিই এক শব্দভেদী শর নিক্ষেপ করেছেন।

কুশল ভট্টাচার্যের ‘খাঁচার পাখি ডাকে’ গল্পে ডিটেনশন ক্যাম্পের যে বস্তুনিষ্ঠ উৎপীড়ক বিবরণ প্রত্যক্ষ্ করি তাতে শারীরিক ভাবেই শিউরে উঠতে হয় পাঠক হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত অসাধারণ সিনেমাগুলোতে প্রদর্শিত হিটলার জমানার   কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ছবিই যেন ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। ক্যাম্পের অমানুষিক পরিবেশ ও প্রাত্যহিক নির্যাতনের মধ্যেও গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্পর্ক। ঠিকরে পড়ে মনুষ্যত্বের দ্যুতি। পরিবার-বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো যেন গড়ে নেয় আরেক নতুন পরিবার। ডিটেনশন ক্যাম্পে। লেখারু, লক্ষ্মী, খগেন, পুলিনের মা এবং ওদের মত আরো অনেকে মিলে নয়া সংসার। একে অন্যের সুখ-দুখের – না, সুখ তো এদের নাগালের বাইরে, দুঃখ ভরা জীবন সংগ্রামের খবর নেয়। ছিন্নমূল মানুষের শিকড় সন্ধানের কাহিনি গুলো কোথাও যেন একসূত্রে গাঁথা। এক অনিবার্য আত্মীয়তা তাই গড়ে ওঠে। পারস্পরিক কথোপকথনে, জীবন-সংলগ্ন  আলাপচারিতায় ফুটে ওঠে সে অমলিনতা। পরিচিত গ্রামের ভেতর থেকে আরেক গ্রাম, চেনা মানুষের ভেতর থেকে অন্য আরেক অচেনা মানুষ যেন জেগে ওঠে।

-আমার কী মনে হয় জানস? বাংলাদেশে গিয়া মুসলমান হইয়া যাওয়াই ভাল। তা হইলে অন্তত আমাগো উপর আর কেউ  অইত্যাচার করব না। ধর্ম ক আর ভাষাই ক, সব এক হইয়া যাইব। ঘর বাড়ি তো এইখানেও নাই, নাহয় হেইখানেও থাকব না। কিন্তু কাম কাজ কইরা খাওন তো জুটান যাইব? নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল লেখারু।

-হেই বুইলা বিধর্মী হইবা কাকা? লেখারুর কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠল লক্ষ্মী।

-আমাগো মতো গরিবের লেইগা জাতি-ধর্ম কুনো কামের না রে।

লেখারু আর লক্ষ্মীর এই অন্তরঙ্গ সংলাপ যেন অদৃশ্য চাবুক হয়ে পিঠে পড়ে। আর্থিক দুরবস্থা ও দুর্দশার জন্য সামান্য আক্ষেপ পর্যন্ত নেই, দায়ী করছে না সমাজ ব্যবস্থাকেও। কেবল একটু সম্মান নিয়ে বাঁচার প্রার্থনা। দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে এই আবেদন কি আন্তর্জাতিক স্বর হয়ে ওঠে না! ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ এমন প্রার্থনা-বিলাস তাদের এক্তিয়ারে নেই, তারা বড় জোর ভাবতে পারে - ‘আমার সন্তান যেন থাকে দেশে ভিতে’। কিন্তু সে আশার বুকেও এনআরসির ছুরি। একবার দেশ-ছাড়া মানুষের দেশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে দ্বিতীয়বার। তবে তফাৎ আছে, এই কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র এমনই নিঃশ্ছিদ্র যে অন্য কোথাও অন্য দেশে পালিয়ে যাবার সুযোগটাও নেই। আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার উদ্বাস্তু-জীবন ও বন্দিশিবিরের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য কি আছে? এ গল্প তাই অসমের দরিদ্র মানুষের নিপীড়নের ইতিবৃত্ত হয়ে থাকে না আর, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মেহনতি মানুষের ওপর সংঘটিত ধারাবাহিক নিপীড়নের ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হয়ে ওঠে।

যারা দিন আনে দিন খায় সেই সাধারণ মানুষগুলোর জীবন ধারণের পথটাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এই এনআরসি। অধিকাংশের স্পষ্ট ধারণাও নেই ব্যাপারটা আসলে কী! ‘তাবিজ’ গল্পের নিতাই দাসেরও নেই। পথে ঘাটে আর কোন আলোচনা নেই, কেবল এনআরসির প্রসঙ্গ, আলাপ। হাটবারে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাবিজ বিক্রি করা নিতাইয়ের ব্যবসায় ভীষণ মন্দা চলছে।  অসুখ-বিসুখ, বশীকরণ, বাণ মারা, গর্ভপাত কত রকমের সমস্যা সমাধানের তাবিজ আছে তার ঝুলিতে, কিন্তু খদ্দের কই! এনআরসি দানো যেন গ্রামের মানুষগুলোর সাপ-খোপ জল-আগুন সব কিছুর ভয় গিলে খেয়েছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে গোটা গ্রাম সন্ত্রস্ত, দিশাহারা। মাস্টার মশায়ের বোঝানোর চেষ্টা সত্ত্বেও নিতাই খুব ভালো বুঝে উঠতে পারে না এনআরসি’র আসল গ্যাড়াকল। বুলু শব্দকর না কাকে যেন ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে এবং সেখানেই নাকি সে মারা গেছে। সেই খবরটাই তার কাছে যা গুরুত্ব পায়। নাগরিত্বের সীল-মোহর দেওয়া কাগজ খুঁজছে সবাই হন্যে হয়ে। যেসব কাগজের কথা বলাবলি করে লোকে সেসবের কিছুই তো তার নেই! তবু, নিজের সংকট নিয়ে আদৌ ভাবনা নেই নিতাইয়ের। গ্রামের মানুষগুলো নিশ্চিন্ত  থাকলে সেও নিশ্চিন্ত। সাধন জেঠা জীবনকাকাদের তাই সে সরল ভাবেই সান্ত্বনা দেয় – ‘শোনো জেঠা, অত ভেবো না।  সবাই তো আছি গো আমরা। এ তো তোমার একার সমস্যা নয়’। এভাবেই ভরসা দিয়ে এসেছে নিতাই, এতদিন। ভিটেমাটি ছাড়া করে যে এনআরসি, সেটা তাহলে ভূত-প্রেত-জিন-পরি থেকে আলাদা কিছু নয়। তাহলে তো না পারার কিছু নেই, ভাবতে ভাবতে গ্রামের লোকগুলোর আতঙ্ক-আর্তনাদ সব নিজের মধ্যে পুঞ্জীভূত করে ভরসা গোটায় সে – আলতা দিয়ে লেখা পিচ বোর্ডের সাইন   বোর্ডে জুড়ে দেয় আরেকটা লাইন – ‘এখানে এনার্সি তাবিজ পাওয়া যায়।’ এ গল্পের সমাপ্তির নিষ্পাপ সারল্যে যে মর্মন্তুদ  অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস, যে আর্তি ব্যক্ত ও পরিব্যাপ্ত তার শাব্দিক সম্প্রসার অসাধ্য নয় শুধু, অসমীচিনও। মেঘমালা দে মহন্ত অসামান্য  দক্ষতায় এক নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। নতুন প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে মেঘমালা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং প্রতিশ্রুতিবান।

তাঁর ‘কাগজের স্বদেশ’ গল্পে খুঁজে পাই আরেক ভিন্ন প্রতিভাস। অসাধারণ বিশ্বস্ততায় সেখানে তুলে ধরা হয়েছে শহুরে মধ্যবিত্তের ফাঁপা মনস্তত্ত্ব, মেকী প্রতিবাদের চিরাচরিত চিত্র। ইন্দ্র, ইন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তার প্রতিনিধি। ছোট-বড় সবার ইন্দ্রদা।  অকৃতদার ইন্দ্র, অবিবাহিত বোনকে নিয়ে এই শহরের বাসিন্দা। শুধু বাসিন্দা বললে ঠিক বলা হয় না, শহরের এমন কোন ‘কবিরাজি’ নেই যেখানে ইন্দ্রনাথের নীরব কিংবা সরব উপস্থিতি নেই। মহিলা মজলিশ থেকে মশাল-মিছিল সর্বত্র তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। যুবা প্রজন্মের নজরে ইন্দ্রদা শহরের আইকন,  আই-কার্ড। ‘এই শহরটাই আমার বাড়ি’ এমন আত্মগর্বী উচ্চারণে অভ্যস্ত, প্রতিটি মিছিলের পুরোভাগে হাঁটা ইন্দ্রনাথ হাঁক পাড়ে – ‘দিচ্ছে ডাক’। একুশে ফেব্রুয়ারি’র আমন্ত্রণে সে যায় ওপার বাংলায়, পিতৃপুরুষের ভিটেয়। তার জন্মও সেখানে, বাবা-জেঠা’র মুখে শোনা ‘দেশের বাড়ি’র গল্প বলে বোন উজিকে।  মনোভূমি আর বাসভূমি’র মাঝখানে বুঝি  লুকিয়ে থাকে বিভাজনের সূক্ষ্ম রেখা। ইন্দ্রের নামেও আসে নোটিশ, ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে সে। তার ‘অবসরের গান’ ভেঙে চুরমার করে দেয় এক টুকরো কাগজ, ছিনিয়ে নিতে চায় আত্ম-পরিচয়। গণহারে ডি-নোটিশ জারি নিয়ে দেশভাগের মতই দু ভাগে ভাগ হয়ে যায় নাগরিক-প্রতিক্রিয়া। এলিট মধ্যবিত্ত, যারা ‘চরিত্রহীন’ প্রতিবাদী মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটে, তারা ব্যস্ত নথি-পত্র গুছিয়ে নিতে। আর আচ্ছে দিনের স্বপ্নে মশগুল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর হেলদোল নেই তেমন। এনআরসি তাড়িত মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে না পারার আত্মগ্লানি থেকে ইন্দ্রকে যেন মুক্ত করে বুক পকেটে রাখা কাগুজে নোটিশ। মনে মনে ইন্দ্র এখন নিজেকে তাদের দলভুক্ত দেখতে পায়। সবার প্রত্যাশা মত আজ আর মিছিলের সামনের সারিতে  আগের মত দাঁড়াতে পারে না ইন্দ্র, সঙ্কোচ হয়। অবস্থান পাল্টে পাল্টে এগিয়ে চলা মধ্যবিত্তের আত্মিক সংকট মূর্ত হয়ে ওঠে ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। এক নতুন লড়াইয়ের জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নেয় ইন্দ্র।   

    

 

এনআরসি’র মার কি শুধু গ্রাম শহরের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনকেই এলোমেলো করে দিয়েছে, সচ্ছল আপাত সুখী মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রায় আঁচড় কি লাগেনি একেবারে! দৌড়ঝাঁপ একটুও কি নেই? আতঙ্ক ততটা  গাঢ় নয় হয়তবা, তবে নিশ্চিন্ত বসে থাকার অবস্থাও নয়। ছেলে-বুড়ো যুবক-যুবতী সবার মুখেই কেবল এনআরসি। ফটো-তোলা, কাগজ জমা-দেওয়া এই নিয়েই ব্যস্ত সবাই। শহরের জানা-বোঝা মানুষের বেশির ভাগের হাতেই গোছানো কাগজ-টাগজ রয়েছে। তবু ঝামেলা একেবারে মিটে না যাওয়া অব্দি যেন স্বস্তি নেই। মধ্যবিত্ত ভাবালুতাও বুঝি থিতিয়ে গেছে। জীবনের উত্তাপ বলতেও কিছু নেই। রক্ত বুঝি জমে ঠাণ্ডা হবার জোগাড়, প্রেম-টেমও জমছে না তেমন। ‘ঠাণ্ডা রক্ত বা NRC–র দিনে প্রেম’ গল্পে মিথিলেশ ভট্টাচার্য তাঁর সুপরিচিত অথচ অননুকরণীয় গদ্য শৈলীতে সে আখ্যানই শোনান। যতীন-সিক্তার অতি সম্ভাবনাময় প্রেমের মাঝখানেও ঢুকে পড়ে এনআরসি। জমে ওঠা খেলায় হতে হতেও গোলটা না হওয়ার মত ‘ধেত্তেরি’ অবস্থা। সুযোগ ছিল হাতের মুঠোয়, তবু দুজনের একটা যুগল ফটো-সেশনের সম্ভাবনা মাঠে মারা গেল, সিক্তার অসম্মতিতে-‘আজ না, আরেক দিন’। যতীন টের পেয়েছে তার রক্ত ঠাণ্ডা, সিক্তার  ল্যাবরেটরিতে তাই টেস্ট করিয়ে কারণটা জেনে নিতে উৎসুক সে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের প্রতি এক তীব্র ও তির্যক শ্লেষ রয়েছে এ গল্পে।

   ‘উঁইপোকা’দের জীবন নিয়ে ইদানীং কালে গল্প কিন্তু খুব কম লেখা হয়নি এ অঞ্চলে। উল্লেখিত গল্পগুলো ছাড়াও ‘মানবরতন’ (স্বপ্না ভট্টাচার্য), ‘স্থায়ী ঠিকানা’ (রণবীর পুরকায়স্থ), হামারি অজিব কাহানি (দোঁলনচাঁপা দাস পাল), একটি গলিত স্থবির ব্যাং অথবা এলি তেলি মহম্মদ আলির জীবন বৃত্তান্ত (কান্তারভূষণ নন্দী) ইত্যাদি নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। এর বাইরে, ব্যক্তিগত পাঠ-পরিধির বাইরেও রয়ে গেছে আরো কত! নাগরিকত্ব-ডি-ভোটার-ডিটেনশন ক্যাম্প-ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কত  বিচিত্র গল্পই না লেখা হয়েছে এই অসময়ে, কত ভয়ানক তথ্য কত নির্মম সত্য খোদাই করা আছে পত্র-পত্রিকা বইপত্রের পাতায়  পাতায় তার সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা ও আলোচনার গুরু দায়িত্ব হয়ত নেবেন আগামীর কোনো সাহিত্য গবেষক। এটুকু আশা করা যেতেই পারে। আমাদের সাধ সীমাহীন, কিন্তু সাধ্য সীমিত। কাজেই দাঁড়ি টানার কথা ভাবতেহচ্ছে। স্থান সংকুলানের দায়ও  আছে। তবে শেষ করার আগে আরেকটি গল্পের কথা বলতেই হবে। না বললে গোটা উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে।

কান্তারভূষুণ নন্দীর ‘মাটিপোকাদের নিয়ে একটি না-গল্পের খসড়া’র কথা না বললে নিজেকেই কাঠগড়াতে দাঁড় করাতে হ। গল্পকার কান্তারভূষণ সম্পর্কে বলার কিছু নেই। এমনিতেই তাঁর গল্প না পড়াটা যে কোন গল্পরসিকের জন্য প্রায় অপরাধের  পর্যায়ে পড়ে। আর এনআরসির প্রসঙ্গে তো কথাই নেই। কেউ যদি একটি মাত্র গল্প পড়ে এনআরসি নিপীড়ণের সম্যক ধারণা পেতে আগ্রহী থাকেন তবে ‘মাটিপোকাদের ……’ তাকে পড়তেই হবে। কারণ এই গল্পে এনআরসি কেন্দ্রিক উথাল-পাথালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থনীতিক -রাজনীতিক-শাসনিক সব কটা দিকই উন্মোচিত হয়েছে। হয়েছে সুনিপুণ বিশ্বস্ততায়। এ গল্প এ সময়ের অসামান্য দলিল, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

রশিদ-মালতী আর তারক-ময়না দুই সংসারের ভোমরা-জুটি। কেবল পাশাপাশি বসবাস নয় এদের, বেঁচে থাকার  দৈনন্দিন কসরতে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনায় একে অন্যের অবিচ্ছিন্ন দোসর। এক পরিবারের কান্নার রোল তাই আরেক পরিবারের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কান্নার রোল আর ঘুম কেড়ে নেওয়ার মূলে সেই এনআরসি।  রশিদ বলে –

“জলপোকা দেখছস না, জলপোকা? আমরা হইলাম গিয়া মাটিপোকা। মাটির গভ্যে আমরার বাস, আমরার মরণ-বাঁচন। মাটি না হইলে আমরা থাকুম ক্যামনে?” তাইতো, কি করেই বা বাঁচবে! এই মাটিই কেড়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক-মানুষিক দুর্যোগ আসে ক্ষণে ক্ষণে। কোকড়াঝাড়ের দাঙ্গায় নিঃস্ব হয়ে রশিদ-মালতী এসে ওঠে গরজুলির পারে। সেখানেও বন্যার প্রকোপ, ঝড়ের দাপট। প্রাণ বাঁচানো দায়, তো কাগজ পত্তর! অথচ কাগজ না হলে ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে, এই আতঙ্কে অস্থির আদ্ধেক গ্রাম। কিন্তু শমন আসে তারকের নামেই, তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পায়ের তলায় এক চিলতে মাটির জন্য তাই মালতীরও হা-পিত্যেশ।

-“সাহাদা, একটা কথা কন তো। কুনোদিন যদি গরজুলির ভিতর থিইক্যা মাটি ভাইস্যা উঠে, চর পড়ে, অউ মাটি কি গরমেন্টের হইব? আমরা হউ চরো থাকতে পারবাম না?” ন্যায্য অধিকার নিয়েও সংশয় মালতীর কন্ঠে।

– “সব গরমেন্টের। কারও বাপের মাল না, বুঝছ ?” মহাদেব সাহা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানিয়ে দেয়, সাহার দলই গরমেন্ট কিনা! আগের গরমেন্ট ছিল বিরোধী দলের পাণ্ডা মোহিনী বরুয়াদের, তারককে তুলে নিয়ে যাবার সময় যে মোহিনী দাঁত কেলিয়ে বলেছিল – “তাঁহতৰ মহাদেব সাহাই কেনেকুৱা বঁচায় চাম নহয় কেলা।” নিখুঁত আঁচড়ে কান্তার খুলে দেন এনআরসি-রাজনীতির মুখোস। গণতন্ত্র-ন্যায়-মানবিকতা- সমানাধিকার শব্দগুলো ঠাট্টার মত শোনায়। এনআরসি’র দাবার ঘুঁটি রশিদ-তারক-ময়না-মালতী-সুমতিরা উপলব্ধি করে গরমেন্ট আসলে আরেক ভগবান, আর ভগবানের মর্জি না হলে কারও পক্ষেই কিছু করা  সম্ভব নয়।

মহাদেব সাহা মিটিং করে বুঝিয়ে দেয় দোষ তারকেরই, সস্তা দরে এক টুকরো মাটি তো সে দিয়েই দিচ্ছিল, কিন্তু নেমকহারাম তারক শুনল না। গ্রামের লোকের ভাল-মন্দের কিছুটা দায় তারও কি না! মহাদেবের টোপ গিলে মালতী ও রশিদ সাত হাজার আগাম দিয়ে মাটির স্বপ্নে বিভোর হয়। মহাদেব মাটিও দেয় না, টাকাও না। ফেরত দিতে বলায় তার চেলারা বাড়িতে হামলা চালায়, হাটবারে ওষুধ বিক্রির ‘অবৈধ’ ব্যবসা বন্ধ করার ফরমান জারি করে, ক্যাম্পে চালান করার হুমকিও দেয়। ভিটে-মাটির সাথে পেটের ভাতও কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কি? মহাদেবের মত ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’রা আবার ধর্মের মোড়কে রাজনীতি পুরে দেবার কায়দাটা রপ্ত করেছে ভালো। শ্যালক ভগীরথ দাসের বাড়িতে দুর্গা পুজো হবে, মিটিং করে চাঁদার হার সাব্যস্ত হয়, ‘মুখ্যমন্ত্রী আসবেন’ ঘোষণাও দেওয়া হয়। রোজকার দেখা পরিচিত রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ তৈরি হচ্ছে যেন। কিন্তু পুরুত ভবতোষ চক্রবর্তীর শাস্ত্র-বিধানে সংকট ঘনীভূত হয় - বেশ্যাদ্বারের মাটি চাই। ‘ক্যান লাগে’ তাও বুঝিয়ে দেন চক্কত্তি মশাই, জুতো খুলে অর্থাৎ তাবৎ পুণ্য ও পবিত্রতা দোরগোড়ায় রেখে বেশ্যার ঘরে প্রবেশ করতে হয় বলে যাবতীয় পুণ্য বেশ্যাদ্বারেই জমা হয়। তাছাড়া যেহেতু পুরুষই গণিকা তৈরি করে, আবার অস্পৃশ্যও করে রাখে বলে গণিকারা যাতে পুজোর বাইরে না থেকে যায় তাই-ই শাস্ত্রের এই মহান বিধান। আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! সব কা সাথ, সব কা বিকাশ! এমন বামুন ঠাকুর না হলে মহাদেব সাহার দোসর হওয়া সাজে! এক সুরে তাই ধ্বনিত হয় – আলবৎ চাই, ‘যিকান থিক্যা পার আন, কিন্তু মাটি লাগবই’।  

মালতী-ময়নাদের মাসকাবারি কাজ আর নেই, রশিদও জ্বরে জর্জর। কী করে হাঁড়ি চড়বে ভেবে কুল-কিনারা পায় না মালতী। বোবা বোনটির সঙ্গে শলা করে, সুমতিকে সাথে করে অন্ধকারে রওয়ানা হয় ভগীরথের বাড়িমুখো। এত রাতেও বাড়ির উঠোনে চলছে মিটিং। ভগীরথকে এক প্রান্তে ডেকে নিয়ে বলে,

–পাইসেন মাটি?

-না, পাই নাই।

-‘আমারে কন, আমি দিতে পারি’- বলে মাটি-ভর্তি কাচের বোতল এগিয়ে দেয় মালতী। ‘আমরার ঘরর মাটি। আমি  আর আমার বইন মিল্যা অনেকদিন থিক্যা গোপনে আপনাগো বড়ো বড়ো নেতারা জানে।’

মহাদেব সাহা-মোহিনী বরুয়াদের সমাজ সভ্যতার রঙ করা মুখের উপর একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় মালতী।

সার্টিফিকেট বানিয়ে দেবার শর্তে আর মাটির দাম নগদ পাঁচশো টাকা হতভম্ব মহাদেবের হাত থেকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে মালতী। অন্ধকার সাপ্টে ধরে। স্বামী-সন্তানের পাশে শুয়ে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বহুদূর থেকে আরও একটা চাপা কান্না যেন এসে মিশে যায় তার কান্নার সাথে। মালতী ঠিক শুনতে পায়। জীবনে প্রথম বার।  

 

কান্তারভূষণকে কুর্ণিশ, সার্বিক সামাজিক ধাপ্পাবাজির গালে এমন বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্ত থাপ্পড় কষানোর জন্য। ‘যুক্তি তক্কো   গপ্পো’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে ক্যামেরার লেন্সে নীলকন্ঠ বাগচি’র মদ ছুঁড়ে মারার দৃশ্য মনে পড়ে যায়। সাম্প্রতীক গল্পচর্চায় এমন  নিদর্শন বড় একটা মেলে না। কী অসাধারণ পর্যবেক্ষণ, কী অভাবনীয় প্রতিরূপ নির্মাণ! এ তো শুধু ভাষাশৈলীর দৌলতে সম্ভব নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু চাই। সেই অতিরিক্ত ধনে কান্তার ধনী।   

শেষ করার আগে একটা কথাই বলার। নাগরিকত্ব, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, এফ টি পীড়িত সাধারণ নাগরিকের জীবনের ভাষ্য কতটা সফল বা সার্থক ভাবে রূপায়িত হল তার নিরীক্ষা এ নিবন্ধের উদ্দিষ্ট নয় কোন ভাবেই। আলোচিত গল্প সমূহের সাহিত্যিক মূল্য কী ও কতটা তার বিচারের ভার আগামী কালের কাঁধেই নাহয় অর্পিত হোক। আলাদা করে প্রতিটি গল্পের  মূল্য নির্ধারণ অবান্তর, অর্থহীন। যেহেতু এই গল্পগুলো একে অপরের পরিপূরক, এক সমগ্রের অপরিহার্য অংশ। কোনোটিই তুচ্ছ নয়। সংযোজ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে বসবাস করেও আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। বিভাজনের ঘৃণ্য রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গল্পগুলো মানবিক প্রমূল্য প্রতিষ্ঠার আন্তরিক প্রয়াস করেছে নিঃসন্দেহে। সে প্রয়াসেই তাদের সার্থকতা। এই বিপন্ন সময়ে গল্পকারেরা যে তাঁদের সামাজিক ভূমিকাও পালন করেছেন সাহস ও সততার সঙ্গে আপাতত সেকথা অকুন্ঠ চিত্তে স্বীকার করাই পাঠক হিসাবে আমাদের আশু কর্তব্য। বুলু শব্দকর-অর্জুন নমঃশূদ্র- দুলালচন্দ্র পাল-খালু দাস’রা ‘কাগজের স্বদেশ’ ছিন্নভিন্ন করে ‘দিচ্ছে ডাক’ - প্রকৃত স্বদেশ গড়ার। গল্পকারেরা সে ডাকে সাড়া দিয়েছেন প্রবল ভাবে। এবার পাঠকের পালা, সে ডাকে সাড়া  দেবার জন্য দৈনন্দিন-দীনতার-কাছে-হাঁটু-মুড়ে-বসা পাঠক প্রস্তুতির সঙ্কল্প নেবেন কি না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর সে প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের কতটা জবাবদিহি তে হবে না হবে তার হিসেব-নিকেষ  

 

 

 

    

একটি কৈফিয়তঃ লেখাটি সীমিত সময়ের তৎপরতায় শরীরি হয়েছে, ফলে প্রকাশিত অথচ আমার পাঠ পরিধির বাইরে থেকে যাওয়া কিছু গল্প এবং হাতের কাছে না-থাকা আরো কিছু গল্প আলোচিত হয়নি। সে তালিকায় মলয় কান্তি দে, রণবীর পুরকায়স্থ সম গল্পকারও অন্তর্ভুক্ত, এই খামতি পরবর্তীতে পূরণের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা রইল।

  

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ক্রসিং ব্রীজেসঃ এক সৎ , অভিসন্ধিহীন যাত্রা

 

 

           

 দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনের ঠিক প্রাক-মুহূর্তে ভাজপা’র ভিশন ডকুমেন্টে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে Immigrants from north-east শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে হাওয়া বেশ গরম হয়েছে। ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডের প্রেক্ষিতে  উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবস্থান তথা এখানকার মানুষের পরিচয় নিয়ে নানান প্রশ্ন ও সংশয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ক্ষোভের বহির্প্রকাশও  ঘটেছে স্বাভাবিক কারণেই। অনেক অবাঞ্ছিত প্রশ্নচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে ভাবুক মনের আনাচে-কানাচে। এসব সবারই জানা, নতুন করে বলার নয়। তবু এখানে এ প্রসঙ্গের অবতারণার এক ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।

না, কোনও রাজনৈতিক নিবন্ধের প্রস্তাবনা হিসাবে উপরের কথাগুলো বলা হয়নি। কথাগুলো  মনে এসেছে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অরুণাচল প্রদেশের  Sange Dorjee Thongdok  নির্মিত  Crossing Bridges সিনেমাটি দেখতে দেখতে। এই অসাধারণ সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই আমার সাথে একমত হবেন যে আত্মপরিচয় সংক্রান্ত অনিবার্য এবং জরুরি কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ ফিল্মটির অস্থি-মজ্জায় জড়িয়ে আছে। অথচ এই ভিন্ন গোত্রের অসামান্য ফিল্মটির বিষয়ে অনেকেই জানেন না, এমনকি সিনেমা-প্রেমীদের অনেকেও! এ নিয়ে আমাদের এই অঞ্চলেও তেমন আলোচনা লক্ষ্য করা যায়নি সেভাবে। এটা শুধু দুর্ভাগ্যের নয়, লজ্জারও। উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রসঙ্গে মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যে অবহেলা-উদাসীনতার অভিযোগ নিয়ে আমরা সতত সোচ্চার, সেই আমরাই কি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে ফিরে তাকাই আমাদের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতি ? দর্শকের উদ্দেশ্যে এই জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিতেও ইতস্তত করেন না ফিল্মের পরিচালক।     

আমাদের সিনেমা দেখার এ পর্যন্ত অর্জিত যাবতীয় অভিজ্ঞতা মুখ থুবড়ে পড়ে Crossing Bridges  দেখতে গিয়ে। কীরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তার সামান্যতম পূর্বানুমান দীক্ষিত দর্শকের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। না, এর নেপথ্যে নেই নির্মিতির কোনো কেতাদুরস্ত কায়দা, কিংবা দর্শককে বোকা বানানোর ফিল্মি চাতুরি। নেই নাটকীয় উপাদান, রোমাঞ্চকর কোনো  উন্মোচনও নেই। তবু, দেখতে দেখতে অরুণাচল প্রদেশের অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যেতে হয়  সহজ সরল জীবনযাত্রার গহনে। এক অভূতপূর্ব প্রশান্তি সিনেমাটির অনন্য সম্পদ। ফিল্মের কাহিনি বলতে মহানগরের এক কর্মচ্যুত যুবকের ঘরে ফেরা ও শেকড় খুঁজে পাওয়ার মর্মস্পর্শী মানবিক বিবরণ। যাত্রা বলাই সঙ্গত, নিজস্ব শেকড়ের দিকে এক অভিসন্ধিহীন যাত্রা। আর সে যাত্রার অনুষঙ্গে  Crossing Bridges  নামকরণও এক ভিন্ন মাত্রা অর্জন করে। 

ওয়েব ডিজাইনার তাসি (Tashi) এক বছর যাবৎ মুম্বাইতে বেকারজীবন কাটানোর পর অনন্যোপায় হয়েই গ্রামে ফিরে আসে,  যে গ্রামের সঙ্গে তার সংযোগ ছিন্ন হয়েছে বছর আটেক। গ্রামের মন্থর জীবন পদ্ধতিতে অসহায় বোধ করে তাসি, যদিও তার পরিবারের সবার ইচ্ছে সে গ্রামেই থাকুক, খামারের দেখাশোনা করুকতাসি অপেক্ষা করে আইনজীবী বন্ধু অমিতের ফোনের, যে তাকে নতুন কর্ম সংস্থানের সুসংবাদ জানাবে। গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। কেবল বিশেষ এক স্থানে, পাহাড় চূড়োয় বৌদ্ধ মঠের কাছে তা পাওয়া যায়। মুম্বাই মহানগরের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামটির প্রান্তিক অবস্থান এতেই প্রতিষ্ঠা পায়তাসি স্বভাবত হাঁফিয়ে ওঠে,  সময়  কাটানোর জন্য একটা ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন (যেহেতু গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি থাকে দু’দফায় মাত্র ঘন্টা দুয়েক) কিনে নিয়ে আসে বন্ধুর সহায়তায়। তাসির বাবা শুরুতে বিরক্তি প্রকাশ করলেও ক্রমে টিভির নেশা তাকেই পেয়ে বসে। এ নিয়ে মৃদু কৌতুকও উপভোগ্য। 

এরই মধ্যে তাসি, গ্রামের স্কুলে পরিবর্ত-শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়,‌ কিছুদিনের জন্যশিশুদের কারো  কারো সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে  হিমসিম খায়, প্রশ্ন জাগে নিজের মনেও। সহকর্মী মেয়েটির (অনিলা) সাথে হৃদ্যতা বাড়ে। জানা যায়, মুম্বাইতে  চাকরি হারানোর সূত্রে তাসি তার প্রেমিকাকেও খুইয়েছে। মহানগরে সবকিছু খুইয়ে ফিরে আসা তাসি একটু একটু করে ক্রমশ গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে থাকে। ল্যাপটপে চ্যাপলিনের সিনেমা দেখিয়ে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বড় আপনার জন হয়ে ওঠে সেঅন্যতর অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করে জীবনের। প্রায় অলক্ষ্যে, গোপনে এই অন্তর্বিপ্লব ঘটতে  থাকে। যেন, বদলটা হয় অন্ধকারে। একদিন অনিলাও চলে যায় অন্যত্র, কিন্তু তাসির অন্তরে অন্য আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। পাহাড়ি নদীর উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে তৈরি ব্রীজ অন্যের হাত ধরে পার হতো অনভ্যস্ত তাসি, অথচ সেই  ব্রীজের উপর দিয়েই এখন সে স্বচ্ছন্দে ও অনায়াসে নদী পার হয় গ্রামের মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযুক্তি ঘটে তার, খুঁজে পায় অস্তিত্বের শিকড়, আত্ম-আবিষ্কারের অনুষঙ্গ । অমিতের কাছ  থেকে সুসংবাদ ও ডাক এলেও তাই আর সাড়া দিতে পারে না তাসি, মহানগরের  মায়াবী হাতছানি (গ্রামের মানুষের লৌকিক বিশ্বাস অনুসারেই যেন) এখন আর প্রলুব্ধ করে না তাকে। সে খুঁজে পেয়েছে তার হারানো স্বদেশ, স্বভূমি।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 Crossing Bridges is a 2013 Indian film directed by Sange Dorjee Thongdok. It is the first feature film ever to be made in the language of Shertukpen, which is an indigenous dialect native to the state Arunachal Pradesh in India. The film premiered on 27 September at the Mumbai International Film Festival in 2013.

   
Music by: Anjo John
 Produced by: Sange Dorjee Thongdok, Tenzing Norbu Thongdok
                                                                              Release date: 27 September 2013 (MIFF), 29 August 2014 (India)
                                                                                                              Starring: Anshu Jamsenpa,Phuntsu Khrime      -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ফিল্ম শুরু হয় দারুণ এক লং শট দিয়ে। একটি নিঃসঙ্গ ব্রীজের দৃশ্য। মুহূর্ত কয়েক পরেই, ব্রীজের ওপারে পাহাড়ের গা  ঘেঁষে, অসামান্য এক নিসর্গ দৃশ্যের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট পরিবহন নিগমের রঙচটা বাসটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে আসতে দেখা যায় বাসের জানলায় তাসির মুখ। শুরুতেই একটা মুড তৈরি করে দেন পরিচালক, অবলীলায় ১০২ মিনিটের যাত্রার সঙ্গী করে নেন দর্শককে। সাত আট বছর আগে ছেড়ে যাওয়া নিস্তরঙ্গ নিষ্কলুষ গ্রামটিতে তাসি প্রবেশ করে পর্যটকের মতন। ক্যামেরা স্থির ও ঋজু ভঙ্গিতে ধরে গ্রামের প্রায় স্থবির জীবনযাত্রাকে। মায়ের দেওয়া চা বিস্বাদ লাগে তাসি-র, গ্রামের জীবন ও সংস্কৃতি অচেনা মনে হয়স্মৃতিভ্রষ্ট সে, স্বর্গচ্যুত(দর্শকের আশা আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েই) পর্দায় এর অতিরিক্ত ও ‘দারুণ’ কিছু ঘটে না। কোনো উত্তেজক মুহূর্ত, কোনো নাটকীয়তা খুঁজে পাবেন না দর্শক। গ্রামের মানুষগুলোর ঘটনাবিহীন একঘেয়ে জীবনযাত্রার টুকরো-টাকরা ছবি, লৌকিক বিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কারের  পাশাপাশি এক চিলতে অস্ফূট প্রেম, ইত্যাদি উপাদান সম্বল করেই তাসির রূপান্তরের ইতিবৃত্ত বিবৃত হয় সহজ সাদামাটা ভাষায়ভঙ্গি দিয়ে ভোলানোর বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই, এমনই সরাসরি, সোজাসাপটা ন্যারেশন। তা সত্ত্বেও পরের দৃশ্যটি সম্পর্কে অগ্রিম অনুমান একেবারেই অসম্ভবপরিচালকের স্বকীয়তা এখানেই।   

অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফী এ ছবির সম্পদ। এই কৃতিত্বের দাবিদার অবশ্যই পূজা গুপ্তে। Canon 5D ক্যামেরায় শ্যুট করা এ  ছবি। সংলাপ ভৌমিকের সম্পাদনা যথাযথ। অরুণাচলের মন মাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। প্রকৃতি এ ছবিতে পটভূমি মাত্র নয়, জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে যেন১০২ মিনিট দৈর্ঘের এ ছবি ভীষণ স্বল্পবাক, নৈসর্গিক প্রশান্তি খর্ব হয় তেমন মুখরতা সচেতন ভাবেই বর্জিত। খুব ছোট অথচ অর্থবহ সব সংলাপ। অরুণাচলের আঞ্চলিক ডায়লেক্টে (Shertukpen) তৈরি প্রথম ফিচার ফিল্ম এটি। একেবারেই স্বল্প বাজেটের। যতটা জানা গেছে, দায়বদ্ধতা থেকেই আর্থিক দায়ও বহন করেছেন দর্জির পরিবার। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতার বদলে না-অভিনেতাদের দ্বারাই রূপায়িত হয়েছে অধিকাংশ চরিত্র।              

আমি স্থির নিশ্চিত, ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে এই অব্দি যারা পাঠ করেছেন তারা নির্ঘাৎ ভাবছেন যে এর মধ্যে এমন ‘আহা মরি’ কী-ই বা আছে। না, কাহিনির যে প্লট উপরে বর্ণিত হয়েছে তার চিত্রায়ণেও, সিনেমায়, আপনারা খুঁজে পাবেন না কোনো পরিচিত ফর্মূলা, অথবা কোনো ধ্রুপদী উৎকর্ষের নিদর্শন। কোন নাটকীয় মুহূর্ত, মেলোড্রামা, আবেগের উচ্ছ্বল ক্ষণ, কিংবা তাক লাগিয়ে দেবার মতো বিচ্ছিন্ন কোন অসাধারণ শট অথবা কম্পোজিশন।  কিন্তু পেয়ে যাবেন অপলক তাকিয়ে দেখার অমল অবকাশ। নিতান্ত সহজ ও সরল, অথচ সাবলীল এক ফিল্মি ভাষায় জটিল জীবনের জলছবি এঁকে যান Dorjee , SRFTI (Satyajit Ray Film Institute), Kolkata প্রত্যাগত এই তরুণটি ! সমগ্র ছবিটি জুড়ে থাকে অনুভবী ক্যামেরার মরমি পরশ। রাতের কলি যেমন অজানিতে ভোরের ফুল হয়ে ফোটে, আর আমরা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখি, এও ঠিক সেরকম। আমাদের দৃষ্টির সামনে অথচ আমাদের অজানিতেই, যেন এক সামুদ্রিক সমগ্রতা নিয়ে, এক প্রাণময় প্রশান্তি নিয়ে পরতে পরতে উন্মোচিত হতে থাকে অপাপবিদ্ধ প্রকৃতি ও জীবন হতবাক করে দেয়   দর্শককে। এ কেবল মুগ্ধ ও মোহিত হওয়া নয়, তারও অতিরিক্ত কিছু, অন্যতর কিছু। এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাঠক, মার্জনা করবেন, সে অভিজ্ঞতার শাব্দিক অনুবাদ বর্তমান কলমচির সাধ্যাতীত। তবু, নিবন্ধ রচনার এই ব্যর্থ প্রয়াসের পেছনে যুক্তি শুধু এই যে,  ঘটনাচক্রে ঘরের পাশে ধানের শীষে যে শিশির বিন্দু দেখেছি তার সংবাদ সংবেদনশীল হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার অতিরিক্ত কিছু নয় !        

 

সৌন্দর্যের বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সৌন্দর্য


সৌন্দর্যের বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সৌন্দর্য
মৃন্ময় দেব

রামধনুর সাতটা রঙের কথা প্রকাশ করায় নিউটনের ওপর বেজায় চটেছিলেন কবি জন কীটস। তাঁর বক্তব্য এই ছিল যে, এর দরুণ রামধনুর রহস্য (সৌন্দর্য) নাকি হারিয়ে গেল এবং তা নিয়ে নাকি আর কবিতা লেখা যাবে না। কথাটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, যেহেতু রামধনু নিয়ে তার পরেও কবিতা লেখা হয়েছে, আজও লেখা হচ্ছে। কথাটা কেন এলো বলি। বহুদিন যাবৎ একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে শিল্প ও সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কটি বুঝি বৈরিতার। এরকম ধারণা প্রচলিত হওয়ার মূলে বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের ধারণা, মতামত এবং মন্তব্য বহুলাংশে দায়ী। কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীত কিংবা চিত্রশিল্পীদের অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করেন যে শিল্প ও বিজ্ঞান হচ্ছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরস্পরবিরোধী এলাকা। ইংরেজিতে যাকে বলে water-tight compartment সেরকম বদ্ধ কক্ষ যেন, একটি থেকে অন্যটিতে প্রবেশের পথ চিররুদ্ধ। ঘটনা কিন্তু আসলে তা নয়। অভিজ্ঞতাও সে সাক্ষ্য দেয় না। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণের পক্ষে (শিল্পী-সাহিত্যিকরাও এক্ষেত্রে সাধারণ বর্গেরই অন্তর্ভুক্ত) বুঝে ওঠা হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর সৌন্দর্যবোধ বা শিল্পবোধ থাকা সম্ভব নয় এমন কথা আহাম্মকেও নিশ্চয় বলবে না। আইনস্টাইন থেকে শুরু করে আমাদের জগদীশ চন্দ্র বসু-মেঘনাদ সাহা চন্দ্রশেখর-রামানুজন-এর মত বিজ্ঞানীরা তার দৃষ্টান্ত।
সৌন্দর্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত। মানুষ, সে যে কোনো স্তরের হোক না কেন, নিজের কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। শিল্পীও না, বিজ্ঞানীও না। কিন্তু সৌন্দর্যবোধ বস্তুটি আসলে কী? সে কি কেবল বিষয়ীগত ব্যাপার? ‘সুন্দর যদি করে গো তোমারে আমার আঁখির ভুল, বলো তাহে কার ক্ষতি’ কিংবা ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’ মার্কা ব্যাক্তিগত বোধের নৈপুণ্য? এই বিষয়টাকেই নাহয় একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক। তবে সে প্রসঙ্গে যাবার আগে আরেকটা কথাও বলে নেওয়া দরকার। সৌন্দর্যের (এবং সাধারণ ভাবে শিল্পকলারও) নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, মানবমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার নিরিখেই সৌন্দর্যের ও সৃজনশীলতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয় মূলত। কবি কীটস কিন্তু সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে অন্যত্র বলেছিলেন – Beauty is truth, truth is beauty.- অথচ রামধনুর সাত রঙা বৈজ্ঞানিক সত্যের কাছে এসে তাঁর নিজের মন্তব্য ও সত্যের উপলব্ধি হোঁচট খেয়েছে। তর্কের একগুঁয়েমিতে হয়ত বলা যায় যে এ হচ্ছে ‘বস্তুর সত্য’, শিল্পের সত্য ভিন্ন বস্তু (?)। বোঝা যায় না, উপলব্ধির জিনিস।
তো আমরা এ নিয়ে সেরকম কোনো গূঢ় তর্কে সময় নষ্ট না করে বরং মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফুল-পাখি-গাছ-লতা-পাতা-নদী-পাহাড়-সমুদ্র সদৃশ যে সমস্ত মূর্ত বস্তু কিংবা কবিতা-গান-ছবি-নাচ ইত্যাদি যেসব বিমূর্ত বস্তু আমাদের কাছে সুন্দর বলে প্রতিভাত হয় তার মধ্যে একটা বিশেষ বিন্যাস (pattern) লক্ষ্য করা যায়, সাংগঠনিক এক সুষমতা (harmony) দৃষ্টিগোচর হয়। অর্থাৎ, আকার ও বিন্যাসগত বৈশিষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম ক্ষেত্রে বস্তু সমূহের বর্তমান রূপ বিবর্তিত রূপ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়ত্ত করে নেওয়ার একটা ব্যাপার রয়েছে যদিও এই আয়ত্ত করে নেওয়ারও এক বিবর্তন মূলক ইতিহাস রয়েছে। গুহা চিত্র থেকে আধুনিক চলচ্চিত্র অবধি যার বিস্তার। একই ভাবে রঙ-বেরঙের ফুলও যে বেঁচে থাকার ও প্রজাতি সংরক্ষণের তাগিদেই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রঙীন হয়ে কীট-পতঙ্গকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা লাভ করেছে সে তথ্যও আর অজানা নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা আদৌ বিষয়ীগত কিছু নয়। সেই যে এক শিল্পী বন্ধু একটা সুন্দর ফুল দেখিয়ে বিজ্ঞানীকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, কী সুন্দর ফুল! কিন্তু আপনি তো (কৌতুহল মেটানোর জন্য) এক্ষুনি এর পাপড়িগুলোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে এর সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলবেন’। উত্তরে, মৃদু হেসে বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘আপনি এখানেই ভুল করছেন, বাইরের এই সৌন্দর্যটা আমিও দেখছি, কিন্তু আমরা আরো গভীরে, অণু-পরমাণু স্তরে পৌঁছে এর এক একটা কোষ কীভাবে বিন্যস্ত হয়ে পাপড়িগুলোর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তাও দেখি। আমরা এর ভেতরের সৌন্দর্যটাও দেখতে পাই, আপনি যা কল্পনাও করতে পারেন না’।
কল্পনার কথা যখন এলো তখন বলি, কবি-শিল্পী মানুষেরা মেধার সঙ্গে কল্পনাশক্তির মিশেল দিয়েই শিল্প সৃষ্টি করে থাকেন, এবং তার জন্য তাদের অহমিকাও বর্তমান। তাই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা ‘নির্মাণ’ কথাটা ব্যবহার করেন এবং শিল্পের বেলায় ‘সৃষ্টি’ কথাটা ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। বাস্তবে কিন্তু একজন বিজ্ঞানীকেও প্রাথমিক ভাবে কল্পনায় ভর করেই এগোতে হয়, কল্পনাশক্তি বিহনে কোনো আবিষ্কারই বোধহয় সম্ভব হত না, সম্ভব নয়। রাতের আকাশে যে তারাটির দিকে তাকিয়ে গবেষণায় মগ্ন হন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তাকে কিন্তু কল্পনা করে নিতে হয় যে ওই তারাটি থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছতে কেটে গেছে কত লক্ষ লক্ষ বৎসর! তাহলেই বুঝুন, যেমন ভাবা হয়, শিল্প আর বিজ্ঞান তেমন কোন বিভাজিত জল-আঁট (water tight) কক্ষ নয় মোটেই। আকাশে ওড়ার অদম্য স্বপ্ন যদি না থাকত উড়োজাহাজের নির্মাণ কি বাস্তবে সম্ভব হত! আসলে সাহিত্য-সঙ্গীত-চিত্রকলা ইত্যাদি শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার ক্ষেত্রে যে সৃষ্টিশীলতা ক্রিয়াশীল থাকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনেও সেই একই মানবিক সৃষ্টিশীলতা বর্তমান। এটা বুঝতে না-পারার ফলেই ভুল ধারণা ঘাঁটি গেড়ে বসে মনের কোণে।
সৌন্দর্যের প্রতি, শিল্প-বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং বস্তুতে সৌন্দর্য আরোপ করা এক মানবিক প্রবণতা। যে কোনো সুন্দর বস্তু, মূর্ত কিংবা বিমূর্ত যাই হোক না কেন, মানুষের (মস্তিষ্কের) ওপর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া করে। আনন্দের উপলব্ধি ঘটে। এবারে ‘আত্মা’, ‘ঈশ্বর’ গোছের বিশ্বাসের (যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই) বশবর্তী না হলে এরকম প্রতিক্রিয়া কেন হয়, কিভাবে হয় ইত্যাদি প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে গত্যন্তর নেই। আর ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিল্পবস্তুর কিংবা সৌন্দর্যের আবেদন সৃষ্টিতে মস্তিষ্কের ভূমিকার বিষয়টি। প্রাণের উদ্ভব থেকে শুরু করে সমাজ বিকাশের ধারা তথা মানবিক বৈশিষ্ট ও বৃত্তি সমূহকে (শিল্প ও সৌন্দর্যের প্রতি অনুরাগও তার অন্তর্গত) বিবর্তনের নিয়ম গুলোর সাহায্যে বহুদূর অব্দি অনুধাবন ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি যে বস্তুত পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোকে (laws of physics) অনুসরণ করে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য কেবল এটা দেখানো যে আমাদের সৌন্দর্যের ধারণা (sense of beauty) ‘আকাশ থেকে পড়া’ কিংবা ‘ঈশ্বর প্রদত্ত’ বস্তু নয় আদৌ। বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য দুই মেরুতে অবস্থান করে না, এবং সম্পর্করহিতও নয়। অথচ এই ‘মিথ’ তৈরিতে আজও ইন্ধন যুগিয়ে চলেছেন বহুজনশ্রদ্ধেয় গুণী জনেরাও –অজ্ঞানে অথবা সজ্ঞানে।
এবারে বক্তব্যের সপক্ষে কিছু সাক্ষী-সাবুদ পেশ করা যাক। গর্ভস্থ ভ্রূণেও সঙ্গীতের (music) মূর্ছনা যে সাড়া জাগায় তা আজ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়ও প্রমাণিত (এবং সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতা বোঝাতে এ দৃষ্টান্ত সঙ্গীতপ্রেমীরাই প্রায়শ হাজির করেন)। বিবর্তনবাদ ছাড়া এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব? বিশ্বের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ধ্রুপদী এবং আধুনিক সঙ্গীতের স্বর-বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে গাণিতিক নিয়মানুসারে সেগুলোকে সূত্রবদ্ধ করা সম্ভব। বস্তুত সঙ্গীত এবং কোলাহলের মধ্যে পার্থক্য তো এই যে প্রথমটি সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত; আর দ্বিতীয়টি অবিন্যস্ত, বিশৃঙ্খল। নিসর্গ-চিত্র আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়। তা কি নিরাপদ স্থলভূমির নির্বাচন ও অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়? হিংস্র শ্বাপদকুলের হাত থেকে বাঁচতে প্রজাতি হিসেবে মানুষ যে সমতল ভূমিকেই বাছাই করেছিল সে তো দিনের আলোর মত স্পষ্ট। এই সাক্ষীসাবুদ পেশের অর্থ অবশ্য এ নয় যে শিল্প উপভোগের জন্য এসব বিষয় জানা জরুরি। স্বাদু আহারের স্বাদ গ্রহণের জন্য রসনার অস্তিত্বই যথেষ্ট, রন্ধনপ্রণালী সম্পর্কে জ্ঞান অপরিহার্য নয়। যেমন, স্পর্শের অনুভূতি আমাদের ত্বকে সাড়া জাগায় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে, সে তথ্য জানা না থাকলেও সাড়া জাগে। নদীতে অবগাহনে যে আনন্দ তা যদি কোন অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিকে নদীর উৎস-সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে তাতে অবগাহনের আনন্দ মাটি হয় না নিশ্চয়। একজন বিজ্ঞানী এই অনুসন্ধিৎসা নিয়েই সুন্দরের প্রতি নিবিষ্ট হন, সৌন্দর্যের ঘাতক হিসেবে নয় –যেরকম ভাবা হয়ে থাকে বহুক্ষেত্রে। আইনস্টাইন তাই ভায়োলিন বাজান, বলতে পারেন "Pure mathematics is, in its way, the poetry of logical ideas." জগদীশ চন্দ্র বসু ‘কবিতা ও বিজ্ঞান’ নামে প্রবন্ধ লেখেন, এমন কি একালের বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরও ‘Truth and Beauty’ রচনা করেন।

কাজেই সৌন্দর্যবোধ (এবং শিল্পবোধও) সম্পূর্ণ বিষয়ীগত (subjective) ব্যাপার নয়। একটা বিষয়গত (objective) দিকও বর্তমান রয়েছে। আপাতভাবে বিষয়ীগত মনে হলেও তার মূলে রয়েছে কার্য-কারণ সম্পর্ক (cause effect relation)। এই দিকটা খেয়াল থাকে না বলেই বহু মানীগুণী মানুষও ভুল বোঝেন, ভুল বোঝান। যুক্তির বদলে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেবার জন্যই এমনটা ঘটে। এও ঠিক যে নিরেট যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না, আবেগেরও প্রয়োজন আছে। তবে যে আবেগ বেগ কেড়ে নেয় তা নয়, বরং যে আবেগ জীবনপ্রবাহকে সমাজকে সজীব ও সতেজ রাখে সেই আবেগ প্রয়োজন। যুক্তির, বৈজ্ঞানিক যুক্তি পরম্পরার অবিহনে সে সজীবতা সতেজতা লভ্য নয়। মানবেতর জীব আবেগ-সর্বস্ব, কিন্তু মানুষের চেতনা আছে। মানবিক আবেগ তাই যুক্তি বর্জিত নয়, মানবিক যুক্তিও আবেগশূন্য নয়। বিজ্ঞানে যদি যুক্তির প্রাধান্য, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে-চিত্রকলায় তবে আবেগের প্রাচুর্য। দুয়ে মিলেই সম্পূর্ণ সত্তা। শিল্প ও বিজ্ঞান তাই একে অন্যের পরিপূরক, পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিজ্ঞান রহস্য-উন্মোচন করে সৌন্দর্য হরণ করে না, বরং এক পা এগিয়ে নতুন রহস্যের দুয়ারে এনে দাঁড় করায়। সৃজনশীল মনের জন্য, শিল্পীর তুলির জন্য যেমন, বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের জন্যও নতুন রসদ যোগায়। কেননা, জানার তো শেষ নেই, এক জানা অনেক অজানাকে সামনে নিয়ে আসে।
পৃথিবী জুড়ে আজ চারুকলা ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে, সৌন্দর্যবোধ তথা শিল্পবোধ নিয়ে চিন্তা উদ্রেককারী নানান ভাবনা-চিন্তা, গবেষণা চলছে। যেসব তথ্য উঠে আসছে তাতে সৌন্দর্য ‘বোঝার নয়, উপলব্ধির বিষয়’ –Beauty is to be perceived, not understood – জাতীয় উক্তির ক্লিশে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বিজ্ঞানের নয়া শাখা Computational Aesthetics তৈরি হয়েছে এই বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য। Science of Aesthetics আজ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক স্বীকৃত ও জরুরি বিষয় হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ, কবি, লেখক, নাট্যকার, আবিষ্কারক, ‘The Ascent of Man’ গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানী Jacob Bronowski-র অসাধারণ একটি মন্তব্য উদ্ধার করার লোভ সম্বরণ করা গেল না কিছুতেই – ‘‘We re-make nature by the act of discovery, in the poem or in the theorem. And the great poem and the deep theorem are new to every reader, and yet are his own experiences, because he himself re-creates them. They are the marks of unity in variety; and in the instant when the mind seizes this for itself, in art or in science, the heart misses a beat.”
ওই একটি ‘বীট’ (beat)যাতে ফসকে না যায় তার জন্যই এই ‘অফ-বীট’ রচনা। এছাড়া এ লেখার সপক্ষে আর কোনো কৈফিয়ত নেই।



ব্লগ সংরক্ষাণাগার